যেতে যেতে পথে -৩৩/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান

পর্ব ৩৩

একদিন বাবলির সঙ্গে মেডিলিংক এর বাসে চড়ে কুইন হাসপাতাল গেলাম। এই হাসপাতালেই দীপ কাজ করে। এখানেই বাবলির ডেলিভারি হবে, তাই চেকআপে এসেছে।  নির্দিষ্ট রুমে গিয়ে দেখা গেল গর্ভবতী মায়েরা অপেক্ষা করছে। কারো সঙ্গে স্বামী ও ছেলেমেয়ে রয়েছে, কারো সঙ্গে পার্টনার রয়েছেন। কিছুক্ষণ পরে দীপের দেখা পেলাম। ও সময় মত এসে বাবলিকে নিয়ে গেল। ফিরে এসে জানালো ডাক্তার সিজার করতে রাজি হয়েছেন। ডাক্তারকে বলেছে ও খুব মানসিক চাপে আছে, তাই ডাক্তার রাজি হয়েছেন। ডেট দিয়েছেন ১ এপ্রিল। এদেশে মহিলাদের সাধারণত স্বাভাবিক ডেলিভারি হয়। বিশেষ কোনও সমস্যা ছাড়া সিজার করা হয় না। তাই ডাক্তার সিজার করতে রাজি হয়েছেন বলে মেয়ে খুশি।
      বাবলি সব গোছগাছ শুরু করল। আমি রোজ ওর পছন্দের খাবার রান্না করার চেষ্টা করছি। সত্যি কথা বলতে, এখানে রান্না করে বেশ আনন্দ আছে। কারণ নটিংহামে সমস্ত ধরণের মশলা ও সেরা শাকসবজি মাছমাংস পাওয়া যায়। ইলিশ মাছগুলো বেশ বড় আকারের, দেখেই মন ভুলে যায়। এছাড়াও চুনোমাছ, পাবদা, কই, পোনা, চিংড়ি, সবই পাওয়া যায়। সীলকরা সচ্ছ পলিথিন প্যাকেটে  একসঙ্গে ফ্রোজেন সাইজ করে কাটা কচুরলতি, ছোট চিংড়ি ও কাঁঠালবীচি পাওয়া যায়। 
      মাঝে মাঝে মনখারাপ হলেও আমার বেশ ভালই লাগছে। কতকিছু জানছি, চিনছি। তবে খান সাহেবের খুব একটা ভাল লাগছে না। আসলে এদেশ সম্বন্ধে আমাদের তেমন কোনও ধারণা ছিলনা। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ আলাদা। আড্ডা দেওয়ার মত এদেশে যত্রতত্র পান সিগারেট, বা চায়ের দোকান নেই। মেলামেশা করার মত লোক নেই, সারাদিন বাড়িতে আটকা থাকতে কার ভাল লাগে? আমি তো এসেই ল্যাপটপে পেপার পড়তে, সিরিয়াল দেখতে শিখে গেছি। ওনাকেও শিখে নিতে বললাম। তাহলে পেপার পড়ে সময় কাটাতে পারবেন। তবুও  ঘরে বন্দি থাকাটা ওনার পক্ষে সুখদায়ক ছিলনা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে  মস্ত একটা কারপার্ক। এখানে শনি ও রবি, সপ্তাহে দুদিন ছুটি(ডাক্তারদের নয়)।  বিকেল ৫ টাতে সমস্ত শপিংমল ও বিভিন্ন কোম্পানির কঞ্জুমারস স্টোর বন্ধ হয়ে  যায়। রবিবার সম্পূর্ণ বন্ধ। খোলা থাকে রেস্টুরেন্ট ও পাবগুলি। জানালা দিয়ে একটা পাবও দেখা যায়। শুক্রবার বিকেল থেকেই পাবে লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়। দেখে মনে হত এদেশে চার্চের থেকে পাবে মানুষজন বেশি যান। খান সাহেব  কোয়ার্টারের সামনে হাঁটাহাঁটি করেন। মাঝে মাঝে আমিও ওনার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা সময় ফুটপাত ধরে বেড়িয়ে আসি।  চারিদিকে কী মনোরম দৃশ্য! উঁচুনিচু রাস্তার দুইধারে কত রকমের ফুল ফুটে রয়েছে। ‘আগাছা’ বলে কিছু নেই, শুধু ফুল। কেন জানিনা সবসময় আমার মনে হত আর একটু এগিয়ে গেলেই নদীর দেখা মিলবে।কিন্তু সেটা আমার কল্পনা ছিল। এই শহরে ট্রেন্ট নামে একটি নদী রয়েছে।পরে দেখেছি। শহরটা সমতল নয়। বাড়ি বানানোর সময় এদেশে সম্পূর্ণ  জমিটিকে সমান করা হয় না। যার কারণে সব রুমের মেঝে এক লেবেলে হয় না। মানুষজন ফুটপাত ধরেই হাঁটেন। ফুটপাতটি সাদা বর্ডার দিয়ে দু’ভাগে ভাগ করা। যে ভাগটিতে পায়ের ছাপ আঁকা রয়েছে, সেই অংশটি মানুষ চলাচলের জন্য। আর যে অংশে সাইকেল আঁকা রয়েছে, সেটা সাইকেল যাতায়াতের জন্য।
      এখানকার আবহাওয়ার স্বভাব কেমন যেন খামখেয়ালি। ঠাণ্ডা তো আছেই, তার ওপর এই রোদ্দুর পরক্ষণেই বৃষ্টি। আবার আকাশ পরিষ্কার থাকলে বরফও  পড়ছে। গত রাতেই(২২/০৩/০৮) বরফ পড়ছে দেখে বাইরে বেরিয়ে খুব ছবি তুলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে নিজেকে সংযত করলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম নিমেষে কেমন বাড়ির ঢালু ছাদে(বরফের জল গড়িয়ে পড়ার  জন্যই ছাদগুলো ঢালু করা হয়েছে), গাড়ির ওপর বরফ জমে সাদা হয়ে গেল।পরের দিনও বরফ পড়তে সুরু করলে মেয়ে বলল, চল মা, তোমার ছবি তুলেদি। তখন ঘড়িতে সময় ৮ টা। লনের সবুজ ঘাসগুলো বরফে ঢেকে সাদা হয়ে গেছে। ওপর থেকে ঝরে পড়া তুলোর মত বরফগুলোকে আলোর বিন্দুর মত দেখাচ্ছে।
      এখানকার পায়রাগুলো হাঁসের সাইজের, কাঠবিড়ালিগুলো নেউলের মত বড় বড়। কুকুরবিড়াল রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় না, সবই পোষা। একদিন এক ব্রিটিশ মহিলা একটি চিঠি গলিয়ে দিয়ে গেলেন। হাতে নিয়ে দেখি বিড়ালের ছবি, ফোন নাম্বারসহ চিঠিতে লেখা রয়েছে, কয়েকদিন হল এই বিড়ালটি পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ যদি দেখে থাকেন, তাহলে আই নাম্বারে ফোন করে যেন জানানো হয়।বুঝলাম এরা এদের পোষা জীবজন্তুকে কতখানি ভালবাসেন। এঁদের খুব একটা  একা হাঁটতে দেখা যায় না, সঙ্গে কুকুর থাকে। আমাদের দেশেও সাহেবদের অনুকরণ করে পোষা কুকুরের চেন হাতে ধরে অনেকে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। তারা  যত্রতত্র মলত্যাগ করে(এই নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বাকবিতণ্ডাও হয়)। পরের যে কাজটি সাহেবরা নির্দ্বিধায় করে থাকেন। সেটি হল,পকেট থেকে পলিথিন বের করে সেই মল তাতে ভরে হাতে ঝুলিয়ে হাঁটতে থাকেন। তারপর ফুটপাতের ধারে নির্দিষ্ট বিনে ফেলে দেন। সব নাগরিক পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতন বলেই এসব শহর এত পরিষ্কার ও সুন্দর।
    আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা ভাল লাগছিলনা। ঠাণ্ডা লেগেছে, সামান্য জ্বর জ্বর ভাবও রয়েছে। তবুও উঠে রান্নাঘরে গেলাম, আজ দীপের ছুটি। কাল থেকেই প্ল্যান করা আছে ব্রেকফাস্টে ডালপুরি ও আলুরদম হবে। সেগুলোই বানাতে শুরু করলাম। ওরা খুব আনন্দ করে খেল। যখন জানল আমার শরীর খারাপ, তখন আর আমাকে কোনো কাজ করতে দিলনা। ওরা দুজনে মিলে ভাত আর মাংসের ঝোল বানাল। দীপও ভাল রান্না করতে পারে, এটা কলকাতায় শেখা।
      রোজই প্রায় দেশে ফোন করে খবর নিচ্ছি। বকুলকে, ওর মামাদের, যাকে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে এসেছি, প্রত্যেককেই ফোন করি। আজ ২৭ মার্চ। দীপ হাসপাতাল থেকে ফিরলে আমাদের রুমে বেশ জমাটি আড্ডা হল। খাওয়া, সিনেমা  দেখা, নানারকম বিষয়ে গল্প ও আলোচনা হল। এদেশে কেউ সাহায্য না চাইলে উপযাচক হয়ে সাহায্য করতে গেলে তিনি বিরক্ত হন, এটা অভব্যতা। পার্কে বা অন্য কোথাও ওপরিচিত ছোট্টবাচ্চাকে গালটিপে বা স্পর্শ করে আদর করা নিষেধ। এখানে পার্টি মানে একসাথে মিলিত হয়ে নিজের নিজের টাকা খরচ করে খাওয়া। তেমন হলে বিনা পয়সায় মদ খাওয়াতে পারে। এমন কী কারো বাড়িতে নিমন্ত্রণ থাকলে নিমন্ত্রিতরা সবাই বাড়িতে রান্না করা বা কেনা খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যান। আমরা যেমন কারো বাড়ি গেলে মিষ্টি নিয়ে যায়, এখানে নিয়ে যায়  মদের বোতল বা চকোলেট। বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্রে কেউ বা বিশেষ কোনো জিনিসের নাম উল্লেখ করে  লিখে দেন উপহার হিসেবে আমি আপনার কাছে এই জিনিসটি আশা করছি। কিম্বা নির্দিষ্ট কোনো দোকান বা শপিংমলের নাম উল্লেখ করে  লিখে দেন ওখানে আমার পছন্দের জিনিসের লিস্ট দেওয়া আছে, আপনি যে জিনিসটি দেবেন তার নিচে টিক দিয়ে আপনার নাম লিখে দেবেন। তখন নিমন্ত্রিতদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, কে সবার আগে পৌঁছে সবচেয়ে কমদামি উপহারটি নিতে পারেন। এমনই আজব নিয়ম এখানে।
    ২৮ মার্চ দীপের ছুটি ছিল, তাই তিনজনে সিটি সেন্টারে যাওয়া ঠিক হল,  কিন্তু ওদের দুজনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়েছে কিসে যাওয়া হবে? গাড়ি থাকলেও লাইসেন্স নেই। দীপ ট্যাক্সিতে যেতে চায়। বাবলি অযথা বেশি টাকা খরচে রাজি নয়, ও বাসে যেতে চায় এবং সেটাই হল। খান সাহেবকে বাড়িতে রেখে আমরা তিনজনে ওদের ভাবি কন্যার জন্য শপিংএ গেলাম। প্রচুর জিনিসপত্র কেনা হল। ভারতীয় মুদ্রার হিসেবে ১ লাখ টাকার ওপর হবে। তবুও বেবিকট, কারসিট, প্র্যাম বাকি থাকল, আগামীকাল কেনা হবে। এদেশে মেয়ে শিশুদের জন্য হাল্কা গোলাপি রং আর ছেলে শিশুদের জন্য নীল রং নির্ধারিত। ৪ মাসের গর্ভাবস্থায় ডাক্তার বলেছিলেন, মেয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এরা সেটা বিশ্বাস করেই মেয়েদের সমস্ত জিনিস কিনছে। যদি ছেলে হয়, তাহলে ওরা যে কী করবে জানিনা। 
                                      ক্রমশ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯