যেতে যেতে পথে-৩৪/রোশেনারা খান

যেতে যেতে পথে

রোশেনারা খান

পর্ব ৩৪

আজ ৩১ মার্চ, দীপের নাইট ডিউটি। তাই ওরা প্র্যাম কিনতে গেছে। আমি রান্না করতে করতে নানারকম কথা ভাবছি। এখানকার মানুষ, মানে ব্রিটিশরা আমাদের মত রান্না-খাওয়ার পেছনে এত সময় খরচ করে না। কৌটোবন্দি খাবার গরম করে খায়। বাকি অনেক খাবারই তৈরি কিনতে পাওয়া যায়। মাংসের মধ্যে মাখন,  সস, নুন,ইত্যাদি মাখিয়ে বেক করে খেয়ে নেয়। সবজি খায় সেদ্ধ করে মাখন,নুন, স্‌স, ইত্যাদি দিয়ে। কফি, ফ্রুটজুস তো থাকেই। আমাদের দেশের মত রাস্তায় জলের কল নেই। রেস্টুরেন্টে লাইন দিয়ে খাবার নিতে হয়। জলের বোতল কিনে নিতে হয়। আমাদের দেশেও আনেক রেস্টুরেন্টে বোতলবন্দি জল দেয়, কোথাও বা  কিনে নিতে হয়।
    এখানে নারী পুরুষের কাজ আলাদা বলে কিছু হয়না। নারী পুরুষ উভয়েই সব রকম কাজ করে থাকেন। পুরুষরা মহিলাদের মত ঘর সামলানো , বাচ্চা সামলানো, খাবার রেডিকরা, ইত্যাদি ইত্যাদি সবই করেন। তেমন মহিলারাও পুরুষের মত  বাস চালাচ্ছেন। নিজেরাই গাড়ি পরিস্কার করছেন। লনে ঘাস ছাঁটছেন। পেট্রলপাম্পে, রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের কাজ করছে্ন, দৈনিক মজুরিতে অন্যের বাড়ি, বাগান পরিস্কার করছেন। যে কাজই করে থাকুন না কেন, এরা যথেষ্ট শিক্ষিত। এদেশের মানুষ কোনও কাজকে ছোট মনে করেন না। পকেট  মানির জন্য শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অন্যের ঘর পরিস্কার বাগান পরিস্কার করে। আমাদের দেশের মত ডাক্তারের ছেলে ডাক্তার না হলে বাবা মায়ের মান থাকেনা, এমন মানসিকতা এদের নয়। ডাক্তারের ছেলে বাস ড্রাইভার, এমনও দেখা যায়। ছেলে মেয়ের উচ্চশিক্ষার জন্য বাবা মা বাধ্য থাকেন না। প্রয়োজনে ছেলেমেয়ে বাবা মায়ের থেকে লোন নিতে পারে। এরকম আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যা আমাদের সঙ্গে মেলে না। এর সবগুলোই যে ভাল মনে হয়েছে, তা কিন্তু নয়।
      আজ সেই বিশেষ দিন, ১ এপ্রিল। গতকাল দীপের নাইট ডিউটি ছিল, ও হাসপাতালেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে বলেছে। বাবলিকে ১০ টায় সিজারের  সময় দিয়েছে। গতকালই ট্যাক্সি বুক করে রাখা হয়েছিল। ৮টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। সাড়ে ৭ টায় গাড়ি নিয়ে এলেন একজন বয়স্ক কাশ্মীরি ড্রাইভার। এ শহরে প্রচুর কাশ্মীরি ড্রাইভার রয়েছে। রেডিই ছিলাম,তখুনি আমরা কুইন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ২৫/৩০ মিনিট সময় লাগে। খান সাহেব  স্বভাব বশে ড্রাইভারের সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলেন। নার চেহারা বিশাল, টকটকে ফর্সা গায়ের রং। উর্দুতে কথা বলছিলেন, উর্দুর সঙ্গে হিন্দির কিছুটা মিল থাকায় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না। উনি বললেন, ওনার বাড়ি আজাদ কাশ্মীরে।  মানে আমরা যেটাকে পাক অধিকৃত কাশ্মীর বলে থাকি। কথায় কথায় খান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, এই যে কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ, এবিষয়ে আপনার কী মত? কী চান আপনারা? বেশ তেজের সঙ্গে বৃদ্ধ বললেল, আজাদি, হাম লোগোকো আজাদি চাহিয়ে। আমরা ভারত বা পাকিস্তান কারো সঙ্গেই থাকতে চাইনা। ওরা কেওই আমাদের ভালো চায়না। স্বাধীনতা চাই আমরা।
      ৮টার আগেই আমরা কুইন হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। দীপকে ফোন করে তিন তলায় ২৯ নং ওয়ার্ডের সামনে পৌঁছাতে করিডরে আমাদের বসিয়ে দীপ বাবলিকে নিয়ে ওয়ার্ডের ভিতরে চলে গেল। ১০টার আগে ওটি খোলে না। কোনো ইমারজেন্সি কেস না থাকলে বাবলিরই প্রথমে সিজার হওয়ার কথা। কী হয়? কী হবে? জানিনা। আমরা দুটি মানুষ বসে বসে ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছি, ছেলে বা মেয়ে যেই আসুক না কেন, মা ও সন্তান যেন সুস্থ থাকে। কিছুক্ষণ পরে দীপ বেরিয়ে এসে জানালো, ও চার্জ বুঝিয়ে দিতে যাচ্ছে, আমরা যে কেউ একজন ভিতরে যেতে পারি। আমি ভিতরে গিয়ে দেখলাম বাবলি ছাড়াও আরও তিনজন মা এই ওয়ার্ডে রয়েছে। প্রত্যেকের বেড ভারি পর্দা দিয়ে ঘেরা রয়েছে। বেডের সঙ্গে কতরকম যন্ত্র লাগানো রয়েছে। নিজের ইচ্ছে মত বেড ভাঁজকরা, নড়ানো যাবে।কাউকে ডাকার প্রয়োজন হলে ইন্টারকম আছে। বাচ্চার কট, টেবিল,  ভিজিটরদের বসার জন্য দুখানা চেয়ার, ইত্যাদি রয়েছে। আমি বাবলির পাশে চেয়ারে বসলাম।

      মিড ওয়াইফ এসে বাবলির ড্রেস চেঞ্জ করিয়ে বেডে শুইয়ে দিল। ওর রিষ্টে নামঠিকানা লেখা ট্যাগ আটকে দিল। বাবলির সঙ্গে কথা বলতে বলতে উনি  ওনার কাজ করে চলে গেলেন। আমরা মা মেয়ে কথা বলছি হঠাৎ চেনা চেহারার এক যুবক ওয়ার্ডে ঢুকে আমাকে হ্যালো বলে বাবলিকে জিজ্ঞেস করলেন আমি ওর মা কিনা। তারপর অনেকক্ষণ ধরে বাবলিকে প্রশ্ন করলেন এবং কী সমস্ত বুঝিয়ে চলে গেলেন। মেয়ের কাছে জানলাম, ছেলেটি সাউথ ইণ্ডিইয়ান। এই হাসপাতালের  একজন এনাস্থেটিস। দীপ চার্জ হ্যান্ডওভার করে এসে জানালো, ইমারজেন্সি  পেসেন্ট আছে, তাই বাবলির ১২ টার পর হবে। ভাবলাম ভালই হবে। এখানে এপ্রিলফুল করার বা হওয়ার সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তাই এদের কথা বা প্রথা অনুযায়ী ১২টার পর ‘এপ্রিলফুল’ হওয়ার সম্ভাবনা রইল না। কথাটা মজার ছলে ভেবেছিলাম। যদিও আমি ওসব মানি না। খান সাহেব একা বাইরে বসে আছেন, তাই আমি বেরিয়ে এসে সঙ্গে নিয়ে আসা কফি ফ্লাক্স থেকে ঢেলে বিস্কুট দিয়ে দুজনে খেলাম। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে  হবে তা তো জানিনা। ঘড়ির কাঁটায় চোখ রেখে চুপচাপ বসে আছি দুজনে।

      ১১ টার দিকে দীপ এসে আমাদেরকে নিচে কফিসপে নিয়ে গেল। কিছু খেতে ইচ্ছে করছিল না। দু’প্যাকেট চিপস, আর একটা কেক জাতীয় জিনিস হাতে দিয়ে বলল, এটা খান ভাল লাগবে। খাবার এখানে অনেকরকম রয়েছে, কিন্তু সবই ব্রিটিশ খাবার। এক বোতল ফ্রুটজুসও এনে দিয়েছে। এদিকে নিজে কিছু খাচ্ছে না। বার বার বলাতে একটুকরো চিপস মুখে দিয়ে বলল, আপনারা এখানেই বসুন।  ১২ টার দিকে আপনারা ‘ডেলিভারি সুইট’এর সামনে এসে দাঁড়াবেন। তার আগে যদি বাবলিকে ওটিতে নিয়ে যায়, আমি ফোনে আপনাদের জানিয়ে দেব।

    কিছুক্ষণ পরে আমরা এখান থেকে উঠে পড়লাম। হাসপাতালের স্টাফ, ভিজিটর, বহু মানুষ ভিড় করে খাবার খাচ্ছে। কেউ কেউ এখানে বসে এককাপ  কফি নিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা খাবার খাচ্ছেন টেবিল চেয়ারে বসে। আমরা আর একটা জায়গায় কিছু মানুষকে বসে থাকতে দেখে আমরাও খালি চেয়ার দেখে বসে দীপের ফোনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। বসে বসে দেখছি, আর ভাবছি এ যেন আর এক দুনিয়া! বিচিত্র জীবনযাত্রা। সামনের করিডোর দিয়ে লোকজন যাতায়াত করছে। হাসপাতাল বলেই অশীতিপর বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা তাঁর থেকেও অথর্ব জীবনসঙ্গীকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গে ছেলে মেয়ে বা অন্য কোনও আপনজনকে দেখছি না। অনেক অসুস্থ, অথর্ব মানুষ একাই এসেছেন হুইল চেয়ারে করে। মনে মনে ভাবি এদের ছেলে মেয়েদের বাবা মায়ের প্রতি কোনো ভালবাসা, দয়ামায়া নেই!
    অবশ্য এরা সবাই স্বামী স্ত্রী নাও হতে পারেন। অনেকে অনেকের পার্টনার। এই পার্টনারদের মধ্যে বয়সের সামঞ্জস্য থাকতেই হবে, তা কিন্তু নয়। অল্প বয়সী পুরুষের অনেক বেশি বয়সের পার্টনার। আবার অল্প বয়সি মহিলার পার্টনারের বয়স অনেক বেশি। এঁদের সন্তানের পিতৃ পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। অনেক সময় দেখা যায় একজন মহিলার একাধিক সন্তানের একাধিক বাবা। এদের বেশি ছেলে মেয়ে হলে খুব ভাল। বিশেষ করে যারা কোনো কাজ না করে শুয়ে বসে জীবন কাটাতে চায়। কারণ এদের সন্তানদের জন্ম থেকেই সরকার তার খাওয়া পরার জন্য ভাতা দিয়ে থাকে।  চিকিৎসা ও পড়াশোনার যাবতীয় করচ সরকার দেয়। তাই অধিক সন্তান হওয়া মানে অধিক পরিমাণ ভাতা পাওয়া। সেই  ভাতাতে মা বাবারও খরচ চলে যায়, তাদের কোনো কাজ করতে হয় না। আমাদের গরিব দেশে মানুষ আয়ের জন্য গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পোষে। আর এরা সন্তান পোষে। কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! উপমাটি শুনতে খারাপ লাগলেও, এটাই বাস্তব। দুটোর সময় দীপ এসে জানালো,এখন একঘণ্টা ধরে ওটি পরিষ্কার করা হবে। তারপর বাবলিকে ওটিতে নিয়ে যাবে।
    আমি যেটুকু দেখেছি, জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে এঁরা সাম্যবাদে বিশ্বাসী। এখানকার  মন্ত্রীরা বডি গার্ড নিয়ে ঘোরেন না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে লাইন দিয়ে টিকিট কাটেন। ডাক্তার দেখানোরও সুযোগ পান ক্রমিক নং অনুযায়ী। আজকের অভিজ্ঞতা, আমার মনে হওয়াকে বিশ্বাসে পরিণত করল। যখন দেখলাম, দীপ এই হাসপাতালের একজন গাইনোকলজিষ্ট হওয়া স্বত্বেও তার স্ত্রীকে ১০ টায় টাইম দিয়ে সবার শেষে বিকেল সাড়ে তিনটেতে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হল।এতটা সময় বাবলিসহ আমাদের অপেক্ষা করতে হল। আমাদের দেশ হলে এটা কেউ মেনে নিত বলে মনে হয় না।

                                      ক্রমশ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯