আলপনা দণ্ডপাট (রেলস্টেশনের মহিলা হকার, খবরের কাগজ বিক্রেতা, পাঁশকুড়া) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০

আলপনা দণ্ডপাট (রেলস্টেশনের মহিলা হকার, খবরের কাগজ বিক্রেতা, পাঁশকুড়া)

ভাস্করব্রত পতি


মুখে হাসি লেগেই থাকে সবসময়। কোনো ক্লান্তির ছাপ নেই। অথচ হাজার যন্ত্রনা, কষ্ট, বেদনা, হাহাকার চেপে রাখেন ঐ হাসির অন্তরালে। তাঁর কাছে 'জীবন' মানে রসমালাইয়ের মিস্টি রস নয়। তাঁর জীবনদর্শনে 'জীবন' হল ধানীলঙ্কারও অধম। অনায়াসে খাওয়া যায়না, তবুও খেতে হয় -- রসনার তাগিদে। পেট ভরানোর তাগিদে। বেঁচে থাকার অছিলায়।

তিনি আলপনা দণ্ডপাট। দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ের পাঁশকুড়া রেলস্টেশনের জনপ্রিয় হকার। একমাত্র মহিলা খবরের কাগজ বিক্রেতা। এটাই তাঁর পেশা। সংসারের হাঁড়ির হাল ওঠানামা করে তাঁর দৈনন্দিন বিক্রিবাটার ওপর। আর এভাবেই পেরিয়ে এসেছেন অনেকগুলো কোকিলডাকা বসন্ত। ট্রেনগাড়ির 'ভোঁ' আওয়াজও আজ ম্লান তাঁর মেয়েলী কন্ঠের 'ফেরিওয়ালার ডাক' আর ব্যস্ত নিঃশ্বাসের শব্দের কাছে।

মেদিনীপুর প্রসব করেছে ভগবতী দেবীকে। মাতঙ্গিনী হাজরাকে। আভা মাইতিকে। ইন্দুমতি ভট্টাচার্যকে। সেই জেলার মেয়েদের শরীরে যে আলাদা বিদ্যুৎ থাকে তা বারবার প্রমানিত। এঁদের বিষয়ে এতো কিছু না জানলেও অকুতোভয় দৃষ্টি নিয়ে চলার পথ তৈরি করেছিলেন আলপনা দণ্ডপাট। যা কিনা মেদিনীপুরের মহিলাদের প্রতিনিধিদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। লড়াইয়ের ময়দানে 'হার না মানা হার'! তিনিও অন্যথা নয়। নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সাদা কাগজে ছাপানো কালো অক্ষর বেচে বেঁচে থাকার রশদ জোগাড় করেছেন তিনি। ইচ্ছে হলেই পাঁশকুড়ার মতো বিশাল সবজির বাজারে খুলতে পারতেন আলু পেঁয়াজের দোকান। এতে অনেক বেশিই উপার্জন হতে পারতো। পরিশ্রমের পরিমানও কম থাকতো। না, তিনি করেননি। আসলে পেটে বিদ্যা আছে। শিক্ষা আছে। জ্ঞান গরিমা আছে। সেইসময়ে মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন অনায়াসে। সেটুকু দিয়েই তিনি চেয়েছেন একজন পুরুষের কাজকে আত্মীকরণ করতে। 'খবরের কাগজ বিক্রেতা'রা তো আসলে পৃথিবীর তথ্য বিলি করে জনে জনে -- এ ধারনা তাঁর মনে গ্রথিত। তাই বেশি লাভের অঙ্কের পেছনে না ছুটে মানুষের জন্য ছুটতে চেয়েছেন।

ছাপানো খবর বিক্রি করতে করতে কখন যে তিনি নিজেই "খবর" হয়ে গেছেন তা বুঝতে বুঝতে পৌঁছে গেছেন জীবন সায়াহ্নে। কিন্তু থেমে নেই লড়াই। তাঁর কাছে থেমে যাওয়ার অর্থ হেরে যাওয়া। আর তিনি তো হারতে জানেননা। সেই নয়ের দশক থেকে তাঁর জীবনের রূপ রস গন্ধ আবর্তিত হয়ে চলেছে খবরের কাগজকে সঙ্গী করে। সেই 'সঙ্গী'ই তাঁর ভরন পোষনের দায়ভার নিয়েছে অচিরেই।

সেই ভোর থেকে তাঁর লড়াই শুরু। রেলস্টেশনে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা -- এ কাজে খামতি নেই। আসলে কাজে না এলে উপার্জন নেই। তাহলে তো হাঁড়ি চড়বেনা। বাড়িতে ছোট্ট মেয়েকে রেখে চলে আসতেন খবরের কাগজের বাণ্ডিল নিয়ে ফিরি করতে। গোটা প্লাটফর্ম আর ওভারব্রিজ জুড়ে তাঁর জনে জনে সওদা। কেউ নেয়, কেউ ফিরিয়ে দেয়। বাজার চলতি সব কাগজের সম্ভার তাঁর কাছে। হাজার প্রতিকূলতা নিয়ে তিনি স্টেশনের নিত্যযাত্রীদের কাছে "আলপনা দি"!

একসময় স্বামী আসতেন একাজে কিছুটা সাহায্য করতে। অনেক বছর হোলো তিনিও এখন আসতে পারেননা। অসুস্থ। বাড়িতেই থাকেন। ফলে একলা হয়েই যুঝবার শক্তি অর্জনে ভরসা করেছেন ওপরওয়ালার কাছে। ফেরাননি। কোনো কাজই ছোট নয়, এই ভাবনা থেকেই তাঁর এ পথে আসা। আজ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। একটা বাড়িও বানিয়েছেন। অসুস্থ স্বামীর নিয়মিত সেবাও করে চলেছেন। নিজেও চরম অসুস্থ। শারীরিকভাবে আর আগের মতো সাবলীল নয়। স্টেশনে অপেক্ষমান যাত্রীদের কাছে যেতে পারেননা অবলীলায়। কিন্তু এতো বছরের শ্রম, পরিচিতি মহলটা নেহাত কম নয়। পাঁশকুড়া স্টেশনে ওঠার সিঁড়িতেই নানা কাগজ এবং পত্রপত্রিকার সম্ভার নিয়ে তাঁর অস্থায়ী দোকান। পরিচিত গ্রাহকরাই নিয়ে যায় কাছে এসে। 

স্টেশনের বাইরে বেজায় রোদ। কখনও বৃষ্টির তাণ্ডব। সেখানেই বসতেন। কিন্তু রোদ জলের জোড়া আক্রমনে আপাতত সেই স্থান ছাড়তে হয়েছে কয়েক দিনের জন্য। তাই আপাতত স্টেশনে ওঠার সিঁড়ির ধাপেই তাঁর হকারগিরি। হাঁটতে গেলে কষ্ট। অস্টিওআর্থ্রাইটিস। আরো নানা রোগজ্বালা। সবকিছুই মুখের নির্মল হাসি দিয়ে 'লেপচাপা' করে আজ তিনি মহিলা জগতে 'দৃষ্টান্ত'। 

পাঁশকুড়া পৌরসভার সুরানানকারে বাড়ি। তখন স্বামী ও ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ছিল কষ্টের সংসার। কিন্তু রোজগার? পেটের ভাত জোগাড় করতে হবে তো! সেই থেকে বদলে গেল ভাবনা। সামাজিক চক্ষুলজ্জা ছেড়ে নেমে পড়লেন পেপার ফিরি করতে। পাঁশকুড়া রেলস্টেশনে। পাশে পেলেন স্বামী জয়দেব দণ্ডপাটকে। তিনিই প্রথমে খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। স্বামীর ভরসায় স্বামীর সাথেই নেমে পড়লেন লড়াইয়ের ময়দানে। এ লড়াইতে তাঁকে তো জিততেই হবে। যে কাজ পুরুষেরা করতে হিমশিম খায়, সে কাজ করবে একজন মহিলা? সে সময় যাঁরা নাক মুখ সিঁটকেছিল, তাঁদেরকে বেশি পাত্তা না দিয়ে, নিজের চিন্তা ভাবনা এবং মনের জোরকে ভরসা করে ও প্রাধান্য দিয়েই আজ তিনি জীবন সংগ্রামের সফল 'রতন'। সেই ছোট্ট মেয়ে বড় হয়েছে আজ। মানুষ করেছেন তাঁকে, বিয়ে দিয়েছেন নিজেদের রোজগারে।

শাড়ি শায়া ব্লাউজ পরে কাগজের সম্ভার নিয়ে স্টেশনে হাঁটাচলা করার ক্ষেত্রে বিশাল অসুবিধা। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। বহুবার আছাড় খেয়েছেন শাড়িতে পা জড়িয়ে। হোঁচট খেয়েছেন ওভারব্রিজে উঠতে গিয়ে। সমস্যা এসেছে দুই হাঁটুতে। চলতে পারেননা আগের মতো। তা বলে তো থেমে থাকা যায়না! আসলে থামতে জানেননা আলপনা দণ্ডপাট। ঘড়ির কাঁটার ঘুর্ণনের ফাঁকে তিনি হয়ে উঠেছেন মহিলাদের আইকন। লড়াইয়ের নেতৃ। সংগ্রামের মুখ। একজন মহিলা হয়েও যে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরুষের কাজ করা যায়, তা তিনি দেখিয়েছেন তিন দশক ধরে। আত্মনির্ভরতা, নিজের প্রতি বিশ্বাস আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সততা এবং আগ্রহ থাকলে 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু' পার হওয়া যায় এক নিমিষে -- তার জ্বলন্ত উদাহরণ দক্ষিণ পূর্ব রেলের পাঁশকুড়া রেলস্টেশনের মহিলা হকার আলপনা দণ্ডপাট।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল