তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/ অষ্টাদশ পর্ব /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী

তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী               
অষ্টাদশ পর্ব         
দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


বিলাসখানি টোড়ি 
তানসেনের শেষকৃত্য নিয়ে বেকায়দায় পড়লেন আকবর। তানসেনের শেষকৃত্য নিয়ে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার উপক্রম। এমন সময়ে তানসেনের মেয়ে সরস্বতী বললেন তার মৃত্যুর পর যে এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা তাঁর পিতা ঠিকই আঁচ করেছিলেন। তাই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা নিয়ে তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন বিস্ময়কর নির্দেশ। আর সেই নির্দেশ হল - গান। যে গায়ক তাঁর গানের প্রভাবে তানসেনের মৃত শরীরে সামান্য হলেও প্রাণের সঞ্চার করতে পারবেন, তাঁর ধর্মানুসারেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে আকবরের 'নবরত্নে'র অন্যতম এই 'রত্ন'টির।  

অবাক হলেন আকবর নিজেও। এ অসম্ভব কাজ! গান গেয়ে মৃতের শরীরে প্রাণের সঞ্চার? কখনও সম্ভব নাকি? 

সরস্বতী বললেন "হ্যাঁ জাহাপনা, তা সম্ভব। কারণ তা সম্ভব না হলে বাবা এরকম নির্দেশ দিয়ে যেতেন না। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যেই রয়েছে সেগুলি, দরকার কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা সুরজ্ঞান ও আন্তরিক পরিবেশনা"। 

শেষ পর্যন্ত সরস্বতীর প্রস্তাব আকবর মেনে নিলেন। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাও একমত হলেন এই প্রস্তাবে। দেখাই যাক তানসেনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তা সম্ভব হয় কিনা? তানসেনের মরদেহ বরফে আচ্ছাদিত করা হলো যাতে মৃতদেহে পচন না ধরে।

তারপর শুরু হল সেই রুদ্ধশ্বাস গানের লড়াই।

মৃতসঞ্জীবনী সুরসুধার সন্ধান এক কথায় ছিল অসম্ভব, কারণ তানসেনের পরবর্তী এমন কোন গায়ক সে সময় ছিলেন না তামাম হিন্দুস্থানে যিনি কিনা এমনই ঐশ্বরিক ক্ষমতাধারী, যার সুরের জাদুতে মৃতের শরীরেও প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে পারে।

তবু শুরু হল গান, সম্রাট আকবরের আমন্ত্রণে তামাম দুনিয়ার সেরা ওস্তাদ ও সুরসাধকদের ভীড় হলো গোয়ালিয়রের রাজদরবারে। 

তিনদিন, তিনরাত দেখতে দেখতে অতিক্রান্ত। দিনরাত ধরে পালা করে চলছে ওস্তাদি গান। ওদিকে ফুল, আতর, বরফ আর ঔষধি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে তানসেনের মরদেহ। মনে হচ্ছে যেন পরম নিশ্চিন্তে তিনি ঘুমিয়ে রয়েছেন, এক্ষুনি জেগে উঠে তানপুরার তার বেঁধে রেওয়াজে বসবেন তার গুরু হরিদাস স্বামীর সৃষ্ট 'বৃন্দাবনী সারঙ্গ' রাগে। তিনদিন ধরে সুরের বন্যা বয়ে গেল রাজ দরবারে, অথচ নিস্পন্দ তানসেন।  এত কিছু করেও কি তবে সব আয়োজন ব্যার্থ হতে চলেছে?  সকলেই ভাবতে লাগলেন যে তাহলে কি এত আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে? শুধু আয়োজনেই নয় তানসেনের নির্দেশও তাহলে ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তো কোন সাধারণ গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ঐশ্বরিক সঙ্গীতসাধক। আকবরও এক এক সময় হতাশ হয়ে পড়ছেন।

ভোরের আলো ফুটতে তখনও দেরী, একটু একটু করে সরছে রাতের পর্দা। এমন সময়ে ধীর পায়ে রাজদরবারে এসে দাঁড়ালেন এক দীন ফকির। তিনি বললেন, “আমি একবার চেষ্টা করতে চাই”। চালচূলোহীন সেই ফকিরের কথা শুনে হেসে কুটিপাটি সভাসদরা। তামাম হিন্দুস্তানের নামজাদা ওস্তাদেরা যেখানে কিছু করতে পারলেন না এই ফকির সেখানে কি অলৌকিক ঘটনা দেখাবেন? ফকির কিন্তু অনড়। শেষ চেষ্টা করে দেখতে তিনি যেন মরিয়া। 

তার উজ্জ্বল দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে সায় দিলেন সুর রসিক আকবর। ফকিরকে দেখে স্বরস্বতীর মুখে এক বিদ্যুৎ চমক খেলে গেল। তার মন যেন বলতে লাগলো এঁর সাথে তার জন্ম জন্মান্তরের এক রক্তের সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সেই সাধক যিনি বাবার নির্দেশ সফল করবেন।

তানসেনের পায়ের কাছে বসে ফকির শুরু করলেন তার গান। কি আশ্চর্য! মূহুর্তে যেন পাল্টে গেল গোটা পরিবেশ। অজানা সেই রাগের অপার্থিব সুরের অদ্ভুত সেই মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন সকলে। ভোর বেলার সেই রাগের এমনই মাধুর্য যেন আজকের সকাল এঁর জন্যই অপেক্ষা করে বসে ছিল। এরকম রাগ তো কেউ কখনো শোনেননি। কেউ কখনো ভাবতেও পারেননি গানের এই গায়কীরীতি, কোন স্রষ্টার কাছে তাঁর এই গানের তালিম? কি অপূর্ব সুর মূর্ছনা। সকলেই যেন তাঁর গান শুনে নির্বাক নিষ্পন্দ হয়ে গেছে। এমন সময় দেখা গেল রাজসভায় শায়িত মিঞা তানসেনের শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘামের সঞ্চার হচ্ছে।       

ফকির কিন্তু ভাবলেশহীন, তন্ময় হয়ে গেয়ে চলেছেন। কোন কিছুই যেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন না, শুনতে পাচ্ছেন না। যেন পরম করুনাময় ঈশ্বরের সাধনায় লীন হয়ে গেছে তাঁর সকল সত্তা, বোধ, জাগরণ। এর পরে যখন তিনি একটি অসাধারণ গমক টানলেন তখন সকলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলেন নিস্পন্দ বরফশীতল তানসেনের শরীরের ডান হাতটি কাঁপছে। সকলের দৃষ্টি সেই দিকে নিবদ্ধ। অবাক করার মতো ঘটনা। এরপরে মৃত তানসেনের ডান হাতের তর্জনি সেই গায়কের দিকে যেন নির্দেশ করে কিছু বলছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। এরপরে ডান হাতটি কাঁপতে কাঁপতে বুকের উপরে এসে পড়ল। সব শেষ হয়ে গেল।                

এই দৃশ্য দেখে সকলেই ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। সম্রাট আকবর ও নবরত্ন সভার সদস্যদের একান্ত অনুরোধে সেই ফকির তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি সংগীত সাধক তানসেনেরই কনিষ্ঠ সন্তান, তাঁর নাম বিলাস খান। আসলে অল্প বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে সুফি সাধনায় নিজেকে মগ্ন করে দিয়েছিলেন যার জন্য অন্য সকলের কাছে তিনি ছিলেন অজ্ঞাত। কিন্তু তানসেন এই ঘটনা জানতেন যার জন্যই তিনি হেঁয়ালি করে তাঁর মৃত্যুর পরে সৎকারের ব্যবস্থার নির্দেশ এইভাবে দিয়েছিলেন এবং সমগ্র পৃথিবীকে দেখাতে চেয়েছিলেন তানসেনের মৃত্যুর পরেও তার বংশধরেরা এক একজন সংগীত জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। যে রাগ গেয়ে তিনি মৃত পিতার দেহে প্রাণের সঞ্চার করলেন সেই রাগটি তাঁরই নিজস্ব সৃষ্টি- নাম বিলাসখানি টোড়ি। 


সেদিন দরবার ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বিলাস খানকে নজরানা দিতে চেয়েছিলেন সম্রাট। বিলাস খান জানিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁকেও তাঁর পিতার পাশে স্থান দেয়া হয়। আজও গোয়ালিয়রে পাশাপাশি শুয়ে আছেন পিতা-পুত্র।

তানসেনের মৃত্যুর পরে তাঁর সমাধির উপরে পরবর্তীকালে দেখা গেল একটি তেঁতুল গাছের জন্ম হয়েছে। প্রবাদ এই তেঁতুল গাছের পাতা চিবিয়ে খেয়ে তানসেনের সমাধি স্পর্শ করলে যেকোনো সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের আশীর্বাদে সঙ্গীতে পারদর্শী হবেন। তানসেনের মৃত্যুর এত বছর পরেও হিন্দুস্তানী এমনকি আন্তর্জাতিক সঙ্গীতেও তানসেন এইভাবে বেঁচে আছেন। তানসেন যে কেবলমাত্র ধ্রুপদী রাগের ধ্রুপদী শিল্পী ছিলেন তাই নয় তিনি অনেকগুলি রাগেরও সৃষ্টি করেছিলেন। যেগুলি হলো দরবারী কানাড়া, দরবারী টোড়ি, রাগেশ্বরী, ভৈরবী, সারঙ্গ প্রভৃতি। বহু জটিল রাগকে ভেঙ্গে সহজভাবে গাইবার পদ্ধতি সৃষ্টি করেছিলেন যার জন্য তানসেনকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জনক বলা হয়। এখনো পর্যন্ত প্রতি বৎসর ডিসেম্বর মাসে তানসেনকে স্মরণ করে গোয়ালিয়রে তাঁর সমাধিস্থলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় 'তানসেন সঙ্গীত সমারোহ' অনুষ্ঠান পালিত হয়। তানসেনের পাশাপাশি তাঁর গুরু হরিদাস ও মহম্মদ ঘাউসকেও এই সমারোহে স্মরণ করা হয়। এছাড়াও ভারত সরকার দেশের সর্বোত্তম সঙ্গীতজ্ঞকে এই অনুষ্ঠানে 'তানসেন' সম্মান প্রদান করেন। তানসেন শুধু যে একজন গায়ক ছিলেন তা নন উপরন্তু তিনি একজন কবিও ছিলেন। তিনি বহু গান রচনা করেছেন এবং সেগুলিকে বিভিন্ন সুরে সুর দিয়েছেন। সবশেষে উল্লেখ করছি যে তানসেনের ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে অনেকগুলি সিনেমা আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে এবং ১৯৮০ সালে পাকিস্তানেও একটি টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছে।            

পরিশেষে একটি কথায় শেষ করছি। আবুল ফজল তাঁর 'আকবর নামা'য় কিভাবে লিখেছিলেন যে তানসেনের মৃতদেহ হিন্দু শাস্ত্র মতে সৎকার করা হয়েছিল? এর উত্তর ঐতিহাসিকরাই বলতে পারবেন।         
                                                                   সমাপ্ত

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন