শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা-৪৩/প্রীতম সেনগুপ্ত

পর্ব ৪৩

শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

প্রীতম সেনগুপ্ত

 শ্রীরামকৃষ্ণের মতোই রঙ্গপ্রিয়তায় কোনও অংশেই কম ছিলেন না তাঁর সন্ন্যাসী সন্তানেরা। বিশেষত নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ ) চূড়ান্ত রঙ্গপ্রিয় ছিলেন। শশী মহারাজ ঠাকুরসেবায় যে কোনওরূপ ত্রুটি সহ্য করতে পারতেন না, তিনি তা  বিলক্ষণ জানতেন। একদিন এক ভক্ত শ্রীরামকৃষ্ণপূজাকে শীতলা পূজার সঙ্গে তুলনা করলে শশী মহারাজ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি এই ভক্তের কাছ থেকে কোনওরূপ অর্থসাহায্য চান না বলে ঘোষণা করলেন। এই ঘোষণা শুনে স্বামীজী কৃত্রিম রাগ সহকারে বললেন, তবে যেন তিনি ভিক্ষা করে অর্থ নিয়ে আসেন। শশী মহারাজ রাজি হয়ে গেলেন। এই ঘটনার চিত্তাকর্ষক বর্ণনা লাটু মহারাজ তথা স্বামী অদ্ভুতানন্দ দিয়েছেন এইরকম --“বরানগর মঠে একদিন গুরুভাইদের মধ্যে ঠাকুরঘর নিয়ে বড় কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। সেদিন (গৃহী) ভক্তদের মধ্যে কে নাকি ঠাট্টা করে বলেছিলো -‘শালারা আর করবি কি?  যেমন শীতলা ঠাকুর বসায়, তেমনি ঠাকুরের ছবি বসিয়ে ঘণ্টা বাজাবি আর পূজুরিগিরি করবি।’ (গৃহী) ভক্তটির কথা শুনে শশীভাই বড্ড চটে উঠে বলেছিলো --‘এমন যে শালা বলে, তার পয়সায় আমি মুতে দিই।’ শশীভাইকে চটতে দেখলে লোরেনভাইয়ের বড় আমোদ লাগতো, তাই হাসতে হাসতে বললে, --‘যাঃ শালা! ভিক্ষে করে তোর ঠাকুরকে খাওয়াগে যা।’ লোরেনভাইকে ঐ কথা বলতে শুনে শশীভায়ের মনে বড্ড দুঃখু হলো, বললে --‘বেশ। তোমাদের এক পয়সা চাই না, আমি ভিক্ষে করে ঠাকুরকে খাওয়াবো!’ তাতে লোরেনভাই হাসতে লাগলো , বললে --‘কিরে! ভিক্ষে করে তোর ঠাকুরকে লুচি ভোগ দিতে পারবি ত?’ শশীভাই ( উত্তেজিত হইয়া ) বললেন --‘হ্যাঁ পারবো, সেই ভোগের লুচি আবার তোকে খেতে দেবো।’ তখন স্বামীজী (উত্তেজনার ভান করিয়া ) বললে --‘তা কখনই হোতে পারে না; আমরা শালা খেতে পাচ্ছি না, আর তোর ঠাকুর লুচিভোগ খাবে? ফেলে দেবো এমন ঠাকুরকে জানিস? তুই যদি ফেলতে না পারিস আমি নিজের হাতে সে ঠাকুরকে ফেলে দেবো! এই বোলে (কৃত্রিম রোষভরে যেন) লোরেনভাই ঠাকুরঘরের দিকে যেতে লাগলো। শশীভাইও লাফিয়ে ইংরেজীতে কি বললেন। হাসিঠাট্টার ব্যেপারে এমন তকরার হোতে দেখে হামার মনে বড্ড দুঃখু হলো। হামনে লোরেন ভাইকে বললুম -- ‘কেনো ভাই! শশীর সাথে তুমি বাদ সাধছো? তোমার মতো তুমি চলো, শশীভাইকে তার মতে চলতে দাও।’ লোরেন ভাই হামাকেও দাবড়ি দিয়ে উঠলো। দাবড়ানি শুনে যেই একটা কড়া কথা বলতে গেছি, অমনি লোরেনভাই হেসে উঠলো। এমন হাসলে যে, শশীভাইও হেসে ফেলল। দু'মিনিটের মধ্যে সব গলাগলি বসে ঠাকুর পুজোর ব্যবস্থা করতে লেগে গেলো’।” (শ্রীশ্রীলাটু মহারাজের স্মৃতিকথা, শ্রীচন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, পৃ:২৫১-৫২)


 ঠাকুর পূজাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মজার ঘটনা উল্লেখের লোভ সংবরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেইসময় বরানগর মঠে বুড়ো বাবা ( সচ্চিদানন্দ ) এসেছিলেন। লাটু মহারাজের বর্ণনা অনুযায়ী -- “একদিন শশীভাই বুড়ো বাবাকে ঠাকুরের দাঁতনকাঠি দিতে বললে। বুড়ো বাবা জানতো না যে, ঠাকুরের দাঁতনকাঠি থেঁতো করে দেওয়া হয়। তাই সে একটা আস্ত দাঁতনকাঠি ঠাকুরের ঘরে দিয়ে এলো। বাল্যভোগ দেবার সময় শশীভাই তা দেখে বুড়ো বাবাকে কি বকুনীটাই দিলে! --‘শালা! আজ তুই আমাদের ঠাকুরের মাড়ি দিয়ে রক্ত বের কোরেছিস; আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।’ হামনে তো তখুনই বুড়ো বাবাকে বললুম --‘পালিয়ে যা, দেখছিস কি?’ হামার কথা শুনে বুড়ো বাবা পালিয়ে গেলো! তাকে ধরতে না পেরে শশীভাই আবার দাঁতনকাঠি খুব থেঁতো করে ঠাকুরঘরে দিয়ে এলো। দেখো তো শশীভাই কেমন মন দিয়ে পূজা করতো?” ( শ্রীশ্রীলাটু মহারাজের স্মৃতিকথা, শ্রীচন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, পৃ:২৬০) শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্ঘের ইতিহাসে বরানগর মঠের অধ্যায়টি অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের অপর এক সন্ন্যাসী সন্তান স্বামী অভেদানন্দজী জানাচ্ছেন -- “(শ্রীরামকৃষ্ণের মহাসমাধির পর) একদিন নরেন্দ্রনাথ আসিয়া হুটকো গোপাল ও আমাকে সঙ্গে লইয়া শরতের ( সারদানন্দ ) বাড়িতে যাইতে চাহিল। আমরা তাহাই করিলাম। শরতের বাড়িতে যাইয়া তাহাকে বরাহনগর-মঠে স্থায়িভাবে যাইয়া থাকিতে বলিলাম। শরৎ আমাদের সহিত যাইতে সম্মত হইল। শশীও ( রামকৃষ্ণানন্দ ) সেই বাড়িতে থাকিত। তাহার সহিত দেখা করিয়া তাহাকেও আমাদের সহিত যাইয়া বরাহনগর মঠে অন্তত সেইদিন থাকিতে বলিলাম। শশী সম্মত হইল। সুতরাং শরৎ ও শশীকে লইয়া নরেন্দ্রনাথ, হুটকো গোপাল ও আমি বরাহনগর-মঠে উপস্থিত হইলাম। শরৎ ও শশী সেইদিন বরাহনগর-মঠে থাকিয়া গেল। নরেন্দ্রনাথও সেইদিন রাত্রে মঠে থাকিয়া গেল। শশী কিন্তু আর বাড়ি ফিরিতে চাহিল না, সে আমাদের সহিতই মঠে থাকিয়া গেল। ক্রমে নরেন্দ্রনাথ, নিরঞ্জন, রাখাল প্রভৃতিও একেবারে বাড়ি হইতে চলিয়া আসিয়া আমাদের সহিত বরাহনগর-মঠে বাস করিতে লাগিল। আমাদের আনন্দের তখন আর সীমা রহিল না। আমরা পরে বুঝিয়াছিলাম যে, আমাদের ভবিষ্যৎ সঙ্ঘ-জীবনের সংগঠন বরাহনগর-মঠ হইতেই শুরু হইয়াছিল। আমাদের সকলেরই মনে ছিল যে, মহাসমাধির পূর্বে একদিন রাত্রে শ্রীশ্রীঠাকুর নরেন্দ্রনাথকে কাছে ডাকিয়া বলিয়াছিলেন: ‘তুই ছেলেদের একত্রে রাখিস ও দেখাশোনা করিস।’ আমরা শ্রীশ্রীঠাকুরের সেই নির্দেশ স্মরণ করিয়া নরেন্দ্রনাথকেই সকলের প্রধান করিয়া তাহার নির্দেশ-অনুসারে চলিতাম এবং মঠে নিয়মিতভাবে ধ্যান-ধারণা, পূজা-পাঠ, কীর্তনাদি করিয়া দিন অতিবাহিত করিতাম। ... ক্রমে শশী (রামকৃষ্ণানন্দ) আসিয়া যে ঘরে শ্রীশ্রীঠাকুরের খাট, বিছানা, পাদুকা ও অন্যান্য ব্যবহৃত দ্রব্যাদি ছিল সেইখানেই সেইগুলি আরো ভালোভাবে সাজাইয়া গুছাইয়া রাখিল এবং খাটের উপর শ্রীশ্রীঠাকুরের ফটো স্থাপন করিয়া নিত্য-নিয়মিতভাবে পূজা, আরাত্রিক ও স্তবপাঠাদি আরম্ভ করিল।” ( আমার জীবনকথা --স্বামী অভেদানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ বেদান্ত মঠ)
 এরপর গঙ্গা দিয়ে গড়িয়ে গেল অনেক জল।

 ১৮৯৩ সালে সুদূর মার্কিন মুলুকে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠলেন বিবেকানন্দ। ১৮৯৭ সালে পাশ্চাত্য থেকে প্রত্যাবর্তন করে রামকৃষ্ণানন্দকে মাদ্রাজে প্রেরণ করলেন তিনি। উদ্দেশ্য রামকৃষ্ণ ভাবাদর্শের প্রচার ও প্রসার। স্বামীজীর আদেশ শিরোধার্য করে রামকৃষ্ণানন্দ চলে গেলেন দক্ষিণ ভারতে। পরবর্তী ১৪ বছর ( ১৮৯৭ -১৯১১ ) ইতিহাসের আরেক বিস্ময়কর অধ্যায়!

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল