কবিতা অ্যাভিনিউ-২০/ বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়


কবিতা অ্যাভিনিউ 

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় 

পর্ব -২০ 

আত্মহত্যার আগে তুমি একবার
আয়নার কাছে নত হয়েছিলে , 
তবু সে তোমাকে কেন পারেনি বোঝাতে 
পুনর্জন্ম যায়নি বিফলে ( সুইসাইডাল নোট ) 
বারবার জলে ও আয়নায় নিজেকে মেলে দিয়েছেন কবি। কেন মেলাতে চেয়েছেন জলের অস্থিরতায়? বৃত্ত ভেঙে ঢেউয়ের ভেতর ঢেউ তুলে নেভাতে চেয়েছেন কি নিজের অন্তরের দাহ? বিচিত্র ও কুহকে আচ্ছন্ন এই  উদ্দীপনা। চূড়ান্ত নিরালম্ব এক অনবস্থার পীড়নে বারবার আক্রান্ত হয়েছে তাঁর চিন্তা ও মেধাবিন্যাস। শিকড়ে জলের ঘ্রাণ খুঁজে পাওয়ার  অদম্য আয়োজন ও মন্থন।কবি অমিতেশ মাইতিকে আমরা জেনেছি এভাবেই। তাঁকে জেনেছি ‘মায়াশিকলের গানে, জেনেছি  মেঘ স্তূপ ব্যথায়। কবি অমিতেশ মাইতির জন্ম  ১৯৬৩ সালে অবিভক্ত  মেদিনীপুর জেলার পাশকুড়া সন্নিহিত তিলন্দপুর গ্রমে এক শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতিমনষ্ক পরিবারে। সংকীর্ণতামুক্ত পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। সত্তরের দশকে যখন মেদিনীপুর কবিতায় উত্তাল, যখন গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার সাংস্কৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি হয়ে উঠেছিল।সেই সময়ে কাথি মহকুমায় মহকুমাশাসক হয়ে এসেছিলেন কবি বাসুদেব দেব। মধুক্ষরা রেস্তোরাঁ হয়ে উঠেছিল মেদিনীপুর জেলার কফিহাউস।সেখানে কবিতা নিয়ে তুলকালাম। মেদিনীপুরের কবিতার ঢেউ যখন তুঙ্গে অমিতেশের কবিতা লেখার শুরু এই প্রেক্ষিতের উপর দাঁড়িয়ে। যৌথ উদ্যোগে আটের দশকে প্রকাশিত হয়েছি ‘ আট জন কবি’। তাঁর একক  কাব্যগ্রন্থ মায়াশিকলের গান প্রকাশিত হয় ১৯৯২  সালে। এরপর ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়  অতল, করতল (১৯৯৭), ধাত্রীরা লেখে জাতককাহিনি ( ১৯৯৮), এই দাহ, এই প্রণয়চিহ্ন ( ১৯৯৯),তিমির বরণ প্রতীক যখন ( ১৯৯৯),  মেঘ স্তূপ ব্যথা (২০০০), ভাঙা হারমোনিয়াম( ২০০১), বাংলা বাজার (২০০১) ঋত প্রকাশন থেকে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়  কবির কবিতা সংগ্রহ ( সুমিতা সামন্ত সম্পাদিত) মায়াশিকলের গান গ্রন্থটির উৎসর্গ পত্রে কবি লিখেছিলেন-  ‘কোন মায়া কোন শিকল যাকে বাঁধতে পারেনি। স্মৃতিধার্য অনুজ জয়কে’।  খুব ছোটবেলাতেই যে ভাই চলে গেছে পৃথিবীয় মায়া কাটিয়ে সেই অনুজের মৃত্যু কি তার সমস্ত অস্তিত্ব কাঁপিয়ে দেয়নি? দিয়েছিল। তুমুল্ভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। 

‘হারিয়ে যাওয়ার সত্যি কোন মানা নেই তবু হারাতে পারি না
পায়ের নীচে যে পথ নিরন্তর সরে যায়
যে হাওয়া এই সংসার প্রত্নভূমি ছুঁয়ে কাঁপে
যে ভালোবাসা বাউল গানে মনের মানুষ খোঁজে
এদের কারোরই হয়তো হারিয়ে  যাওয়ার কোনো কারণ নেই
কোনো শিকল নেই তবু কেউ কেউ হারিয়ে যায়’। 
এই হারিয়ে যাওয়ার তাড়না কি তাকে ক্রমাগত প্ররোচিত করে গেছে, ইন্ধন জুগিয়ে গেছে লিখতে বাধ্য করেছে ‘ এপারে তার বাড়ি ছিল না/ ওপারেও না/ মধ্যিখানে  নদীই তাকে চিনত বেশি/  জল যে দেখেছে আকাশের ছবি/ তার কাছে আনন্দ মানে গতি/ এপারে কি কেউ ছিল না/ নিরালম্ব শূন্যের বসতি’।
জন্ম ও মৃত্যুর যে শূন্য আয়তন তারই অন্বেষণ করেছেন কবি এবং অনুভব করেছেন- ‘ আমি গত জন্ম থেকে এক কলি গান  ঠোঁটে নিয়ে /এতদূর আসতে পেরেছি/ পাখিরা আমার বন্ধু ছিল বলে’।  নিঃশব্দে পুনর্জন্মের ঈপ্সিত বাসনায় সংক্ষেপিত পরিক্রমা ।মৃত্যুর রঙ সাদা না কালো ... প্রাক ইতিহাস থেকে খনন করতে চেয়েছেন তারই দিকভ্রান্ত  বিষধর স্মৃতি –
 পথে দেখা হয়েছিল।  পথই তাকে নিয়ে গেছে দূরে
জানি না পথের শেষে কেমন দেখাতো তাকে 
 ... স্মৃতি পার হতে হতে  একটু দূরত্ব থেকে নিজেকে দেখেছি
পরাজিত কিন্তু ধুলোর  ঐশ্বর্যে মহার্ঘ উজ্জ্বল । (দূরত্ব ) 
এভাবেই তর্পণের স্নিগ্ধতায় নিজেকেই দেখতে চেয়েছেন পীতবর্ন জলে। জলে বিম্বিত অবয়বে কী দেখেছেন ? সচেতন পরিধি জুড়ে  সিক্ত শূন্যতাবোধ। এই স্তব্ধলোক স্পর্শ করার অভিপ্রায় জলের কাছে নিয়ে এসেছে তাঁকে এবং এখানেই  দেখতে চেয়েছেন –
 প্রতিটি ঢেউয়ে স্রোতে  জলকণায় জ্যোৎস্নায় 
 শুধু মৃত্যুচিহ্ন জেগে আছে । 
কলমের জিহ্বায় বা ঠোঁটের কিনারে এবড়ো খেবড়ো বিষাদমগ্ন স্মৃতি।শূন্যতার ভেতর  অনন্ত শূন্যতা । 
কবি অমিতেশের কবিতায় আমরা পাই যেসব উজ্জ্বল দিকচিহ্ন 
অস্ত্রের ব্যবহার করতে করতে মানুষই একসময়
অস্ত্রের চেয়ে মারাত্মক হয়ে ওঠে।
আমার কোন বাণী নেই, মহৎ কোন পথের সন্ধান নেই
নেই কোন দারিদ্র মোচনের গান
শুধু অসহায়তা অন্ধকারে তুচ্ছতম এই জীবনের মূলে জল দিয়ে যাওয়া।
আসলে তুচ্ছ কিছু পরমায়ু ছাড়া এ জীবনে আর কিছু পাইনি।
অবশেষে এক আশ্চর্য  দেশে  পৌঁছে যাই, জলাভূমির দেশ।
সেখানে ভারী বাতাস
মৃত্যুর বিষাদ ও অনুরাগ কাঁপছে সেখানকার আকাশে
কখনো অন্ধকার চমকে দিয়ে জ্বলে উঠছে ফসফরাস
এই সংকটেও  নারীর শরীর বসন্তের উৎসব ডেকে আনে
তার চোখে ঠোঁটে চুলে কিংবা ঘামের মুকুলে
যে সৌন্দর্য
আমি নিমেষের জন্য সন্ন্যাসী হয়ে হারিয়ে যাই তার মেদে ও বারুদে।
এই কি জন্মের সুখ?
এই কি হিসেব মতো বুঝে নেওয়া?
একটা জন্ম আলোছায়া খেলা, বিবর্ণ চিঠি, শিশির জমানো?
আহা রাত, আহা নিষ্ঠুর প্রপাত, স্বপ্ন নয়- আগুনের পাহাড় দেখাও
চাঁদ নয় আমি তার  পদতলে নৌকা ভেড়াবো, সব খেলার অবশেষ 
কোনো পুষ্পবৃষ্টি  নয়- ছাই শুধু
ছাই ঝরে পড়ে, ধূসর হয় গণতন্ত্রের মুখ।

তবু হারানো সমস্ত সুর এখনও বুকে করে
কোনোমতে বেঁচে আছে ভাঙা হারমোনিয়াম 
তার প্রতিটি রীডে স্তব্ধ উচ্চারণ
এখন অনেক গান অনেক সুর অনেক স্বরলিপি
ভিড় করে আসে
অনেক ধুলো অনেক আরশোলা 
এখনও যদি  একবার গেয়ে উঠতে পারি, জানি
জলের অতল থেকে বিদ্যুৎবেগে উঠে এসে
তুমিও একইভাবে  বেজে উঠবে আবার
তোমার মায়াবী ঘুম ভেঙে যাবে
ডানা মেলে উড়ে যাবে মেঘের সরগমে।
আজ একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ
প্রশাসন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে
ময়লা মগজ থেকে পাপ ও রক্তের দাগ
সে নিজের মতো করে ধুয়ে মুছে তৃপ্ত হতে চায়
এ স্বপ্ন অনেকেরই অনেক দিনের
সবাই ঘুমোলে  নিজের ছায়াকে সাক্ষী রেখে
আমিও ভক্তের প্রণত ভঙ্গিতে
ওয়াশিং মেশিনের কাছে যাই
গিয়ে বসি
কাঁদি। 
এখন হৃদয়ে কোন শোক নেই খরা নেই
বিরহের ফুল ফোটে একা…
৯ 
যে লিখেছে আত্মজীবন
লিখেছে মৃত্যুর প্রতিবেদন
১০
শিয়রের কাছে মেঘ জমে আছে খুব
কখনো বৃষ্টি হবে দুজনের মধ্যবর্তী শোকে। 
১১
তারপর আর কিছু নেই, শুধু
অসীম রিক্ততা পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধরছে
এই খরার ভিতর এক আঁচলা জল…
তুমিই পারো এমন নির্মম পরিহাস 
এমন নির্মম হতে পারে তোমারই কৃপণ করতল।
১২
বহুদূর যাবো বলে 
আমরা গুছিয়ে নিয়েছি জামাকাপড়  বাক্স ইত্যাদি
আমাদের মনের পিঠে ছটফটাচ্ছে
কচি দুটি ডানা
চোখের কোণে সুদূর একবার ঝিলিক দিয়ে 
পরক্ষণে মুখ থুবড়ে পড়ছে অন্ধগলিতে,
তবু আহ ডানা

আমাদের ইহজন্ম তুচ্ছ হয়ে ওঠার আগে 
শেষবারের মতো ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে।   

জীবন যতখানি আকর্ষক মৃত্যুর আবেদন কি তার চেয়ে কিছু কম ? এরই মাইক্রোন্যারেটিভ বিন্যাসে এক অর্থহীন নিঃসঙ্গ বৃত্ত। কালো গহ্বরের মধ্যে ক্ষতচিহ্নের দুরন্ত ইশারা। যেন সেই প্রতিধ্বনি – there are moments when , even to the sober eye of reason, the world of our sad Humanity may assume the semblance of a Hell… Alas! The grim legion of sepulchral terros cannot be regarded as altogether fanciful…নাড়াচাড়া করা এক থকথকে কাদা মাখা জীবন থেকে এক মহার্ঘের অনুসন্ধান । এই ঘুম আসলে জাগরণের পূর্বশর্ত। চ্যুতভূমি থেকে নতুন বসতির দিকে দু’কদম অভিযান। মৌলিক ধূসরতার মধ্যে বর্ণময়তার সনাক্তকরণ। উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির মাঝে সরু রেখায়িত পথ । যা প্রতিদিনের পরিত্যক্ততাগুলিকে নতুন করে চিনিয়ে দিতে চাইছ। অনুপম হৃদয় বোধের ভেতরে কবি বেঁচে থাকেন অনন্তকাল । তিনি ছাপা খানার ভুত নন ।
‘সব তোলপাড় করে চলে যেতে চেয়েছিল বলে
গত চৈত্রে পাতা ঝরেছিল , উড়েছিল কার মরণে 

হে ব্যর্থ কবি তুমি ছাপাখানার ভূত হও
আঁধার কথা বলুক , ভেঙে যাক শিলা’ (ছাপাখানার ভূত ) 
 আঁধার ই তো কথা বলে কবির সাথে । এই অন্ধকারেই নিজের মুখমুখি হয়ে আত্ম পরিক্রমা করেন কবি ।  শূন্যের ঝংকার শোনেন । আর অবলম্বন হিসেবে পান  নিরুপায় শুষ্কতার বিপরীতে এক সজল যুক্তি নির্ভরতা ।   কখনও হাওয়ার গান ঢেউয়ের কল্লোল ভেঙে ভেঙে অপরাহ্নের আলো  ফেলেছে  তাঁর ব্যক্তিগত নিসঙ্গতায় । অবচেতনে কবি শব্দহীন হেঁটে গেছেন মিথ্যে আতর গন্ধ অতিক্রম করে  একেবারে নিজস্ব মানুষটির কাছে । যাকে তিনি আয়নায় দেখেছেন বারবার । এবং জলের প্রতিবিম্বেও – ( চলবে)

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯