আস্তিক ও নাস্তিক /মিলি ঘোষ

আর কবে ভাবব!  পর্ব ২ 

আস্তিক ও নাস্তিক

মিলি ঘোষ


ছোটবেলায় ঠিক বলব না। ছোটোর থেকে সামান্য একটু বড়ো বেলায় 'নাস্তিক' শব্দটার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। এও শুনলাম, যারা ঠাকুর মানে না, তারা হলো নাস্তিক। কার কাছে শুনেছিলাম, মনে নেই। এখন 'ঠাকুর মানে না' কথাটার যে কতরকম মানে হতে পারে, তা বুঝিনি। বোঝার বা ভাবার চেষ্টাও করিনি। শুধু বুঝেছিলাম, এরা বিজাতীয়। ততদিনে বাংলা ব্যাকরণে বিজাতীয় শব্দর সাথে পরিচিত হতে শুরু করেছি। কিন্তু নাস্তিকের যে একটা বিপরীত শব্দ থাকতে পারে এবং সেটা কী, তা জানার কোনও আগ্রহ ছিল না। কারণ, যা ব্যতিক্রম, তা নিয়েই আলোচনা হয়। যা কিছু স্বাভাবিক, তা কখনওই আলোচ্য বিষয় হয় না। সেই হিসেবে 'নাস্তিক' হয়ে গেল আমার চোখে ব্যতিক্রমী শব্দ। 

প্রথমে আমার খুব কাছ থেকে দেখা দুই আস্তিক ও নাস্তিকের কথা একটু বলে নিই। তাঁরা হলেন আমার বাবা ও মা।
একটু বড়ো হয়ে শুনেছি, বাবা'কে উদ্দেশ্য করে মা'কে বলতে, "তুমি তো নাস্তিক।"
বাবা হাসতেন।
অদ্ভুত ব্যাপার, এই বাবা'ই কিন্তু কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোয় ঠাকুর কিনে পুজোর যাবতীয় বাজার করে দিতেন। যত্ন করে কলা গাছের খোল কেটে , তা দিয়ে নৌকো বানিয়ে ভাগে ভাগে শস্য রাখার ব্যবস্থা করে দিতেন। সরস্বতী পুজোতেও সহযোগিতা করতেন। শুধু ঠাকুর মশাই ভুল সংস্কৃত উচ্চারণ করলে তার টুটি টিপে ধরতেন। 
মা বলতেন, "দরকার নেই। অত ভুল ধরতে যেও না। এরপর আর ঠাকুরমশাই পাব না।"
বাস্তবে তাই ঘটেছিল। মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে পুজো করতে ঠাকুর মশাইদের ভয় ছিলই। বাবা রাগারাগি কিছুই করতেন না। শুধু ভুলগুলো শুধরে দিতেন। আর আমরা ঠাকুর মশাইয়ের অবস্থা দেখে ফিক ফিক করে হাসতাম। 
বাবার কানে ভুল লাগলে, বাবা ভুল ধরবেনই। কিন্তু আমাদের বোধহয় হাসাটা ঠিক হয়নি। পুরোহিতবৃত্তিও একটা পেশা। ক'জন মানুষ নিজের কাজ নিখুঁতভাবে করতে পারে! এখন সেটা বুঝি। 

বাবা বেসিক্যালি নাস্তিক হয়েও মা'কে পুজোতে সাহায্য করতেন। কেন ? তার একটাই কারণ, অন্যের বিশ্বাসে আঘাত না দেওয়া। অপরকে সম্মান করা। মা'ও পুজো নিয়ে এমন কিছু করতেন না, যা অন্যের জীবন যাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। পাশের বাড়ির ছেলের পরীক্ষা থাকলে বা পাড়ায় কেউ অসুস্থ হলে  তাণ্ডব করে ঢাক ঢোল পিটিয়ে পুজো হয়নি আমাদের বাড়িতে কখনও। বাবাও নিজেকে নাস্তিক বলে জাহির করার চেষ্টা করেননি। তিনি শিক্ষক। অযথা নাস্তিক-আস্তিক নিয়ে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করা তাঁর কাজ ছিল না। 

কিন্তু বর্তমানে মানুষকে সচেতন করার নাম করে, নিজেদেরকে সমাজ সংস্কারক, বিজ্ঞান মনস্ক বা যুক্তিবাদি দেখানোর প্রচেস্টায় সমাজে দুই শ্রেণীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে বই কমছে না। 
আর একদল অতি আস্তিক এমন সব কাণ্ড করছেন, যা বিরক্তিকর পর্যায় পৌঁছে যাচ্ছে। 
তাঁরা ঠাকুরের ছবি দিয়ে লিখে দিচ্ছেন, এই পোস্ট অন্তত কুড়ি জনকে শেয়ার না করলে তিনদিনের মধ্যে তোমার চরম বিপদ হবে। এইভাবে ভয় ধরানোর চেষ্টার মানেটা কী ? যারা এগুলো শেয়ার করছেন, ভয় পেয়েই করছেন। কারণ, জীবন অনিশ্চিত। আপনজনকে হারানোর ভয় মানুষের সবথেকে বেশি। এই জায়গাতেই তাঁরা দুর্বল। তাই ভয় পেয়ে কুড়ি জনকে পাঠাচ্ছেন। এবার ওই কুড়ি জনের মধ্যে যদি আমার মতো কেউ থাকে, তবে তো তাঁর কপালে অশেষ দুর্গতি। প্রথমে ভালোভাবে বলি। তার পরেও যদি একই রকম বার্তা আমার কাছে আসে, সেটা তাঁর পক্ষে খুব একটা সুখের হয় না। এরপরে তিনি আমার কাছে আর শেয়ার করবেন না, জানা কথা। কিন্তু অন্য কাউকে করবেন। 
এসব বিষয়ে প্রচুর প্রতিবাদ করেছি। আমার বক্তব্য, ঈশ্বরে বিশ্বাস কোনও ব্যক্তিকে যদি সুখি রাখে, তিনি থাকুন তাঁর বিশ্বাস নিয়ে, কিন্তু অন্যকে উত্ত্যক্ত করে নয়। বাড়িতে নীরবে আরাধ্য দেবতার উপাসনা কেউ যদি করেন, আমার তো বলার কিছু থাকতে পারে না। পুজো করে কেউ যদি শান্তি পান, আমি কেন তাঁর শান্তি নষ্ট করব ? অপরের জীবনে অসুবিধা সৃষ্টি না করে, তিনি যদি ঘরে প্রার্থনা করে ভালো থাকেন, আমি তাঁর ভালো থাকায় বাধা দিতে পারি না। তবে পুজো পুজো করে তিনি যদি সংসারে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে থাকেন, তাহলে সাংসারিক অশান্তি অনিবার্য।

আমার একই বক্তব্য নাস্তিকদের প্রতিও। 
যতদূর জানি, নাস্তিকরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। তাহলে যার অস্তিত্বই নেই, তাকে নিয়ে কেন পড়ে আছেন ? প্রায়ই তাঁরা পোস্ট দেন, ঈশ্বর নেই। তলায় কোনও এক মহান ব্যক্তির ছবি ও বাণী জুড়ে দেন। সেই মহান ব্যক্তি দেশপ্রেমিক হতে পারেন বা বিজ্ঞানী বা অন্য কিছু। নিজেদের বক্তব্যে বিশ্বাস অর্জনের জন্য অন্যের ছবি ও কথা জুড়ে দিতে হচ্ছে। তাহলে নিজেদের প্রতি তাঁদের আস্থা কোথায় ? তাঁরা করবেন সমাজ পরিবর্তন ? 

আস্তিকদের ঈশ্বরে বিশ্বাস অনেক কারণে। অনেকেই আছেন, ঈশ্বরকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। কেউ বা ভয়ে পুজো করেন। কারণ, তিনি নিজে জানেন জীবনে তিনি কী কী কীর্তি করেছেন। অথবা নিজের লোককে হারানোর ভয় থেকেও করেন। আবার কেউ বা ধান্দায় পুজো করেন। তাঁর ভবিষ্যৎ, প্রমোশন, সন্তানের কেরিয়ার ইত্যাদি। কিন্তু নাস্তিকরা যেহেতু ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়, তাদের এই চিন্তা থাকবে না, ধরে নেওয়া যায়। তারপরেও কেন এত অনাস্থা ? ফেসবুকে যুদ্ধ না বাধিয়ে থাকুন না, নিজেদের ধ্যান ধারণা নিয়ে। কে বাধা দিয়েছে ? 

যদি বিষয়টা এই পর্যন্তই হয়, তাহলে উভয় পক্ষকেই  বলব, নিজের মতাদর্শ নিয়ে অপরকে সম্মান করে চলতে। এতে কোথাও কোনও বিভেদ সৃষ্টি হবার কথা নয়। 

কিন্তু, বিষয়টা এখানেই থেমে নেই। দু'একটা ঘটনা বলি এই প্রসঙ্গে।

বেশ অনেক বছর আগে আমার এক পরিচিত  বলেছিলেন, তিনি কাজের মাসিকে ঘরে ঢুকতে দেন না। নিজেই ঘর মোছেন। শুধু বাসনটা মাজান তাকে দিয়ে। কারণ হলো, কাজের মাসির ধর্ম আলাদা। তাই ঘরে ঢোকান না। অথচ, তাকে দিয়ে বাসন মাজিয়ে সেই থালায় খেতে ওই পরিবারের কারোর আপত্তি নেই। 
ওই পরিচিত মহিলা চাকরি করেন ও তার স্বামী একটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 
কাদের বোঝাব ? কাদের বিরুদ্ধে গলা তুলব ? 
আর একটি ঘটনা বলি। তিনিও শিক্ষিকা। রিটায়ারমেন্টের মুখে। হাজারো শারীরিক সমস্যা নিয়েও ঘরে বাইরে খেটে চলেছেন। সেখানেও একই সমস্যা। রান্নার লোক হিসেবে যাকে আনা হয়েছিল, তার ধর্ম আলাদা।  
সরাসরি প্রশ্ন করি, "ভিন্ন ধর্মের লোক বলে রান্না করালে না ?"
বেগতিক দেখে ঘুরিয়ে দিল। 
বলল, "না, ওরা তো খুব অপরিষ্কার হয়।"
কতটা অপমানজনক কথা ভেবে দেখুন।
অপরিষ্কার কে ? 
যিনি বললেন কথাটা,তাঁর মনের কালিমা দূর হয়েছে কি ?
এরকম ঝুড়ি ঝুড়ি উদাহরণ আছে। 
অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এরা তথাকথিত শিক্ষিত। শিখেই পৃথিবীতে এসেছেন। কারণ, বীজ বপন হয়ে গেছে অনেক আগেই। পরিবার তাঁদের ঠিক এই রকমই ভাবতে শিখিয়েছেন। এর শিকড় বহুদূর বিস্তৃত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁরা এই নিচ মানসিকতাকে লালন করে চলেছেন এবং এটাকেই ঠিক বলে ভেবে এসেছেন। 

তবু প্রতিবাদ করতে হবে। একেবারে নিজের ঘর থেকে। ধর্ম যদি যুদ্ধের আকার নেয়, সে যুদ্ধের সৈনিকরা কোনও না কোনও পরিবারেরই মানুষ। তাই প্রতিবাদটা পরিবারেই প্রথম হওয়া উচিত। বাড়িতে কারোর মধ্যে এই মানসিকতার এক শতাংশ দেখলেও প্রতিবাদ করুন। পাশের বাড়ির কেউ এই একই রোগে আক্রান্ত হলে, সেখানেও গর্জে উঠুন। আত্মীয় বন্ধুদের মধ্যে যারাই এই মানসিকতা পোষণ করেন, তাদের বোঝান। 
আপনি খারাপ হবেন, কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, আপনি স্রোতের বিপরীতে পা ফেলছেন। পাল্টা যুক্তি অনেক শুনবেন। যা আসলে অযৌক্তিক। তবু বলতে হবে। এক প্রজন্মকে না শেখাতে পারলে, পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতে হবে। তারাই দেশের ভবিষ্যৎ। তারাই শেখাবে বাবা, মায়েদের। বোঝাবে, এ ভুল। এ মিথ্যে। 
প্রতিটি পরিবার একটু একটু করেও যদি পরিবর্তিত হয়, আজ না হোক, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কিছুটা ভালো সমাজ আমরা পাব। 

জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এর কবিতা আমরা সবাই পড়ি, গান শুনি। তখন কি সাম্প্রদায়িকতা জেগে ওঠে ? তাহলে কেন এত অনাচার ? ধর্মের কারণে যার হাতের রান্না খাওয়া যায় না বা যাকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যায় না, তার রক্তই যে আপনার শরীরে প্রবেশ করবে না কে বলতে পারে ? হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে  রক্তের ধর্ম জানতে চাইবেন ? 
ক'দিন আগে কোলকাতার এক নামকরা ডাক্তারবাবু বলেছেন, এক মহিলার হার্ট প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে আর এক যুবকের শরীরে। জন্মগত কারণে এদের দু'জনের ধর্ম আলাদা।
ডাক্তারবাবুর কথায়, "হার্টের কোনও ধর্ম হয় না।"

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শঙ্কুর ‘মিরাকিউরল’ বড়িই কি তবে করোনার ওষুধ!/মৌসুমী ঘোষ

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯