তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী /নবম পর্ব /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী               
নবম পর্ব         
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


এই দিন ছিল শুক্রবার বা জুম্মাবার। মিঞা খোদাবক্সের আজ গান গাওয়ার দিন। তাই তিনি নিজের আসন ছেড়ে উঠে সঙ্গীত পরিবেশন করার উপক্রম করবার সময় বীরবল সম্রাটকে কুর্নিশ জানিয়ে বললেন "জাহাঁপনা, আমার একটি আবেদন আছে। বেশ কিছুদিন হল আমরা যারা দরবারীরা প্রত্যহ এখানে উপস্থিত হই তারা সভাগায়ক সঙ্গীত সম্রাট তানসেনের কন্ঠ মাধুর্য শুনতে পাইনি। তাছাড়াও আজকের এই প্রচণ্ড দাবদাহে তানসেনের গান শুনে আমরাও শান্তি লাভ করতে পারি এবং আপনিও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হতে পারবেন। আপনি অনুমতি করলে হয়তোবা তিনি গান গাইবেন। বীরবলের কথা শুনে সম্রাট বললেন "কবিবর আপনার প্রস্তাব অতি উত্তম। তাহলে মিঞা তানসেনের সংগীতের মাধ্যমেই আজকের সভা শেষ হোক"। সম্রাট একথা বললেন বটে কিন্তু তাঁর স্মরণে ছিলনা যে আজকে মিঞা খোদাবক্সের সংগীত পরিবেশন করার দিন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে তানসেনের জন্য কোন নির্দিষ্ট দিন ধার্য নেই। তিনি কেবল মাত্র সম্রাটের অনুরোধে গান গেয়ে থাকেন।                                        

কবিবর বীরবলের প্রস্তাব শুনে সম্রাট সম্মতি জ্ঞাপন করার পরে সবার প্রবীণতম গায়ক মিয়া খোদাবক্স কনুইয়ের খোঁচা দিলেন তার পাশে বসা দরিয়া খাঁকে ব্যাপারটা অনুধাবন করার জন্য। দরিয়া খাঁ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন "জনাব আপনার হয়ত স্মরণে নেই যে আজকে ওস্তাদ খোদাবক্সের সঙ্গীত পরিবেশনের নির্ধারিত দিন"। দরিয়া খাঁর কথা শুনে সম্রাট বললেন "অবশ্যই আমার স্মরণে আছে। তবে তানসেনের গান আমরা আগে শুনবো তারপরে আমরা মিঞা খোদাবক্সের গান শুনবো। মিঞা খোদাবক্সকে কোনরূপ অসম্মানিত করা হবে না"। সম্রাটের কথা শুনে তানসেন এই সময়ে টোড়ি রাগ ধরলেন। তার সেই গানের সুর সমস্ত দরবারে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই সংগীতের সুর অন্তরে আস্বাদন করতে লাগলেন। এমনকি যে সমস্ত হাবসী খোঁজা প্রহরীরা থাকে যাদের হৃদয়ে দয়ামায়ার কোনো লেশমাত্র নেই তারাও দরবার কক্ষের প্রবেশদ্বারে দাড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই গান শুনতে লাগলো এবং তাদের মুখ চোখের মধ্যে যেন একটা পরিবর্তন এলো। তানসেনের সংগীত শেষ হওয়ার পরে দরবার কক্ষে করতালির ঝড় বয়ে গেল। সম্রাট সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন "কেয়াবাত, বহুত আচ্ছা গানা গায়া তানসেনজী" এই বলে সম্রাট তানসেনের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাতের অঙ্গুলি থেকে হীরক নির্মিত অঙ্গুরীয় খুলে তানসেনকে পরিয়ে দিলেন। তানসেন সম্মুখে নত হয়ে সম্রাটকে অভিবাদন জানানোর পরে মিঞা খোদাবক্সের oiসংগীত পরিবেশন করার কথা। তিনিও বীণাযন্ত্র নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন কিন্তু সম্রাট সিংহাসনে যে মুহূর্তে ফিরে এসে বসলেন তখন দ্বারপ্রান্তে তিনি দেখলেন বেগম মরিয়মের প্রধানা বাঁদী মেহেরাকে। মেহেরাকে দেখে সম্রাটের মনে পড়ে গেল আজ মধ্যাহ্নভোজ মরিয়মের কক্ষে করার কথা। সেই মুহূর্তে খোদাবক্সকে সংগীত পরিবেশন করার সুযোগ না দিয়ে তিনি সত্বর দরবার সমাপ্তির ইঙ্গিত দিলেন। 

সম্রাট চলে যাবার পরে দরবারের অধিকাংশ লোকেই তানসেনের কাছে এসে তাকে অভিবাদন জানালেন। এদিকে সম্রাটের এই আচরণের যথার্থ কারণ না বুঝে মিঞা খোদাবক্স, দরিয়া খাঁ, নবাব খাঁ, ফরিদ খাঁ গম্ভীরভাবে দরবার থেকে বেরিয়ে আসার সময় দরিয়া খাঁ মিঞা খোদাবক্সকে চুপি চুপি বললেন "দেখলেন আজকে সম্রাটের কান্ড। তিনি তানসেনকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন একথা ঠিক কিন্তু আমরাও তো সভাগায়ক। আমাদেরকে কোন সুযোগই এখন আর দেওয়া হচ্ছে না। আজকে যদিও আপনার সঙ্গীত পরিবেশনার দিন ধার্য ছিল তথাপি আপনাকে দাবিয়ে রেখে তানসেনকে সঙ্গীত পরিবেশনের সুযোগ দিয়ে অকস্মাৎ সম্রাট দরবারের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। এইভাবে আমাদের অপমানিত হতে হচ্ছে। আজ আপনি অসম্মানিত হলেন, কালকে হয়তো আমি হব পরের দিনে হয়তো নবাব খাঁ হবেন"। এই কথা শুনে মিঞা খোদাবক্স বললেন "হ্যাঁ ব্যাপারটা খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারছি। সুরদাস কমলমীড়ে যেয়ে যে উপহার পেলেন সেই উপহার তো নবাব খাঁয়ের প্রাপ্য ছিল। আমিতো সেই প্রস্তাব করেছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমার প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল মহেশ দাস ও সেনাপতি মানসিংহের কথায়"। মিঞা খোদাবক্সের এই কথা শুনে নবাব খাঁ বললেন "এই রকম অসম্মানিত হতে হতে হয়তো এমন একদিন আসবে যখন সম্রাট আমাদের তানসেনের বীণাবাহকের কাজে নিয়োজিত করবেন"। পাশ থেকে ফরিদ খাঁ বললেন মিঞা খোদাবক্স "আমরা চিরকাল আপনাকে অনুসরণ করে চলি, কারণ আপনি সম্রাট হুমায়ুনের আমল থেকেই সভার গায়ক। সম্রাট যদি এইভাবে ধূর্ত বীরবলের কথাতে এবং তানসেনের কথাতে পরিচালিত হন তাহলে আমার মনে হয় আপনিই যোগ্য ব্যক্তি যিনি এই অসম্মানের বিহিত করতে পারবেন"। মিয়া খোদাবক্স বললেন "দেখুন এই সমস্ত আলোচনা এখানে না করাই ভাল কারণ অন্যান্য সভাসদরা এখানে আছেন, আর তাছাড়া জানেনইতো দেওয়ালেরও কান থাকে। সম্রাটের কুনজরে আমরাতো পড়েই গেছি। এর পরে হয়ত কেউ সম্রাটের কাছে আমাদের নামে নালিশ করলে তিনি আমাদের কি নজরে দেখবেন বলা যায় না। কোন দিন হয়তো আমাদের এখানে আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তার থেকে আমরা বরং কোন এক গোপন জায়গায় বসে শলা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেব কিভাবে আমাদের পরবর্তী কর্মপন্থা স্থির করব"। এই বলে তারা দরবার কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন          
                                                                  ক্রমশঃ


পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল