দূরদেশের লোকগল্প-- নিউজিল্যান্ড/সকালের জলখাবার/চিন্ময় দাশ

দূরদেশের লোকগল্প-- নিউজিল্যান্ড
সকালের জলখাবার

চিন্ময় দাশ

নিউ জীল্যান্ড। চারদিকে সমুদ্র দিয়ে ঘেরা একটা দেশ। মাঝ দরিয়ায় একেবারে ছোট্ট একটা ডিঙ্গি নৌকা যেমন, ঠিক তেমন এইটুকুনই দেশটা। সেখানে কয়েকটা ঘর নিয়ে নিগ্রোদের একটা গ্রাম। বলতে গেলে, তাসমান সাগরের একেবারে গা ঘেঁষে গ্রামটা।
তখন গরমকাল শেষ হয়ে আসছে। কারাকা (এক জাতের বাদাম) পাকবার সময়। কমলা রঙের থোকা থোকা ফল ঝুলে আছে গাছে গাছে। তেমনই একটা বাদাম গাছে উঠে পড়েছে ছোট ছোট দুটো ছেলেমেয়ে। ছেলেটার নাম তিকি। আর মেয়েটা হোল সোয়াঙ্কি। 
অন্য জাতের বাচ্চারা এই বাদাম খেতে ভয় পায়। কিন্তু নিগ্রো বাচ্চারা একেবারে আলাদা ধাতের। ভয়ডর বলে তেমন কিছু নাই তাদের। পাকা বাদামের শাঁসে এখন হলদে রঙ ধরেছে। কামড়ে খেতে ভারি মজা। 
মনের আনন্দে খাচ্ছে দু’জনে। যেমন ঝকঝকে সাদা তাদের দাঁত, তেমনি ধারালোও সেগুলো। শাঁস নরম বটে, ভেতরে কিন্তু শক্ত বীজ। দুজনে খাচ্ছে আর বীজগুলো ফেলে দিচ্ছে নীচে। 
এক সময় ছেলেটার নজর পড়ল, একটা কিউয়ি পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছে নীচে। কিউয়ি হোল সমুদ্রে ঘেরা এই দ্বীপদেশের এক বিখ্যাত পাখি। বেশ নাদুস-নুদুস আর শক্তপোক্ত চেহারা। ঠোঁট জোড়া অবিকল একেবারে সারসের মত লম্বা, তবে একটু বাঁকানো। কিন্তু পাগুলো তাদের বেঁটেখাটো। সারস বা বকেদের মত সরু লিকলিকে নয়। 
যাইহোক গে, পাখিটাকে দেখেই মাথায় দুষ্টুমি এসে গেল ছেলেটার মাথায়। একটা করে বাদাম খায়, আর শক্ত বীজটাকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে পাখিটাকে। বেচারা পাখি! ঠক করে একটা বীজ এসে পড়ে গায়ে, আর চমকে লাফিয়ে ওঠে। বেদম ঘাবড়ে গিয়ে, এই আচমকা উৎপাতের কারণ খুঁজতে থাকে এদিক ওদিক চেয়ে। ওপরে বসে বসে ভারি মজা লাগে ছেলেটার।
সোয়াঙ্কির ততক্ষণে গোটা চোদ্দ বাদাম খাওয়া হয়ে গেছে। পনের নম্বরটাতে দাঁত বসাতে যাবে, তার আগে বলে উঠল—আচ্ছা, সত্যি করে বল তো তিকি, সারা জীবন এই বেরি আর ফার্ণের কন্দ খেতে ভালো লাগে তোমার? সেই একই বেরি, বেরি আর বেরি! সেই কন্দ, কন্দ আর কন্দ! খেয়ে খেয়ে আলা হয়ে গেলাম। তবে, ঐ যে দু-চার রকম পাতা আছে, সে তবু একটু মুখে দেওয়া যায়। 
সাগরে ঘেরা এই দেশে নিগ্রোরা ভারি অভাবী। ভালো করে পেটের দানা জোটে না তাদের। গাছের ফল, শেকড়-বাকড়, লতাপাতা চিবিয়ে পেট ভরাতে হয় অনেকেরই। সেই কষ্ট বিরক্তি হয়ে ঝরে পড়ছে মেয়েটার গলায়। 
কিন্তু তিকি নামে এই ছেলের স্বভাব অন্যরকম। সে অল্পেই সন্তুষ্ট। পাকা বেরি আর টাটকা ফার্ণের মূল ছাড়া, অন্য কিছু খাবারের কথা মাথাতেই আসে না তার। 
ছেলেটা জবাব দিল—এছাড়া আর আছেই বা কী আমাদের খাবার মতো? কিচ্ছুটি নাই। 
--কে বলেছে তোমাকে যে নাই? আছে, আছে। অনেক কিছুই আছে। সোয়াঙ্কি বলল—পুর দেওয়া কিমা-র বড়া, হ্যামের স্যাণ্ডউইচ, টক স্বাদের জ্যাম, বড়ইর পিঠা, বাঁধাকপির আচার-- আরও কত কিছু। খাবারের আবার অভাব নাকি?  
চোখ গোল গোল করে চেয়ে রইল ছেলেটা। চেখে দেখা তো অনেক দূরের কথা! এসব খাবারের নামও সে শোনেনি কখনও। সোয়াঙ্কি কত কিছু জানে, এই ভেবে অবাক হয়ে গেল। 
আসলে হয়েছে কী, মূল ব্যাপারটা তিকিকে বলেনি মেয়েটা। এই তো গতকালই সকালে একটা জিনিষ দেখেছে সে। এক দল লোক বনভোজন করতে এসেছিল নদীর পাড়ে। কত রকমের খাবার দাবার তাদের সাথে। খাবারের নাম ধরে একে ওকে ডেকে ডেকে বিলি করছিল লোকগুলো। একটা গাছের খোঁদলের ভিতর ঢুকে পড়েছিল সোয়াঙ্কি। সবই দেখেছে নিজের চোখে। শুনেছেও নিজের কানে। তাতেই তো অত সব নামধাম জেনেছে সে। সেসব খাবার নিশ্চয়ই একঘেয়ে বেরি আর কন্দের চেয়ে সুস্বাদুই হবে।  
আর এটাই তো দুনিয়ার নিয়মই বলা যায়। যেসব জিনিষ নিজেদের কপালে জোটে না, সেগুলোকে শ্রেয় বলেই মনে হয় সকলের।
বিস্ময়ের ঘোর কাটল যখন, সোয়াঙ্কির বলা খাবারের নামগুলোর মধ্যে, একটা নামই কেবল চিনতে পারল তিকি। সে বলল—তোমার ঐ কিমা-র বড়া, হ্যামের স্যাণ্ডউইচ, টক স্বাদের জ্যাম, বা বড়ইর পিঠার গাছ কোথায় আছে, আমি তার কিছুই জানি না। তবে হ্যাঁ, বাঁধাকপির গাছ আমি দেখাতে পারি তোমাকে। সেইটা আমার জানা।
--সত্যি বলছ তুমি? বাঁধাকপির গাছ দেখাতে পারবে? চলো তাহলে এক্ষুনি। কতদিন ধরে বাঁধাকপির আচার খাবার সখ আমার। 
হয়েছে কী, অতসব খাবার-দাবার তো দূরের কথা, বাঁধাকপিটাও যে কোন গাছ নয়, সেটাও এদের দুজনের কেউই জানে না। 
--চলো বললেই কি আর যাওয়া যায় না কি? সে কি এইখানে? অনেক অ-নে-ক দূরের রাস্তা।
সোয়াঙ্কি বলল, দূরে তো কী হয়েছে? যত তাড়াতাড়ি রওণা দেওয়া যাবে, পৌঁছানো যাবে তত তাড়াতাড়ি। দূরত্বটা কোন ব্যাপার নয়।
চটপট গাছে থেকে নেমে পড়ল দুজনে। নেমেই কিউই পাখিটাকে পেয়ে গেল সামনে। পাখিকে বলল—অনেকটা দূর যেতে হবে। খানিকটা এগিয়ে দাও আমাদের। 
পাখির পিঠে চেপে যাওয়া যেমন গর্বের, তেমনি কষ্টও কম হবে অনেক।
খানিক দূর যাওয়ার পর, দেখতে দেখতে বন শেষ হয়ে গেল। সামনে খোলা প্রান্তর। অমনি পাখিটা দাঁড়িয়ে পড়ল। খোলামেলা জায়গা কিউয়ির পছন্দ নয়। আর এগোবে না সে। 
অগত্যা নেমে পড়তে হল দুজনকে। কী আর করা যায়? বাকি রাস্তাটা পায়ে হেঁটেই রওণা দিল দুজনে। ঘাসের মাঠ দিয়ে চলেছে, একটা লেজঝোলার সাথে দেখা। (লেজের ভারি বাহার এই পাখির। মেলে দিলে একেবারে খাপ খোলা একটা পাখার মত দেখতে লাগে। সেকারণেই, ইংরেজিতে এ পাখির নাম—fantail) এক ঝাঁক মাছির পিছনে উড়ে উড়ে চক্কর কাটছে পাখিটা। 
লেজঝোলা এমনিতে বেশ মিশুকে, আর ক্ষতিকারকও নয়। তবে, একটাই বদ স্বভাব ছোট্ট পাখিটার। সকলের সব ব্যাপারে তার অসীম কৌতুহল। সব ব্যাপারই তার জানা চাই। আর, কারও কিছু পেয়ে গেলে, আর কোন কথা নাই। সারা বনে রটিয়ে বেড়াবে। বনে-পাহাড়ে কেউ বাকি থাকবে না কিছু জানতে। 
ছেলেমেয়ে দুজনেও বুঝতে পেরেছে, তারা কোথায় চলেছে যদি জেনে যায় পাখিটা, তাহলে আর কোন কথা নাই। সাতকাহন হয়ে ছড়িয়ে আবে সব জায়গায়। তাড়াহুড়ো করে পাখিটাকে এড়িয়ে যেতে চাইল দুজনে। 
কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। লেজঝোলা ঠিক দেখে নিয়েছে বাচ্চা দুটোকে। রইলো পড়ে তার মাছির পিছনে পাক খাওয়া। ঝুপ করে বাচ্চা দুটোর সামনে নেমে এলো। অমনি সোয়াঙ্কি ফিসফিসিয়ে বলল—এইরে, এসে গেছে। এবার শুরু হবে এর হাজারো প্রশ্ন। 
ঠিক তাই। কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, লেজঝোলা বলে উঠল—কী, কী? কোথায়, কোথায়? চললে কোথায় দুজনে? কিসের তাড়া, কিসের তাড়া? কী, কী? ব্যাপারটা কী? 
বাচ্চাগুলোর থেকে কোন উত্তর এলো না। পাখি কিন্তু তাতে পিছু ছাড়বার পাত্র নয়। সেও চলল সাথে সাথে। কখনও এগিয়ে যায় খানিকটা, কখনও চক্কর কাটতে থাকে মাথার উপর। গলা কিন্তু থেমে নেই তার—চললে কোথায়, চললে কোথায়? কিসের তাড়া, কিসের তাড়া? ব্যাপারটা কী, ব্যাপারটা কী?
প্রশ্ন চলছে, ওড়াও চলছে। ওড়া চলছে, প্রশ্নও চলছে। এভাবে কখন মাঠ শেষ হয়ে বন শুরু হয়েছিল, খেয়ালই নাই পাখির। আবার যখন বন শেষ হয়ে গেল, থমকে গেল পাখি। বনেই তার জন্মানো, বনেই বেড়ে ওঠা। বন ছেড়ে বাইরে যাওয়া মোটেই পছন্দ নয় তার। গাছপালার ছায়ায় তার বাস। বাইরে বেরুলে, রোদের তাত লেগে, কষ্ট হতে পারে। বার কয়েক চক্কর কেটে ফিরেই গেল পাখিটা। 
এবার নিশ্চিন্ত মনে চলতে লাগল বাচ্চা দুটো। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর, রোদ লেগে কষ্ট হতে লাগল তাদেরও। সামনে কোথাও মাথা গুঁজবার মত কিছুই চোখে পড়ছে না। 
সোয়াঙ্কি বলল—চলো তিকি, ফিরেই যাই। অনেক দূর চলে এসেছি কিন্তু। 
তিকি বলল—বাঁধাকপি আচারের গাছ কিন্তু আর খুব দূরে নয়। একবার বেশ উঁচু একটা রাতা গাছে উঠেছিলাম। তখন একটা বুনো পায়রা আমাকে দূরে বাঁধাকপি আচারের গাছ দেখিয়ে দিয়েছিল।  জায়গাটা এই আশেপাশেই।
-সে তো ঠিক আছে। কিন্তু এখানে কোন বিপদ হলে, দেখবে কে আমাদের? দুটো শুকনো ডালের মত, মরে পড়ে থাকতে হবে দুজনকে। সেটা জানো তো?
--চলো, তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যাই মাঠটা। বলে, সোয়াঙ্কির হাত মুঠো করে ধরল তিকি। ছুট লাগিয়ে দিল দুটিতে।
একটা জলাভূমির সামনে পৌঁছে, থামতে হোল।
--সোয়াঙ্কি, দ্যাখো, দ্যাখো। ঐ যে গাছগুলো! ওগুলোই তো বাঁধাকপি আচারের গাছ। পায়রাটা বলেছিল আমাকে। তিকি চেঁচিয়ে উঠেছে উৎসাহের সাথে। বেশ গর্বও তার গলায়। 
জলাটার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা গাছ। সরু আর এই লম্বা। গায়ে ডালপালা নাই বললেই চলে, একেবারে সরল। কেবল উপরে ঘন সবুজ পাতার ছাতার মত মুকুট গাছগুলোর মাথায়।
সোয়াঙ্কি বলল—এগুলোর মাথায় চড়তে হবে? বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছে তাকে। 

নিগ্রোদের বাচ্চারাও হামেশাই গাছে চড়ে। কিন্তু সেসব গাছে ডালপালা থাকে যথেষ্ট। কোন অসুবিধাই হয় না গাছে চড়তে। এ যে একেবারে সরল গাছ। ডালপালা বলতে কিছুই নাই।
দুটিই ছোট বাচ্চা। ছোট ছোট হাত। নরম চামড়া। হলুদ রঙের হাঁটুতে বেড় পায় না ঠিক মত। চার-পাঁচ বার খানিকটা উঠেও, পিছলে নেমে এসেছে তিকি। 
কী করা যায়? কী করা যায়? দুজনেই বসেছে ভাবতে। মেয়েটা বলল—এক কাজ করা যাক। তুমি একটা পা দাও আমাকে। আমি তোমাকে ঠেলে তুলে দিই। তারপর আমি তোমাকে আমার পা দেব। তুমি আমাকে তুলে দেবে। এভাবে উপরে উঠে যাব আমরা।
বাচ্চাদের ভাবনা! এটা যে আদৌ হবার নয়, তারা কি আর বোঝে?
যাইহোক, গত বছর কেনা জ্যাকেট ছিল বাচ্চা দুটোর গায়ে, শেষমেষ সেটাই হাতে জড়িয়ে, আঁচড়ে কামড়ে কোন রকমে গাছে উঠল দুজনে। গাছেটার মাথায় ঘণ পাতার ছাতা। তার উপর চড় বসে, খোঁজ শুরু হল, বাঁধাকপির আচারের। কিন্তু কোথাও তো কিছু চোখে পড়ছে না। অথচ কত কল্পনা, কত আশা করে ওঠা হয়েছে গাছটায়। 
শেষ পর্যন্ত কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে চিবিয়ে পরীক্ষা করল দুজনে, এগুলোই বাঁধাকপির আচার নয় তো? দূর, দূর! যেমন তেতো স্বাদ এগুলোর, তেমনি কড়া ঝাঁজ। শুকনো চিমসে হয়ে যাওয়া কিছু ফুল ছিল ডালগুলোর ডগায়। পরখ করে দেখা হল, যদি এগুলো হয়। কিন্তু না, এগুলোও বিস্বাদ। 
তুমি মনে হয় আমাকে ঠকিয়েছ, তিকি!—এই বলে, তিকিকে একটু ঠেলা দিয়েছে মেয়েটা। সর্বনাশ! পা পিছলে, গাছটার একেবারে মাথা থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল বাচ্চাটা। 
হায় হায়, এ কী করলাম! বলতে বলতে তরতরিয়ে নেমে এলো সোয়াঙ্কি। দেখে, ডাঙ্গায় না পড়ে, জলাটায় পড়েছে তিকি। তবে, এক হাঁটু পাঁক সেই জলায়। আঁকুপাঁকু করে উঠে আসবার চেষ্টা করছে ছেলেটা। 
সোয়াঙ্কি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তিকিকে—আমার হাত ধরে উঠে এসো, তিকি। শক্ত করে ধরো।
শক্ত করেই হাত ধরেছে তিকি। কিন্তু তাকে টেনে তুলতে গিয়ে, আর এক বিপদ। সোয়াঙ্কির পায়ের তলার মাটি গেল ধসে। জলে কাদায় গড়িয়ে, পড়ে গেল মেয়েটাও। 
ভাগ্যিস পাড়ের দিকে জল তেমন গভীর নয়। কিন্তু পাঁক থেকে পা টেনে তোলা ভারি কঠিন। একটা বুড়ো ব্যাঙ দেখতে পেয়ে গেল দুজনকে। সে দৌড়ে এসে, নিজের পা বাড়িয়ে দিল বাচ্চাগুলোর দিকে। সেটা ধরেই উপরে উঠে এলো দুজনে। 

জলে কাদায় মাখামাখি, মুখে ভয়াণক ভয়ের ছাপ। একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থা দুজনের। গুটি গুটি পায়ে বাড়ি ফিরে চলল তারা। 
বনের কাছাকাছি গিয়েছে। দেখল, একদল লোক হইহই করতে করতে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। 
হয়েছে কী, সেই যে লেজঝোলা পাখি, সে এক কাণ্ড করেছে। বাচ্চা দুটোকে ছেড়ে, ঘুরে ঘুরে বনের সবাইকে ডেকে ডেকে বলে বেড়িয়েছে তাদের কথা। নিগ্রোদের পাড়ায় অনেকেরই কানে গিয়েছিল কথাগুলো। তারাই দল বেঁধে খুঁজতে বেরিয়েছে বাচ্চা দুটোকে। 
এখন বাচ্চাগুলকে সামনে পেয়ে, ভারি নিশ্চিন্ত হোল সকলে। কোন প্রশ্ন নয়, আগে ঘরে ফিরে চলো। দুটো বাচ্চাকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে গ্রামে ফিরে এলো সবাই। 
গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছে সেদিন। একটা পাথরের উপর বসেছে গাঁওবুড়ো। এ গ্রামের মোড়ল সে। তার কথাতেই এতক্ষণ চুপ করে ছিল সকলে। এবার মোড়লই জানতে চাইল—কোথায় গিয়েছিলি তোরা? কেন গিয়েছিলি? আর, তোদের জামাকাপড় বা শরীরের এই দশা হোল কী করে? 
তখন সোয়াঙ্কি সব কথা খুলে বলল এক দুই করে। শুনে তো মোড়ল অবাক। বলল—বাঁধাকপির আচারের গাছ? সেই গাছের মাথাতে চড়েও বসেছিলি দুজনে? 
আর থামানো গেল না। হো-হো করে হেসে উঠল গোটা জমায়েত। বলিহারি বুদ্ধি তো বাচ্চা দুটোর। সে হাসি যেন আর থামতেই চায় না। 
মোড়ল নিজেও হেসে ফেলেছিল সব শুনে। এখন হাসি চেপে, গম্ভীর গলায় ধমকে উঠল—চুপ করো সবাই। কাণ্ডজ্ঞান আছে তোমাদের কারও? সারা দিন বাচ্চা দুটো কিছু খেয়েছে কি না, সে খোঁজ করেছ কেউ? আগে কিছু খেতে দাও এদের। 
সেদিন একটু ভালো খাবারই জুটল বাচ্চা দুটোর। ফার্ণ-এর শেকড় ফোটানো চা। আর দু’-তিন রকম পাকা বেরি। সেই খাবারই চেটেপুটে খেল বাচ্চা দুটো।
সেদিন থেকে গ্রামের কেউ কোনদিন সোয়াঙ্কিকে অভিযোগ করতে শোনেনি—সেই একই বেরি, বেরি আর বেরি। একই শেকড়-বাকড় ফোটানো চা! কেন, আর কি কোন খাবারই নাই দুনিয়ায়?

কোনদিন আর বলে না এসব। বাইরের দুনিয়ার হালচাল বুঝে গেছে মেয়েটা। বাবা মা যেদিন যা দেয়, তা-ই খেয়ে নেয় হাসি মুখে। বায়না বা আপত্তি যেন জানেই না সে।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল