আইচুরা /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব - ৩৪

আইচুরা

ভাস্করব্রত পতি

ফি বছর ভাদ্র মাসের প্রথম ১৩ দিনের মধ্যে বিবাহিত মহিলারা তাঁদের বাপের বাড়িতে গিয়ে প্রথমে ভাই ও দাদাদের এবং পরে পরিবারের সকলকে 'ভোজ' দেন। এই ভোজকেই বলে 'আইচুরা'।
'আই' হল স্নেহসূচক। মূল শব্দ 'ভাই'।
কানভাই> কানহাই> কানাই
এরকম ভাবেই এসেছে জগাই, মাধাই, শিবাই, বলাই, ভবাই, নিতাই, দনাই ইত্যাদি। 'ময়নামতির গান' তে রয়েছে, "মৈনামতী বোলে বাপু রাজা গোবিন্দাই"!
যদিও এখানে রাই সরিষাকে 'আই' বলা হয়েছে। সংস্কৃতে রাজক্ষবক, হিন্দিতে লাই, গুজরাটিতে রাই জম্বুসরী বলে। এঁর বিজ্ঞান সম্মত নাম Synapis nigra, Brassica juncea। শ্বেত সরিষার চেয়ে রাই সরিষার ঝাঁঝ বেশি। আর 'চুরা' হল চিড়া বা চিড়ে বা চিঁড়া। অর্থাৎ 'চিপিটক'।
চিপিটক> প্রাকৃত চিইডঅ > চিড়া
ঢেঁকিতে চাল চ্যাপ্টা করে তৈরি খাদ্য। হিন্দিতে বলে চুড়া, চিড়রা। মৈথিলীতে বলে 'চূড়া'। চট্টগ্রামে বলে 'চুরা'। এই রাই এবং চিঁড়া একসাথে বেটে খাওয়ানোর নাম পরিচিত 'আইচুরা' নামে। আসলে ভাইদের চিঁড়া খাওয়ানোর রীতিই 'আইচুরা'।

এককথায় বলা যায় 'আইচুরা' আসলে রাজবংশী সমাজের ভাইফোঁটা বা ভাতৃদ্বিতীয়া। বিবাহিত মহিলারা সাতসকালে স্নান করে শুদ্ধাচারে তুলসিতলায় পরপর কাঁঠালের পিঁড়ি সাজিয়ে রাখেন। প্রত্যেক ভাই দাদাদের জন্য আলাদা আলাদা পিঁড়ি বরাদ্দ থাকে। সেগুলিকে তেল সিঁদুর মাখানো হয়। এরপর দাদা ভাইদের নতুন জামা কাপড় পরিয়ে সেখানে বসিয়ে তাঁদের মঙ্গল কামনায় এই 'আইচুরা' তথা রাই সরিষা ও চিঁড়ের মিশ্রন খাওয়ানো হয়। খাওয়ানোর সময় একটি ছড়া বলতে শোনা যায়। রাজবংশী ভাষায় তা -- 'ভাইয়ের মুখত দিনু আই / যমের মুখত পড়িল ছাই'। অনেকটা ঠিক "ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা / যমের দুয়ারে পড়লো কাঁটা"র মতোই। সেসময় শাঁখ বাজাতে হয়। মুখে উলুধ্বনিও দেওয়া হয়। ভাই দাদাদের আইচুরা খাওয়ানোর পর বাড়ির অন্যদেরকেও খাওয়ানোর রীতি রয়েছে। সবশেষে যম দেবতা তথা সিংগা গদাকে প্রনাম জানিয়ে মনে মনে নিবেদন করা হয় এই বলে যে সবাই যেন সুস্থ থাকে।

আইচুরা পালনের জন্য বিবাহিত মহিলাটি তাঁর সাধ্যমতো সামগ্রী বাপের বাড়িতে নিয়ে যান। আর্থিক সঙ্গতি অনুযায়ী চলে আইচুরা পালনের রীতিনীতি। এ প্রসঙ্গে নীরেনচন্দ্র রায় উল্লেখ করেছেন, "নতুন বিবাহিত মেয়ে জামাইয়ের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী দুধ, দই, গুড়, চিনি, মিষ্টি, মিষ্টান্ন, তিল, তেল, কলাই (ডাল), এমনকী মাছ, মাংস সব কিছুই মেয়ের পিত্রালয় বা জামাইয়ের শ্বশুরালয়ে নিয়ে যাবেন। নিয়ম হল সামান্য প্রয়োজনীয় বস্তুও যেন ছাড়া না পড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি সহ সবকিছুই যেন নিয়ে যাওয়া হয়। সামান্য জিনিস অন্য কারো কাছ থেকে নেওয়াও নিয়ম বিরুদ্ধ"। এইদিনে বাপের বাড়িতে সকলের খাওয়ানোর ভার পড়ে ঐ মহিলার ওপর। বাঙালির ভাইফোঁটাতেও প্রায় এরকমই লোকাচার লক্ষ্য করা যায়। নিজের হাতেই রান্না করে খাওয়াতে হয় ভাইদের। এরফলে ভাইবোনের মধ্যেকার সম্পর্কটা আরো দৃঢ়তর হয়ে ওঠে। আইচুরাতে দুইপক্ষের মধ্যে উপহার দেওয়া নেওয়ার চল রয়েছে। নতুন জামা কাপড় শাড়ি শায়া ব্লাউজের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, সোনার গহনা, টাকা পয়সাও দেওয়া নেওয়া হয়। তবে ইদানিং তা ক্রমশঃ যান্ত্রিকতায় রূপ নিয়েছে বলে খেদ প্রকাশ করেছেন নীরেনচন্দ্র রায়। তাঁর কথায়, "আইচুরার মধ্যে যে অকৃত্রিম স্নেহ ভালোবাসার আত্মপ্রকাশ ছিল তা হয়ে উঠেছে ঘরবন্দি যান্ত্রিক অর্থের চার দেওয়ালে বন্দি ক্ষুদ্র সংস্করণ জন্মদিন পালন"।

মূলতঃ দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার রাজবংশী সমাজে এই লৌকিক উৎসবটি প্রচলিত। লোকসমাজে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে একটি ছড়াও খুব জনপ্রিয়  -- "শ্রাবণের বারো, ভাদ্রের তেরো / এর মধ্যেই যত দিতে পারো"। এই 'দিতে পারো' আসলে ভাইদের জন্য বিবাহিত দিদি ও বোনেদের বিশেষ মঙ্গলকামনা করা।

উপরোক্ত ছড়াটি নিয়ে একটি সরস কাহিনী ফেরে রাজবংশী সমাজে। শ্রাবণ মাসের ১২ তারিখে ‘সিংগা গদা' নামে এক দৈত্য তাঁর মামার বাড়ি যান। আসলে সে নাকি জারজ সন্তান। তাঁর মাথায় সিং গজিয়েছিল। যা তাঁকে খুব পীড়া দিত। এই শিং থেকে মুক্তিলাভের জন্যই মামার বাড়িতে যান। এবং মামা বাড়ি থেকে ফিরে আসে ভাদ্রমাসের ১৩ তারিখের মধ্যে। যা পরিচিত 'শিংঘুরা' নামে। কারোর কারো মতে, এই 'সিংগা গদা' আসলে শ্রীকৃষ্ণেরই একটি রূপ। অনেকের মতে আবার 'সিংগা গদা' আসলে একজন দৈত্য। মানুষের বিশ্বাস যে, এই শ্রাবণের ১২ থেকে ভাদ্রের ১৩ পর্যন্ত 'সিংগা গদা' দৈত্যের চলাচলের প্রকৃষ্ট সময়। তাই এই সময়ে অনেকের অনীষ্ট করতে পারে সে। সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ভাদ্রের ১৩ এর মধ্যে বিবাহিত বোনেরা ভাইদের মঙ্গল ও সুস্থতার কামনায় 'আইচুরা' খাওয়ায়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয়, ভাদ্রের ১৩ এর পর দেখা যায় শালিক পাখির গলা ও ঘাড়ের পালক উঠে যায়। তখন লোকেদের ধারণা যে সিংগা গদা দৈত্যের সিংয়ের ভার সহ্য করতে না পেরে ঘাড়ের পালক উঠে গেছে। আসলে এটা ঋতুকালীন পরিবর্তন। আবার ১৩ তারিখের পর থেকে কাশফুল ফোটা শুরু হয়। এর আগে নাকি কাশফুল ফোটেনা। বিষয়টি কিন্তু অদ্ভুত। যেহেতু অনেকেই এই 'সিংগা গদা'কে শ্রীকৃষ্ণের একটি রূপ বলেছেন, এক্ষেত্রে একটা বিষয় নজর দেওয়া দরকার যে ভাদ্রের ১৩ তারিখের মধ্যেই কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন পড়ে। অর্থাৎ জন্মাষ্টমী। ফলে বলতেই পারি, আইচুরার অন্তরমহলে এবং অন্দরমহলে শ্রীকৃষ্ণের প্রভাব রয়েছেই।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯