শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা/-প্রীতম সেনগুপ্ত

পর্ব ৪১

শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

প্রীতম সেনগুপ্ত

স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ

 “শশীর Originality ( মৌলিকতা ) ভারি কম, তবে খুব good workman, persevering ( ভালো কাজের লোক -- অধ্যাবসায়শীল ), সেটা বড়ই দরকার; শশী খুব executive (  কাজের লোক )  ...।”   
 “শশীকে আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসি। He is the only faithful true man there ( ওখানে সে-ই একমাত্র বিশ্বস্ত ও খাঁটি লোক )।”
 “ঠাকুরের দেহ যাবার পর আমরা বরানগর মঠে কত জপ-ধ্যান করতুম। তিনটার সময় সব সজাগ হতুম। শৌচান্তে কেউ চান করে, কেউ না করে ঠাকুরঘরে গিয়ে বসে জপ-ধ্যানে ডুবে যেতুম। তখন আমাদের ভেতর কি বৈরাগ্যের ভাব! দুনিয়াটা আছে কি নেই, তার হুঁশ ছিল না। শশী চব্বিশ ঘণ্টা ঠাকুরের সেবা নিয়েই থাকত এবং বাড়ির গিন্নির মতো ছিল। ভিক্ষাশিক্ষা করে ঠাকুরের ভোগরাগের ও আমাদের খাওয়ানো-দাওয়ানোর জোগাড় ওই সব করত। এমন দিনও গেছে, যখন সকাল থেকে বেলা ৪/৫টা পর্যন্ত জপ-ধ্যান চলেছে। শশী খাবার নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থেকে শেষে কোনরূপে টেনে হিঁচড়ে আমাদের জপ-ধ্যান থেকে তুলে দিত। আহা! শশীর কি নিষ্ঠাই দেখেছি!”
 “খরচের অনটনের জন্য কখনও কখনও মঠ তুলে দিতে লাঠালাঠি করতুম। শশীকে কিন্তু ঐ বিষয়ে রাজি করাতে পারতুম না। শশীকে আমাদের মঠের central figure ( কেন্দ্রস্বরূপ ) বলে জানবি।”
 গুরুভ্রাতা শশী সম্পর্কে নানা সময়ে এমন সব মন্তব্য করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এগুলি সবই আমরা পাই স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা থেকে। শশী অর্থাৎ উত্তরকালে যিনি স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ, সম্পর্কে ছিলেন ঠাকুরের অপর সন্ন্যাসী সন্তান শরৎ মহারাজের ( স্বামী সারদানন্দ ) খুড়তুতো ভাই। শ্রীরামকৃষ্ণ দিব্যদৃষ্টিতে দেখে বলেছিলেন -- “শশী আর শরৎকে দেখেছিলাম ঋষি কৃষ্ণের ( অর্থাৎ যিশু খ্রিস্টের ) দলে।” স্বামী গম্ভীরানন্দ প্রণীত ভক্তমালিকায় উল্লেখ আছে -- “হুগলী জেলার ময়াল-ইছাপুর গ্রামবাসী বাপুলী-উপাধিধারী শ্রীযুত কালীপ্রসাদ চক্রবর্তীর তিন পুত্র ছিলেন -- রামানন্দ, রাজচন্দ্র ও ঠাকুরদাস। রামানন্দের পুত্র গিরিশচন্দ্র ছিলেন শরৎচন্দ্র বা স্বামী সারদানন্দের পিতা এবং রাজচন্দ্রের পুত্র ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন শশীভূষণ বা রামকৃষ্ণানন্দের পিতা। শ্রীযুত গিরিশচন্দ্র কলকাতায় বাটি নির্মাণ করে সেখানেই বাস করতে থাকেন; কিন্তু শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র স্বগ্রামে থেকে যান। ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন অতি উন্নত তান্ত্রিক সাধক এবং কৌল সমাজে তন্ত্রবিদ্যার জন্য তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তিনি পাইকপাড়ার রাজা ইন্দ্রনারায়ণ সিংহের সভাপণ্ডিত ছিলেন; রাজা তাঁকে গুরুর ন্যায় শ্রদ্ধা করতেন এবং সাধনার জন্য যখন যা প্রয়োজন হতো তার ব্যবস্থা করে দিতেন।” ১৮৬৩ সালের ১৩ জুলাই ( ১২৭০ বঙ্গাব্দের ২৯ আষাঢ়, চান্দ্র আষাঢ় কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে রবিবার, শেষরাত্রে ৪টা ৫৬ মিনিটে ) নিজগ্রাম ময়াল ইছাপুরে জন্মগ্রহণ করেন শশীভূষণ। ধর্মপরায়ণ পরিবারের আবহে শৈশব ও বাল্যকাল অতিবাহিত হওয়ায় শশী ভগবদপ্রেমী ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। তাঁর গর্ভধারিণী অত্যন্ত উদারহৃদয়া ও লজ্জাশীলা ছিলেন। গ্রামের বিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করে শশী  ইংরেজি শিক্ষা অর্জনের জন্য কলকাতায় চলে আসেন। শরৎচন্দ্রের গৃহে এসে ওঠেন। এরপর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উচ্চ স্থান অধিকার করেন এবং বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। এফ এ এবং বি এ পাস করেন যথাক্রমে আলবার্ট কলেজ ও মেট্রোপলিটন কলেজ থেকে। ছাত্রজীবনে শশী ও শরৎ দুই ভাই-ই ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত আরম্ভ করেন। উভয়েই সমাজের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিলেন। কেশবচন্দ্রের পুত্রের কিছুদিন গৃহশিক্ষকতাও করেছিলেন শশী। ১৮৮৩ সালের অক্টোবর মাসে শরৎ ও শশী বন্ধু সমভিব্যাহারে এসে উপস্থিত হন দক্ষিণেশ্বরে, শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। শশীকে শ্রীরামকৃষ্ণ জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি সাকার না নিরাকার -- কোনটিকে ভালোবাসেন। সরল ও নির্ভীক উত্তর দিলেন শশী, বললেন -- “ঈশ্বর আছেন কি না তাই জানি না -- তাঁর আবার সাকার না নিরাকার?” ঠাকুর এই উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। এরপর ওঁর কাছে থাকা বাইবেলে চিহ্নিত কিছু অংশ পাঠ করতে বললেন। এখানে লিখিত ছিল -- “অবিবাহিত ও বিধবাদিগকে আমি বলিতেছি যে, বিবাহ না করাই ভাল -- যেমন আমি অকৃতদার রহিয়াছি। কিন্তু তাহারা যদি সংযম অবলম্বন না করিতে পারে, তবে বিবাহ করাই ভাল, কারণ বাসনার আগুনে পুড়িয়া মরা অপেক্ষা বিবাহ করাই উত্তম।” ঘরে উপস্থিত আরও অন্যান্যরা থাকলেও এই কথাগুলি মূলত দুই ভাই শরৎ ও শশীকে উদ্দেশ্য করেই যে ঠাকুর বলতে চেয়েছিলেন তা বলাই বাহুল্য। কেননা শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর দুই পার্ষদকে প্রথম দর্শনেই চিনে নিয়েছিলেন। প্রথম দিন সাক্ষাতের পর বিদায়কালে তাই ঠাকুর শশী প্রভৃতিকে বলেছিলেন, “আবার এসো, কিন্তু একা একা, ধর্মের সাধন গোপনীয়।”

 শশীভূষণ আবার এসেছিলেন। যার পরিণতি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সন্ন্যাসী শিষ্য স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ হয়ে ওঠা। স্বামী চেতনানন্দ চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন -- “মরমিয়া সাধকদের মুখে আমরা শুনি --‘সেবা বন্দি ঔর অধীনতা এই সে মিলে রঘুরাঈ।’ স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের গুরুসেবা, গুরুপূজা ও বন্দনা এবং গুরুর প্রতি আনুগত্য রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে প্রবাদ হয়ে রয়েছে ও থাকবে। তাঁর অতুলনীয় গুরুসেবার নিদর্শনস্বরূপ স্বামী বিবেকানন্দ গুরুভাইদের সন্ন্যাসকালে শশী মহারাজকে ‘রামকৃষ্ণানন্দ’ নাম দেন। শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তর্ধানের পর তিনিই সর্বপ্রথম বরানগর মঠে গুরুপূজা প্রবর্তন করেন। পরিশেষে গুরুর প্রতিটি আদেশ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পালন করে দেখালেন গুরুর উপর অধীনতা বা আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা। 
 মানুষের প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশ পায় কথায় নয় কাজে। এই কাজই নিঃস্বার্থ সেবা। শ্রীরামকৃষ্ণ গরমকালে জলে বরফ মিশিয়ে খেতে পছন্দ করতেন। যুবক শশী বরানগর থেকে বরফ কিনে কাপড় বেঁধে হেঁটে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে গিয়েছিলেন। ঠাকুর বরফ পেয়ে খুব খুশি। তারপর ঠাকুরের ক্যানসার হলে শশী বি এ পড়া  ছেড়ে দিয়ে আহার-নিদ্রা ভুলে কাশীপুরে দিনরাত গুরুসেবায় মগ্ন হলেন। বাপের অনুরোধেও বাড়ি যেতে অস্বীকার করলেন। শেষে বাপ যখন গুরুর নিন্দা করেন, তখন শশী বাপকে কেটে ফেলার হুমকি দেন। সাধক পিতা নিষ্ঠাবান পুত্রের গুরুভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে আনন্দে ঘরে ফিরে যান।

 রামায়ণে আমরা হনুমানের দাস্যভক্তির কথা শুনেছি, কিন্তু শশী মহারাজ দাস্যভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন।” ( স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের স্মৃতিমালা, তাঁর পত্র ও রচনাসংগ্রহ -- সংকলক -- স্বামী চেতনানন্দ ও স্বামী বিমলাত্মানন্দ )

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল