ভাঁজো /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব - ৩৬

ভাঁজো

ভাস্করব্রত পতি

"ভাদদ মাসে আসেন ভাঁজো আসেন বাপের বাড়ি।
মনমরা নয় মনমরা নয় বড়ই যে আদুরী।।
দুয়ারে আলপনার ছটা ঘরে ভাঁজোর সরা।
বাপের বাড়ি আসেন ভাঁজো ঝলমল ঝলমল করা।।
এসো ভাঁজো বোসো ভাঁজো এই পিঁড়িতে বোসো।
আদরে পূজিব ভাঁজো মুখ তুলে গো হেসো"।।

অন্ত্যজ শ্রেনীর মানুষের নিরাসক্ত জীবনে কিঞ্চিত  আনন্দের প্রয়োজনেই ভাঁজো লৌকিক উৎসবের অবতারণা। মূলতঃ ভাদ্র মাসে 'ভাঁজো’ উৎসব শুরু হয় ‘ইন্দ্রলক্ষী’ বা ইন্দ্র দ্বাদশীর সন্ধ্যায়। এতে কোনো পুরোহিত লাগেনা। কোনো বাঁধাধরা নিয়মনীতিও নেই। বর্ধমান, বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদের নিম্ন জাতের নারী সমাজের অন্যতম উপাস্য উৎসব এটি। কুমারী মেয়েদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে 'ছোটো ভাঁজুই' এবং বিবাহিত মহিলাদের উদযাপিত ভাঁজোকে বলে 'বড়ো ভাঁজুই'। সম্পূর্ণভাবে কৃষি উৎসবের আওতায় আসে এই 'ভাঁজো'। তবে স্থানভেদে উৎসবের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। 

'ভাঁজো’ নামকরণের উৎপত্তি কিভাবে? অনেকের মতে, রাগিনীর পর্দ্দা অনুসারে আলাপ করে সুর ঠিক করাকে 'ভাঁজ' বলে। এই লৌকিক উৎসবেও গান করা বা 'ভাঁজ' এর রীতি রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, "মোটা আওয়াজে আর কুক্কুর রাগিনী ভাঁজিয়া কাজ নাই"। তেমনি যতি অনুসারে পাঠ করা বা কোনো কিছু আওড়ানোকে বলে 'ভাঁজ'। 'আলালের ঘরে দুলাল' তে আছে, "ভাট বন্দী কত কত ..... ছন্দ নানামত ভাঁজে"। তবে পরিপাটি করে সাজানোকেও 'ভাঁজ' বলে। ভাঁজো উৎসবে নানা ধরনের খাদ্য পরিপাটি করে সাজানোর রেওয়াজ চালু। হেমচন্দ্র লিখেছেন, "খোস্ক রদি রাজা / শিল্ক শাটিন গরদ চেলি চাপকানেতে ভাঁজা"। আবার কারোর কারোর মতে 'ভাঁজো' গানের সময় দেহ সামান্য বামদিকে ‘ভাঁজ’ করে বা কুঞ্চিত করে নাচ করা হয়। সেই ‘ভাঁজ’ থেকেই ‘ভাঁজো’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। কোথাও কোথাও একে 'ভাঁজুই'ও বলে।

সাধারণত ভাঁজোর কোনো মূর্তিপূজা হয়না। তবে বীরভূমের অজয় নদের পার্শ্ববর্তী কিছু গ্রামে মূর্তি তৈরি করা হচ্ছে। সিংহাসনে থাকে একটি পুরুষ মূর্তি (ইন্দ্র) এবং পাশে নৃত্যরত নারী (অপ্সরা)। এই বীরভূমের কোথাও কোথাও মূর্তির বদলে মাছধরার ‘পোলুই’, বাঁশের বাতা ও কাপড় দিয়ে উপাস্য দেবতা রূপ পায়। নানা ধরনের ফুল দিয়ে সাজানো হয়। কোথাও কোথাও ভাদু বা টুসুর মতো এক দেড় ফুট উঁচু সুন্দরী মূর্তিও বানানো হয়। 'ভাঁজো' আসলে কি রকম? ড. স্বপন কুমার ঠাকুরের মতে, "ভাঁজো বলতে নৃত্যভঙ্গীতে গঠিত মাটির তৈরি দেবীমূর্তি। কিংবা একটা লাঠির ডগায় লাগানো বেতের কাঠা। চেলি কাপড় পরিয়ে দিব্বি বউ এর মতো লাগছে"। 

সারা রাত চাঁদের আলোয় উঠোনের মাঝখানে চলে এই উৎসব। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, "নিকোনো বেদির উপর ইন্দ্রের বজ্রচিহ্ণ দেওয়া আলপনা, কোথাও মাটির ইন্দ্রমূর্তিও থাকে। এই বেদির চারদিকে, পাড়ার মেয়েরা সকলে আপন আপন শস পাতার সরাগুলি সাজিয়ে দেয়। তারপর হাত আট থেকে কুড়ি পঁচিশ বছরের মেয়েরা হাত ধরাধরি করে বেদির চারদিক ঘিরে নাচগান শুরু করে"। এই ভাঁজোর রাত হলো চুরির রাত। এইদিনে যুবকের দল চুরি করে। নারকেল, কলা, লাউ ইত্যাদি। অনেকটা ঠিক কালীপূজার রাতের মতো। 

ভাঁজো হল 'শইসের' ঠাকুর। কুমারীদের চাওয়া পূরণ করেন। এর পূজা করলে সম্পত্তি বাড়ে, বংশবৃদ্ধি হয়। আদপে এটি কৃষি উৎসব। ইন্দ্র পূজার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। আর ইন্দ্র হল জলের দেবতা। কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে ইঁদুর মাটিতে বীজ বপন করা হয়। শন, ধান, যব, খেসারি, ছোলা, খেসারী, পাট, সরিষা - এই ৭ টি শস্যই বোনা হয় ‘শোষ’ পাতায়। তা অঙ্কুরিত হলেই ভাঁজো পূজার সমাপনী। তখন সাধভক্ষণ করানো হয়। ‘শস’ অর্থাৎ শস্য, আর ‘পাতা’ অর্থাৎ  বিছানো। তাই একে "শস পাতার ব্রত"ও বলা হয়ে থাকে। পাত্রে শস্য বিছিয়ে অঙ্কুরোদ্গম বা Germination করানোই ভাঁজোর মূল উদ্দেশ্য। পুরোপুরি মেয়েলি উৎসব এবং কৃষি উর্বরতাবাদের সাথে জড়িত। শষ্যের কামনায় ভাঁজো ব্রতের গানে উঠে এসেছে এই সুর --
"ভাঁজো লো কলকলানি মাটির লো সরা।
ভাঁজোর গলায় দেবো আমরা পদ্মফুলের মালা।।
এক কলসী গঙ্গাজলে এক কলসী ঘি।
বৎসরান্তর একবার ভাঁজো নাচবো নাত কি?
পুর্ণিমার চাঁদ দেখে তেঁতুল হলেন বঙ্ক।
গড়ের গুগলি বলেন আমি হব শঙ্খ।।
ওগো ভাঁজো, তুমি কিসের গরব কর।
আইবুড়ো বেটাছেলের বিয়ে দিতে নারো!!
ভাঁজো এই পথে যেও।
বেণা গাছে কড়ি আছে দুধ কিনে খেও"।।

ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা ভাঁজোর উপচার সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, "ভাদ্র মাসের ইঁদ একাদশীতে ইঁদ পূজার পর ছাগ বলি স্থানের বা দুর্গা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানের কিংবা ইঁদুরে তোলা মাটির কিছু মাটি একটা আলপনা আঁকা নতুন বা বিগত বছরের ব্যবহৃত খোলায় বা সরায় কুড়ানো হয়। তার উপর ৭ বা ৮ রকমের কিছু কিছু করে ছড়ানো হয় ধান, বিরিকলাই (খোটাবিরি), সরষে, শনবীজ, ছোলা, মটর, মুগ ও পস্তুদানা। খোলায় পরানো হয় শালুক ফুলের মালা। তারপর পূজার্থিনীদের সুবিধামতো পূর্ব্বোল্লিখিত স্থানের যেকোনো একটিতে আলপনা দিয়ে নানা ফুলে সজ্জিত করে খোলাটি রাখা হয়। তার পাশেই রাখা হয় পঞ্চপল্লব যুক্ত জলভর্তি ঘট। একেই বলে ভাঁজো বা 'ভাঁজো খোলা'।"

ইন্দ্র দ্বাদশীর সন্ধ্যায় শুরু হয় ভাঁজোর উপচার। এরপর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পূজা চলে টানা ৮ দিন ধরে। এই সময় নৈবেদ্য দেওয়া হয় বাতাসা, চিড়া, গুড়, মুড়কি, নকুলদানা, ফল ইত্যাদি। সেসময় শাঁখ বাজে, ঘন্টা বাজে, প্রদীপ জ্বলে, ধূপ ধূনা জ্বালানো হয়। 

"ধূপের ধোঁয়া খাওরে ভাঁজো ধূপের ধোঁয়া খাও।
ক্ষীর ছাউনি নাওরে ভাঁজো ক্ষীর ছাউনি নাও।।
এ কূলে কদমের ফুল সদাই ফেলে মানি।
কি আরো ভাঁজো ঘরকে আলো করি"।।

আর অষ্টম দিনে হয় 'জাগরণ'। আর নবম দিনে 'বিসর্জন'। প্রতিদিন সন্ধ্যায় গান ও পূজা হয়। সেই গানে প্রস্ফুটিত হয় গ্রামীন জীবনের নানা ওঠাপড়ার কান্নাহাসির চুনিপান্না। শহুরে মেজাজ বর্জিত এক গেঁয়ো আড্ডার অন্তস্থল হয়ে ওঠে ভাঁজোর গান। জাগরনের দিন প্রতিটি মহিলা উপোসী থেকে পুকুর থেকে ঘটে করে জল আনে দলবেঁধে। এদিন নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয় লুচি, সুজি, মিস্টি, পায়েস, গুড়পিঠা, নানা ধরনের ফল, দুধ, দই, চিড়া ইত্যাদি। বলি দেওয়া হয় আখ, শসা, গোটা সুপুরি, চালকুমড়ো ইত্যাদি। 

"একদিনের ভাঁজো আমার দু দিনে দিলেন পা।
তবু আমার সোনার ভাঁজো গা তোলেনা।।
গা তোলো গা তোলো খেতে দিব নুনী।
জনম সফল করো মা বোল শুনি।।
মা বলাটা বড় কথা বল যাদুমনি।
যাদুকে দিব খেতে এবার ক্ষীর সর নুনী।।
বদ্ধমানের সীতাভোগ, শক্তিগড়ের ল্যাংচা।
মানকরের কদমা দিব জামালপুরের মাখা।।
জয়নগরের মোয়া দিব মা বোল রে শুনি।
আমার ভাঁজোই যাদুমনি"।।

আর জাগরণের রাতে বীরভূমের মহিলারা ভাঁজো গানের সাথে যে নৃত্যগীত করে, তা হয় উন্মত্ত নৃত্য। প্রায় উলঙ্গনৃত্যের সঙ্গে কোনো পার্থক্য থাকেনা। পুরুষদের দেখা নিষিদ্ধ। ঠিক তেমনি উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের 'হুদুমদেও' উৎসবে বৃষ্টির কামনায় অনেকটা এরকম উলঙ্গপনা নৃত্যের প্রথা লক্ষ্য করা যায়। ভাঁজো উৎসব সম্পূর্ণ ভাবে মহিলাদের উৎসব। পুরুষেরা অংশগ্রহণ করেনা। তবে ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য এক যায়গায় মন্তব্য করেছেন, "মুর্শিদাবাদ, বীরভূম অঞ্চলে প্রচলিত এক কৃষি উৎসবের নাম ভাঁজো। ভাঁজো পূজার একটি অনুষ্ঠানের নাম ভাঁজোর বালি আনা। এই উপলক্ষে মেয়েরা এক সারিতে দাঁড়াইয়া এবং পুরুষেরা অন্য এক সারিতে দাঁড়াইয়া পরস্পর মুখোমুখি হইয়া নৃত্য ও গীত করিয়া থাকে"।

ভাঁজো উৎসবে একটি অন্যতম মজার উপচার হল ভাঁজোর সাধভক্ষণ করানো। উল্লেখ্য যে নলসংক্রান্তি উৎসবে ধানগাছের সাধভক্ষণ করানোর রীতি রয়েছে। তবে এখানে সপ্তম দিনের সন্ধ্যায় দই চিড়া কিংবা নয় রকমের ফল  মিস্টি দিয়ে সাধভক্ষণ করানো হয়। তবে মুর্শিদাবাদের কিছু এলাকায় ট্যাংরা মাছ ও বেগুন ভেজে সাধভক্ষণের নৈবেদ্যতে দেওয়া হয়! 
"সাধ খাও রে ভাঁজো সাধ খাও।
সেজে গুজে বসে ভাঁজো এবার সাধ খাও।।
বার হাত কাপড় তের হাত ডোরসি।
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরো কাঁকালে কলসি"।।
এদিন বলি দেওয়া হয় ভেঁড়ি, ঝিঙ্গা, শসা ইত্যাদি। তবে এর চেয়েও জনপ্রিয় উপচার হল 'উকুনমারা'! বিসর্জনের দিন এটি পালিত হয়। কিরকম সেই পদ্ধতি?

ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা সেই 'উকুনমারা'র বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে -- "বিসর্জনের আগে পূজার্থিনীরা ভালো করে সারা গায়ে তেল মাখে। গায়ে গামছা জড়ায়। তারপর ভাঁজোকে নিয়ে তেল মাখানোর গান ধরে। সে সময় তাঁরা গানে গানে ভাঁজোর চুল আঁচড়ায়, চুল বাঁধে, উকুন মারে। বস্তুতঃ অঙ্কুরিত দানাগুলির মাথায় দু একটি কালো কালো খোসা থাকে, তাকেই তাঁরা উকুন বলে। কোনো কোনো নারী সে খোসাটি দুই বুড়ো আঙুলের নখে ঠিক উকুন মারার ভঙ্গিতে নিয়ে আসে ও মুখে উকুন মারার শব্দ করে। কোথাও আছে চুল বাঁধার রীতি। অঙ্কুরিত লম্বা চারাকে সূক্ষ্ম পাট দিয়ে বাঁধাই হলো চুল বাঁধা"।

ভাঁজো আসলে গ্রামীণ মহিলাদের একান্ত নিজস্ব অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। সেখানে কোনো অনাচারের স্থান নেই। সরলমতি মেয়েদের ততোধিক সরল বিশ্বাসের সুর আর স্বর ধ্বনিত হয় ভাঁজোতে।

"ভাঁজো লো সুন্দরী মাটি লো সরা।
সিংহাসনে আছো ভাঁজো ঝলমল ঝল করা।।
দুধের ফেনা ভাঁজই কুমরী।
কে বুনেছে শন সরিষা আর বাসমতি।।
ভাঁজো লো সুন্দরী রূপের বাহারা।
এমন সোনার যাদু পূজিছে কাহারা।।"

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল