আষাঢ়ে গল্পের আল ধরে -৮/তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য।

আষাঢ়ে গল্পের আল ধরে 

তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য

পর্ব -৮

উপচে পড়া শব্দ ভান্ডার 


 মনে আছে সেই  গল্পটা? তখন হতে  সরি সরি করছিস বাবু, তাবাদে সরছিস নাই কেনে?

আসলে প্রচন্ড  ভিড় বাসে ঝাঁকুনিতে আদিবাসী  এক মহিলার গায়ে ধাক্কা  লেগে যাচ্ছে বারবার  বলে ভদ্রলোক খালি Sorry  sorry  বলছেন।

 আমি  ভাবি ছোটবেলায় আমিও  sorry  বলতে শিখলাম যখন, তখন প্রয়োগ  করতে  বেশ ভালোই লাগতো। নিজেকে বেশ বড়োদের মতো মনে হতো।

 sorry, thank you, no, yes, okay, weather, Nature, behavior,acutely,  এরকম  বহু  শব্দ শুধু  ইংরেজি  শব্দ বলে আর চিহ্নিত  করা য়ায় না। এ যেন সব দেশের ভাষার আপন ভাষা। যারা লেখাপড়া  জানেনা তারাও এসব বলে। একবার  ট্রেনে চা ওলার পাত্রটা আমার  গায়ে লেগেছিল। আমি  কিছু  বলিনি ও বুঝতে পেরে বললো ছরি ম‍্যাডাম।

বই এ তো সারাজীবন  ধরে কতকিছু  পড়েছি তা কী আর সবসময়  ইউজ করি? এই যে use বলে ফেললাম।আমি তো ভাবিনি আমি  ইংরেজি বলছি।

 কোনো  দেশের কোনো  ভাষা নিজস্ব শব্দে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। আমাদের  মুখের ভাষা লেখার ভাষা তো এক নয়। চলতি কথায় অনেক পরিযাযী শব্দ আমরা ব‍্যবহার করি অবচেতন ভাবে। যেমন ধরুন দু জনের কথোপকথন " ও রিনা তুমি  দিল্লিতে হঠাৎ  কী ব‍্যাপার ?  really  কী ভালো  লাগছে তোমায় দেখে। হ‍্যাঁ  বিজনদা মেয়ে এখানে  transfer  হয়ে এসেছে এমস্ এ জয়েন করেছে। 

Wonderful  রিনা তুমি  প্রাউড মাদার। আর তোমার  ছেলে কী করছে বিজনদা, বৌদি কেমন আছে? আমার  ছেলে কলকাতা  আই আই এম জোকা তে পড়ে। ওরে ব্বাবা তোমার  ছেলে মাস্টার পিস, তুখোড়।  দেখ  রিনা আজকালকার  বাচ্চারা সবাই  ব্রিলিয়ান্ট।  তোমার  বৌদি স্কুল নিয়েই  মজে আছে। তা বলি তুমি  তোমার বর এবং  কন‍্যাকে নিয়ে একদিন আমাদের  বাড়িতে  এসো "চায়ে পে চর্চা" মে  কেমন? নিশ্চয় যাব বিজনদা এদিকটা একটু   সামলে নিই। মেয়েটা খুব বিজি থাকে। ও এতো পেরে উঠবেনা। ওকে রিনা চলি বাই।"

 বিশেষ  করে লক্ষ্য  করলে দেখা যায় আজকাল যেন ভাষাটা বেশি খিচুড়ি  হয়েগেছে। কেউ কাউকে হয়তো একটু সেজেগুজে দেখলো, প্রশংসা  করবে ঠিক  এরকম "বাবা তুমি  ভীষণ  সুন্দর  লাগছো"।

 আমি  যখন প্রথম ধানবাদে যাই ওখানকার  বাঙালি দের বাংলা শুনে খুব  হাসতাম।

একজনের সঙ্গে রাস্তায়  দেখা। তার সঙ্গে তার মাসি আছেন ওদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে।আমাকে পরিচয় করাচ্ছে "উনি আমার  মাসি লাগেন"। আমি  তো আকাশ থেকে পড়লাম মাসি আবার  কেমন করে লাগে?। আরেকজন  বলেছিলেন উনি আমাদের ল‍্যান্ড লর্ড হচ্ছেন। মানে এখনো হয়নি হচ্ছেন ধীরে  ধীরে। অদ্ভুত  বাংলা।  অনেকেই  বলেন বিন্দাস আছি। এ সব শব্দ আমরা  আগে তেমন প্রয়োগ তো করিনি। কথায়  কথায় তুই কোন হরিদাস রে, তোর কথা মানতে হবে।? বিন্দাস এ তো হিন্দি শব্দ কিন্তু  এখন তো বাংলা তে বাসা ভাড়া নিয়েছে । ফেসবুক, হোয়াটসঅ‍্যাপ, টাইমলাইন, নেট, মেইল, এ তো এখন আদরের বাংলার জামাই শব্দ হয়ে গেছে। আবার  হালে পানি পেয়েছে লকডাউন, করোনা, 

মাস্ক,স‍্যানিটাইজার, জীবন নয়ছয় করে দিয়েছে এইকটি ইংরেজি শব্দ। লাভ এবং  সেক্স এই দুটি  শব্দ এখন পাশাপাশি  বাংলা  ভাষা দখল করে আছে। যেন এই শব্দের  বাংলা  বললে অসম্মান  হয়ে যায়।

না আছে মানুষের  অনুভব না আছে হৃদয়বোধ।

সহজেই  সব কিছু  ধরা যায়। আসলে আমাদের  সময়   শীতের ফুলকপি বাঁধাকপি, কমলালেবু, অন‍্য সময়ে পাওয়া  যেতনা। আপনি এখন ইচ্ছে করলেই শীতকালে আম খেতে পারেন। স্বাদ গন্ধ থাক আর না থাক।

"মেঘ না চাইতেই জল"  তাই কোনো জিনিসের  মূল‍্য নেই। সব হাতের কাছে চলে আসে পয়সা থাকলেই হলো। আজকাল  আর কেউ  বই পড়ছেনা, চোখের মাথা খেয়ে ইবুক পড়ছে।

বিশ্বায়নের  জোরে প্রাচ‍্য পাশ্চাত্যের  মিশ্র  সংস্কৃতিকে আমরা ছুঁতে পারছি। এটা খুব  আশার দিক।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯