মহাসপ্তমী।। সন্দীপ দত্ত


গল্প।।

 মহাসপ্তমী।। সন্দীপ দত্ত


"হিসেবের খাতাটা আর একবার দেখলে ভাল হতো প্রবালদা।" খানিক দূরে দৃষ্টিজালের মধ‍্যে আটকে পড়া ফেরিওয়ালার কাছ থেকে প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে দরদাম করতে থাকা পাড়ার সহেলীবৌদির সরু কোমরের দিকে চকচকে চোখে তাকিয়ে কথাগুলো বলল নিতাই।
"কেন রে,কোনও গরমিল ঠেকছে?" নাক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে প্রবাল জিজ্ঞেস করে।
"না গরমিল নয়,আসলে আমরা যদি আর মাত্র তিরিশ হাজার টাকা ভোম্বলদাকে দিই,প‍্যান্ডেলটা তাহলে অবিকল তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা হয়ে যায়। কোভিড পরবর্তী আবার সেই জাঁকজমক পুজো দাদা। তার ওপর পঁচিশ বছর পূর্তি। একটু থিম থিম ভাব না আনলে হয়?"
"সে তো বুঝলাম। কিন্তু আরও তিরিশ হাজার টাকা যদি আমরা প‍্যান্ডেলের পেছনে খরচ করে দিই,তাহলে সপ্তমীর দিন বিকেলে বস্ত্রবিতরণ অনুষ্ঠান'টা করব কী করে? আমাদের এই 'নবদূত সংঘ'র পুজোয় প্রতিবছর এটাই রেওয়াজ।"
"সরকারি অনুদানের ষাট হাজার টাকা থেকে তো কিছু খরচ করা যায়। বস্ত্রবিতরণ অনুষ্ঠানটা নাহয় ওখান থেকেই হবে। প‍্যান্ডেলটা ভাল করে হোক না। লোকজন জমুক। একটু ভিড় বাড়লে তো আমাদেরই লাভ। পরের বছরের জন‍্য খাটার একটা উৎসাহ পাব। পঁচিশ বছরের পুজো। জৌলুস তো একটু বাড়াতেই হবে।" নিরুপম বলল কথাগুলো।
"না। সরকারি অনুদানের ষাট হাজার টাকা থেকে এক টাকাও অন‍্য কোনও দিকে খরচ করতে দেব না। ওটা ডান্স ট্রুপের জন‍্যই থাকবে। বস্ত্রবিতরণের অনুষ্ঠানটা এবছর যদি না-ই করা হয়। আসে তো পাঁজর বের হওয়া ভিখিরিদের দল। অষ্টমীর সকালে নতুন কাপড় ওরা পরলেই কী আর না পরলেই কী। ডান্স ট্রুপের ম‍্যানেজার শেখর মালহোত্রার সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। মহাসপ্তমীর দিন রাত ন'টা থেকে ভোর তিনটে পর্যন্ত মোট ছ'ঘন্টার অনুষ্ঠান করবে মাত্র ষাট হাজারে।" নিতাই বলল।
"মানে সরকারি অনুদানের পুরো টাকাটাই ওখানে?" নিরুপম অবাক হয়ে তাকায়।
নিতাই বলে,"আরে সব সেটিং আছে বস! পুরসভার চেয়ারপার্সন নিজে আসবেন অনুষ্ঠান দেখতে। পুলিশ তো থাকবেই। মেয়েগুলোর নাচ দেখলে শালা পাগল হয়ে যাবি। এক একজনের ফিগার! আমাদের কপাল অনেক ভাল বলে শেখর মালহোত্রা রাজি হয়েছে। নইলে এখানে অনুষ্ঠান করে কখনও? তাই না প্রবালদা?"
"পাড়ার কাকু কাকিমাদের নিয়েই চিন্তা। মঞ্চে ওরকম অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির নাচগুলো দেখে যদি.......।"
"তুমিও যেমন প্রবালদা! প্রথমেই ওসব নাচ হবে নাকি? পুরপ্রধান থাকবেন,স্থানীয় কাউন্সিলর থাকবেন,থানার আইসি থাকবেন,পাড়ার বয়োজৈষ্ঠ‍্য'রা থাকবে,ওদের সামনে ওসব নাচ হয়? ওসব নিয়ে তুমি একদম চিন্তা কোরো না। নিরুপম,আমি,পুলক,মহিম,আমরা তো সব আছি। শেখরদার সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। যা বলার,ওকে বলে দিয়েছি। সাড়ে বারোটা অব্দি রবীন্দ্রসংগীত আর নজরুলগীতির ওপর নাচ চলবে। শুভমিতা বা আশার দু'একটা আধুনিক হয়তো হতে পারে। ব‍্যস। তারপর দর্শকও কমে যাবে,গণ‍্যমান‍্য ওঁরা কেউ থাকবেনও না। তখন কীসের লজ্জা? আরে শেখরদা আজকে অনুষ্ঠান করছে না প্রবালদা। ওটাই ওর পেশা। স্টেজে কখন কোন্ মেয়েকে তুলতে হয়,ওর সব জানা আছে।" বলে নিতাই হাতে খৈনি ডলতে শুরু করল।
"ঠিক আছে। হোক তাহলে। অনুদানের টাকাটায় সব হয়ে যাবে তো?"
"তুমি একদম ভেবো না প্রবালদা। আমরা সব সামলে নেব।"

অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে অবশেষে এল দুর্গোৎসব। পাড়ার রাস্তা সেজে উঠল বাহারি আলোয়। 'নবদূত সংঘ'র সামনে অবিকল দাঁড়িয়ে গেল তি তুমীরের বাঁশের কেল্লা।পঞ্চমীর দিন সকাল থেকেই রাস্তায় রাস্তায় তারস্বরে বেজেউঠল মাইক। বাজল ঢাকের রেকর্ড আর মহালয়া। 
           বোধন পেরিয়ে আজ সপ্তমী। মহাসপ্তমীর তিথি ধরে নবপত্রিকার স্নান হয়েছে সকালে। রীতি মেনে শুরু হয়েছে পুজো। তারপর দফায় দফায় পুষ্পাঞ্জলি।
             বিকেল ফুরোতেই ডান্স ট্রুপের জন‍্য  সুসজ্জিত মঞ্চের আশেপাশে দর্শক জমতে শুরু করে। সময় যত গড়ায়,ভিড়ে থিকথিক করে চারদিক। 
           জড়ো হয় শহরের ভিখিরির দলও। না খেতে পাওয়া বিত্তহীন মানুষ যারা,কাঁখে ছোট্ট ছেলে নিয়ে হাজির হয়। কেউ বা পিঠে বেঁধে আনে শিশু। রাত পোহালেই অষ্টমী। অষ্টমী মানেই নতুন কাপড়। শারদোৎসব বলে কথা। পুজো তো সক্কলের। ফি বছর এখানে,এই ক্লাবের এই মঞ্চ থেকেই ক্লাবের ছেলেরা বস্ত্রবিতরণের অনুষ্ঠান করে। বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে এই অনুষ্ঠান। ভিখিরিমানুষগুলো তাই চোখে অপেক্ষা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়েই থাকে। আর ওদের সেই আশার পিদিম জ্বলা চোখের সামনে লাস‍্যময়ীরা শরীর দেখিয়ে মঞ্চ কাঁপায়। পেলব চিকন শরীর আর আগুনে যৌবন।
          পুরপ্রধান নিজের শরীর খারাপের কথা ভুলে যান। ড্রাইভার ফোন করে মনে করিয়ে দিলে তিনি বিরক্ত হন।  মেয়েদের শরীর চাটতে চাটতে তিনি ড্রাইভারকে ধমকে বলেন,"সময়জ্ঞানটা আমাকে শেখাস না বিষ্ণু। এখন পুজোর ছুটি চলছে। একটু যদি দেরিই হয়,ক্ষতি কী? আর শরীরটা আমার না তোর?"
          থানার আইসি ভিড় নিয়ন্ত্রণ করবার নামে মুখ থেকে লালা ঝরিয়ে দারুণভাবে উপভোগ করেন মঞ্চে উদ্দাম নাচরতা সুন্দরী মেয়েদের উন্মুক্ত গভীর নাভি।
          রাত যখন দুটো পার হয়ে যায়,নাচতে নাচতে শরীর থেকে শাড়ি খোলে মেয়েরা। ছোঁড়ে দর্শকদের দিকে। খোলে ব্লাউজ। ছুঁড়ে দেয় সেটাও। সঙ্গী ছেলেরাও পরনের প‍্যান্ট খুলে ছুঁড়ে দেয়। ছোঁড়ে জামাও। এখন শুধু অন্তর্বাস পরে নাচবে ওরা। শেখর মালহোত্রার এই ডান্স ট্রুপের এটাই চূড়ান্ত উপভোগ। এরপর ওরা যখন স্টেজ থেকে নেমে যাবে,তখন ওদের জন‍্য অন‍্য আর এক সেট শাড়ি,জামা,প‍্যান্ট রেডি রাখবে দলের লোক। যা পরে নিজেদের পারিশ্রমিক বুঝে নিয়ে গাড়িতে উঠবে ওরা। এ কথাগুলো নিতাই আগেই শুনেছে। বায়না নেওয়ার সময় শেখর নিজেই বলেছে তার দলের বিশেষত্ব। শেখরের কথায়,"শরীর না দেখালে আজকাল লোক টানা যায় না। বিশেষ করে মেয়েদের শরীর। ওদের নাভি আর বগল দেখতে চায় দর্শক। দর্শকরা আমাদের কাছে লক্ষ্মী। তাদের গুরুত্ব তো দিতেই হবে।"
            হরিলুটের বাতাসার মতো শাড়ি,ব্লাউজ,জামা আর প‍্যান্ট নিয়ে নিজেদের মধ‍্যে কাড়াকাড়ি মারামারি করে ভিখিরির দল। রাত পোহালে মহাষ্টমী। নতুন কাপড় গায়ে তোলার দিন। যে পাবে,সে-ই তো রাজা!
             ওদের দেখে হাসে বড়লোকগুলো। পাগল বলে ঠেলে দেয়।

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন