কুমীরের কাহিনী /নিশান চ্যাটার্জী

জীবনের গভীরে বিজ্ঞান-১৫

কুমীরের কাহিনী

নিশান চ্যাটার্জী


কুমীর নামক প্রাণীর প্রতি মানুষের আকর্ষন চিরন্তন। সে ছোট হোক বা বড়ো। আজ এই কুমীর সম্পর্কে কিছু জানা অজানা তথ্য আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার পালা। জানেন কি মিশরে কুমীর কে দেবতার মতো পুজো করা হত। প্রাচীন মিশরে ফারাও রাজাদের আমলে কুমীর দেবতার সম্মানে একটি শহর গড়ে তোলা হয়েছিল। শহরটির নাম ছিল ক্রোকোডিলোপলিস। সেই শহরের হ্রদে এক কুমীর রাজার মতো বাস করত। সে কেক খেত এবং মধু থেকে প্রস্তত একধরনের পানীয় পান করত। তার মৃত্যুর পরে পুরোহিতেরা তাকে মমি করলেন। তারা কুমীরের দেহটাকে শুকিয়ে সুগন্ধি মাখিয়ে কাপড়ের ফালি দিয়ে পেঁচিয়ে নিলেন সংরক্ষণের জন্য। আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়ার গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলের হ্রদ এবং নদী গুলির ধারে কুমীর বাস করে। কুমীর এক সরীসৃপ প্রাণী এবং এটি হল পৃথিবীর সবথেকে বড়ো এবং শক্তিশালী সরীসৃপ। মানুষের জন্মের লক্ষ লক্ষ বছর আগে থেকেই কুমীর পৃথিবীতে আছে। কালক্রমে তাদের বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে। কুমীরের অনেক জাতভাই আছে যেমন  ক্রোকোডাইল,কেইমেন,গাভিয়াল বা ঘড়িয়াল। 

এখন ক্রোকোডাইল কী দেখে চেনা যায়? এদের তলার চোয়ালের দুদিকের চতুর্থ দাঁত বাইরে বেরিয়ে থাকে। কেইমেন কীভাবে চিনবেন? তার দুই চোখের মাঝখানে কুলোর মতো উঁচু ঢিবি দেখা যায়। আ্যলিগেটর কীভাবে চেনা যায়? গরুর ডাকের মতো তার গর্জন শুনে। আর ঘড়িয়াল চেনা যায় তাদের ছুঁচোলো লম্বা মুখ দেখে। তাদের মুখের এই বিশেষ আকৃতি ছোট ছোট মাছ ধরার জন্য। কুমীর যখন গর্জন করে, আমরা বলি সে চিৎকার করে কাঁদছে। কিন্তু তার ডাক অনেকটা  গোঁ গোঁ শব্দের মতো। আপনারা কি জানেন কিছু কিছু কুমীর আছে যেগুলো আমাদের চেয়ে চারগুণ বড়ো এবং চল্লিশ গুন ভারী। কুমীরের গায়ের চামড়া ঢালের মতো শক্ত। কুমীরের চামড়া একরকম scale দিয়ে তৈরি। কিন্তু সেটা ঠিক কচ্ছপের শক্ত খোলকের মতো নয়। এদের পায়ে রয়েছে নখ যুক্ত থাবা। এদের লেজের ওপরের দিকের  scale গুলি ঝুঁটির মতো। এরা রাত্রে বেলায় বেড়ালের মতোই দেখতে পায়। এদের লেজ খুব শক্তিশালী। দুটি চোয়ালে ৫৪টি বড়ো বড়ো দাঁত থাকলে কি হবে সেগুলো বেশ দূর্বল। কিন্তু কোনো দাঁত পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আর একটা দাঁত সেখানে গজায়। এই রকম ভাবে একটা দাঁত প্রায় ৪৫ বার নতুন করে গজাতে পারে। কুমীর তার মুখ খোলে ওপরের চোয়াল উঁচু করে কিন্তু আমরা মুখ খুলি থুতনি নীচু করে। কুমীরের জন্ম পদ্ধতিটিও বেশ আকর্ষণীয়। বসন্তকালে মা কুমীর তার সামনের দু পা দিয়ে মাটি খুঁড়ে গর্ত করে একটা বাসা বানায়। মুরগির ডিমের মতো আকারের সাদা রঙের গোটা পঞ্চাশেক ডিম পাড়ে এবং ডিম গুলো বালি দিয়ে ঢেকে রাখে। ডিমে তা দেওয়ার সময়ে মা কুমীর ডিম ছেড়ে দূরে যেতে চায়না। দূরে যেতে হবে বলে মা কুমীর তখন প্রায় কিছুই খায়না। যদি খুব গরম পড়ে, সে ছুটে যায় জলের মধ্যে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে বাসার ওপর শুয়ে পড়ে বাসাটাকে ঠান্ডা করে।নয় থেকে দশ সপ্তাহ পরে ডিমের খোলা ভেঙে বাচ্চা কুমীর বেরিয়ে আসে। ডিমের খোলা ভাঙার জন্য বাচ্চা কুমীরের মুখের ওপরে দাঁতের মতো একটি ছোট্ট সিং গজায় যাকে ডিমের দাঁত বলা হয়। ডিমের খোলা ভাঙার পরেই সেই দাঁত টি খসে যায়। তাদের চিৎকার শুনে মা কুমীর ছুটে এসে নখ যুক্ত থাবা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে বাচ্চাদের মুক্ত করে। ডিম ফুটে বেরোবার সাথে সাথে বাচ্চা গুলো দ্রুত জলের দিকে ছুটে যায়। বাচ্চা কুমীর গুলি পোকা-মাকড়, ডাশ জাতীয় পতঙ্গ এবং অন্যান্য কীট ধরে খায়।

 মনিটর নামে এক প্রজাতির বড়ো গিরগিটি, বিশেষ প্রজাতির বক, জাগুয়ার, শকুন এমনকি বুড়ো কুমীর গুলোও বাচ্চা কুমীরের কচি মাংস খেতে পছন্দ করে। সেই জন্য জন্মের পরে দিন পনেরো এরা গর্তে ই লুকিয়ে থাকে। একটি কুমীর প্রায় পঞ্চাশ বছর বেঁচে থাকে। অন্যান্য সরীসৃপের মতো কুমীরেরও দেহের তাপমাত্রা বাড়ে কমে। দেহের তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য কুমীর জলে ডুবে থাকে। সূর্যের আলোয় সারাদিন নদীর জল গরম হয়। কিন্তু সকালে নদীর জল ঠান্ডা হয়ে ওঠে তখন কুমীর রোদ্দুরে লম্বা হয়ে শুয়ে রোদ পোহায়। এদের চোখে একটা পাতলা স্বচ্ছ পর্দা থাকে তাই এরা জলের তলায়ও দেখতে পায়। এরা শিকার খুঁজে না পেলে প্রায় দুই তিন মাস না খেয়ে থাকতে পারে। কুমীর অনেক সময় ছোট ছোট নুড়ি পাথর গিলে ফেলে। অনেকের মতে এইসব ছোট্ট ছোট্ট নুড়ি পাথর কুমীর কে খুব তাড়াতাড়ি গিলে ফেলা খাবারকে পিষতে সাহায্য করে। একবার আয়েস করে ভোজ খেয়ে সে নদীর ধারে রোদের মধ্যে দ্রীবানিদ্রা দেয়। যখন খুব গরম লাগে তখন সেই তার মুখের গহ্বর খুলে দেয়। এটাই কুমীরের ঘেমে যাওয়ার লক্ষণ। কুমীর যদি কখনো তাড়া করে তাহলে এঁকে বেঁকে ছুটলে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কারণ কুমীরের দিক পরিবর্তন করতে মানুষের থেকে বেশি সময় লাগে। কুমীরররা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দল বেঁধে বসবাস করে এবং নিজেদের সীমানা চিহ্নিত করে তাদের পেটের তলার মাংসগ্রন্থি থেকে বের হওয়া একরকম গন্ধের সাহায্যে। দলপতিরা নেয় সবথেকে ভালো জায়গাটা আর বুড়োরা ঘাসের ওপর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা দখল করে থাকে। অল্পবয়সীরা নদীর পাড়ের ঢালু জায়গায় থাকে। যখন আমরা দুঃখ পাওয়ার ভাণ করে কাঁদি তখন তাকে কুমীরের কান্না বলে কটাক্ষ করা হয় কিন্তু কুমীর কাঁদে শুধুমাত্র হাই তোলার সময়, অথবা যদি দুঃসাহসিক সমুদ্র অভিযানে যায় তখন নুন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কুমীরের দাঁত মাজার ব্রাশ খুব মজাদার। প্লোভারস নামক একধরনের পাখি, খাবারের কুচি, কীট যা কুমীরের দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকে, ঠোঁট দিয়ে তা খুঁটে খুঁটে খায়। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে এগুলো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীরা বর্তমানে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। এদের পেটের নরম scale ট্যানারির জন্য ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও এদের চামড়া দিয়ে ব্যাগ,জুতো প্রভৃতি বানানো হয়। এদের হাড়ের গুঁড়ো জমির সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কুমীরের কস্তুরী থেকে সুগন্ধি প্রস্তুত করা হয়। কুমীরের মাংস এশিয়ার বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে একটি উল্লেখযোগ্য পদ। কিন্তু মনে রাখতে হবে কুমীর একটি সংরক্ষণ যোগ্য প্রাণী। তাদের বাসস্থান গুলি সংরক্ষিত অঞ্চলে রুপান্তরিত হয়েছে এবং এ বিষয়ে আরো দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯