আষাঢ়ে গল্পের আল ধরে /পর্ব সাত(রূপের আড়ালে)/তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য


আষাঢ়ে  গল্পের আল ধরে  

পর্ব সাত

রূপের আড়ালে

 তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য 

........আমাদের সুখ দুঃখ গুলোকে আমরা আলাদা   করে বোঝাতে পারি ।
 ইচ্ছে মতন খাবার খেতে পারি   ...ইচ্ছে মতো আবহাওয়া অনুকূলে আনতে পারি ঠান্ডা ঘরে।
কিন্তু যাদের সুখ দুঃখের আলাদা কোনো চেহারা নেই। শুশুকের মতো মাথা তুলে আবার  জলে ডুব মারে। বহুরূপী দের কথা বলতে চাইছি ...বীরভূম ,বর্ধমান হুগলির  গ্ৰামে ,ট্রেনে ,বাসে মফস্বল শহরে এদের দেখা যায়।এরা কেউ কেউ বংশ পরম্পরায় এ পেশায় এসেছে ,কেউ বা কোনো কাজ না পেয়ে এ পেশা গ্ৰহণ করেছে।সারাদিন ঘুরে ঘুরে  সামান্য আয়  এ এদের সংসার চলে।।হুগলী র সুবল দাশ বৈরাগ‍্য  বললেন তিরিশ বছর এ লাইনে আছেন । 40 থেকে খুব বেশী হলে 100 টাকা পর্যন্ত আয় উপায় হয় সারাদিন ঘুরে ঘুরে। একশো টাকার কথা বলতেই বৃদ্ধ সুবলের মুখে চিকচিকে রোদ্দুর খেলে গেল ...100 টাকা মানে লটারী পাওয়া। আসলে এরা ভীষণ গরিব এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট‍্যে নিরীহ মানুষ।সাধারণ ত পৌরাণিক চরিত্রের ভেতর নিজেদের কে সাজিয়ে তোলে।কখন কৃষ্ণ কালী রাম ,সীতা  পুতনা রাক্ষসী, কিংবা আলখাল্লা মজার পোশাক পরে মানুষের কাছে বিনোদন পৌঁছে দেয়।   বীরভূমের বাপ্পাদিত‍্য ঘোষ    অদ্ভুত সেজে মজার ছড়া বলতে লাগল..."মাংস খেয়ে ফেলেনা হাড় তাদের বাড়ি কিণ্ণাহার" টিপির টিপির জল পড়ে লিচু বাগানে ,একটা লিচু পড়ে গেল চায়ের দোকানে ,ও চাওলা এ দিকে এসোনা ?স্টেশনে বউ এসেছে দেখতে চল না ?",   " গিজিগা  গিজাং গিজাং গিজাং  জামাই এল কামাই করে  খেতে দেবো কী ? দাও গো গিন্নি মুড়কি ভেজেছি "     মুড়ে বাসে বোলপুর চলে যাবো লাভপুর ,এই খানেতেই শেষ চলে যাবো লিজের দেশ "....এদের সব ছড়া গুলো প্রচলিত বা অঞ্চল ভিত্তিক ...  কিন্তু তাহলেও ছড়াকারের সঠিক নাম জানা যায়না।কিন্তু প্রত‍্যেক বহুরূপী র ছড়া খানিক টা এক ই ধরনের।এর ভেতর থেকে উঠে আসে তাদের ব‍্যক্তিগত জীবনের দুঃখ বা দারিদ্রের কথা।  যখন এরা কালী বা রাম সীতা সেজে দুয়ারে দুয়ারে যায় ..কেউ কেউ ছড়া বলেনা রঙ্গ রসিকতা করেনা , গৃহস্থের দুয়ারে গেলে এরা বেশ আদর পায়  ...তাদের ঈশ্বরের  প্রতীক রূপে দেখা হয় ...চাল ডাল অল্প টাকা পায়।  এরা যে রঙ  মুখে মাখে তা অত‍্যন্ত নিম্নমানের .... আজকাল বর্ধিত মূল‍্যের জন‍্য দামী রঙ কিনতে পারেনা বহুরূপী রা ।
আমাদের বাংলার লোকসংস্কৃতির অঙ্গ এই বহুরূপী রা। গ্ৰামীন লৌকিক শিল্প চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। বীরভূমে গেলে ট্রেনে বাচ্চা ছেলে দের এই সাজে ভিক্ষা করতে প্রায় দেখা যায় ... ।
 বয়স্ক মানুষ যারা এ পেশায় আছেন  এই সামান্য আয়ের উপর তাদের সংসার চলে ।বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার করে। জীবিকা র ভেতর থাকতে থাকতে তা আসলে তাদের রক্তে মিশে গেছে   ,যখন তারা যে চরিত্রে থাকে  তার ভেতরে একবারে একাত্ম হয়ে যায়। বছরে দু মাস বর্ষার সময় এদের কাজ থাকেনা ...ধার বাকি করে সংসার নির্বাহ করতে হয়। কেউ কেউ তখন রাজমিস্তিরির কাজ বা ক্ষেত খামারের অল্প সল্প কাজ পেলে করে। হয়তো পরবর্তী প্রজন্ম কে এরা এই অনিশ্চিত জীবনে আনতে চায় না।

বর্তমানের এই বন্দী জীবনের সংকট কালে অসহায় দরিদ্র মানুষ গুলো কেমন করে বেঁচে আছে কে বা জানে ?  সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো অনুদান কেউ সে ভাবে পায়নি ।আমার মনে হয় এই লোক শিল্প আমাদের সমাজের অলঙ্কার প্রাচীন শিল্প কে বাঁচিয়ে রাখার খুব দরকার।  বর্ধমানের তারা সুন্দরী বলছে "নামুনেরা আমার নাম দিয়েছে খেপি গো খেপি
আমি বর্ধমানের রাজার একমাত্র ছেলের বউ আমার নাম তারা সুন্দরী  ..আমি বাছা ন তলায় ছ তলায় দশ তলায় বাস করি।আমার শ্বশুর ভালো বেসে আমার জন্যে বর্ধমান থেকে উকুনের চারা এনেছিল  ...তোলে আর হু হু করে মারে  ,তোলে আর হু হু করে মারে,.।  দাঁত করেছি ছোলা আমার বন্ধুর নাম রেখেছি মুড়ি ভাজার খোলা।হেঞ্চার শাক তুলতে গেলাম ,পড়ে গেলাম পা পিছলে দেখলো ভাসুর তুললোনা, তোর  ভাইয়ের ভাত খাবোনা।আরে বিড়ি খেয়ে ফেলেনা পুঙা তাদের বাড়ি তালডোঙা।
আরে ভাবের বন্ধু কল টিপে দাও কলকাতা যাব ,আরে কলকাতার জল টলমল পশ্চিমে যাব । হাট গেলাম বাজার গেলাম কিনে আনলাম চিঁড়ে ,চিঁড়ে খেয়ে বোদের মা মারলো মাথায় পিড়ে"।এরা প্রত‍্যেকেই পুরুষ ... আর এটাই তাদের রুজি  রোজগারের একমাত্র পথ । 
বর্তমান আর্থ সামাজিক পরিস্থিতি আর করোনার করাল গ্ৰাসে এই মানুষ গুলো কেমন আছে  কী খাচ্ছে ?    এরা কিন্তু দেখলে বোঝা যায় এক এক জন দক্ষ অভিনেতা ...কী সুন্দর করে প্রত‍্যেক চরিত্রের ভেতর প্রাণ প্রতিষ্টা  করে। একটু যদি ওদের ছড়া গুলো বিশ্লেষণ করা য়ায় তাহলে বোঝাযাবে   কী চরম দারিদ্র্য কী অভাব এই মানুষ গুলোর  ! সকলকে আনন্দ দিয়ে প্রদীপের মতো নিজের বুকে র দিকে তাকিয়ে দেখে শুধু অন্ধকার  ।মাটির চালা ঘরে বর্ষা কালে  প্লাস্টিক পেতে একদিক ভেজে তো একদিক শুকোয় ।আমফানের ঝড়ে সে সম্বল টুকু হয়তো তারা হারিয়েছে। এক মানব জন্মে কেউ পৃথিবীর সব রূপ রঙ রস ,নিঙড়ে নিচ্ছে ,হাওয়ায় ওড়াচ্ছে আত্ম অহংকার  ।কাউকে প্রতিদিনের বাঁচাটা হিসেব করে বাঁচতে হচ্ছে। ....একটা লোকগান খুব মনে পড়ছে " মানুষ হইয়া  জন্ম লভিয়া মানুষের করিলাম কী "?

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯