খর্জুর বীথির ধারে-১০/মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে
মলয় সরকার

(১০ম পর্ব ) দশম পর্ব



চলেছি রায়েধের গাড়িতে আর  মাঝে মাঝে গাড়ি থেকেই ইন্টার নেটে ফোন করছি, প্রিয়জনদের সাথে। এটাও এক নতুন অভিজ্ঞতা, যেটা আগে কখনও দেখি নি। 
পৌঁছালাম, ওয়াদিরাম মরুভূমির ধারে। সেখানে দেখি বেশ কয়েকটি তাঁবু খাটানো রয়েছে আর রয়েছে  সামনে কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়িগুলির মধ্যে কিছু চার চাকাওয়ালা মাথা খোলা জীপ। কিছু মাথা ঢাকা বড় গাড়ী। আমাদের সাথে রিয়াধ ওদের পরিচয় করিয়ে দিল। ওরা সবাই দেখলাম, একেবারে পাক্কা বেদুইন, সেই রকমই সাদা টিউনিক, সাদা আলখাল্লা, মাথায় সাদা কাপড় ঢাকা। ওরা দৌড়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা করে তাঁবুর ভিতরে বসাল।তারপর একজনকে আরবীতে কিছু বলল।

একটু পরে একজন এসে বলল, চলুন ঐ গাড়ীতে বসুন, সঙ্গে গাইড হিসাবে যাবে এই ছেলেটি। দেখলাম ওরা ভালই ইংরাজী বলতে পারে। পারাই তো উচিত- যারা দিনরাত এত বিদেশী টুরিষ্টকে ঘোরাচ্ছে, তারা হয়ত, শুধু ইংরাজী নয়, অনেক ভাষাই জানে, যেমনটি দেখেছিলাম, ইস্তানবুলের গ্রাণ্ড বাজারে।
আমরা একটা চার চাকাওয়ালা মাথা খোলা জীপে উঠে বসতেই জীপ দৌড়ালো বালিয়াড়ির বালির সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে।  
আগে বলে নিই, এখানকার সম্বন্ধে দু চার কথা। ওয়াদি রাম কথাটার অর্থ হল চন্দ্র উপত্যকা। এটিই হল জর্ডনের যত মরু উপত্যকা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। এই যে মরুভূমির উপত্যকা, এটি যদিও বহু প্রাচীন জনবসতি পূর্ণ এলাকা, তবুও এটি আধুনিক যুগে বেশি খ্যাতি লাভ করে এক ব্রিটিশ অফিসার  T W Lawrence এখানে কয়েক বার এসে সুদীর্ঘ দিন থেকে, এখানের সম্বন্ধে বাইরের পৃথিবীকে অনেক বেশি জানানোর পর। আজ, তিনি যা বলেছেন, সেগুলিই প্রামাণ্য বলে ধরা হয়েছে। ফলে Lawrence of Arabia বইটি থেকেই ১৯৬২ সালের পর থেকে এখানে পর্যটক বাড়তে থাকে। আজকে এটি জর্ডনের এক প্রধান পর্যটন কেন্দ্র এবং দেশের অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ।এখানে যে বেদুইন উপজাতিরা থাকে বা এই সমস্ত পর্যটনের সবচেয়ে বড় সহায়ক, তারা হল জালাবি (Zalabieh) উপজাতির।তারা সযত্নে এই জায়গাকে রক্ষা করে এবং এখানে এই সমস্ত কাজের জন্য তারা একেবারে দক্ষ।
আমাদের জীপে একজন আছে ড্রাইভার আর একজন গাইড। তারা প্রথমেই জীপ ছুটিয়ে যেখানে নিয়ে এল সেটি একটু উঁচু মত জায়গা। এই অঞ্চলের আশেপাশের থেকে এই জায়গাটা বেশ কিছুটা উঁচু। এখানে এসে আমরা নেমে দেখলাম, যতদূর চোখ যায় চারপাশে, শুধু লাল রঙের বালির সমুদ্র। পড়েছি প্রাকৃতিক কারণে যদি কখনও সমুদ্রতল উঁচু হয়ে যায়, তখন তার জল সরে গিয়ে শুধু তলদেশের বালি পড়ে থাকে। তখন ভবিষ্যত পৃথিবীর কাছে তাই হয় মরুভূমি।সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। 
এই ওয়াদি রামের মধ্যে নাকি ছেলেদের একটি স্কুল এবং মেয়েদের একটি স্কুলও আছে। পাকা বাড়ি আছে, আর আছে ওদের ছাগলের চামড়ার তাঁবুর ঘর এবং গুটি কয়েক দোকান পত্তর।
এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটির নাম জবল রাম যেটি ৫৭০০ফুট উঁচু এবং এর শৃঙ্গটিই জর্ডনের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ।৭৪২০০ হেক্টরের এই অঞ্চলটি আয়তনে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরের প্রায় সমান।
এর উপরের লাল বালির অসমান ভুপৃষ্ঠের এমনই দৃশ্যকল্প যে দেখলে অনেকটা মঙ্গলগ্রহের জমির মত লাগে। তাই এখানে অনেক সিনেমারও শুটিং হয়েছে, এখনও হয়। এর যে লাল বালির রঙ তা আসলে রেড অক্সাইড মিশ্রিত বালি বলে, তাই এই রঙ।এখানে যে ছবি গুলি তৈরী হয়েছে তার কয়েকটি হল, Dune (Warner Brothers), The Martian (2015)  Prometheus (2012) (Ridley Scott), Star Wars 1 (2016) Star wars 2 (2019) , Lawrence of Arabia (1962),Mission to Mars (2000) ইত্যাদি। সাম্প্রতিক কালে আমাদের বলিউডি সিনেমা ক্রিশ -৩ ও এখানেই শুটিং হয়েছে।

এর মাঝে একটা সৌন্দর্য্য দেখছিলাম যে, বালি গুলোর উপর এক অদ্ভুত কোঁচ কোঁচ ঢেউ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি কোথাও বেশী কোথাও কম। এটি আসলে তৈরী হয় এই বালিয়াড়ির উপর যখন হাওয়া বয়ে যায় । হাওয়ার প্রভাবেই এই সুন্দর বালি ঢেউ এর সৃষ্টি হয়, যেমন হয় প্রবহমান জলের তলায়।এই লাল  বালিয়াড়ির দৃশ্য সত্যিই খুব সুন্দর।একেই বলে, Sand Dunes ।
এখানকার জমির দৃশ্য এমনই যে , অনেকটা মঙ্গল গ্রহের মত । সেকারণেই, সিনেমায় মঙ্গলগ্রহ দেখাতে হলে এখানেই শুটিং বেশি হয়।একে বলে “Mars on the Earth” ।   

এখানে বালি খুব মিহি নয় আবার খুব বড় বড় দানাও নয়। একটা কথা বলি, এখানে কিন্তু আমরা দূরে দূরে বেশ কিছু টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন ভাবে ছোট বড় পাথরের স্তুপ বা পাহাড়ও দেখতে পাচ্ছিলাম। সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই , অন্যান্য পাহাড়ী জায়গার মত একটানা বা সারবদ্ধ নয়। বিচ্ছিন্নভাবে কোন কোন জায়গায়। আর এই সমস্ত পাহাড় গুলোর রংই একেবারে টকটকে লাল। 

এছাড়াও দেখতে পাচ্ছিলাম , এখানে ওখানে উটেরা হয় দাঁড়িয়ে আছে ঠা ঠা রোদ্দুরে, আর নিশ্চিন্তে ঘাস বা ঐ জাতীয় কিছু চিবোচ্ছে।আবার কোথাও দেখছিলাম, পরপর উটের সারি চলেছে পিঠে পর্যটকদের নিয়ে ঢিমে তালে, সামনে রয়েছে দড়ি ধরে তাদের মালিক বা চালক। দেখে মনে হল, চোখ সার্থক। যেমনটি আমরা ছবি দেখে থাকি, মরুভূমিতে উটের সারির, ঠিক সেই রকমই সুন্দর। 

আমরা দেখছিলাম, এই সমস্ত পাহাড় গুলোর আকৃতি। এগুলো সবই বেলে পাথরের তৈরি। ফলে কালের প্রভাবে বাতাসের সাথে ঘষা লেগে এই সমস্ত পাহাড় গুঁড়ো হয়ে আরও বালি বাড়ছে এবং ঐ পাহাড় গুলোর বিচিত্র সমস্ত আকৃতি হচ্ছে। এরকম বাতাসের ঘষায় পাহাড়ের বিচিত্র আকৃতি দেখেছিলাম তুরস্কের কাপাদোসিয়ায়।আমাদের দেশের লাদাখেও এরকম দেখা যায়।  এই সমস্ত পাহাড়ের নানা আকৃতি দেখিয়ে গাইডরা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আর যা মনে হয়, তাই বলে। আমার মনে পড়ল, জব্বলপুরে নর্মদায় নৌকা বিহারের সময় পাশের পাহাড়ের উপর বিভিন্ন আকৃতি দেখিয়ে , তার সম্বন্ধে নানা কথা বলে , মাঝিরা পর্যটকদের নৌকাযাত্রা আকর্ষণীয় করে তোলে। এও অনেকটা সেই রকম। 
তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে , সাতটি স্তম্ভাকৃতি পাহাড়। এটি ওয়াদি রামের ভিজিটর সেন্টারের কাছেই।একটি বড় পাহাড়ের গায়ে হাওয়া লেগে এমন ভাবেই পাথরের ক্ষয় হয়েছে যে দেখলে মনে হবে সাতটি থাম পরপর জোড়া রয়েছে। দেখে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। একে বলা হয়, Seven Pillars of Wisdom। তবে গুণতে গেলে, আমার চোখে সাতটির বদলে পাঁচটিই প্রতীয়মান হল। সে যাই হোক, দেখতে এটি বড়ই সুন্দর।

এখান থেকে জীপে চড়ে গেলাম পাহাড়ের আর এক বিচিত্র রূপ দেখতে। সেখানে পাথর ক্ষয়ে গিয়ে এমন হয়েছে, যেন একটি ছোট ব্রিজ মত তৈরী হয়েছে। অনেককে দেখলাম , এই সব পাহাড়ের মাথায়ও উঠছে। আমাদের গাইড জিজ্ঞাসা করল, উঠবেন নাকি পাহাড়ে? বললাম, বিদেশে এসে এই বুড়ো বয়সে হাত পা ভেঙ্গে বসি, সেটাই কি তুমি চাও? হেসে উঠল সে, বলে না না আপনি তো এখনও অনেক ‘ইয়ং’। নিজের সম্বন্ধে এই প্রশস্তি শুনে, মুচকি হেসে বুলবুলের দিকে তাকালাম। ও ছদ্ম রাগ দেখিয়ে হেসে বলল, জিজ্ঞাসা কর, ওদের ঘরে কোন আরব যুবতী আছে কি না, তাহলে তোমাকে এখানে রেখে যাই ওদের জিম্মায়। 
এর পর একটা পাহাড় দেখাল যেটির নীচেটি ক্ষয়ে গেছে মাথার চেয়ে বেশি। ফলে সেটি একটি ছাতার মত দেখতে হয়েছে। ওরা বলল, এটির নাম, Mushroom Rock. এই সব নামে অবশ্য কিছু যায় আসে না। তবে পাহাড়গুলোর আকৃতির বৈচিত্র্য সত্যিই আকর্ষণীয়।প্রতিটা জায়গাতেই মনে হচ্ছে ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখি।তা তো আর সম্ভব নয়। তাই মনের ক্যামেরাতেই ছবি তুলতে লাগলাম বেশি করে।

 এর পর যেখানে নিয়ে গেল, সেটি সত্যিই ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাখে। ওরা পাহাড়ের গায়ে দেখাল, বেশ কিছু খোদাই করা লেখা ও আঁকা উট হাতি বাঘ সিংহ বা ঐ জাতীয় প্রাণীর ছবি, যেগুলির বয়স যথেষ্ট প্রাচীন। সম্ভবতঃ ১২০০০ বছর আগে নাবাতিয়ারা বা অন্য কোন প্রজাতির মানুষেরা এগুলো লিখেছিল। আমাদের দেশেও মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকাতে এরকম  ছবি দেখেছি। একে বলে পেট্রোগ্লিফ (Petroglyph)। এর থেকেই বোঝা যায়, এই জায়গার প্রাচীন বসতির কথা।এখানে প্রায় ২৫০০০ পেট্রোগ্লিফ ও ২০০০০ অক্ষর খোদিত আছে। এর থেকে বোঝা যায় যে কত মানুষ এখানে কত দিন ধরে বাস করেছিল এবং তারা যে এটা করায় অভ্যস্ত ছিল।এটা নাকি থামুদ (Thamud) উপজাতিদেরই প্রধানতঃ সৃষ্টি।আসলে এই থামুদরা পাথর কাটায় আর পাথরে লেখায় বেশ দক্ষ ছিল। তারাই পেট্রায় অনেক কারুকাজের শিল্পী। অনেক লেখা বা আঁকাই আবার খ্রীষ্ট জন্মের কিছু আগে বা পরেকার সময়ের।একটা কথা বলে নিতে চাই, এখানে পেট্রোগ্লিফ বলতে ছবিগুলোকেই বোঝায়।আর ছবি যদি রঙ দেওয়া হয়, ভীমবেটকার মত, তখন তাকে বলা হয়, পিক্টোগ্রাফ (Pictograph) ।
তবে এখানে থামুদদের অক্ষর ছাড়াও রোমান, হিব্রু, ইজিপ্সিয়ান, গ্রীক, আরব, ইংরাজী ইত্যাদি নানা রকমের অক্ষরের ছবি দেখা যায়।
এগোলাম  আরও—-
চলুন সঙ্গে । দেখি আর কি দেখা যায়।    
ক্রমশঃ—

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. খুব সুন্দর

    ReplyDelete
  2. আপনার লেখা অপূর্ব । দৃষ্টিক্ষীণতায় সব লেখা পড়া হয়ে ওঠে না । খুব আফসোস থেকে যায় । সবগুলিই অবশ্য সংগ্রহে রেখে দেই সুবিধামতো পড়ার জন্য ।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯