দূরদেশের লোকগল্প—ইউরোপ (নেদারল্যাণ্ড)বেড়াল মাসির বোনপো /চিন্ময় দাশ


দূরদেশের লোকগল্প—ইউরোপ (নেদারল্যাণ্ড)
বেড়াল মাসির বোনপো

চিন্ময় দাশ


এক বনবেড়াল আর এক বনমোরগ থাকে বনে। বেড়াল হোল মোরগের মাসি। ভারি ভাব দুজনের। একটা আদ্যিকালের বেহালা আছে বেড়ালের। আর গান আছে মোরগটার গলায়। হাতে একটু ফুরসত পেলে, বেহালা টেনে নিয়ে বসে বেড়াল। অমনি মোরগ এসে জোটে। গান জুড়ে দেয় গলা খুলে। ভারি আমোদে আনন্দে দিন কাটে মাসি আর বোনপোর।

কিন্তু কেবল গান আর বাজনা নিয়ে তো আর থাকা যায় না। দুটো পেট তো আছে, না কী? খাবারের ভাবনাটা তো ভাবতেই হয়। বেড়াল হোল মাসি। খাবারের ভাবনা সে নিজে নিয়েছে। বাইরে বেরোতে দেয় না মোরগকে।
যখনই শিকারে যায়, দরজায় খিল আটকে, মোরগ থাকে ঘরের ভিতর। মাসি পই পই করে বারণ করে যায় তাকে—খবরদার, ঘরের বাইরে বের হবে না। আর শোন, ভেতরে আসতে দেবে না কাউকে। সে যে-ই হোক না কেন। দরজাই খুলবে না কখনো। 
--নাগো, না। দরজা খুলবো না। ভিতরেই থাকব আমি। অত চিন্তা করতে হবে না তোমাকে। নিশ্চিন্তে নিজের কাজে যাও তুমি। 
দুজনের এই সওয়াল জবাব নিত্যদিনের। বেড়াল শিকারে যায়। দরজায় খিল আটকে দেয় মোরগ। মাসি না ফেরা পর্যন্ত, জানালার পাশটিতে গিয়ে, বাইরের দিকে চেয়ে  বসে থাকে। 
আদর-যত্ন খাওয়া-দাওয়ায় দিন দিন বড় হচ্ছে মোরগ। চেহারাটি বেশ নধর হয়ে উঠেছে দেখতে দেখতে। একদিন মাসি গিয়েছে শিকারে। এক শেয়াল যাচ্ছিল সেদিক দিয়ে। জানালায় মোরগটা চোখে পড়ে গেল তার। 
আর যায় কোথায়? আহা, আস্ত একটা মোরগ! কী হৃষ্টপুষ্ট চেহারা! ঘাড়ের পালকের কী রঙ! আর, মাথার  ঝুঁটিখানা যেন একেবারে খাঁজ কাটা খাঁড়া একখানা। জিভ দিয়ে জল গড়াতে লাগল শেয়ালের। যেভাবেই হোক, কব্জা করতে হবে এটাকে—একটাই ভাবনা এখন শেয়ালের মাথায়। তক্কে তক্কে থাকে, আর ফন্দি আঁটতে থাকে। 

একদিন বেড়াল বেরিয়ে গেছে শিকারে। শেয়াল পা টিপে টিপে জানালাটার কাছে এসে হাজির। গলা তুলে বলল—মোরগ ভায়া, মোরগ ভায়া! এমন জোয়ান বয়স তোমার। করোটা কী তুমি, সারাদিন ঘরে বসে থেকে? না খেয়ে মরবার সাধ হয়েছে না কি তোমার? বাইরে এসো, কতো কতো গমের দানা ছড়িয়ে আছে। আর, কী মিষ্টি জল পিছনের ঝরণাটায়!
কিন্তু মোরগ তাতে ভুলল না। না খুলল দরজা। না বেরুলো বাইরে। ভেতর থেকেই জবাব দিল -- 
মাসির বারণ আছে আমার—
না যেন যাই বাইরে। 
জল থাকুক বা গমের দানা, 
কেমন করে যাই রে?
সাধাসাধি করেও মোরগকে পটানো গেল না। শেয়াল ভাবল, একদিনে হবে না। চেষ্টা করে যেতে হবে। 
দু’দিন না যেতে, আবার এসে হাজির শেয়াল। পুরুষ্টু পুরুষ্টু গমের দানা। ঝরণায় টলটলে মিষ্টি জলের বাখান দিতে লাগল সাতকাহন করে। 
মোরগকে টলানো গেল না। তার একটাই কথা— বাইরে আমার যেতে মানা। জল থাকুক বা গমের দানা।।   
শেয়াল বেশ বুঝতে পারল, এতে হবে না। অন্য ফন্দি করতে হবে। 
একদিন রাতের বেলা এসে হাজির হোল বেড়ালের বাড়িতে। ভেতরে মাসি-বোনপো তখন নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। এক মুঠো গম এনেছে শেয়াল। জানালাটার ঠিক বাইরে দানাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে, ঘাপটি মেরে বসে রইল একটা ঝোপের আড়ালে। 
সকাল হতে, বেড়াল বেরিয়ে গেল শিকারে। দরজায় খিল লাগিয়ে, জানালায় গিয়ে হাজির হোল মোরগ। একটু বাদেই বাইরে নজর গেল তার। সেখানে ঝকঝকে সোনার মত গমের দানা ছড়ানো। চকচক করে উঠল মোরগের চোখ দুটো। 
ভাবতে লাগল—আহা, কী মিষ্টি স্বাদই না হবে দানাগুলোর! ভারি মজা হবে কুড়িয়ে খেতে। এইসব ভাবছে, তখনই মাসির বারণ মনে পড়ে গেল তার। বাইরে যাওয়া মানা। 
একবার গমের দানা, একবার মাসির মানা। একবার মাসির মানা, একবার গমের দানা। এমনই দোলাচল চলল কিছু সময়। শেষে গমের দানারই জয় হোল। মোরগ মনে মনে বলল—কেউ তো কোথাও নাই। কিসের এমন ভয়?  টুক করে একটি বার বেরুব। কয়েকটা দানা খুঁটে নিয়ে পালিয়ে আসব। দেখে ফেলবার কেউ নাই। মাসিকে বলে দেবারও কেউ নাই।
কিন্তু নিষেধ না মানলে, যা হয়! শেয়াল তো ঘাপটি মেরে ছিল। সবে দরজা খুলে বেরিয়েছে মোরগ। অমনি লম্বা এক লাফ। শেয়াল সোজা এসে পড়ল মোরগের উপর। মোরগকে ধরেই ছুট লাগালো শেয়াল। 
বেদম ভয় পেয়ে গেছে মোরগ। সে চেঁচাতে লাগলো—মাসি, বাঁচাও আমাকে। শেয়াল ধরে নিয়ে  যাচ্ছে। কোথায় তুমি? তাড়াতাড়ি এসো, নইলে মারা পড়ব আমি। 
কিন্তু চেঁচানোই সার। বেড়াল তখন অন্য দিকে। অনেক দূরে। মোরগের গলা সে শুনতে পাবে কেন? 
বেড়াল যখন ঘরে ফিরল, সব ভোঁ ভোঁ। দরজা হাট করে খোলা। ফাঁকা ঘর। মোরগের চিহ্নটিও নাই কোথাও। অনেক ডাকাডাকি হোল। অনেক খোঁজাখুঁজি। কোথায় পাওয়া যাবে তাকে?
কী হতে পারে? কোথায় যেতে পারে? ভাবতে ভাবতে শেয়ালের কথা মনে পড়ল তার। নিশ্চয়ই এটা ঐ হতভাগারই কাজ। 
একটা ফন্দি এলো বেড়ালের মাথায়। শেয়ালের ডেরা চেনে বেড়াল। এক  হাতে বেহালা আর এক হাতে একটা বড় ঝোলা নিয়ে শেয়ালের বাড়ি চলল হন্তদন্ত হয়ে। 
বেড়াল যখন শেয়ালের বাড়ির একেবারে কাছটিতে পৌঁছেছে, শেয়াল তখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। চারটা মেয়ে আর একটা ছেলে শেয়ালের। বাচ্চাদের ডেকে শেয়াল বলল—শোন বাছারা। আমি বেরুচ্ছি। পাঁচজন মিলে পাহারা দেবে মোরগটাকে। আর এক হাঁড়ি জল গরম করে রাখবে, আমি এসেই এটাকে কেটেকুটে রান্না চড়াব। আজ রাতের ভোজটা ভালোই জমবে আমাদের। আরও শোন, একটা কথা মনে রাখবে, আমি না ফেরা পর্যন্ত কাউকে ঘরে আসতে দেবে না।  

বাড়ির পেছনটায় বসে বসে সবই শুনছে বেড়াল। শেয়াল বেরিয়ে  যেতে, বাড়ির সামনে চলে এলো সে। জানালার নীচটাতে বসে বেহালা বাজাচ্ছে আর গান গাইছে—কী সুন্দর রাড়িখানা শেয়াল দিদির। আরও সুন্দর তার ছেলেমেয়েগুলো। কিন্তু তারা ঘরে বসে কেন? বাইরে আসুক সবাই, মিষ্টি গান শোনাব তাদের। 
শেয়ালের বড় মেয়েটা বলল—তোমরা সবাই ভেতরেই থাকো। আমি দেখে আসি, কে এমন সুন্দর গান গাইছে। 
যেই না শেয়ালের ছানাটা বাইরে এসেছে, কপ করে ধরে ফেলল বেড়াল। ধরেই সোজা তার ঝোলার ভিতরে চালান কর দিল।  আবার গান ধরল—একা বসে শুনলে হবে? বাকিরাও আসুক তবে। 
শেয়ালের মেজ মেয়ে বলল—তোমরা এখানে বসে থাকো। দিদি কোথায় গেল দেখি গিয়ে। 
মেজোটা বাইরে এলো। তাকেও কপ করে ধরে ফেলল বেড়াল। ধরেই ঝোলায় চালান করে দিল। 
একই ভাবে তিন নম্বর আর চার নম্বর ছানাটাকেও ঝোলায় ঢুকিয়ে ফেলল বেড়াল। একমাত্র ছোটটাই এখন ভেতরে। 
গান শোনায় তারও কোন আগ্রহ নাই। ছানাটার মনে হোল, যাই, দেখে আসি, দিদিরা সব গেল কোথায়। নইলে মা ফিরে এসে আমার ওপরেই চোটপাট করবে। 
সেই ছেলেটাও বাইরে বেরুলো। সাথে সাথেই থলের ভেতর ঠাঁই হোল সেটারও। 
সামনে ছিল কতকালের পুরানো মরা একটা উইলো গাছ। এবার থলেটার মুখে শক্ত করে গিঁট দিয়ে, গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিল বেড়াল। 
কাজ সেরে, শেয়ালের ঘরে ঢুকে চটপট বাঁধন খুলে দিল মোরগের। ঘরে যা কিছু খাবার-দাবার ছিল শেয়ালের, পেট ভরে দুজনে খেলো সব। ফেলে ভেঙে দিল গরম জলের হাঁড়িটাকে। ঘরের যা কিছু বাসন-কোসন, হাঁড়ি-কুঁড়ি সব ভেঙে চুরমার করল। গোটা ঘরটাকে তছনছ করে, দুজনে বেরিয়ে গেল বাইরে। 
ভারি ফুর্তি এখন বেড়ালের মনে। বলতে লাগল—আমার বোনপোকে চুরি করা? চালাকি করবার আর জায়গা পাওনি? এবার বোঝ ঠেলা। নিজের বাচ্চাদের খুঁজে মরো এবার। 

সেদিন থেকে আর বড়দের কথা অমান্য করে না মোরগ। প্রতিদিন ভোর না হতেই, চেঁচিয়ে নিজের প্রতিজ্ঞা শোনায় মাসিকে— ভুল করেছি কথা না শুনে। আর কক্ষণো এমন ভুল করব না। কক্ষণো না। কক্ষণো না।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯