ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

 ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা  ১১০


সম্পাদকীয়,
  ১৯৭৫-এ ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বের প্রথম মহিলা হিসাবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন জাপানের জুঙ্কো তাবেই। সম্প্রতি অদম্য জেদ ও অনবদ্য সাহসিক মানসিকতার পরিচয় দিয়ে অক্সিজেন ছাড়াই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছালেন হুগলির চন্দননগরের মেয়ে পিয়ালী বসাক। সুতরাং মেয়েদের এই জয়যাত্রা অব্যাহত জয়াবতীর সময় থেকে আজও। জয়াবতীর সমুদ্দুর দেখার শখ পিয়ালীর এভারেস্ট জয়ের শখ যুগে যুগে নারীদের সাহসী করেছে। হ্যারি পটার  হচ্ছে  লেখিকা জেকে রাউলিং রচিত সাত খন্ডের কাল্পনিক উপন্যাসের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সিরিজ। নারীদের এই ট্র‍্যাডিশান থামবার নয়। আমাদের ছোটোবেলাতেও আজ তৃষ্ণা আন্টি, মৌসুমী মাসি, রঞ্জনা পিসি গল্প কবিতা লিখে একই ভাবে নারীদের জয় জয়কার অব্যাহত রেখেছে। এত এত কথা বলবার কারণ কি জানো? বলে কিনা পথে নারী বিবর্জিতা, মেয়েদের বেশী পড়ালেখা শিখতে নেই...... কে বলেছে?  বলব না। তোমরাই পড়ে দেখো। তোমরাও আমার মতো রেগে যাবে। আর তারসঙ্গে অঙ্কিতের দুই বন্ধুর গল্পটাও পড়ে জানিও কিন্তু। ছোটো বন্ধুরা বছর শেষ হতে চলল, কিন্তু শেষের বেলায় একটা নতুন খবর দিই। তোমাদের দিদি দাদারা তোমাদের জন্য কলম ধরেছে। কি খুশি তো? আমিও খুব খুশি। এসো আমরা তাদের লেখা থেকে জেনে নিই, বছরের স্মরণীয় দিবসগুলি..... - মৌসুমী ঘোষ।

ধারাবাহিক উপন্যাস
জয়াবতীর জয়যাত্রা
পর্ব ৩৫

তৃষ্ণা বসাক
 ৩৯
-ছিখেত্তর!
এর থেকে জয়াবতী যদি সাত রাজার ধন মানিক কিংবা সাগর ছেঁচা মণিমানিক্য কিংবা পংখীরাজ ঘোড়া  এমনকি সাপের মাথার মণিও চাইত কিংবা রাক্ষসীর প্রাণ ভোমরা, তাতে জমিদারমশাই এত অবাক হতেন না,
কিন্তু ছিখেত্তর! যেখানে তিনি এখনো যাননি, এই গাঁ থেকেও কেউ কোনদিন যায়নি, চার পাঁচ গাঁ পরে হরগৌরী বলে একটা গাঁ আছে, সেখান থেকে কজন গেছিল শুনেছিলেন, তারা ফিরেছে কিনা আর খবর পাননি, সেই ছিখেত্তর যেতে চায় এই পুঁটে মেয়েটা! ওর দুঃসাহস দেখে প্রথমে কী বলবেন কথাই খুঁজে পেলেন না প্রথমে। শুনেছিলেন বটে রামগতি পণ্ডিতের মেয়ের খুব চটাং চটাং কথা, তা বদ্যি হয়েছে বলে কি মেয়েমানুষের এত বাড় হবে যে সোজা ছিখেত্তর যেতে চাইবে? নাহ, ওর বাপকে ডেকে একটু ভাল করে বুঝিয়ে দিতে হবে। মেয়েকে সময় থাকতে সামলাও হে, নইলে পরে পস্তাবে। কথায় আছে না,
কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ
পাকলে করে টাঁস টাঁস
তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে জয়াবতী বলল,
‘বুজতেই পারচি খুব আচ্চযয হয়েচেন আমার কতায়। ভাবচেন এত কম বয়সে ধর্মেকর্মে মতি কেন? না না ওসব মতি আমার নেই। পিথিমির কাজ ফেলে, মানুষের দুঃখের দিকে না তাকিয়ে চোখ বুজে হা ঠাকুর হা ঠাকুর করা আমার কম্মো নয়। তাছাড়া, নিজেরা কিচুই করব না, ঠাকুরকে ডেকে উদ্ধার হব, এ কেমন কতা বলুন তো? আসল কতা হল আমি শুনেচি ছিখেত্তরে সমুদ্দুর আচে। আমি এই উমাশশীর সঙ্গে সাগরজল মিতে পাতিয়েচি। তাই সবাইকে নিয়ে গিয়ে একবার দেকতে সাধ হয়েচে সাগর কত বড়’
ধম্মোকম্মে মতি নেই,  শুধু সমুদ্দুর দেকতে ছিখেত্তর যেতে চায়- এমন কতা কোন বড় মানুষের মুখেও শোনেননি জমিদারমশাই। এ মেয়ে বলে কী?
কিন্তু কী যে মায়া এই মেয়ের মুখে! রাগ করতে গিয়েও রাগ করতে পারেন না। সমুদ্দুর দেখতে চায় ও। শুনলেই মনে হয় কি দুঃসাহস। কবে কে শুনেচে ঘরের মেয়েরা আবার কোথাও যেতে চায়, তাও আবার স্পষ্ট বলে দিল তীর্থ নয়, সে চায় সমুদ্দুর দেখতে।রাঘবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যাঁর ভয়ে দশটা গাঁয়ের লোক কাঁপে, তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যান এ কথা শুনে।
মেয়েরাও তাহলে এমন ইচ্ছে পুষে রাখতে পারে মনের মধ্যে? কোনদিন ভেবে দেখেননি তো। তিনি কথা বলবেন, মেয়েরা শুনবে, রান্নার ফোড়ন নিয়ে, তরিতরকারির কাটার ধরন নিয়ে, নিজের ছেলে কেন মাছের মুড়ো পেল না- এই নিয়ে মেয়েমহলে প্রায়ই গজালি শোনা যায়। মেয়েদের ইচ্ছে বা মতামতের ওইটুকুই চৌহদ্দি তিনি জানেন। বড় জোর কেন মেঘডম্বুর শাড়ি পেল না পূজায়, বা বাঁড়ুজ্জে গিন্নির মত মান্তাসা বা কানবালা চাই- এইটুকু, কিংবা সারাবছর নানান বার ব্রত উপোস- এই তো ওদের জগত। তাছাড়া মেয়েমানুষ  বারো হাত কাপড়েও কাছা দিতে জানে না, পথে নারী বিবর্জিতা –এই কথা তো শাস্ত্রেই লেখা আছে। তাদের নিয়ে পথে বেরোনোর ভারি জ্বালা।  সেই মেয়েমানুষ বলছে সমুদ্দুর দেখবে, এই নাকি তার সাধ! মুখুজ্জেমশাই অবাক হয়ে ভাবলেন, তাঁর মা, স্ত্রী, কন্যারা কিংবা এই অন্য বাড়ি থেকে এ বাড়ির বউ হয়ে আসা সব্বো, তাদের কি মনে মনে এমন কোন সাধ জমে আছে? কোনদিন তারা কিছু চায়নি তো সামনে দাঁড়িয়ে! চাইবে কী করে? মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না- এমনটাই শেখানো হয় আঁতুড়ঘর থেকে। শুনতে শুনতে তারাও সেটাই বিশ্বাস করে নেয়। সেই যেমন একটা বামুনঠাকুর পুজো করে একটা পাঁঠা পেয়ে সেটাকে নিয়ে ফিরছিল। পথে তিনটে লোক দেখল তাঁকে, আর তাদের নোলা সকসক করে উঠল। কী করা যায়- ভাবতে ভাবতে তারা একটা বুদ্ধি করল। বামুনঠাকুরের যাবার রাস্তায় তিনজন দূরে দূরে আলাদা দাঁড়িয়ে রইল। প্রথমজন যখন বলল ‘ও বামুনঠাকুর একটা কুকুরকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছ কেন?’ তখন বামুন তার কথা মোটেই বিশবাস করল না। আর একটু দূরে যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল, সেও বলল ‘ও বামুন ঠাকুর শুধুমুদু একটা কুকুর নিয়ে ফিরছ কেন?’ তখন বামুনঠাকুরের মনে সন্দেহ ঢুকল। দু দুটো লোক বলছে যখন, সত্যি হলেও হতে পারে। তবুও সে কিছু না বলে পাঁঠাটা নিয়ে হাঁটতে লাগল, এবার তৃতীয় লোকটির সঙ্গে দেখা। সেও যখন বলল এটা পাঁঠা নয়, কুকুর, তখন বামুনঠাকুর কোল থেকে ছুঁড়ে ফেললেন পাঁঠাটাকে। দূর হ অপয়া কুকুর। তিনি যেই ওকে ফেলে চলে গেলেন, অমনি লোক তিনটে পাঁঠাটাকে নিয়ে মহানন্দে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল, আজ তাদের পাঁঠার মাংস ভাতের মহাভোজ।
এই গল্পটা ছেলেবেলা থেকে কত শুনেছেন, কিন্তু আজ তার প্রকৃত অর্থ তাঁর কাছে ধরা দিল। একটা মিথ্যে কথা অনেকে মিলে বললে সেটা সত্যির মতো শোনায়। আজ তাঁর প্রথম মনে হল, সমাজে কত কথাই এমন চলে আসছে, কখনো তাদের খতিয়ে দেখা হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে কথাগুলো-
-মেয়েমানুষ লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয়,
-মেয়ে  হল পরের ধন
-পথে নারী বিবর্জিতা
আর ওই বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না! আসলে যাদের কথা বললেই চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে চিরকাল, তারা কখন যে বোবা হয়ে গেছে। আজ তাঁর প্রথম মনে হল মেয়েদের কথা না বলতে দিয়ে জীবন থেকে কত কী হারিয়ে ফেলেছেন। কী মধুর বাচন ভঙ্গি এই মেয়েটির। আর যা বলছে তার প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের গভীর থেকে উঠে আসছে।ওর অসম্ভব জ্বলজ্বলে মুখ দেখে ওর প্রতিটা কথা বিশ্বাস হয় তাঁর।তিনি ভাবেন সত্যিই তো, শুধু জগন্নাথ দর্শন কেন, অমন যে সমুদ্দুরের কথা  পড়েছেন মহাকবি কালিদাসের রচনায় ‘ দূরাদয়াশ্চক্রনিভস্য তন্বী তমাল তালী বনরাজি নীলা। আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশের্ধারা  নিবদ্ধেব কলংক রেখা’
আহা সমুদ্রের কী রূপ, তার ধারের তাল তমাল নারিকেল বনের সারি, আর ঢেউর পরে ঢেউ, সমুদ্রতীরের অগাধ সোনালি বালি রাশি, তার ওপর এসে পড়া সূর্যের প্রথম প্রভাতী কিরণ- এইসবের কত বর্ণনা করে গেছেন কবিরা। নীলাচল কেন, তাঁদের কাছেই তো আছে সাগর, গংগাসাগর, যেখানে গংগা এসে মিশেছে সাগরে। এখানে কপিলমুনির আশ্রম, প্রতি বছর পুণ্যস্নানের জন্যে  সংক্রান্তিতে কত দূর দূর থেকে সাধু সন্ন্যাসীরা আসেন, তাঁরা এই গ্রামের ওপর দিয়েই যান। তাঁদের জন্যে চালাঘর বেঁধে দেওয়া আছে, রোজ সিধে পাঠানো হয়, চাল দাল ফলমূল মিষ্টান্ন- সামান্যই নেন তাঁরা, বেশিরভাগই ফেলে যান, সেসব পরে গ্রামের গরিব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়।সেই সাগরেও যাওয়া হয়নি তাঁর। জমিদারির কাজে এমন জড়িয়ে গেছেন, যে বেরোনো শক্ত। তবে সাগরে একটি ভারি খারাপ প্রথা আছে তিনি শুনেছেন। শিশুসন্তান বিসর্জন দেওয়া হয় সাগরের জলে। মায়েরা কী করে এমন করতে পারেন? তাঁর আচমকা  মনে হয়, সত্যিই কি মায়েরা এটা করেন? নাকি তাঁদের মগজ ধোলাই করিয়ে করানো হয়! মেয়েদের মনের কথা কি জানতে চেয়েছে কেউ?
তিনি দেখেন জয়াবতী চেয়ে আছে তাঁর দিকে সোৎসুক চোখে। তিনি বলেন ‘নিশ্চয় ব্যবস্থা করে দেব মা। কিন্তু সমুদ্দুর দেখতে চাইলে আমাদের গঙ্গাসাগর তো কাছেই আছে, সেখানেও একবার যেও।’
(ক্রমশ)

ঝাড়ুমাসির সারপ্রাইজ

মৌসুমী রায়

বাঁই করে একটা পাক খেয়ে ধপ করে মাটিতে পড়লো।পড়লো বললে খানিকটা কম বলা হয়।ঐ যাকে বলে কুমড়ো গড়াগড়ি একেবারে।

         গায়ের ধুলো ফুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেও এখনো ঘোর এখনো কাটেনি। অমন মগডাল থেকে কোনদিন মাটিতে পড়েনিকো! বেয়ে বেয়ে ,ভেসে ভেসে ,ঝুলে ঝুলে এডাল ওডাল করেই, তার বলে, ম্যাক্সিমাম রাত কাটে।মায়ের ভোমাইল ফোনে ঝাড়ুমাসির আলপটকা ইনভিটেশন! খেতে এসে কি চিত্তিরেই না পড়া গেল! সজনে গাছে এর আগে কখনো চাপেনি যে! এখন ঝাড়ুমাসির নতুন স্যামসাঙ বাক্স ফ্ল্যাট এই সজনে গাছের আবডালেই কিনা। মাসি সেইরকমই ঠিকানা খানা দিয়েছিলেন। অগত্যা সজনে গাছে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে এই বিপদ!

         কোনমতে পাক খেয়ে উঠে টলতে টলতে একটা গোল মত কি একটা ,কি যেন রেনপাইপ না ড্রেনপাইপ বলে,সেটা বেয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে কোনমতে ঝাড়ুমাসির ফ্ল্যাটের আউট ইয়ার্ডে গিয়ে ফ্ল্যাট হলো সে। ঝাড়ুমাসির ফ্ল্যাটের গায়ে বড় বড় গোটা গোটা করে লেখা স্যামসাঙ ফর্টিথ্রি ইঞ্চেস সুপার স্মার্ট এল ই ডি টিভি! কি ঝিনচ্যাক্ নাম! 
 

       বাক্স থেকে বেরিয়ে এলেন ঝাড়ুমাসি।ঠিক দুক্কুরবেলা ভোম্বলকে দেখে মাসিও নেচেকুঁদে অস্থির।
"ও মাই গড! কত্ত বড় লেজ হয়েছে তোর, ভোম্বল! আর গায়ে কি ফাইন গন্দো! তুই আমাদের ফ্যামিলির মুক উজ্জ্বল করবি বাপ!"

"উঃ!সবেতেই ঝাড়ুমাসির বাড়াবাড়ি!" বেশ একটু লজ্জামত পাচ্ছে ভোম্বল।

"ওগো,শুনচো! আমাদের ভোমলা এয়েচে।শিগগিরি রায়গিন্নীর ডাইনিং থেকে কাঁটাল আর কটা পাকা পাকা সবরি কলা নে এসো দিকিনি। সকালেই ঝাঁক মেরে দেকে এয়েচি, মক্কিচুষ রায়বুড়ো এই অ্যাত্তো ফলপাকুড় এনেচে।"

    ঝাড়ুমেসোর সামনে গিয়ে লেজ নেড়ে নেড়ে ঝাড়ুমাসি চিৎকার করতে লাগলো। মেসোর মধ্যে অবিশ্যি নড়াচড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে একখানা ইনজিরি পেপার পড়ছেন। ভোম্বল একটু পিছিয়ে গেলো। স্মৃতি কথা বলতে কি, ভোম্বলের ইনজিরিতে বড্ড ভয়।বলতে গেলে এবছর ইনজিরির জন্যেই সে ক্লাসে লাড্ডু খেলো। তারপরে মা কি পিট্টিটা যে দিয়েছেন,ভাবলে এখনো ভোম্বলের পিঠটা টনটন টনটন করে।

"কি হলো! কথাটা কি কানে ঢুকলোনি?"
ঝাড়ুমেসো আচমকা মাসির চিৎকারে চমকে উঠে পেপার থেকে মুখ তুলতেই ভোম্বলকে দেখে খানিক ব্যোমকেই গ্যালেন মনে হচ্ছে।
"ভোম,ভোম, ভোম্বল! কখন এলে? গাছের সকলে ভালো তো? তোমাদের ডাব গাছে এখনো সেরকম ই শক্ত শক্ত ডাব হয়? খোসাটা কি বিচ্ছিরি খেতে।সেই সেবার হানিমুনে তোমাদের গাছে গেছলুম,তোমার ঝাড়ুমাসিকে নিয়ে..."

"থামবে তুমি? ঐ টুকুন বাচ্ছা ছোঁড়াকে তুমি হানিমুনের গপ্পো শোনাচ্ছো!সাধে কি বলি, বুড়ো ভাম একটা"

"আহা চটো কেন ,গিন্নী?তুমি যেন কিসব কলা টলা আনতে বলছিলে"ঝাড়ুমেসো 
ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন,
"বলছি কি গিন্নী, অন্ধকার না হলে তো ডাইনিংএ ঢুকতে পারবোনা। জানোই তো রায়বুড়োর শকুনের চোখ।ঠিক,টের পেয়ে যাবেন। আপাতত ,ভোম্বলকে এই বিস্কুট কটা দাও। এই যে, এই নাও"।পশমের পকেট থেকে চারটি পোস্ট বিস্কুট বার করলেন  ঝাড়ুমেসো।

ঝাড়ুমাসি কটকট করে উঠলেন,
"বিস্কুট দাও! ছেলেটার ঐ কচি কচি দাঁত।তোমার বিস্কুট খেলে আর দেকতে হবেনিকো।বিস্কুট তো নয়,যেন এক একটা থান ইঁট!
খবদ্দার খাবিনে ভোমলা!"
    
       ভোম্বল একটু কনফিউজড হয়ে গেছে। কার কথা শোনে বেচারা?
এরমধ্যেই ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ করে একটা সরু চিৎকার ।যেন স্টেনগান থেকে একটানা গুলি চলছে!
ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ...
মাগো!বুকটা কেমন ধড়াস ধড়াস করছে ভোম্বলের।
ঝাড়ুমাসি শব্দটা শুনে, চোখের পলক ফেলতেই কেমন হাসি হাসি মুখ করে সাঁ করে বাক্সের ভিতরে সেঁধিয়ে গেলো!
কি আছে ঐ বাক্সে?

"ওলে আমার কুঞ্চুনি মুঞ্চুনি গ্যালাটা প্যালাতা ছোনা! ও কুচুমুচু পুচিয়াবুলি!ওলে বাবা গো! তত্ত খিদে পেয়েতে! তাইতো আমাল ছোঙ্কাবুলি এত্ত সুন্দর কোলে ডাতচে আমালে গোওওও..."

ট্র্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা.... চিলচিৎকারে বাক্সফ্ল্যাট ফেটে যাবার উপক্রম হতে, ঝাড়ুমেসো বুলেটের বেগে বাক্সে ড্রাইভ মারলেন। 

       ভোম্বল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। কি করবে সে? আবার বাড়ি ফিরে যাবে নাকি! এই দিনমানে ঝাড়ুমাসির বাড়ি আসাটাই ঝাড় হয়ে গেলো! মা পাঁইপাঁই করে বারন করেছিলেন ,অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে এইসব সারপ্রাইজ নেমতন্নে না আসতে।পাঁইপাঁই করে মানে, ঘোষাল বাড়ির ছাদের রেলিং এ পাঁইপাঁই পাক খেতে খেতে আরকি! ভোম্বল মার পিছনে ছুটতে ছুটতে বায়না করেছিল, 
"যাই না মা। ওমা, যেতে দাও না গো" ঝাড়ুমাসির ঘরে কত ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া হবে ,ভেবেই তার জিভ জড়িয়ে আসছিলো!

   কোথায় কি? এসে থেকে ঐ থান ইঁট বিস্কুটের অফার ছাড়া আর কিছুই জুটলো না যে! তার উপর ঐ স্টেনগানের ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ! সারপ্রাইজ না হাতি! কি বিপদে পড়া গেলো! এই জন্যেই বাংলা মিস বলেন, "সর্বদা পিতা মাতার কথা শুনিবে"। এখন লেজ ছড়িয়ে ভ্যাঁ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ভোম্বলের।

কিন্তু ওকি! ঝাড়ুমাসি আর মেসো মিলে হাসি হাসি মুখে টি টোয়েন্টি ট্রফির মত ওটা কি কোলে করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসছে?

"সুইট সারপ্রাইজ ভোমলা। এই নাও তোমার ওয়ান এন্ড ওনলী সুইট সিস্টার!"
বলেই তুলোর পুঁটুলির মত তুলতুলে বাচ্চাটাকে ঝপ করে ভোম্বলের কোলে বসিয়ে দিলেন।
"মিট ইওর সুইট সিস মিস ভামিকা!"
"ওমা! কি মিষ্টি! কি স্মার্ট নাম!  আমাদের লিটল ভাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এমন স্মার্ট নেম কারো নেই! এই তাহলে তোমাদের সারপ্রাইজ ঝাড়ুমাসি!"
ভোম্বলের মনটা বোনটার মতই নরম হয়ে ওঠে।

"কি মজা,কি মজা! এতদিনে আমার একটা খেলার পার্টনার হলো।" ভোম্বল খুশীতে গদগদ ।

"ইয়েস মাই বয়। এবার তোর মজার শেষ নেই। যখন ইচ্ছে আমাদের স্যামসাঙ ফ্ল্যাটে চলে আসবি।খেলবি ওর সঙ্গে"বললেন ঝাড়ুমেসো।

ওমা এই ফাঁকে ঝাড়ুমাসি কখন রায়গিন্নীর ভাঁড়ার থেকে পাকা পাকা সবরী কলা নিয়ে এসেছে গো!
ভোম্বলের প্রাণে আনন্দ আর ধরেনা।
জয় হোক ঝাড়ুমাসির সারপ্রাইজ নেমন্তের। বাংলা মিস ঠিক ই বলেন গো
"সব ভালো যার শেষ ভালো।"



ছেলেবেলার বৃত্তে 
রঞ্জনা বসু

ভোর আকাশে সূর্য এল, ছড়িয়ে দিতে আলো
বইল বাতাস গাইল পাখি, বলল সবাই জাগো

খেলার মাঠে ফসল ক্ষেতে, ছুটলো যে যার কাজে
খোকা-খুকু মন দিয়েছে নতুন বইয়ের পাঠে। 

উঠোন ধারে আমের গাছে কাঠবিড়ালী বাঁধছে বাসা
রান্নাঘরে মায়ের হাতে খাবার বুঝি হচ্ছে খাসা! 

স্কুলে যাবার সময় হল, তৈরি হওয়া চাই
পড়াশোনা, খেলায় মেতে কত না মজা পাই

এমনি করেই একটা দিন আহ্লাদে আটখানা 
সন্ধ্যা নামে সূর্যদেবের বিদায় নেবার পালা। 

সত্যিকারের জীবন পেতে চলতে হবে নিয়ম মেনে
খুশি খুশি বাজবে বাঁশি সফল হওয়ার উচ্ছাসে।


অজয়ের স্বপ্ন
 অঙ্কিত ঘোষ
নবম শ্রেণী
সুখচর কর্মদক্ষ চন্দ্রচূড় বিদ্যালয়
উত্তর ২৪ পরগণা


রাহুল,আজ ভূগোলের পড়া মুখস্থ করেছিস?
অজয় তোকে আগেও বলেছি আমার পড়া রেডি ,এখন তো মনে হয় তোর পড়া হয়নি,কী তাই তো?...। 
রাহুল বলল,হুম শেষের দিকের একপাতা বাকি ছিল শুধু। 

অজয় ও রাহুল দুই বন্ধু। ক্লাস টেনে পড়ে। পড়াশুনোতে খারাপ না। একই কোচিং এ পড়ে। আজ ভূগোল পরীক্ষা, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। তাই ওদের ম্যাম পরীক্ষা নিচ্ছে।

আচ্ছা রাহুল তুই মায়াবী জিনিস বিশ্বাস করিস, মানে যা একবার দেখলে খুব আকর্ষণ করে?

রাহুল -কেন? কী হয়েছে? 
অজয়- জানিস আজ রাতে মানে ওই ভোরের দিকে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। 
রাহুল - কী?
অজয় - আমি আর তুই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়েছি কলকাতার দিকে। জানি অদ্ভুত,তাও।
আমি কলকাতার বেশি রাস্তা জানি না তার মধ্যে কোন গলি গালার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছি আমরা। সন্ধের দিক তার মধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ও শুরু হয়েছে। হঠাৎ একটা রাস্তায় ঢুকলাম, সেখানে কোনো ইলেকট্রিক বাতি নেই। প্রদীপের আলো, একটা ঘাট ও দেখতে পেলাম সেখানে ঢুকলাম। সারা ঘাট প্রায় অন্ধকার কিছু জায়গায় প্রদীপ মাত্র। প্রথমে খেয়াল করিনি তবে একটু ঘুরে দেখলাম, সামান্য দূরে কিছু অজানা ভাষাভাষী মানুষ যাদের পোশাক পরিচ্ছদ ও আলাদা। কি এক মিষ্টি অজানা সুরে গুনগুন করে গান করে অজানা কোনো দেবতার পূজা করছিল। আমরা প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সমস্ত দৃশ্য গুলো দেখছিলাম। কখন যে ওরা চলে গেছে বুঝতে পারিনি। ঘাটে প্রদীপের হালকা আলোয় আমি আর তুই। সেই গান, সেই লোক গুলো, ঘাটটা,প্রদীপের আলোয় কেমন একটা মায়াবী বশের অনুভূতি হচ্ছিল। তারপর ঘাট থেকে বেরিয়ে আসি। সেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি অবস্থাতেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম আমরা। হঠাৎ কি করে আমি সাইকেল নিয়ে পুকুরে পড়ে গেলাম। এমনিতেই সাঁতার জানিনা তার মধ্যে.....। তুই দাঁড়িয়ে আছিস। আমার গলা অবধি জল, ডুবছি আমি,ডোবার ঠিক এক মুহূর্ত আগে পুকুরের পাশের বাড়িতে জানলায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে হেসে যাচ্ছে দেখে....জলে তলিয়ে গেলাম....।

বাপ্ রে ! অজয় এত কিছু দেখে ফেলেছিস। 
হা.হা.হা.
নারে , রাহুল বড্ড টানছে স্বপ্নটা আমায়। 
রাহুল- ব্যাস্ হয়েছে এবার, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, পড়ায় মন দে। 

ক্লাস টেনের পরীক্ষা টা অজয় আর রাহুল দুজনেই ভালোভাবে দেয়। এখন ছুটি কাটাচ্ছে। ওরা, মাঝে মাঝেই ঘুরে আসে দুজনে সাইকেল নিয়ে। এই যেমন বিকেলে বেরোবে।..

রাহুল- অজয়, তোর কাছে পাঁচ টাকা খুচরো হবে? সাইকেলে হঠাৎ খেয়াল করলাম হাওয়া নেই।
অজয় - হ্যাঁ, নে। 

সামনের জগা জেঠুর সাইকেলের দোকান দিয়ে সাইকেলে হাওয়া ভরিয়ে বেড়িয়ে পরে ওরা।

অজয় - এ রাহুল জানিস আজ ওয়েদার রিপোর্টে বলেছিলো, ঝিরঝিরে বৃষ্টি হতে পারে।

রাহুল - তো! কিছু হবেনা ওতে।

সন্ধ্যা তখন সাতটা হবে,ওরা ফিরবে এবার। রাস্তা দুটো আছে। একটা বড়ো রোড ধরে তবে সেটা বেশ লম্বা হয়ে যাবে, ওরা বোসের পুকুরের পাশ দিয়ে আসবে, সেটা শর্টকাট।

রাহুল - ওই অজয়, রাস্তাটা বড্ড প্যাঁচ প্যাঁচে। যাওয়া যাবে নাকি?

অজয় - কি করা যাবে,নাহলে দেরী হয়ে যাবে তো। মা বলেছিল সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি ঢুকতে। কেননা আজ মিলি পিসিরা আসবে।

রাহুল - ঠিক আছে। আস্তে সাইকেল চালাস, সামনে পুকুরের সরু রাস্তা। 

অজয় - আরে চাপ্ নিস না। কতবার এলাম আর গেলাম।

রাহুল - হুম্, চল।

ছোটো বেলা থেকেই অজয় এ রাস্তা ধরেই স্কুলে যাওয়া আসা করত তাই সরু রাস্তা  বলে ওর বিশেষ অসুবিধা হয়না। অজয় তখন তা রাহুলের কথা শুনে হালকা ব্রেক কষে ধীরে করে নিল সাইকেল।
 এমন সময় কি জানি কি করে হঠাৎ টায়ার পিছলে যায় অজয়ের। রাহুল আরে,আরে বলে চিল্লিয়ে  ওঠে।

অজয় - আরে দাঁড়া উঠছি আমি।

অজয় সাইকেল নিয়ে পুকুরে পড়ে গেছে। তবে বেশি দূরে পড়েনি। লতা গাছটা ধরে উঠলেই সহজে উঠে আসবে। এমন সময় হঠাৎ অজয় কান ফাটানো স্বরে চিৎকার করে ওঠে।

অজয় - ওই রাহুউউল, সে - সেই মেয়েটা...

রাহুল - কোন মেয়ে?

অজয় - আরে স্বপ্নের সেই...

 রাহুল - ধূর, কেউ নেই এখানে, তুই ওঠ তাড়াতাড়ি।

না। অজয় উঠল না, সে তখনো বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে "সেই মেয়েটা আবার হাসছে" হঠাৎ লতাটা ছেড়ে দিল অজয়। রাহুল 'পাগল' বলে চিৎকার করে যাচ্ছে। কিন্তু অজয় উঠল না, নেমে গেল জলে। সে দেখতে পায় মেয়েটা হাসছে, আরো হাসছে, চিৎকার করে হাসছে, হেসেই যাচ্ছে.... তারপর সব শান্ত... রাহুল পাথরের মত দাঁড়িয়ে সমস্তটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যায়। শুধু সেই অজানা গানের সুরটা এখনো শোনা যাচ্ছে........


পাঠপ্রতিক্রিয়া
(জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ১০৮ পড়ে দেবাশীষ দে যা লিখলেন)

মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত জ্বলদর্চি ছোটোবেলা বিশেষ  সংখ্যা ১০৮ পেলাম।সুন্দর সম্পাদকীয়। প্রতিবারের মতোই  তৃষ্ণা বসাকের জয়াবতীর জয় যাত্রা খুব ভালো লাগলো। স্বাগতা ভট্টাচার্য্যর ছুটির মজা পড়ে ফিরে গেলাম নিজের ছোটোবেলায়। বাচ্চাদের কাছে পূজা খুব আনন্দের অবশ্য বড়রাও কিছুতে কম যায় না। প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথের কবিতা বেশ ভালো লাগলো। আফরিন নিগারের ' ভূতের ভয় ' এ ভুত আসার প্রস্তুতি থেকে সত্যিই গা বেশ ছমছম করে, ওই খানে আমরা থাকলেও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। সুন্দর।
শুভঙ্কর সেন ও  দীপেন্দু দেবনাথ এর আঁকা ছবি খুব সুন্দর।
এই সংখ্যা সত্যি খুব ভালো লাগলো।

পেজে লাইক দিন👇



Comments

Trending Posts

কথাকার সন্মাত্রানন্দ-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্বলদর্চি-র পক্ষে মৌসুমী ঘোষ

বাঙালি জীবনে দামোদর ব্রত/বিভাস মণ্ডল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

ষষ্ঠীপূজা / ভাস্করব্রত পতি

বিশ সাল বাদ উদার আকাশ : ফারুক আহমেদ/ খাজিম আহমেদ

ইতু পূজা /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ভীম ঠাকুর /অমর সাহা