বিনিময় প্রথা /মিলি ঘোষ

আর কবে ভাবব! (শেষ পর্ব)

বিনিময় প্রথা

মিলি ঘোষ

 জানি, বিনিময় প্রথা কথাটার সঙ্গে ঘুষ খাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টা ওতেই আটকে নেই। এই যে আমাদের জীবন-যাপন, অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য যা যা আমাদের দরকার সবই তো পাচ্ছি অর্থের বিনিময়ে। বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসা বা অন্য আরো কিছু অনুভূতিরও দরকার, তবে সেগুলির সঙ্গে বিনিময় প্রথার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। প্রাত্যহিক জীবনে যা যা আমাদের লাগে, সবই অর্থের বিনিময়ে বিক্রেতার থেকে কিনে নিই। আবার বিক্রেতাও ওই টাকায় তার সংসার চালায় এবং ব্যবসাকে বাড়িয়ে নেয়। এভাবেই পুরো সিস্টেমটাই একটা সাইকেলের রূপ নেয়। জীবন ধারণের অন্যতম প্রয়োজনীয় বস্তু হলো টাকা। এই টাকা কিন্তু আমরা চিবিয়ে খাই না। টাকা হলো একটা মাধ্যম, যা আসলে ভ্রাম্যমান। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান অবশ্যই আমাদের চাহিদার প্রথম সারিতে থাকে এবং এই চাহিদা মেটাতে টাকাই একমাত্র মাধ্যম। এই তিনটি চাহিদার পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর একটি চাহিদা থাকা প্রয়োজন, তা হলো শিক্ষা। শিক্ষা প্রতিটি মানুষের জীবনের অঙ্গ হওয়া উচিত। এখন শিক্ষাকে ঠিক পথে চালনা করতে গেলেও অর্থের দরকার। এও তো বিনিময় প্রথাই। টাকার বিনিময়ে শিক্ষালাভ। 

বিনিময় প্রথার কিছু ভিন্ন রূপও আছে। সেগুলো সৎ বললে সৎ, অসৎ বললে অসৎ। আসলে সবটাই আপেক্ষিক।
সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যারা বহু মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তবে নিঃস্বার্থভাবে নয়। তাঁরা ভবিষ্যতে এর দাম তুলতে চান। উপকৃত ব্যক্তিকে নানাভাবে দাম মেটাতে হয়। নিতান্ত অসহায় না হলে কে আর অন্যের দ্বারস্থ হয়। নিজের পক্ষে সম্ভব হলে সাধ করে কেউ অপরের অনুগ্রহ চায় না। তবু সময় সুযোগ মতো উপকারী মানুষটি দাম চায়। চাকরি, প্রমোশন, সিনেমায় সুযোগ দেওয়া, থিসিস সাবমিট করা, এসবের মূল্য খুব ভয়ঙ্কর এবং চড়া ( অবশ্যই সবাই এই ধরনের কাজে লিপ্ত নয় )। এঁদের লেভেলটা এতটাই উচ্চস্তরের যে, সুদে আসলে সব দাম উসুল করেও তাঁরা মাথা উঁচু করেই থাকেন। লেভেল হাই হলেও আপাত দৃষ্টিতে এঁরা সংখ্যায় কম।

কিন্তু আড়ালে আবডালে আরও অনেক রকম লেনদেন নিত্য ঘটে চলেছে। অর্থের জন্য অসহায় মানুষ নিজের সন্তান, নিজের শরীর বিক্রি করছে। যেহেতু ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই অসৎ উপায় ( সমাজের চোখে ) অবলম্বন করছেন, তাই যা ঘটে অন্ধকার জগতেই। ধরা পড়লে দরিদ্র অসহায় মানুষগুলিই পড়ে। রাঘব বোয়ালদের কেউ ছুঁতেও পারে না। এই বিনিময় প্রথায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার কোনও হিসেব নেই। 

এবার আসি অর্থহীন বিনিময় প্রথায়। অর্থাৎ, যেখানে দাম চোকাতে টাকা লাগে না। তাঁদের দাম মেটাতে হয় সারাজীবন ধরে। যতই করো, শোধ আর হয় না। কারণ, তাঁরা উপকার করে মানুষকে পায়ের তলায় রাখতে চান আমৃত্যু। অনেক সময় সেটা উপযাচক  হয়েই করেন। যেহেতু তিনি এক সময় কোনও ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়েছেন, সুতরাং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনিই ঠিক, উপকৃত ব্যক্তিটি ভুল। তাঁর 'হ্যাঁ'তে হ্যাঁ বলতে হবে, 'না'তে না। তাঁরা আশা করেন, রোজ সকালে উপকৃত ব্যক্তি তাঁর ছবিতে প্রণাম করে দিন শুরু করুক। অন্যথা হলেই তিনি খোলস ছেড়ে বাইরে আসেন। তাঁরা বেশ উচ্চ মার্গের দাম্ভিক। কখনও তাঁরা অর্থের বিনিময়ে অর্থ নেন না, নিজেদের স্থানচ্যুত হবার ভয়ে। সব সময় যে তাঁরা উপকারের বিনিময়ে উপকারই চান, তা নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা নাম কিনতে চান। উপকৃত ব্যক্তিটি যদি নিত্য ঢাক বাজিয়ে তাঁর জয়গান করেন, তবেই তিনি তৃপ্ত।

আর এক শ্রেণি আছে, তাঁরা ঢাক পেটানো অবধি হয়তো যেতে চান না, কিন্তু উপকৃত ব্যক্তি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুক, এই আশাটা করেন এবং সেটাও সমগ্র জীবনব্যাপী। মতের অমিল হলেই মনে করিয়ে দেবেন, তিনি কী কী করেছেন। এঁরা প্রত্যেকেই ভীষণ অকৃতজ্ঞ। অন্যের থেকে প্রাপ্ত উপকার মনে রাখেন না। কিন্তু নিজে কী করেছেন, সবটাই মনে রাখেন। কাজেই দাম মেটাতেই হয়, তবে অর্থের বিনিময়ে না। 

অথচ, পরোপকার এমন একটা শব্দ, যা শুনলে মন, কান তৃপ্ত হয়। বহু মানুষ আছেন, নীরবে অন্যের সেবা করে যান। তাঁদের কাজের খবর কাকপক্ষীতেও টের পায় না। প্রতিদানের আশাও তাঁরা করেন না। তাঁদের মানসিক গঠনই এরকম। এঁরা সাধারণত ব্যক্তিগত উদ্যোগেই কাজ করেন। কখনও তাঁরা অভুক্তকে খাদ্য দেন, কখনও অসুস্থর পাশে থেকে সেবা করেন, কখনও দরিদ্রকে অর্থ দান করেন। বিশ্বাসযোগ্য না হলেও, এমন মানুষ আছেন, নিজে না খেয়ে বা কম খেয়ে অভুক্তকে দিয়ে দেন। এঁরা প্রতিবেশির জন্য হাসপাতালে রাত জাগেন। হয়তো পরদিন সকালে তাঁকে অফিস যেতে হবে। তবু রাতের প্রয়োজনীয় ঘুমটুকু বাদ দিয়ে অন্যের জন্য সজাগ থাকেন। নিঃস্বার্থ এই মানুষগুলি সাধারণত সমাজের চোখে হাস্যস্পদ হয়ে থাকেন। এঁদের শুনতে হয়, 'সমাজ সেবা করছে!' অথবা 'ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ায়' ইত্যাদি ইত্যাদি। 

মানুষের প্রয়োজনে টাকা দেওয়াও বিপদ, না দেওয়াও বিপদ। দিলে ভাববে, অনেক আছে। দরকারে, অদরকারে চাইলেই পাওয়া যায়। না দিতে পারলেই কথা শুনিয়ে যাবে সেই ব্যক্তিটি, যে একদিন  ওই মানুষটির থেকেই সাহায্য পেয়েছে। এমনও শোনা যায়, ওর আছে তাই দিচ্ছে। দিলেই তাঁর অনেক আছে তা কিন্তু নয়। তাঁর দরজাতেও হয়তো অভাব কড়া নাড়ে। একটা ছিঁড়ে যাওয়া পোশাকও তিনি এমনভাবে পরেন, লোকে তাঁর দৈন্যটা ধরতে পারে না। বাইরের লোকের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করার ওপরে মানুষের আর্থিক অবস্থা ওঠা নামা করে না। এরপরেও কিন্তু তাঁরা মানুষের পাশে থাকেন নিঃস্বার্থভাবেই। স্বার্থপরতার অগ্নিবাণ এঁদের কাজে বিশেষ ব্যাঘাত ঘটায় না। সাময়িক আঘাত লাগতে পারে, মানুষ তো। এই সহৃদয় ব্যক্তিরা শুধু মানুষের পাশে থাকেন না, পাখিদের খাবার দেন, রাস্তার কুকুর, বেড়াল অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। গাছে জল দেন, গাছ বাঁচাতে চেষ্টাও করেন। একই ব্যক্তি যে সব কিছু করেন, তা নয়। কিন্তু কিছু না কিছু করেন, কোনও প্রতিদান আশা না করেই। 

তবে কি এই ধরনের মানুষেরা বিনিময় প্রথায় অংশ গ্রহণ করেন না ? করেন, তাঁরাও করেন। মনের শান্তির বিনিময়ে তাঁরা এই কাজগুলি করে থাকেন। করার সময় সে হুঁশ থাকে না। কিন্তু কাজটি করে সফল হলে তৃপ্ত হন। 

মনের তৃপ্তি বা মানসিক শান্তিই আসল উদ্দেশ্য এবং সেটা সকলেরই। প্রচুর অর্থ উপার্জন, সেও মনকে তৃপ্ত করার জন্য। অন্যকে দাবিয়ে রাখা, ভগবান ইমেজ নিয়ে চলা, সবটাই নিজের মনকে ভালো রাখার জন্য। সেভাবে দেখতে গেলে সমগ্র পৃথিবী দাঁড়িয়ে এই বিনিময় প্রথার ওপর।

একজন ভালো খেলোয়াড় সব সময় চাইবেন প্রতিপক্ষকে হারাতে। এতেই তিনি তৃপ্ত। যেকোনো শিল্পী বা সাহিত্যিক চেষ্টা করেন, তার শিল্প বা লেখা যেন মানুষের ভালো লাগে। মানুষ এভাবেই নিজের কাজের বিনিময়ে নিজেকে ভালো রাখতে চায়। সে কাজ লোকের চোখে সৎ বা অসৎ যাই হোক না কেন।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. বাহ্ চমৎকার লেখা

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল