আষাঢ়ের গল্পের আল ধরে-৫/ তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য

আষাঢ়ের গল্পের আল ধরে 

তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য 
 পর্ব পাঁচ

গ্রামবাংলার প্রেম

"হৃদয় আমার চায় যে দিতে কেবল নিতে নয়".. .
 ছোট্ট হৃদয় কতকী বয়ে নিয়ে বেড়ায়!সেই মনের বিরাট বড় শতরঞ্জি তে ...কতদিন ধরে কত অলস আশা বিশ্রাম নিচ্ছে আর পান চিবোচ্ছে ...চর্বিত চর্বন।ইচ্ছে করেনা শহুরে মৌচাকের মধ‍্যে বাস করতে।যেতে চাই মনে মনে রোজ আমার ফেলে আসা গ্ৰাম‍্যতা যাকে প্রতিদিন উড়িয়ে দিই নগরের ধুলোর দূষনে ...আমার ছত্রিশ ইঞ্চি বুক  মায়াবী হরিণ ধরতে গিয়ে নাগাল না পেয়ে ক্লান্ত হয়ে যায়।তারপর কী হয়?ঘুম ছাড়া আবার কি?স্বপ্ন কেবল ফেলে আসা অতীত যা দেখা এবং চেখে দেখার কি অপার আনন্দ! কিশোর কিশোরীরা ছাগল চরায় ,গরু চরায় ...এখানে ই তো আছে আসল বৃন্দাবন।কি সরল প্রেম !কি সহজ হৃদয় বিনিময়! এই প্রেমে বিরহ থাকে কিন্তু ভেঙে চুরমার হয়না ..প্রকৃতি ,অরণ‍্য,আর মেঠো প্রেম ..অদ্ভুত সবুজ, অনন‍্য সবুজ।একে অপরের চোখের নেশায় যেন ঘোর লেগে থাকে।ছাগল চরানি মেয়েটি প্রেমিকের জন‍্য নিজেকে কেমন করে সাজায়?ঐ যে ইসমাইল লাঠি ওয়ালা কাঁচের  চুড়ি,আলতা সিঁদুর ,টিপ,মাথার ফিতে ... ধরুন ওর নাম শেফালি ও সব ধার বাকিতে নেয়।এমনকি মাথার বাসনা তেল .. একখান ছোট্ট ভাঙা আয়না ও লুকিয়ে রাখে।ওকে যেদিন খুব ভালো লাগে রাখাল প্রেমিক ...শেফালির দিকে তাকিয়ে গাইতে থাকে "আমি কি তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা...."  শেফালি হাল্কা ধাক্কা মেরে বলে লাও অনেক হয়িছে ..গরু গুলান ভেগি গেল যে!গোবিন্দ এই সুযোগে  সেফালির হাত টা একটু জোরে চাপ দেয়...সেই তরঙ্গে শেফালির বুকে পাহাড়  ওঠা নামা করে।গোবিন্দর এক দৃষ্টিতে তে যেন আষাঢ়  শ্রাবণ এককরে বৃষ্টি নামায়।আগুন  ভিজেও জপজপ করে আকাঙ্খার ,তেষ্টার মেঘে।কতদূরে বিরাট সব নগর!সুসভ‍্য ,সভ‍্যতা ভীষণ যান্ত্রিক অক্ষর  প্রেমে মোড়া,উল্লাসে বাঁধানো।তামাম দুনিয়া জানেনা এলেবেলে প্রেমের গল্প।বৈষ্ণব বৈষ্ণবী  বেরিয়েছে মাধুকরীতে।এরা পরস্পর স্বামী স্ত্রী নয় ,তবে কি প্রেমরোগ এখানে বাসা বাঁধে নি?গ্ৰাম‍্য কুসংস্কার এখানে বাধা দেয় না কি? বয়স হলে এসব আসেনা?না একেবারে ভুল।এ পৃথিবীতে কেউ তো বৃদ্ধ হয়না ...শুধু সংখ্যা ধুঁকতে থাকে,সমাজের লজ্জা ,ভয়  আসলে বর্ম পরিয়ে রেখেছে।কৃষ্ণ প্রেম? না আসলে রক্ত,মাংস ,সুস্থ মস্তিষ্ক সেখানে দুই আর দুই চার যেমন অঙ্ক নগরে তেমন গ্ৰামেও বর্তমান। শহুরে ইগোর কাঁকড়া বিছে গুলোর মাঝে নকশা আঁকা ডানা থাকলেও ওড়া বড্ড কঠিন।ভারী ভয় লাগে,মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে যদি গেঁয়ো স্বভাব ,বেরিয়ে পড়ে যদি আমার ঘুঘনি মুড়ি।উঁকি মারে যদি মাছলজেন্স , চোখ মারে যদি বৃষ্টির দিনে  স্কুল থেকে কচু পাতা মাথায় দিয়ে ঘরে ফেরা।আমার বিনোদন হোক পুতুল নাচ,আলকাপ,রামযাত্রা ,টুসু,ভাদু পরব।আমি পাট ছাড়াবো পুজোর আগে ,পয়সা জমিয়ে লক্ষ্মীর ভাড় ভেঙে নতুন জামা কিনব।আমার ভ‍্যালেন্টাইন উচ্চারণ করতে খুব কষ্ট হয় ...প্রেমের জন‍্য ছাগল চরানো বিস্তৃত মাঠ ,ঘাট,বাবুদের বাগান...আমার পান্তাভাত একটা কাঁচা নঙ্কা নেবু পিয়াজ নিশ্বাস নিয়ে জেগে থাকে।গোবিন্দর গান যেখানে সবুজ অক্সিজেন "ছোট বেলায় গাছ তলাতে পুতুল খেলার ছলনা তে আম কুড়াতে যাইতাম দুজনা রে জরিনা ...আমি কি তোর আপন ছিলাম না"? না ,এখানে রবীন্দ্রনাথ ,নজরুল কেউ নেই.."আমার  পরান  যাহা চায় তুমি তাই গো".. ..এসব গান ওরা জানেনা।এই কথা একটু অন্য ভাবে বলে  " ও রাধে রসিয়া তোমারে কে দিল রঙ মাখাইয়া"।গোবিন্দর হৃদয় শেফালির জন‍্য উপহার দিতে চায়।মুখার্জী বাবুদের বাগান থেকে একটি ডাঁসা পেয়ারা চুরি করে ..হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে ..দেখ দেখ একদম তোর ইয়ের মত...  শেফালি লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠে  ...মাটির দিকে তাকিয়ে বলে ঝাও তো  ঝাও  .....ছোটোনোক ভারী ..ছিঃ ছিঃ  নজ্জা নজ্জা।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
 

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯