জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো

জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

পর্ব- ৪৮

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা

সূর্যকান্ত মাহাতো


বিকেলটা গড়িয়ে গেলেও একেবারে সন্ধ্যা নামেনি। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা তখনো লাল হয়ে নিভু নিভু করছে। সাইকেল দোকানের বাইরেটাই বেশ একটা জমাটি আড্ডা বসেছে। বললাম, "কেউ বলতে পারবে পৃথিবীর সবথেকে শ্রেষ্ঠ আনন্দ কি থেকে হয়?" কেউ বলল, 'খেয়ে', কেউ বলল, 'ঘুমিয়ে', কেউ বলল, 'খেলা করে', কেউ বলল, 'ত্যাগ ও ভালোবেসে।' এরকম নানান ধরণের উত্তর উঠে আসতে লাগল। আমি কেবলই 'না, না' বলতে লাগলাম। ওরা আরো ধৈর্য হারা হয়ে তখন কেবল জানতে চাইল, 'তবে কি! তবে কি!'

বললাম, "'সমস্যার সমাধান করতে পারা।' সে অংকই হোক আর যে কোন সমস্যাই হোক। সমাধান করতে পারার খুশি বা আনন্দের থেকে বড় খুশি বা আনন্দ আর কিছুতে নেই। যে 'সমস্যা' যত বেশি জটিল তার সমাধান করতে পারাটা তত বেশি তৃপ্তিদায়ক। তাৎক্ষণিক বুদ্ধির প্রয়োগ, আর চিন্তাভাবনাকে নানাভাবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা ও দক্ষতা গড়ে ওঠে একমাত্র সমস্যা সমাধান করলেই। এতে মস্তিষ্কের যেমন ধার বাড়ে, আনন্দও তেমন বাড়ে। একই সঙ্গে বুদ্ধি ও বিনোদনের এরকমই একটি খেলা হল 'ধাঁধা'। সমস্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাধান গুলোকে খুঁজে বের করাই হলো 'ধাঁধা'-র মূল উদ্দেশ্য।

"কাঁচায় লদপদ পাকায় সিঁদুর
যে না বলতে পারে তার বাপ ইঁদুর"

'ধাঁধা' নিয়ে আমি যখন বেশ একটা বক্তৃতা দিচ্ছিলাম ঠিক তখনই এক বন্ধু বেশ আক্রমণাত্মক ঢঙে এই 'ধাঁধা' বলল। উত্তর তো দিতেই হবে। আমার জন্য না হলেও বাবার জন্য অন্তত উত্তরটা পারতেই হবে। তাঁকে তো আর 'ইঁদুর' বানানো যাবে না! এমন অপমানের জবাব দিতে তাই উত্তরটা নানা ভাবে হাতড়াতে লাগলাম। অনেকক্ষণ ভাবার পর বললাম, "কাঁচা মাটির হাঁড়ি বা কাঁচা মাটির কোন পাত্র। কাঁচায় বেশ নড়বড়ে থাকে। পরে আগুনে পোড়ানোর পর বেশ শক্ত ও সিঁদুরের মতো লাল রঙ হয়ে উঠে।"

বন্ধুর ঐ ধাঁধাটি আমাকে একটু আহত করেছিল। তাই আমিও বন্ধুকে একটা পাল্টা 'ধাঁধা' দিয়ে আক্রমণ করলাম।

"পাত চিকচিক ফলটি গ্যাড়া, যে নাই জানে তার গুষ্টি ভেড়া"

এমন যুতসই একটা ধাঁধার জবাব দিতে পেরে নিজেকে বড় তৃপ্তিদায়ক মনে হচ্ছিল। সেই সঙ্গে ভাবলাম, 'ধাঁধা' মানে কেবল বুদ্ধির খেলায় নয়। বুদ্ধি দিয়ে কাউকে জব্দ করতে পারাটাও ধাঁধার একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। যাই হোক, বন্ধু আমার এই ধাঁধাটির উত্তর দিতে পারল না। তাই আমিই উত্তরটা বলে দিলাম, "বুনো "পিঁড়রা" ফল। খুবই ছোট বা বেঁটে(ছোট) ফল। এই গাছের পাতাগুলোও খুব চিকচিক করে। তাই এমন ধাঁধা।"

আমাকে থামিয়ে অন্য এক বন্ধু বলল, "তাহলে আমি একটা ধাঁধা বলি, 'মা বিটিকে গড় করে'---এর উত্তর কী হবে বল?"

"মা বিটিকে গড় করে!" দারুন অবাক হলাম। আসলে ধাঁধার উত্তর বা সমাধান সব সময় সোজাভাবে হয় না জানি। তাই বলে এমন অদ্ভুত! আসলে ধাঁধায় বস্তু বা প্রাণীর বৈশিষ্ট্য ও আচরণ রূপকের আড়ালে নানা ভাবে বলা হয়ে থাকে। এটাও সেরকমই একটি ধাঁধা বলে মনে হচ্ছে। কারণ এমনিতে মা কখনো বিটিকে গড়(প্রণাম) করে না। কিন্তু অনেক ভেবেও উত্তরটা দিতে পারলাম না। বন্ধুই তখন ব্যাখ্যা সহ উত্তরটা বলল। "'ভাতের হাঁড়ি', এবং 'খাপরি'। ভাত হয়ে যাওয়ার পর ফ্যান গড়ানোর সময় 'হাড়ির মুখ' যেভাবে 'খাপরির' উপর নিচু হয়ে থাকে সেটাকেই 'গড়' করা অর্থে এখানে বলা হয়েছে।"

আমাদের আসরে একটু বয়স্ক এক দাদু অনেকক্ষণ ধরেই আমাদের কথাবার্তা শুনছিলেন। এবার তিনি সবাইকে অবাক করে বললেন, "আমি একটা 'জান কহনি' বলছি।"

আমি অবাক! 'জান কহনি' আবার কি! পরে জানা গেল "ধাঁধা" জঙ্গলমহলে 'জান কহনি' নামেও পরিচিত।

দাদু বললেন, "ভক্ত বড় শক্ত পণ্ডিত রইল বস্যে/গাছের ফল গাছেই রইল বঁকটি গেল খস্যে।"

ধাঁধাটি শুনে আমার মনে হল, এ তো কেবল সমস্যাযুক্ত একটা ধাঁধাই নয়। এর মধ্যে অন্ত্যমিল যুক্ত এক কাব্যিক ব্যঞ্জনাও দারুন ভাবে ফুটে উঠেছে। ছন্দোবদ্ধ ধাঁধাগুলো গড়ে ওঠার পিছনে সেই সব মানুষগুলোর কাব্যিক প্রতিভা যে কতখানি ছিল সেটা ভেবেই অবাক হলাম। গভীর জ্ঞান ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে ধাঁধাগুলোতে যে ভাবে রসবোধের  দারুণভাবে উপস্থিতি ঘটেছে সেটা এককথায় অনবদ্য।

এক বন্ধুর উত্তরটা জানা ছিল। সে বলল, "'পাঁজ' বা 'পায়ের ছাপ'। মানুষটি হল 'গাছ' পায়ের পাতা হল 'ফল' আর 'পদচিহ্ন' হল 'বঁক'।" সেই সঙ্গে সেও দাদুকে একটা পাল্টা ধাঁধা বলল,

"আঁচির ডুবল পাঁচির ডুবল, ডুবল বড় বড় মুঢ়া
সরষা ডুবতে জল নাই ডুবল রথের চূড়া"

এ তো খুব ঘোরালো একটা ধাঁধা। সরষে ডুবতে জল নেই অথচ রথের চূড়া কীভাবে ডুবে যাচ্ছে! না। অনেক ভেবে, মাথা খাটিয়েও যখন উত্তরটা পেলাম না তখন বন্ধুই উত্তরটা দিয়ে দিল। উত্তরে বলল, "'কুয়াশা'। কুয়াশায় আঁচির পাঁচির(প্রাচীর) সর্বত্রই ঢাকা পড়ে গেছে। এমনকি রথের চূড়াটাও। এটাকেই ডুবে যাওয়া বলা হয়েছে।"

আর একজন বন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল, ""এক যে আছে মস্ত বড় বীর উয়াকে চোখে দেখতে পাই না।"এই ধাঁধার উত্তর কী হতে পারে?"

কিছু পরেই বন্ধু নিজে থেকেই উত্তরটা দিয়ে দিল। উত্তরে বলল, "'হাওয়া'। কারণ হাওয়াকে আমরা চোখে দেখতে পাই না। অথচ তার অনেক ক্ষমতা। বীরের মতোই।" সেই সঙ্গে আরও একটা ধাঁধা বলে উঠল,

"এক থালা সুপারি, গুনতে লারে ব্যাপারী"

বন্ধুর মুখে এমন ধাঁধা শুনে সকলে হো হো করে হেসে উঠলাম। ধাঁধাটা অত্যন্ত সহজ ছিল বলে। আসলে হাস্যরস সৃষ্টি করাই তো ধাঁধার মুখ্য উদ্দেশ্য। হাসি মজার সঙ্গে বুদ্ধির প্রয়োগ না হলে ধাঁধার উদ্দেশ্যটাই তো মাটি হয়ে যায়। কারণ হাস্যরস ধাঁধার প্রাণ। বন্ধুর ধাঁধার উত্তর সকলেরই জানা ছিল। তাই সহজেই বললাম, "'আকাশের তারা'। এখানে আকাশকে 'থালা' আর তারাকে 'সুপারি'র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।"

বন্ধু বলল, "আমাদের জঙ্গলমহলের 'ধাঁধা' গুলোকে যে কয়েকটা ভাগে বিভক্ত করা যায় তাহল---'প্রকৃতি বিষয়ক', 'গার্হস্থ্য জীবন বিষয়ক', 'তত্ত্ব ও আচার মূলক বিষয়ক', এবং 'গাণিতিক বিষয়ক'। তবে এখানকার একটি বিশেষ গাছ ও তার ফলকে নিয়ে বেশ কয়েকটি ধাঁধা গড়ে উঠেছে। কারণ এ গাছের সঙ্গে এখানকার মানুষ ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত।"

আমি বললাম, "কী সেই গাছ?"

বন্ধু বলল, "উঁহু। নাম বলবো না। বরং ধাঁধাগুলো বলি। ধাঁধা শুনে নামটা বলতে পারিস কিনা দেখি---"

১) গাছটির নাম হিরা তাই ধরেছে গুড়, বাইগন, জিরা
২) উপরে বাসা তলে ডিম
৩) ঢাক ঢোল ভেতর খোল নিংড়ালে পড়ে ঝোল
৪) মা বিটি একেই নাম ডুমকা ছঁড়ার ভিনু নাম

এমন ধাঁধার উত্তর আমরা কেউই পারলাম না। বন্ধু আমাদের অক্ষমতা দেখে মিটমিট করে হাসতে লাগল। তারপর নিজে থেকেই উত্তরগুলো বলে দিল। প্রথমের উত্তরটা বলল, "মহুল, কচড়া ও পরাগ"। এই তিনটির 'গুড়' হল 'মহুল', 'বাইগন' বা বেগুন হল মহুলের ফল 'কচড়া', আর 'জিরা' হল 'ফুলের পরাগ'।পরের দুটো ধাঁধার উত্তর হল "মহুল"। এবং শেষেরটার উত্তর হল একই সঙ্গে মহুলের "গাছ ও ফুল" এবং "কচড়া"। এখানে গাছের নাম হল 'মহুল', এবং ফুলেরও নাম 'মহুল'। এই ধাঁধায় ফুলকে কন্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাই মা বিটির একই নাম। অন্যদিকে 'ফল'-কে ছেলে রূপে মনে করা হয়েছে। তাই তার ভিন্ন নাম 'কচড়া'।"

গাছ নিয়ে বন্ধু আরো একটি ধাঁধা বলল,---"গাছটির নাম লালবিহারী তাই ফলেছে তিন তরকারি।"

উত্তরটা আমি জানতাম। তাই সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলাম "সজনে গাছ"। কারণ এর পাতা, ফুল ও ডাঁটা তিনটেই তরকারি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

দাদু অনেক্ষণ পর বললেন, "গাছের ও ফলের কথা যখন উঠলই  তখন আমিও কয়েকটা 'কহনি' বলি, দেখি উত্তর দিতে পারো কিনা।"

১) উপর থেকে পড়ল ধুম, ধুম বলে আমার পিছন শুঙ
২) কাকা হে কাকা বীজ বাহির ফল পাকা
৩) এতটুকু ডালে কেষ্ট ঠাকুর দুলে

দারুন সব ধাঁধা। হেসে সকলে গড়িয়ে পড়লাম। শুধুমাত্র শেষের উত্তরটা জানতাম, তাই বলে দিলাম, "এর উত্তর হবে 'তেঁতুল।'  গাছে 'তেঁতুল' কেষ্ট ঠাকুরের মতোই ঝুলে থাকে।" বাকি দুটোর উত্তর জানা ছিল না। তাই বলতে পারলাম না। তবে দাদুর মুখে উত্তরগুলো শুনে খুব আফসোস হচ্ছিল। কারণ উত্তর দুটো খুবই সহজ ছিল। যেমন দ্বিতীয়টার উত্তর হল, 'ভেলাই' বা 'কাজুবাদাম'। এই ফলের বীজটি ফলের বাইরে  থাকে। আর প্রথমটির উত্তর শুনে আরো একবার হাসলাম। এর উত্তর ছিল "পাকা তাল"। আসলে পাকা তাল পড়লেই আমরা তালের পিছনের পাকা গন্ধ নিই। তালটা প্রকৃতই পাকা কিনা।সেটা থেকেই এই ধাঁধার জন্ম।

সবজির ক্ষেত থেকেও অনেক ধাঁধার উৎপত্তি ঘটেছে। এক বন্ধু সেরকমই দুটি ধাঁধা শোনাল, " মা ঝাঁপড়ি, বিটি সুন্দরী"এবং আরেকটি হল "এতটুকু ডালে লাল বউটি ঝুলে"।"

আরেক বন্ধু এর উত্তরে বলল, "পাকা 'লাল লঙ্কা'। তাকে ঝাঁপড়ি গাছের সুন্দরী 'বিটি' রূপে কল্পনা করা হয়েছে। আবার পরের ধাঁধাটির উত্তর যে 'পাকা লঙ্কা' তাকেও 'লাল বউ' রূপে মনে করা হয়েছে। তবে আমিও দুটো ধাঁধা শোনাই---"

১) গাইটা রইল বাঁধা চরতে গেল পাঘা
২) ঝাপঝুপা গাছটি তার তলে শাঁকটি
৩) এ হেন মটা ঝাবঝুব্যাটা কাপড়ের তলে থাকে
ছানায় দেখলে মাগে, ঠাকুর পূজায় লাগে।

উত্তরটা অবশ্য বন্ধু নিজেই দিল। উত্তরে বলল, "প্রথমের উত্তরটা হবে লাউ কুমড়োর ফল ও লতা। গাছটা হল গাই, সেটা একজায়গায় স্থির। কিন্তু তার ফল ও লতা গুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এটাকেই 'গাই বাঁধা' ও 'পাঘা চরানো' রূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয়টির উত্তর হল 'মুলা'। উপরটা  শাক পালায় ভর্তি আর নিচেরটা অংশটা হল 'শাঁক'। শেষের উত্তরটা তো বেশ একটা হেঁয়ালির মতো 'জোনার বা ভুট্টা।'"

আমি বললাম, "কতকগুলো জলজ ধাঁধাও আছে। যেমন---" 

১) কেউ হাসে কেউ ভাসে, কেউ কাদায় লটপট
২) তিন শিঙ্গা তিরিং বিঙ্গা পাত বাঙ্গা ফল খাঙ্গা

এই ধাঁধাগুলোর উত্তরও কেউ বলতে পারল না। তাই আমিই বলে দিলাম। প্রথমটির উত্তর শালুকের ফুল, পাতা ও মূল। এখানে শালুক ফুলের সৌন্দর্যকেই হাসা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। শালুকের পাতাগুলো সর্বদাই জলে ভাসে। আর মূল বা শিকড়টি কাদার মধ্যে প্রোথিত তাই লটপট খায়। আর শেষের উত্তরটা হল, কাঁটাযুক্ত 'পানি ফল।'"

অন্য এক বন্ধু শুনে বলল, "শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিয়েও তো কত ধাঁধা আছে। যেমন---"

১) এতটুকু কানি শুকোতে না জানি
২) কাটলে বাঁচে, না কাটলে বাঁচে না
৩) নোয়াতে পারি, ভাঙতে পারি না

শুধুমাত্র শেষের উত্তরটা জানা ছিল বলে বললাম, "'মাথার চুল।' চুলকে নোয়াতে পারি কিন্তু ভাঙতে পারি না।" অন্য দুটির উত্তর জানা নেই তাই বন্ধুর মুখে উত্তরগুলো শুনে অবাক হলাম। প্রথমের উত্তরটা হল 'জিভ'। সর্বদাই লালারসে ভেজা। এবং পরের উত্তরটা হল বাচ্চার 'নাভি কাটা'। কী আশ্চর্য চিন্তাভাবনার গভীরতা থাকলে এমন ধাঁধা তৈরি করা যায়! সেটা ভেবেই অবাক হলাম।

বললাম, "শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেন, আস্ত প্রাণীগুলোকে নিয়েও তো কত রকমের ধাঁধা আছে। যেমন---"

১) আট পা ষোল হাঁটু মাছ ধরতে যায় লাঠু
শুকনা বাঁধে ফেলে জাল মাছ ধরে খায় চিরকাল
২) কুত্থিবল মতন জিনিসটা, ঢেঁকির মতন আহার করে
৩) দুই সতীনের একেই রা, কার বা ডিম কার বা ছা
৪) গাছে ঠ্যাং, জ্বলে পঁদ
৫) ইং চং চং চিড়িং ঠ্যাং চখ গুজগুজ মাথাই নাই
৬) মাঝ পথ'রে কাড়ার লাদ
৭) বার বছরের খাসি, এক কুট্যাই মাস
৮) ডাগুর ডাগুর ডাগুর, বাবা থাকতে বেটার কেনে নেগুড়
৯) ঘসর ঘসর ঘসকা, তিন মুড় দশ পা।

"এই ধাঁধা গুলোর পরপর উত্তর গুলো হল--- ১) মাকড়সা ২) ছারপোকা ৩) চিল ও ঘোড়া ৪) জোনাকি ৫) কাঁকড়া ৬) কচ্ছপ ৭) গেঁড়ি শামুক ৮) ব্যাঙাচি ৯) দুই বলদ ও লাঙল্যা(যিনি লাঙল করেন)।"

বয়স্ক মহিলা তথা 'বুঢ়ী'-র রূপকেও একাধিক ধাঁধার জন্ম হয়েছে। যেমন---
১) একটা বুঢ়ীর দাঁতগাই শুধা
২) একটা বুঢ়ীর আঁতগিলাই শুধা
৩) একটা বুঢ়ীর পিঠে দুধ(স্তন)

এই ধাঁধা গুলোর উত্তরও বেশ তাৎপর্যময়। প্রথমের উত্তরটা হল 'চিরুনি'। চিরুনির দাঁড়গুলো দাঁতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়টির উত্তর হল 'দড়ির খাট'। খাটের দড়িগুলো যেন আঁত বা নাড়ি ভূঁড়ি। শেষেরটার উত্তর হল 'কুলো'। কুলোর পিছনের উপরিভাগের দুই পাশটাকে নারীর স্তনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

আনন্দ বিনোদনের জন্য যে বাদ্যযন্ত্র গুলো এখানকার মানুষ ব্যবহার করে তাদের নিয়েও একাধিক ধাঁধা প্রচলিত। যেমন---
"মামার ছাগল ছুলেই মেমায়" আবার, "বনের লে বাহরাল্য কাড়া/ কাড়া বলে আমার পেটে ঢাড়া।" কি দারুণ চিন্তা ভাবনা! ধাঁধার উত্তর গুলোও দারুণ--- 'মাদল' আর 'ধমসা'।

অসাধারণ ছন্দোবদ্ধ ও অলংকারে সজ্জিত ধাঁধাগুলো একদিকে যেমন চিন্তা ভাবনায় খোরাক যোগায় অন্যদিকে তেমনি বুদ্ধি ও কল্পনার বিকাশে সহায়তা করে। ধাঁধার চর্চা বর্তমানে কোথাও কি একটু হলেও গতি হারাচ্ছে? তবে সেদিন একটি ছোট বাচ্চা হঠাৎ এসে বলল, "কাকু একটি ধাঁধা বলছি, উত্তর দাও  দেখি "এতটুকু পেটটি, খাড়ি খোঁচায় ভত্তি"।" তখন মনে হল না। ধাঁধার চর্চা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। ওর কাছে হার স্বীকার করতেই বেশ উজ্জ্বল মুখে ও উত্তরে বলল, "এত সহজ তাও বলতে পারলে না। উত্তর হবে 'দেশলাই বক্স'।"

তথ্যসূত্র: উল্লিখিত ধাঁধাগুলো বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতোর "ঝাড়খণ্ডের লোকসাহিত্য" গ্রন্থ থেকে গৃহীত।

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Post a Comment

Trending Posts

কথাকার সন্মাত্রানন্দ-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্বলদর্চি-র পক্ষে মৌসুমী ঘোষ

বাঙালি জীবনে দামোদর ব্রত/বিভাস মণ্ডল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

ষষ্ঠীপূজা / ভাস্করব্রত পতি

বিশ সাল বাদ উদার আকাশ : ফারুক আহমেদ/ খাজিম আহমেদ

ইতু পূজা /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ভীম ঠাকুর /অমর সাহা