মাটিমাখা মহাপ্রাণ। তেত্রিশ /শুভঙ্কর দাস

মাটিমাখা মহাপ্রাণ। তেত্রিশ 

শুভঙ্কর দাস 


"পাষাণসমান আছে পড়ে
প্রাণ পেয়ে সে উঠবে ওরে,
আছে যারা বোবার মতন তারাও কথা কবেই কবে।
সময় হল, সময় হল
যে যার আপন বোঝা তোলো রে
দুঃখ যদি মাথায় ধরিস সে দুঃখ তোর রইবে সবে।
ঘন্টা যখন উঠবে বেজে
দেখবি সবাই আসবে সেজে 
একসাথে সব যাত্রী যত একই রাস্তা লবেই লবে।"


বলরামপুর অভয়া আশ্রম।
এটি একটি নিখিল ভারত খাটুনি সংঘের শাখা। এদের কাজ প্রধানত হাতের কাজ শিখিয়ে দেশবাসীকে স্বাবলম্বী করে তোলা।সেই সঙ্গে প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা আছে। মূলত মেয়েদের সুশিক্ষিত করে তুলতে এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম।
এ-র মূল কেন্দ্র কুমিল্লাতে।
সেখান থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মেদিনীপুরের বলরামপুরে অভয়া আশ্রম। 
সারিবদ্ধ মাটির বাড়ি।
মাটির দেওয়ালে আলপনা আঁকা।
সামনে প্রশস্ত বাগান।বাগানের ঠিক মাঝখান দিয়ে প্রবেশপথ। 
অফিসঘরের সামনের বারান্দায় মাদুর পাতা।
সেখানে কুমারচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ,ক্ষিতীশচন্দ্র রায়চৌধুরী বসে আছেন।
তাঁরা সাইমন কমিশন নিয়ে আলোচনা করছেন।

এটা কী ধরণের অন্যায় বলুন তো?  আমাদের দেশ কীভাবে চলবে, তা নাকি ইংল্যান্ড থেকে আগত প্রতিনিধি দল অনুসন্ধান করবে,বিচার করবে,নির্দেশ জারি করবে! বলে উঠলেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

যা বলেছেন! উত্তর করলেন ক্ষিতীশচন্দ্র। 

এটা যতখানি অন্যায়, তার চেয়েও বেশি অপমান। ইংরেজ সরকার জুতো মেরে মেরে ভারতবাসীকে বোঝাচ্ছে,তোমাদের অবস্থান জুতোর তলায়।

ঠিক তাই, না হলে বোঝো কাণ্ড!  যেসব লোক কোনোদিন ভারতবর্ষে থাকল না,ভারতবর্ষ কী বুঝল না,তাঁরাই নাকি দেশ শাসনের পর্যালোচনা করবে, এটা কী ধরণের সিদ্ধান্ত? 

আমারও অসহায়, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি,লড়াই করছি,কিন্তু সরকার তাকে ফেউ ছাড়া কিছুই মনে করে না।খুব হতাশ হয়ে বললেন ক্ষিতীশচন্দ্র। 

না,এতোখানি হতাশ হওয়ার কিছু নেই, গান্ধিজি অবশ্যই কিছু বড় সড় পদক্ষেপ নেবেন।যথারীতি লালা লাজপত রায় পথে নেমে গেছেন,দেখা যাক কী হয়! 

আর কী হয়? সাইমন কমিশন তো আসছেই, এবং তাতে সকল সদস্য ইংরেজ, কোনো ভারতীয়দের স্থান নেই, বারংবার গান্ধিজি বললেন,তা সত্ত্বেও ইংরেজ সরকারের পক্ষে লর্ড আরউইন সাহেব তো কর্ণপাত পর্যন্ত করলেন না! 

আচ্ছা, এই সাইমন কমিশন যদি চালু হয়ে যায়,তবে? 

তবে আর কী, আমাদের অবস্থা হবে অনেকটা গোয়ালে বাঁধা গরুর মতো, শুধু গলায় দড়ি পরে শান্তশিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব,আর জাবর কাটব, কেন হল?  কেন হল?  

এইবার মুখ খুললেন কুমারচন্দ্র।

তাহলে কুমারবাবু,আপনার চোখে সাইমন কমিশনের কী হওয়া উচিত?  এ দেশে থাকা নাকি আন্দোলন করে দূর দূর করে তাড়ানো?

কুমারচন্দ্র বলে উঠলেন,ক্ষিতীশ, একটা কথা মনে রেখো,ইংরেজ দিয়ে সারা পৃথিবীতে আর যাই হোক,ভারত শাসনের নামে এইসব বাঁদরামি চলবে না! সাইমন কমিশন কী জানো? 
ধরো, তোমার ঘরে আছো,অথচ খেতে-শুতে এমন কি পায়খানা করতে যাওয়ার জন্য অন্যের অনুমতি নিতে হবে। এ হচ্ছে, ইংরেজ রাজসরকারের সর্বাধুনিক চালাকি! আইনের লম্বা লম্বা দড়ি তৈরি করে গোটা ভারতবর্ষের গলায় পরিয়ে আমাদের গরু-ছাগল করে রাখার পরিকল্পনা। 

সঠিক বলেছেন তো!  বলে উঠলেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

কিন্তু আমাদের গরু-ছাগল ভাবলে তো চলবে না,আমরা যে গোরা ব্যারাদের চালাকি বুঝি এবং সেই চালাকির উত্তর দিতে জানি,তাই দেখাতে হবে।

উত্তর দেওয়া উচিত,এই সুসভ্য জাতি হিসেবে গর্বে মাটিতে পা না-পড়া ইংরেজদের প্রতিটি অন্যায় কাজের কৈফিয়ত দিতে হবে এবং হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে চাইতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে,এমন উত্তর দেওয়া উচিত। বললেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

তাহলে এর জন্য আমাদের কী করণীয়?  জিজ্ঞেস করলেন ক্ষিতীশচন্দ্র। 

গান্ধিজি হরতাল ডেকেছেন,যেদিন সাইমন কমিশন আসবে,সেদিন সারা দেশ জুড়ে হরতাল পালন করা হবে। আমরা সুতাহাটায় হরতাল করব, দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলেন কুমারচন্দ্র।

কিন্তু সুতাহাটায় হরতাল করলে কি কোনো লাভ হবে, সাইমন কমিশন তো আসবে দিল্লিতে, তাহলে?  দিল্লিতে না হোক,অন্তত আমরা সবাই চলো কলকাতায় যাই,সেখানে গিয়ে... 

কথাটি শেষ হওয়ার আগে কুমারচন্দ্র বলে উঠলেন, হাঁড়ি 

হাঁড়ি! অবাক হলেন ক্ষিতীশচন্দ্র।

হ্যাঁ,ঐ হাঁড়িটি নিয়ে আসুন,জল যেন ভর্তি থাকে।

ক্ষিতীশচন্দ্র একটি হাঁড়ি জল ভর্তি করে বারান্দার বাইরে একটি ইট জড়ো করে, তার ওপর রাখলেন।
এরপর কুমারচন্দ্র অদ্ভুত একটি কাণ্ড করলেন।তিনি অফিসঘরের ভেতর থেকে একটি পেরেক আনলেন।
তারপর সেই জলভর্তি হাঁড়ির কাছে গেলেন।
মুখে বললেন,মনে করুন এটি বৃটিশ সরকারের সাম্রাজ্য। একেবারে গলাভর্তি জল।
এবার আমি যদি এর নিচে অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র করে দিই।
এই দেখুন।
বলেই পেরেটি দিয়ে সেই হাঁড়িটির নিচে ফুটো করে দিলেন।তার ফলে সেই স্থান দিয়ে অতি সরুরেখায় জলে মাটিতে পড়তে লাগল।
বুঝলেন ক্ষিতীশবাবু,এই দেখুন গলাভর্তি জলের মুখ,কেমন জল কমতে শুরু করেছে। মেনে নিচ্ছে, এই জল কমার কাজটি বহু সময় সাধ্য।কিন্তু জল তো কমছে।এটাই আমরা করে চলেছি।
মনে রাখবেন,এই ছিদ্র একদিন এতো বৃহৎ হয়ে যাবে,তখন বৃটিশকুম্ভ ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।

সাবাশ কুমারবাবু,এতো সহজ করে বোঝালেন,মনে হচ্ছে, আপনি তো বৃটিশ সরকারের ভিত একাই নড়িয়ে দিতে চলেছেন,বলে উঠলেন,প্রফুল্লচন্দ্র। 

না,না,প্রফুল্লবাবু, আমি মেদিনীপুরের চাষা,গান্ধিজির অহিংস অনুসরণকারী, বীরেন শাসমলের শিষ্য, অতি সামান্য সেবক, আপনারা আছেন বলেই এতো সাহস পাই। 

তাহলে আমাদের কী করতে হবে বলুন? আমারও চাষার অনুসরণকারী ভূষা,বলে উঠলেন ক্ষিতীশচন্দ্র। 

সকলে হেসে উঠলেন। কুমারচন্দ্রও।

তারপর কুমারচন্দ্র দৃঢ়কণ্ঠে বললেন,যেদিন সাইমনের দল দেশে আসবে,সেদিন পুরো সুতাহাটায় হরতাল হবে।এবং হরতালের সঙ্গে একটি সভা।সেই সভায় আমরা জনগণকে জানাব,দেশের বর্তমান অবস্থা এবং স্বাধীনতার জন্য গান্ধিজি কী ডাক দিতে চলেছেন,তার জন্য কী কী প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার?  এইসব

বাহ্ দারুণ হবে তাহলে, সমর্থন করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

কুমারচন্দ্র এরপর বললেন,কিন্তু যেদিন হরতাল হবে,সেদিন পথে নামলে হবে না,আজ থেকে কাজে নামতে হবে।

বুঝতে পেরেছি,তাহলে এইভাবে কাজ শুরু হোক।

এইভাবে আলোচনা শেষের পথে, তাঁরা সকলে উঠবেন,ঠিক সেই সময় একটি বছর পাঁচেক ছোট্ট মেয়ে ছুটে এসে কুমারচন্দ্রের সামনে দাঁড়াল।
তার হাতে গাঁদা ফুল।
সে একবার সকলের দিকে চেয়ে নিয়ে বলে উঠল,এ কী ঠাকুল গো? তোমার জানো?

প্রশ্ন করেই নিজেই মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলতে লাগল,বুঝতে পারিনি!  বুঝতে পারিনি! 

ঠাকুল! ঠাকুল কীরে?  কী বলছিস রে?

হ্যাঁ গো,ঠাকুল সেজেছে 

ওহ্ ঠাকুর, তা কী বুঝতে পারছিস না? 

আবার মাথা নেড়ে নেড়ে, বুঝতে পারিনি, বুঝতে পারিনি!

শুধু সেই ছোট্ট শিশু নয়,
কুমারচন্দ্রসহ সকলেই প্রথমে বুঝতেই পারলেন না! ছোট্ট মেয়েটি কী বলতে চায়!
অথচ সে অভয়া আশ্রমের একটি শ্রেণিকক্ষের দিকে আঙুল তুলে কথাটি বলেই চলেছে। যা আঙুল তুলেছে,তার হাত থেকে একটি গাঁদা ফুল মাটিতে পড়ে গেছে। তখন তার কী ব্যাকুলতা,সেটি তুলে নিয়ে ফুঃ দিয়ে বলল,যাঃ পড়ে গেল ধূয়ায়! কী হবে? 

আচ্ছা, নে ধুয়ে দেবো,চিন্তা করিস নি, বলে উঠলেন কুমারচন্দ্র। 

বলা মাত্র সেই শিশুটি কুমারচন্দ্রের হাত ধরে নিয়ে গেল সেই শ্রেণি কক্ষের দিকে।
কুমারচন্দ্রের সঙ্গে অন্যান্যরাও এগিয়ে গেলেন।
সকলের এক কৌতূহল, কী ঠাকুরের কথা বলছে!

শ্রেণির সামনে যেতে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নৃপেন্দ্রনাথ। তিনি সকলকে দেখে মৃদু হেসে উঠলেন। 

কুমারচন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে নৃপেনবাবু?

আর বলবেন না,আমাকেও এই যে এই ছোট্ট ছেলেটি অফিসঘর থেকে ডেকে এনেছে, এসে এদের কাণ্ড দেখে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পড়েছি।

কিন্তু কী হয়েছে?  ঠাকুর?  কীসের ঠাকুরের কথা বলছে!

তবে দেখবেন আসুন,অবশ্য কেউ দেখুক না দেখুক, আপনাকে তো দেখতে হবে,কুমারবাবু 

মানে?

মানে নিজের চোখে দেখে নিন

বলেই সকলে ধীর পায়ে শ্রেণিকক্ষের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
শ্রেণির মধ্যে একটি ছোট্ট টুল। তার ওপর একটি ছোট্ট মেয়ে শাড়ি পরা।তার মাথায় ও গলায় একটি গাঁদা ফুলের মালা। সেই সঙ্গে শাড়ির আঁচলের প্যাঁচের মতো কোমরে জড়ানো একটি চরকা আঁকা পতাকা।
তাকে ঘিরে রয়েছে জনা সাতেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে।
সেই পতাকা জড়ানো মেয়েটি গম্ভীর গম্ভীর মুখে করে তাকিয়ে ছিল। সহসা কুমারচন্দ্রসহ সকলকে দেখে একটু ফিক করে হেসে টুল থেকে নেমে এলো।তারপর দৌড়ে এসে কুমারচন্দ্রকে জড়িয়ে ধরলেন।
কুমারচন্দ্র মাথায় হাত রেখে চিবুক স্পর্শ করে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করলেন,একি সেজেছিস মা?

আমি ভালতমাতা সেজেছি 

ভালত মাতা!  ওহ্ আচ্ছা ভারতমাতা। 

হ্যাঁ,কিন্তু এই পুচু-বিনুরা আমাকে পুজো করছে না,শুধু চেঁচামেচি করছে,কী ঠাকুল?  কী ঠাকুল!

তা তোরা কী খেলা করছিস? 

আমরা ঠাকুল ঠাকুল খেলছি, আচ্ছা ভালতমাতা কি ঠাকুল নয়?

কুমারচন্দ্র সবার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, অবশ্যই ঠাকুর মা,ঠাকুরের ঠাকুর, আমরা তো ভারতমাতার সন্তান,তিনি তো মা, আর কতবার তোকে বলেছি, মা সবচেয়ে বড় ঠাকুর। 

ছোট্ট মেয়েটি হাততালি দিয়ে উঠল।দেখলি,তোরা সব দেখলি,মোর বাবা বলে দিল,ভালতমাতা ঠাকুল। 
এখন বিশ্বেস হলো তো! 

বলেই মেয়েটি আবার টুলের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,নে নে পুজো কর এবার।

প্রফুল্লচন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন,এতো ভারি আশ্চর্য মেয়ে।কেমন দেশকে পুজো করার ঠাকুর হয়েছে। 

হবে না,কার মেয়ে দেখতে হবে তো? পাশে দাঁড়ানো কুমারচন্দ্রের দিকে ইঙ্গিত করে ক্ষিতীশচন্দ্র বলে উঠলেন। 

কুমারচন্দ্র মৃদু হাসলেন।

কী নাম আপনার মেয়ের?  জিজ্ঞেস করলেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

মুক্তি 

বাহ্, সত্যি তো দেশমাতার পরাধীনতার শিকল ভেঙে আমাদের একটাই জিনিস আনতে হবে,তা মুক্তি। 

ঠিক বলেছেন

আপনার মেয়ে এখানেই পড়ে?

হ্যাঁ,এখানে থাকে, পড়াশোনা শেখে,ওর মা-ও আছেন এখানে 

কে চারুশীলা দেবী?

হ্যাঁ

আরে আগে বলেননি! তাহলে আজ ফিরছি না,দুপুরের পেটপুজোটি সেরে যাবো,আপনার গিন্নি নাকি দারুণ ছানার ঝোল রাঁধে, ওহ্ দারুণ হবে।উৎসাহিত হয়ে বললেন প্রফুল্লচন্দ্র। 

ঠিক হ্যায়,চিন্তা কি কোই বাত নেই,কিসি কো ছানা মে মানা নেহি হ্যায়!বলে হেসে বলে উঠলেন কুমারচন্দ্র।

তাঁর বলার ধরণ দেখে সকলে হেসে উঠলেন। 


১৯২৭ সাল।
ভারতবর্ষে সাইমন কমিশন আসার দিন।
মেদিনীপুরের সুতাহাটা অঞ্চল। 
একেবারে হাটের মধ্যে জনতার ভিড়। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন কুমারচন্দ্র।
হাটের একপাশে সারিবদ্ধ গরুর গাড়ি। গরুগুলিকে খুলে দেওয়া হয়েছে। তারা অদূরে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মুখের সামনে ফেলে দেওয়া ঘাস চিবোচ্ছে। 

এগুলো সব পণ্যবহনকারী গাড়ি।
অন্যদিন হলে আসা-যাওয়াতে একেবারে বাজার সরগম করে রাখত।
এখন সব বন্ধ। 
হাটের সব দোকানগুলো বন্ধ। দোকানদাররা কুমারচন্দ্রের সামনে জমা হয়েছে। পুরো হাটে একটা যেন শোকের ছায়া। সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে মানুষের এই ঐক্যবদ্ধ হরতাল কানে কানে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
তার ফলে সুতাহাটা থেকে দূরে দূরে ছোট হাট বা বিদ্যালয়,সরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু খোদ সুতাহাটা বাজারে একটি কাণ্ড ঘটেছে।সেখানে একটি সরকারি অফিস খোলা আছে।
তার সামনে দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।
সুতাহাটা থানা থেকে মোতায়েন করা হয়েছে। 
এখুনি একটি সরকারি অফিসের দিকে যাত্রা করা হবে।অফিসটি জমিজমার নথিনামা দাখিল করার স্থান।এটি কোনো কারণে খোলা আছে।
তাই সেখানে যাওয়া হবে।
একটু পরে সেই অভিযান শুরু হল।
কুমারচন্দ্র দলবলসহ সেই অফিসের সামনে পৌঁছে গেলেন। সেখানে গিয়ে চারিপাশে একটু চোখটা চারিয়ে নিলেন।
অফিসের সামনে মোট দশ-বারো জন লোক উপস্থিত। বোধহয় তাদের জমিজমাজনিত রেজিস্ট্রেশন আছে। অন্যদিকে অফিসের গেটে দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। 
ভেতর এখনও কাজকর্ম শুরু হয়নি।
দুজন অফিসের লোক চেয়ারে বসে আছে। অফিসের দরজা খোলা হলেও কাজকর্ম শুরু হয়নি।
কুমারচন্দ্র অফিসের গেটের দিকে মুখ করে জোর গলায় বললেন,এই মাটি আমাদের, এই মাটির ওপর কাজকর্ম আমাদের, আমরা একে-অপরের পাশে থাকব,কাজ করব এবং মৃত্যুর পর আমাদের লোকজন আমাদের মনে রাখবে।তাই আমাদের মাটিকে, আমাদের মানুষকে অপমান করলে,অন্যায় করলে আমরা চুপ থাকতে পারি না!
আজ সাইমন কমিশন দেশে পা রেখেছে।
এটি বলার পর কুমারচন্দ্র নিজের পা তুলে দেখিয়ে ইঙ্গিত করলেন,এইরকম পা
যা আমাদের মাথায় কাঁধে রেখে,সেই বুট ঘষছে। এরপর আমাদের মাথায় রেখে থেঁতলে দেবে।
তা কি আমরা মেনে নেব? 

সেই সময় সমস্বরে চিৎকার, না 

আমরা কি আমাদের মায়ের অপমান সহ্য করতে পারি?

না

আমাদের ঘর-বাড়ি, আমাদের জমিজমা, আমাদের পিতা-মাতাকে কেউ শিকল পরিয়ে রাখতে চায়,আমরা কি চোখ বন্ধ করে মেনে নেব?

না

সাইমন কমিশন হল একধরণের থাপ্পড়, আমাদের সরল-সহজ নরম গালে জুতোর থাপ্পড়, আমরা কি মেনে নেব?

আবার চিৎকার, না, না, না। 

এরপর কুমারচন্দ্র তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন,যারা অফিসে জমিজমাসংক্রান্ত৷ কাজে এসেছিলেন।তাদের একে একে অনুরোধ করলেন,আজকে কেউ যেন ইংরেজ রাজসরকার অফিসে কাজ না করায়।
আশ্চর্যের বিষয়,যেসব লোকজন উপস্থিত হয়েছিল,তারা একে একে উঠে দাঁড়াল। 
সেই সময় পুলিশ ছুটে এলো।
একজন পুলিশ কুমারচন্দ্রকে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, আপনি সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন!

সরকারি কাজ ? 

হ্যাঁ,ওরা সবাই অফিসে এসেছেন, আপনি তাদের ভুল বোঝাচ্ছেন কেন?

তাই? 

হ্যাঁ,তাই, এরকম চললে আমরা স্টেপ নিতে বাধ্য হব।

এরপর কুমারচন্দ্র জোর গলায় বলে উঠলেন,আচ্ছা,ঠিক আছে স্টেপ নিন। আমি ভারতমাতার হয়ে কাজ করছি। দেখি কী করতে পারেন!
আরও গলায় জোর এনে বললেন,আবার আমি বলছি,এই দেশে আমাদের, এই দেশের মাটি আমাদের,একদিন কাজ বন্ধ হোক,কালকে হবে,পরশু হবেই।কিন্তু ইংরেজ রাজসরকারের অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না।কিন্তু যদি সাইমন কমিশন যদি চালু হয়,তোমাদের জমি থাকবে,অধিকার থাকবে না।তোমাদের হাত থাকবে,হাতের শক্তি চলে যাবে।তাই এই হরতাল শুধু সুতাহাটা নয়, পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে চলছে।
সহসা একটি পুলিশের জিপ এগিয়ে এলো।
তা থেকে একজন অফিসার নেমে এলেন। তিনি এগিয়ে এসে বললেনকুমারবাবু,আপনাকে গ্রেফতার করা হবে,যদি আপনি আন্দোলন বন্ধ না করেন।

কেন? আন্দোলন বন্ধ হবে বলতে পারেন?

ওপর মহলে পৌঁছে গেছে এই হরতালের সংবাদ,আপনি কথা না শুনলে, আপনাকে অ্যারেস্ট করা হবে।

কুমারচন্দ্র এবার একটি বার ক্ষিতীশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলে উঠলেন, দেখুন, পুলিশের অপূর্ব ব্যবহার। আমি কোনো দোষ বা অন্যায় করিনি,অথচ আমাকে গ্রেফতার করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে!  সাইমন কমিশন এখনও চালু হয়নি,তাতে এই,তাহলে ভাবুন, যদি কমিশন চালু হয়, তাহলে কী মারাত্মক হতে পারে।
একথা শোনার পর যারা অফিসের কাজে এসেছিলেন,তারা অফিসে না ঢুকে কুমারচন্দ্রের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
কুমারচন্দ্র দুটি ছেলেকে কাছে ডেকে নিলেন,তাদের গান গাইতে বললেন,
তারা শুরু করল,

"বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান
তুমি কি এমনি শক্তিমান!
আমাদের ভাঙাগড়া তোমার হাতে এমন অভিমান
তোমাদের এমনি অভিমান।
চিরদন টানবে পিছে চিরদিন রাখবে নীচে
এত বল নাইরে তোমার সবে না সেই টান।।"

সমস্বরে গানটি উত্তাল হয়ে উঠল।
ঠিক সেই সময় পুলিশ অফিসার এসে কুমারচন্দ্রকে ধরে গাড়িতে নিয়ে বসালেন।
আর সঙ্গে সঙ্গে রেজিষ্ট্রেশন অফিসের ভেতরের লোকগুলো বেরিয়ে এসে বাইরে দাঁড়াল।
তা দেখে কুমারচন্দ্র গাড়ির ভেতর বলে উঠলেন,সাইমন কমিশন মানছি না,মানব না
আর চারিপাশে ধ্বনিত হল সেই একই কথা,সাইমন কমিশন মানছি না, মানব না!

গান্ধিজি কি 

জয়

বীরেন শাসমল কি

জয়

ভারতমাতা কি 

জয় 

পুলিশের গাড়িটি ছেড়ে চলে গেল।
যে মুহূর্তে কুমারচন্দ্র ভারতমাতা কি জয় বললেন,সঙ্গে সঙ্গে একটি কচিমুখ তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল।
নিজেই আপন মনে হেসে উঠলেন। 
তারপর গাড়ির মধ্যে নিজের মেয়ের মুখটি কল্পনা করে বাতাসের ওপর হাতটি ঘুরিয়ে নিলেন।যেন নিজের কন্যাকে আশীর্বাদ করলেন।
ভারতমাতা। 

কিছুদূর যাওয়ার পর একটি ফাঁকা জায়গায় গাড়িটি থেমে গেল।
সেখানে কুমারচন্দ্রকে নামিয়ে দিলেন।
পুলিশ অফিসার একটু এগিয়ে এসে বললেন,আপনি যে কী ধাতু দিয়ে তৈরি, বুঝতে পারি না! গ্রেফতার করার পর মৃদু মৃদু হাসছেন!

কুমারচন্দ্র তখন নিচু হয়ে কিছুটা ধুলো তুলে নিয়ে নিজের মাথায় মেখে উত্তর দিলেন,ধাতু নয় স্যর,এই মাটি দিয়ে তৈরি, আপনিও তাই। 
ভারতমাতার বুকের মাটি, একেবারে দুধের মতো খাঁটি,কোনোদিন ব্যর্থ হতে পারে! 
বলেই কুমারচন্দ্র পাশের একটি মাঠে নেমে পড়ে হাঁটতে লাগলেন।
পুলিশ অফিসারটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কুমারচন্দ্রের চলে যাওয়ার দিকে।

হাঁটতে হাঁটতে কুমারচন্দ্র  অনন্তপুর এসে পৌঁছালেন।
জাতীয় বিদ্যালয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই তাঁর চোখ ভিজে এলো।
চারিপাশে শূন্য। 
কোনো ছাত্র-ছাত্রী নেই। 
কোনো শিক্ষালাভের চেষ্টা নেই। 
কোনো শিক্ষক নেই। 
কোনো আবাসিক ছেলেমেয়েদের কলকাকলি নেই। 
বিদ্যালয়ের ঘরগুলো দরজা খোলা অবস্থায় পড়ে আছে।
তিনি সেই বিদ্যালয়ের সামনে একটি জামরুল গাছের নিচে দাঁড়ালেন। এই গাছটি একদিন স্বয়ং বীরেন্দ্রনাথ রোপন করেছিলেন।
গাছটি জাতীয় বিদ্যালয়ের সুখ-দুঃখের সকল দিনের সাক্ষী দেওয়ার জন্য এই শ্মশানপুরীতে দাঁড়িয়ে আছে।
আজ তিনমাস জাতীয় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে। 
নিজের হাতের একটি প্রতিষ্ঠান এইভাবে ধ্বংস হয়ে গেল,তা দেখে কুমারচন্দ্র কষ্টে মরমে মরে আছেন।
জানেন,কেউ এখানে নেই, তবুও কীসের অমোঘ টানে তিনি মাঝেমধ্যে এখানে আসেন।
চুপচাপ বসেছিলেন।

আরে কুমার,তুই এখানে?

সহসা একটা কণ্ঠ পেয়ে কুমারচন্দ্র তাকালেন।

সূর্যকান্ত। 

তোকে কোথায় পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে যে! 

ঐ আর কি ধরেছিল,কিন্তু রাখতে পারেনি! 

তা তুই বাড়ি যাচ্ছি কেন?  সকলে বড্ড চিন্তা করছে!

সে তো তুইও যাসনি! 

আমি এখানে আসি, আমার এখানে আসতে ভালো লাগে।কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে এখানে, বলেই চোখ গোপন করল সূর্যকান্ত।

তা দেখে কুমারচন্দ্র নীরব। তাঁরও চোখ সিক্ত।

সহসা জনার্দন ছুটে এলো। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে। 
এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে কুমারচন্দ্রের সামনে দাঁড়ালেন।

কুমারদা,দারুণ দুঃসংবাদ। 

কী হলোরে?

লালা লাজপত রায় মারা গেছেন।

সেকি! 

হ্যাঁ,হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল,বুকে আঘাত ছিল,মারা গেলেন,মারা যাওয়ার আগে লালা বলেছিলেন," আমার শরীরে করা বৃটিশের প্রহার বৃটিশ ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠবে।"

কুমারচন্দ্র এবার কেঁদে ফেললেন।

সূর্যকান্ত বললেন,লালার শেষ কথাগুলো যেন সত্যি হয়! 

কুমারচন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে দৃঢ়কণ্ঠে বলে উঠলেন,সত্যি হয় নয়, সত্যি করব।

বলেই আবার মাঠের মধ্যে হাঁটতে লাগলেন।

ক্রমশ...

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯