দুয়ারবন্দনা ও গিরিবন্দনা /ভাস্করব্রত পতি

পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব - ৩৯

দুয়ারবন্দনা ও গিরিবন্দনা

ভাস্করব্রত পতি

"এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাবো না / মায়ে ঝিয়ে করব ঝগড়া জামাই বলে মানবোনা" --
আগমনী গানে এভাবেই মা মেনকার সুরে সুর মিলিয়ে যেন বাংলার প্রতিটি মা গেয়ে ওঠেন। আর দুর্গার আগমনকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রবেশদ্বারে মাঙ্গলিক ফোঁটাদান চিরায়ত ঐতিহ্য। একে বলে "গিরিবন্দনা"। গিরিরাজ কন্যার বন্দনা। একদিকে দুর্গার আগমণ আর অন্যদিকে বাড়ির মেয়ের বাপের বাড়িতে আগমণ যেন মিলেমিশে একাকার। তার আগে ঘরদোর গোবর দিয়ে নিকোনো একটা প্রথা। ঘরদোর সাফ সুতরো করে রেখে দেবীকে নিজের মেয়ের আসনে বসানোর রীতি বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। এই ঘরদোর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে দেবীকে আবাহন করার রীতি হলো "দুয়ারবন্দনা"।

বিল্ববৃক্ষমূলে দেবীর বোধন শুরুর আগেই মহাষষ্ঠীর বিকেলে টিকিফলের ফোঁটায় দুর্গাকে আবাহন আসলে স্বর্গের দেবীকে মর্তের আপন মেয়ে বলে বাঙালির কোমল ভাবনাই জারিত। আসলে বাঙালির মান্যতা যেন 'দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা'। এ আসলে সকলকে আপন করে নেওয়ার ভঙ্গীমা। আর তাতেই নিতান্ত অবহেলিত পেটারি গাছের ফলও হয়ে ওঠে দেবীকে বরণের অন্যতম উপকরণ। আসলে দুর্গা তো ঘরের মেয়ে। নিতান্তই ছাপোষা পরিবারের একজন। তাই কোনো রকম বাহুল্য ছাড়াই এই উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালিরা। 

দেবী দুর্গার নয়টি রূপ। তাই বলা হয় 'নবদুর্গা'! শাস্ত্রমতে  ‘প্রতিপদাদিকল্প’-এর পুজোয় দেবী দুর্গাকে ৯ রাত্রি ধরে ৯ টি ভিন্ন ভিন্ন দেবী রূপে কল্পনা করে পুজো করা হয়। প্রতিপদে গিরিরাজ হিমালয় কন্যা দেবী 'শৈলপুত্রী', দ্বিতীয়ায় তপশ্চারিনী দেবী 'ব্রহ্মচারিণী', তৃতীয়ায় শান্তি ও কল্যাণের দেবী 'চন্দ্রঘন্টা', চতুর্থীতে ব্রহ্মাণ্ড উৎপন্নকারিনী দেবী 'কুষ্মাণ্ড', পঞ্চমীতে কুমার কার্তিকেয়র মাতা দেবী 'স্কন্দমাতা', ষষ্ঠীতে মহর্ষি কাত্যায়নের কন্যা দেবী 'কাত্যায়নী', সপ্তমীতে দুষ্টের দমনকারী দেবী 'কালরাত্রি', অষ্টমীতে মহাদেবপত্নী দেবী 'গৌরী' এবং নবমীতে সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী দেবী 'সিদ্ধিদাত্রী' হিসেবে পূজা করা হয়। আর ষষ্ঠীতে কাত্যায়ণী।
লোক গবেষক শংকর মহাপাত্র উল্লেখ করেছেন, "প্রকৃতির আবহ রচনার প্রভাবে এবং মা দুর্গাকে নিজ নিজ কুটীরে আবাহন জানিয়ে পল্লীগ্রামের রমণীরা আলপনা আঁকা, দেওয়াল চিত্রন ও দু'চারটি পংক্তি রচনা করেন — যাকে আমরা 'দুয়ারবন্দনা' বলছি। এটি প্রধানত পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান, বীরভূম জেলায় লক্ষ্য করা যায়। সাঁওতাল সমাজের আঁকা দেওয়াল চিত্র ও মানভূম অঞ্চলের ভূমিজ, বাগদী, বাউরী, মাহাতো, কামার, কুমোরদের আঁকা দেওয়াল চিত্র গবেষকদের সযত্ন উদ্যোগে আমাদের গোচরে এসেছে"। 

আসলে বর্ষায় নানা ভাবে মাটির ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হয়। নষ্ট হয়ে যায় দেওয়ালের পলেস্তারা। শ্রীহীন সেইসব ঘরের শ্রীছাঁদ ফেরাতে শরতের এই আবহে শুরু হয়ে যায় ঘর দুয়ার বাগানোর কাজ। মাহাতো, বাগদি, লোহার, বাউরীদের পাশাপাশি ব্রাম্ভণ, মাহিষ্য, কায়স্থদের মাটির বাড়িতেও পড়ে কাদা ও গোবরের প্রলেপ। একটা উৎসবের গন্ধে ম ম করে চারিদিক। বাড়িময় জমে থাকা ঝুল ঝেড়ে দেওয়াল, উঠোন, রান্নাঘর, গোলাঘর থেকে যাবতীয় অংশে নতুন মাটির পোঁচ পড়ে। সমভূমি এলাকায় গোবরের ব্যবহার বেশি হলেও মালভূমি এলাকায় লাল মাটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। শঙ্কর মহাপাত্রর কথায়, "বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে রয়েছে কাঁকুরে মাটির উপস্থিতি। তাই উপযুক্ত মাটির খোঁজ চলে। মেয়েরা দলবেঁধে দূর থেকে বালতি বা হাঁড়িতে করে মাটি বয়ে আনে, পরে তাকে জল দিয়ে মেখে কাজের উপযুক্ত ক'রে তোলে। কাদা জলের প্রলেপ পড়ে মাটির দেওয়ালে দেওয়ালে। ফুটে ওঠে সরলতার এক মূল্যবান নিদর্শন, যা তাঁদের জীবনধারণের মতই সহজ ও সরল, যা নান্দনিক হয়ে ছড়িয়ে থাকে রঙহীনতায়। ভূমি থেকে মাটির দেওয়ালের দেড় ফুট উঁচু পর্যন্ত অনেকে ব্যাটারী ভেঙে, তার কালো অংশটি জলে গুলে নাতা দেয় রঙের বিভিন্নতা আনার জন্য। আলপনা বা দেওয়াল চিত্রে সাধারণতঃ পদ্মঝাড়, পদ্মচক্র, ফুল লতা, কলকা লতা প্রভৃতি বেশি চোখে পড়ে। বাড়ির পুরো দেওয়াল জুড়ে দেওয়াল চিত্র আগে দেখা গেলেও ইদানিং প্রায় চোখে পড়ছেনা। এই সব আঁকায় রঙ হিসাবে চালবাটা, গিরিমাটি, সিঁদুর, কাপড়ে দেওয়া নীল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রঙের স্থায়িত্বের জন্য বহু আগে রঙের সঙ্গে প্রাকৃতিক আঁঠা মেশানো হলেও, বর্তমানে বাজারের কেনা আঁঠাই ব্যবহার করা হয়ে থাকে"।

'দুয়ারবন্দনা' প্রাথমিক উৎসব হলেও পরবর্তী উৎসব কিন্তু 'গিরিবন্দনা'। কেউ কেউ বলেন গিরিমাটি দিয়ে দেওয়াল রাঙানো হয় বলে 'গিরিবন্দনা'। কিন্তু আসলে গিরিরাজ কন্যা দেবী দুর্গার বন্দনাই 'গিরিবন্দনা'। "বাপের বাড়ির শাড়ি সিন্দুর আলতা শোভনে / এয়োস্ত্রীরা চলে সবে মা দুর্গা বরণে"। অর্থাৎ বিবাহিতা মেয়েরা বাবার দেওয়া কাপড় পরে দেবী দুর্গাকে আবাহন করে গৃহে তোলেন। এক ঘটি গঙ্গাজল, জোড়া পান ও সুপারি দিয়ে বরণ করা হয় কাত্যায়ণীকে। এরপর সাত বা তার অধিক বিজোড় সংখ্যক এয়োস্ত্রীরা হাতে কুলো, বরণডালা এবং 'শ্রী' [আতপ চাল বাটা, পঞ্চগুঁড়ি বা আতপ চাল বেটে সাদা রং, চালের সঙ্গে হলুদ মিশিয়ে হলুদ রং, বেলপাতা বেটে সবুজ রং, কুসুম ফুল গুঁড়ো করে লাল রং, ধানের খোসা পুড়ে কালো রং] নিয়ে সাত বার প্রতিমা প্রদক্ষিণ করে। প্রথমে গণেশ, তারপর একে একে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, অসুর, সিংহ ও অন্যান্য বাহনকে বরণ করতে হয়। কিন্তু সব বাড়িতে তো আর দুর্গা পূজা হয়না। কিন্তু প্রতি বাড়িতেই দুর্গাকে আবাহন করে ঘরে তোলা হয় গিরিবন্দনার মাধ্যমে। অনেক পরিবারের বাড়ির দেওয়ালের গায়ে লিখে দেওয়া হয় "দ্বারে দিলাম গিরিমাটি / আসবে আমার দুর্গা মা'টি"।

মহাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় প্রতিটি হিন্দু বাঙালি পরিবারে দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে চালবাটার ফোঁটা দেওয়ার জন্য লাগে পেটারি বা টিকিফল। প্রায় হারিয়ে যাওয়া অপাংক্তেয় এই গাছটি এখনও বাঙালির দুর্গোৎসবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর দেবীর উদ্দেশ্যে উচ্চারিত হয়, "এসো মা দুর্গা, বস মা ঘরে / পান সুপারী সিঁদুর দিলাম তোমার তরে"।
গিরিমাটি, চালের গুঁড়ো বাটা এবং আলতার ফোঁটা লাগানো হয় গেরস্থের দরজায়। ফোঁটা দিতে এই পেটারি ফলই লাগে। এটি সৌগন্ধি প্রবালাকৃতি ফল। সংস্কৃতে পেটিকা, আটিবালা, তামিলে থুথি, তেলুগুতে দুভভেনা কায়ালু, দুভভেনা বেন্দা, কন্নড়ে তুথথি গিডা, ওড়িয়াতে পেড়ি পেড়িকা বলে। Malvaceae পরিবারের গুল্ম টিকিফলের হলুদ ফুল সন্ধ্যেবেলা ফোটে। কিন্তু ফলগুলো দেখতে সবচেয়ে সুন্দর। শীতে কালো হয়ে পেকে যায়। এঁদের গঠন বৈশিষ্ট্য চমৎকার। সেইজন্য এগুলো দিয়ে ফোঁটা দেওয়া হলে দেওয়ালে সুন্দর নক্সা ফুটে ওঠে। অতি সাধারণ এই ফলটির বৃন্ত ধরে বাড়ির বিবাহিত বা অবিবাহিত মহিলারা নতুন কাপড় পরে বাড়ির দরজায় ফোঁটা দেন। আসলে দুর্গার মর্ত্যে আগমনকে এভাবেই প্রতিটি বাড়িতে স্বাগত জানানোর রেওয়াজ চালু রয়েছে পশ্চিমবাংলায়। কোনো পৌরাণিক যোগাযোগ না থাকা সত্ত্বেও দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ হিসেবে জড়িয়ে আছে এই অখ্যাত গাছের ফলটি। 

পেটারির বিজ্ঞানসম্মত নাম Abutilon indicum। দেশি পেটারি বা ইণ্ডিয়ান অ্যাবুটিলন বা ইণ্ডিয়ান ম্যালো উষ্ণমণ্ডলীয় এবং উপউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দেশি পেটারি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় গাছ। রাস্তার পাশে জন্মায়। মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভিন্নতায় এটির উচ্চতা ৭ - ৮ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। তবে গড় উচ্চতা ৪ ফুটের মতো। এর কাণ্ড গাঢ় বাদামী এবং তা ২ - ৩ ইঞ্চি মোটা হয়। কাণ্ড শক্ত ও ভঙ্গুর। কাণ্ডের একেবারে নিচ থেকে ডালপালা বের হয়। এজন্যে এই গাছকে ঝোপালো মনে হয়। গিরিবন্দনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে গ্রামবাংলার অতি সাধারণ এই পথের গাছটি। বাংলার লৌকিক উৎসবের সাথে যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিকভাবে, তা অতুলনীয়।


পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন