তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/ চতুর্থ পর্ব/দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী   
            
চতুর্থ পর্ব        
 
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


রামতনুর এই কথা শুনে সভাস্থ সকলে প্রত্যেকে প্রত্যেকের মুখের দিকে বিস্ময় ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে 'কে এই বেয়াদব যে সম্রাটের সামনে শর্ত আরোপ করল। এই বেয়াদপ কি জানেনা যে মহামান্য সম্রাটের এক অঙ্গুলিহেলনে বদতমিজ রামতনুর ছিন্নশির সভাস্থলে লুটিয়ে পড়বে'। 

কিন্তু সকলেই ততোধিক বিস্ময়ে দেখলেন মহামান্য সম্রাট মোলায়েম সুরে বললেন "বলুন সঙ্গীতসাধক আপনার কি শর্ত আছে? আপনার গান শুনবেন বলে আমার আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে আমি নিজেও সাগ্রহে অপেক্ষা করছি"। 

আকবরের কথা শুনে রামতনু বললেন "আপনার এই প্রাসাদের সব দরজা জানলা বন্ধ করে দিতে হবে যাতে বাইরের থেকে কোন কিছু ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে"। রামতনুর কথা শুনে আকবর তার পাশে বসা কবিবর বীরবলকে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন "এই শর্ত কেন দিচ্ছেন রামতনু?" 

বীরবল বললেন "জাহাঁপনা, এখানে আসার পূর্বে গুরুজি বলেছিলেন ওঁর গাওয়া বিভিন্ন রাগের গানে আকৃষ্ট হয়ে হিংস্র জানোয়ারের যেমন বশীভূত হয়, মৌমাছিরা গুঞ্জন করে আবার পাখিদের কলকাকলিতে সভাস্থল ভরে যাবে"। সম্রাট আকবর এই কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেওয়ানকে নির্দেশ দিলেন রাজসভার সমস্ত জানালা দরজা বন্ধ করে দিতে।                                

যথাসময়ে রাত্রির প্রথম প্রহরে গানের মজলিস শুরু হলো। রামতনু তম্বুরা নিয়ে বসলেন সুরের মায়াজাল সৃষ্টি করতে। তানপুরাতে সুর তৈরী করে রামতনু শুরু করলেন তার ঈশ্বর দত্ত কন্ঠের গান। এ সুর যেন সপ্তলোকের সুর, গায়কের অন্তরের অন্তস্থল থেকে সেই সুর ঝংকৃত হতে থাকলো প্রাসাদের সর্বত্র। সম্রাট আকবর সেই সুরের মায়াজালে যেন কোন এক অন্যজগতে চলে গেলেন। রামতনু শুরু করেছিলেন রাত্রির প্রথম প্রহরের ইমনকল্যাণ রাগ দিয়ে। সেই রাগের গমকিতে ঝংকৃত হতে থাকলো সারা দরবার কক্ষ। অদ্ভুত এক মাদকতা সৃষ্টি করলো উপস্থিত প্রত্যেকের মনে ও শরীরে। রামতনু শুরু করেছিলেন গানের এই কথা দিয়ে "শুভ নখত তখত বৈঠো রাজত ছাজত হ্যায় সব মুলক খলক যে বিধনা কি সব ছত্র ধরে তে সব লাগে সব সেবা করানা। ধন ধন চক্রবর্তী নরেশ আকবর দুঃখহরণ তানসেন আইসো সুরপুরী নর নরেন্দ্র নরন"। আকবর গানের ভাষার অর্থ বুঝতে পারলেন না কিন্তু সুরের খেয়ায় ভেসে যেতে লাগলেন। বীরবল জাহাঁপনার পাশে বসেছিলেন। সম্রাট বীরবলকে অস্ফুটস্বরে গানের অর্থ জিজ্ঞেস করার পরে যে অর্থ বীরবল বললেন তা শুনে আকবর নিজে তাজ্জব বনে গেলেন। বীরবল বললেন সুরের জাদুকর তাঁর গানে আপনার বর্ণনা করছেন "চক্রবর্তী জাহাঁপনা আকবর, তিনি দুঃখহরণ। তাঁর সম্রাজ্য নয়তো বেহেশত্। কত আমির-ওমরাহ আর রাজাদের বাস এখানে, সম্রাট সমস্ত মানুষের দুঃখ দূর করেন"। রামতনু যখন তার গান শেষ করলেন তখন মধ্যরাত প্রায় অতীত। প্রাসাদের অলিন্দে তখনও পর্যন্ত অনুরণিত হচ্ছে সেই সুরের মূর্ছনা। সম্রাট আকবর যেন এক খোয়াব দেখছেন। একি মানুষের সৃষ্টি না কল্পলোকের সুর। তার সভাতেই বহু নামিদামী গায়ক আছেন কিন্তু এইরকম গান তিনি কোনোদিন শুনেন নি। সেই গানের সুর শুনে তিনি যেন কোন এক স্বপ্নলোকে বিচরণ করছিলেন। চোখ খুলে দেখলেন রামতনু তখনও চোখ বন্ধ অবস্থায় আছেন। তার চোখে-মুখে এক প্রদীপ্ত ভাস্বর। তিনি যেন ধ্যানরত অবস্থায় ঈশ্বর লোকে চলে গেছেন। শুধু বা সম্রাট কেন তাঁর আমীর-ওমরাহেরা পর্যন্ত সুরের নেশায় বুঁদ হয়ে গেছেন।

অবশেষে রামতনু যখন ঈশ্বর লোক থেকে মর্ত্যলোকে ফিরে এসে চোখ খুললেন তখন সম্রাট আকবরের সাথে দরবার কক্ষের সকলের একই কণ্ঠস্বর 'তোবা তোবা, বহুৎ আচ্ছা'। আকবর তাঁর সেনাপতি মারফত খাজাঞ্চিকে এত্তেলা দিয়ে বললেন থলি ভর্তি মোহর আনতে এবং সেই থলি ভর্তি মোহন রামতনুকে দিয়ে  বললেন "আপনার গান শুনে আমার দিওয়ানা হয়ে গেল। আজ থেকে আপনি এইখানেই থাকবেন। আর এই মোহর ভর্তি থলে আপনি গ্রহণ করুন"। শুধু মোহর ভর্তি থলে দিয়েই সম্রাট সন্তুষ্ট হলেন না, তিনি তাঁর গলার থেকে বহুমূল্য মণিমাণিক্য খচিত রত্নহার খুলে তানসেনের কন্ঠে পরিয়ে দিলেন। এছাড়াও তিনি বললেন আজ থেকে আপনি হলেন মিঞা তানসেন। 'মিঞা' শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ গায়ক। 

তানসেন ভাবলেন এতদিন ধরে তিনি রেওয়ারাজের সভায় গান গেয়েছিলেন কিন্তু এমন সম্মান তো তিনি সেখানে পাননি, ভারত সম্রাট আকবর আজ আগ্রার দরবার কক্ষে এত সমঝদার আদমিদের সামনে তাঁকে যে সম্মান দিলেন। আবুল ফজলের লেখা ‘আইন-ই-আকবরী’ থেকে জানা যায় সেই রাত্রে সম্রাট তানসেনকে যে থলে ভর্তি মোহর দিয়েছিলেন তার মূল্য দু'লক্ষ টাকা। আবুল ফজল আরো লিখলেন বিগত পাঁচশত বৎসরে তানসেনের সমকক্ষ কোন গায়ক তামাম হিন্দুস্থানে জন্মায়নি এবং ভবিষ্যতেও জন্মাবে কিনা সন্দেহ আছে।                                              
                                                                   ক্রমশঃ

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯