মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

বিজ্ঞানের অন্তরালে বিজ্ঞানী — ৬৬

এগ্রিকালচারাল রেটুনিং

(মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী)
উপপর্ব — ০১

পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ভূমিকা :

'আমি একদিনও না দেখলাম তারে
বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথায় পড়শি বসত করে
             একঘর পড়শি বসত করে
আমি একদিনও না দেখলাম তারে।'

―একদা বলে গেছিলেন এক আধ্যাত্মিক বাউল কবি। আজ থেকে আনুমানিক প্রায় দেড়শত বছর আগে। তিনি সাধক লালন ফকির (১৭৭৪―১৮৯০)। গোঁড়া জাতি-ধর্ম-বর্ণ'র উর্ধ্বে মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং গভীর দার্শনিক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল আর বাংলাদেশের আকাশে তখন বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। একঝাঁক গুণী কবি-সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক-গল্পকারের ছড়াছড়ি। অথচ লেখাপড়া-না-জানা, স্কুলের গণ্ডি পার না-হওয়া এক গ্রাম্য-বাউলের এ হেন সুগভীর দর্শন আপামর বাংলার মননকে অভূতপূর্ব নাড়া দিয়ে গেল। ছুঁয়ে গেল আট থেকে আশির মনন। আসলে তিনি যেন প্রদীপের শিখার তলায় যেটুকু অমানিশা ছেয়ে থাকে, তার চারপাশে ঢাকা-পড়ে-থাকা এক চিলতে অপদ্রব আলো। অবজ্ঞা আর অবহেলার পঙ্কিল সলিলে আজীবন নিমজ্জিত। সমকালীন সমাজ সংসার থেকে, স্বগ্রাম থেকে আজীবন বিতাড়িত। অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সর্বকালীন সমাজে আজও তিনি বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক তাঁর মনন, দর্শন আর চিন্তন প্রণালী। এবং তাঁর অমর সৃষ্টি।

 আসলে, উপরিল্লিখিত গান তথা কবিতার ছত্রে ছত্রে চাপা রয়েছে অপরিসীম যে ব্যথা-বেদনা-কষ্ট; তার মুক্তি কীসে? কীভাবে মিটবে এই চরম লাঞ্ছনা! অপমান? এ হেন গভীর দার্শনিক ভাবনা-চিন্তায় আচ্ছন্ন ব্যথিত লেখকের কোমল মন। বাড়ির নিকট যে আঁতুরঘর ― আরশিনগর, সেখানে যে-সকল অমূল্য রতন জ্ঞানী মানুষ থাকেন অনাদরে, অবহেলায়; তার খবরাখবর আমরা ক'জন রাখি? এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ আমরা। নির্লিপ্ত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জানবার আগ্রহ। অথচ দূর আকাশে কত চাঁদ ধরতে গিয়েছি। আইনস্টাইন, নিউটন, গ্যালিলিও, ডারউইন, স্টিফেন হকিং, আরও কত কী ভারী ভারী নাম! আলোকবর্ষ দূরের নিহারিকার খোঁজে হন্যে হয়েছে মানুষ। গেঁয়ো যোগী ভিক্ষ পায় না—এই আপ্তবাক্য সত্যি প্রমাণ করে বড় বড় তারাদের পেছনে ছুটতে ব্যস্ত সকলে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো দশা। বুঝতেও পারেনি, হিরে-মণি-মুক্তো খচিত খাঁটি সোনা আপন জন্মভূমিতে লালিত-পালিত। সে-সোনা অন্য কিছু নয়, বরং কতিপয় পরম প্রিয় পড়শি বৈজ্ঞানিক― যাঁদের জগৎজোড়া সুখ্যাতি আর আলমারি ভর্তি পুরস্কারের ডালি। রীতিমতো গর্ব করার মতো বৈজ্ঞানিক অন্বেষা ও এষণা। এবার তাই সুদূর আকাশের চাঁদ ধরতে নয়, অলীক মরিচিকার পিছনে ছুটে বেড়ানো আর নয়; বাড়ির কাছে আরশিনগরে সত্যিকারের রক্ত মাংসে গড়া উজ্জ্বল নক্ষত্র যে ক'ঘর বৈজ্ঞানিক আমার পড়শি, তাঁদের অনুসন্ধানে লেখকের পায়ের নিচে সরষে নড়ে উঠল। তাঁদের অনুপ্রেরণাময় উল্কা গতি আর উত্থানের রোমহর্ষক অথচ রূঢ় বাস্তব গল্প আকর্ষণ করল এক অমোঘ টানে। সে-গল্প শোনাব আজ। প্রিয় পাঠক, চলুন, রওনা হই অখণ্ড মেদিনীপুরে বিজ্ঞানের এক আরশিনগর― ঐতিহাসিক খেজুরী থানা এলাকার কশাড়িয়া গ্রামে। সেখানে একঘর স্বনামধন্য পড়শি বসত করে যে! সে-পড়শি আর কেউ নন, তিনি খেজুরী'র ভূমিপুত্র, মেদিনীপুরের গর্ব, শিক্ষাবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, প্রাক্তন বিধায়ক, খেজুরী কলেজের রূপকার-অধ্যক্ষ, নিরলস বিজ্ঞান-সাধক এবং সমাজ সেবক ও সংস্কারক ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যার। চুরানব্বই বছর বয়স পেরিয়েও চিরতরুণ উজ্জ্বল এক প্রাণ। প্রখর তাঁর স্মৃতি শক্তি। গায়ের লোম খাড়া করে তাঁর অনন্ত জীবন সংগ্রামের রোমহর্ষক বাস্তব দলিল। শতকোটি প্রণাম জানাই মহান এই বিজ্ঞান-তপস্বীর চরণে।

গোড়ার কথা :

সময়টা দারুণ উত্তাল। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের কথা। ইংরেজ শাসনে জেরবার গোটা দেশ। ফিরিঙ্গি অত্যাচার, শোষণে অতিষ্ঠ গোটা বাংলাদেশ তথা অখণ্ড ভারত ভূমি। বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে দেশে। কলরব উঠছে মুক্তি চাই, চাই স্বাধীনতা। স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর যত তীব্র হয়েছে; পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্রিটিশের অত্যাচার, শোষণ, দমন, নিপীড়ন নীতি। এ হেন অত্যাচারে নাভিশ্বাস উঠেছে পল্লীবাংলার খেটে খাওয়া মানুষগুলোর। বাঁচার ন্যূনতম শর্তে তাদের জীবন আর জীবিকা বৈতরণী পার হচ্ছে এমন দুর্বিষহ অবস্থা। দিনকে দিন যে-হারে শাসকের চাহিদা ও শোষণ বেড়ে চলেছে, দেউলিয়া হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। জনরোষের অবশ্যম্ভাবী ফল— বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশের কোণে কোণে। এর ব্যতিক্রম ছিল না বিপ্লবের ধাত্রীভূমি অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার খেজুরী থানা। খেজুরীর স্বাধীনতা সংগ্রামের রোমহর্ষক ইতিহাস তথা ঐতিহাসিক দলিল নামা বেশ সম্পৃক্ত ও সম্ভ্রান্ত। ১৯৪২ সালে পরাধীন ভারতে স্বাধীনতার প্রথম ধ্বজা উড়েছিল খেজুরীতে। তারও অনেক আগে, ইংরেজ আমলে পূর্ব ভারতের প্রথম ডাকঘর স্থাপিত হয়েছিল হলদী নদীর তীরে 'কেডগিরি' নামক জায়গায়। সেটা ১৭৭২ সালের ঘটনা। আনুমানিক পঞ্চাশ বা ষাট ফুট উঁচু ডাকঘরটি। ইঁটের গাঁথুনির ভেতরে হেলিক্সের মতো সাজানো সিঁড়িগুলি সোজা বিল্ডিং-এর উপরে উঠে গেছে। কেডগিরি মূলত বন্দর এলাকা। জাহাজ আসা-যাওয়া করে। ব্যবসা বাণিজ্য চলে।  ১৮৫২ সালে সেখানে গড়ে উঠল কলকাতা-কেডগিরি ভারতীয় তার (টেলিগ্রাফ) ব্যবস্থা আর 'বাউটা'। টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। স্থায়ীত্বের মেয়াদ ছিল মাত্র দু'বছর। এক বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঝড় আর অকল্পনীয় জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় গোটা এলাকা। সেই সঙ্গে ভেসে গেল ডাকঘরের তৎকালীন ইংরেজ পোস্টমাস্টার বোটেল হো সাহেব, তার স্ত্রী মেরি, শিশুপুত্র ইউজিন সমেত বেশ কয়েকজন। একই সঙ্গে বিধ্বস্ত হয় ডাকঘরটিও। তারপর আর চালু হয়নি সেটি। সময়ের করাল স্রোতে একটু একটু খসে পড়ে ইঁটের গাঁথুনি। চুন সুরকির দেয়াল। ছোট থেকে বড় হয় দেওয়ালের ফাটল। গজিয়ে ওঠে নাম না-জানা অজস্র জংলী গাছ। ফাটল আরও তীব্র হয়। জঙ্গলে জঙ্গলে ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ক্ষয়প্রাপ্ত অতীতের সে-ডাকঘর পুরনো করুণ স্মৃতির স্বাক্ষ্য বহন করে চলে। গজিয়ে ওঠা অশ্বত্থ, খেজুর, ঝাউ আর ভগ্নপ্রায় ইঁটের স্তুপের মাঝে আজও দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সেই করুণ ইতিহাস। এর মাঝে অনেক জল বয়ে গেছে হলদী নদী ওরফে কাউখালী নদী (স্থানীয় নাম) গর্ভে। কেডগিরি কবে কখন কীভাবে যে আজকের 'খেজুরী' বনে গেল, তার হিসেব ক'জন রাখে! অথচ, লালচে ইঁটের কঙ্কাল বের হওয়া, চুন সুরকির পলেস্তারা খসা পুরনো সে-ডাকঘর বিদ্রুপের হাসি হেসে মুখ লুকায় অন্ধকারে। তার শরীর থেকে খসে পড়ে ঐতিহাসিক অলংকার; অবলীলায়, অনাদরে। সমুখে হাত পঞ্চাশ দূরে আজও অযত্নে দাঁড়িয়ে রয়েছে 'বাউটা'। চৌকোনা একটি সেমাফোর স্টেশন। বন্দরের অদূরে কাউখালী নদীর মধ্য দিয়ে লঞ্চ, জাহাজ ইত্যাদি সুরক্ষিত যাতায়াতের এক সিগনেলিং ব্যবস্থা। একপাশে থরে থরে সাজানো ভগ্নপ্রায় ইঁটের সিঁড়ি। অপ্রসস্থ সিঁড়ি বেয়ে বাউটা'র ওপর তল কিংবা ছাদে ওঠা যায়। বিস্মৃত হয়েছে অতীত ইতিহাসের সাবেক স্মৃতি।


খেজুরী ব্লকের প্রাচীন সেই ডাকঘর থেকে পশ্চিমে প্রায় কিলোমিটার পাঁচেক পথ। সেখানে রয়েছে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। নাম কশাড়িয়া। গ্রামে একজন মাত্র জমিদারের বাস। বাকি সব কৃষক সম্প্রদায়। চাষ আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কশাড়িয়া গ্রামে এমনই একজন মানুষ ছিলেন প্রহ্লাদ চন্দ্র মণ্ডল। স্বাধীনচেতা মুক্ত মনের একজন মানুষ তিনি। মোটামুটি স্বচ্ছল অবস্থাপন্ন তাঁর ঘর। একজোড়া চাষের বলদ আর চাষযোগ্য ক'বিঘা জমি সম্বল। জায়গা জমি দেখাশুনা করে দিন চলে যায়। চাষ-আবাদ অন্ত প্রাণ। প্রায় প্রতিদিনই সকালে বলদ জোড়া নিয়ে তিনি রওনা হয়ে যান চাষের জমিতে। দুপুর অব্দি চাষাবাদ। দুপুর গড়িয়ে বাড়ি ফিরে দুদণ্ড জিরোবার সময় নেই তাঁর। বিকেলে চষে বেড়ান বিভিন্ন হাটে বাজারে। ছোট্ট একখান মুদির দোকান। ভ্রাম্যমান। তাই নিয়ে এ হাট-সে হাট ঘুরে বেড়ান তিনি। পাশাপাশি এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হাট বসে, বিকেলের দিকে। সোম ও শুক্রবার অজানবাড়ির হাট। শনি-মঙ্গলবার হাট বসে কুঞ্জপুর গ্রামে। চুনপুড়ির হাট বুধ ও রবিবার। প্রতি বৃহস্পতিবার তেখালির হাট বেশ বিখ্যাত। ঘরে প্রহ্লাদবাবুর দুদণ্ড জিরোবার অবকাশ অমিল। ভূষিমাল দোকানের জিনিসপত্র মাথায় নিয়ে হেঁটে হেঁটে ‌রোজ হাটে পৌঁছতে বেশ বেগ পেতে হয়। বিকেলের লালচে আলোয় কেনাবেচা হত। পুরনো খদ্দেরের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা হয়। গ্রাম্য আলাপচারিতায় বিকেলের সময়টা সুন্দর কাটে। সূয্যিমামা কখন যে ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে পশ্চিম আকাশে, তার খবর ক'জন রাখে! গোধূলির সন্ধিক্ষণে কলরব থেমে যায়। গুটি গুটি পায়ে হাট ফেরত লোকজন গ্রামের পথে ফিরে যায় নিজ নিজ বাড়ি। দোকানদার জিনিসপত্রের পসরা গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর বাড়ির পথ ধরে। চাঁদের স্বল্পালোকে বাড়ি ফেরে লোকজন। 

ঘরে ফেরা অব্দি নিস্তার নেই প্রহ্লাদ বাবুর। আদ্যন্ত স্বদেশীয়ানা তাঁর রক্তে। তীব্র অপছন্দ বিদেশি দ্রব্য ব্যবহার। তাঁর পরনে দেশজ খদ্দরের মোটা ধুতি আর পাঞ্জাবি। তাঁর ব্যবহৃত গামছা পর্যন্ত নিজের হাতে বোনা। হাট ফেরত প্রহ্লাদ বাবু রোজ তাঁতের কাপড় বুনতে সিদ্ধহস্ত। গান্ধীজির আহ্বানে দেশে তখন স্বদেশী আন্দোলনের হাওয়া বইছে। বিদেশি দ্রব্য বর্জন, দেশী খদ্দরের কাপড় গ্রহণ— এই ছিল মোটো। আট থেকে আশি প্রত্যেকে নিজের সাধ্যমত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর ব্যতিক্রম ছিলেন না প্রহ্লাদ বাবু। প্রায় সন্ধ্যায় গৃহস্থের নিত্যব্যবহার্য গামছা ধুতি শাড়ি প্রভৃতি বুননে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর সুযোগ্য অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন সাবিত্রীবালা দেবী। সংসারের যাবতীয় কাজ নিজের হাতে সামলান। সাধ্যমত হাত লাগান স্বামীর কাজে। সুখে দুঃখে দুজনের সংসার বৈতরণী পার হচ্ছিল কোনোক্রমে। বাড়ির আরও একজন সদস্যা। তিনি প্রহ্লাদ বাবুর এক বোন। স্বামী মারা যাওয়ার পর এ হেন বিধবা বোনটিকে নিজের কাছে এনে রেখেছিলেন প্রহ্লাদ বাবু। চিরদুঃখিনী বোনটিও বাড়ির কাজে, চাষবাসের কাজে দাদাকে যারপরনাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কসুর করত না।

সময়টা ছিল ১৯২৯ সাল। সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখ। শনিবার। সেদিন খুশির খবর নামল মণ্ডল ঘরে। উষারাত্র থেকে একফোঁটা ঘুম নেই প্রহ্লাদ বাবুর চোখে। দুচোখের পাতা এক হচ্ছে না উত্তেজনায়। অনাগত ভয় মিশ্রিত আনন্দের এক অদ্ভুত মিশেল। শনিবারের সুন্দর সকাল। সূর্যদেবতার প্রথম কিরণে আলোকিত মাটির দালান, খড়ের চাল, মায় সমস্ত খামার। স্নিগ্ধ বাতাস বইছিল। শুভ সংবাদ আগমনের অন্তিম ক্ষণ। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে এক নবজাতকের আকস্মিক কান্নার সুরে আনন্দের হিল্লোল বইছিল মণ্ডল বাড়িতে। সাবিত্রী বালা দেবী এক ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। টুকটুকে ফর্সা গায়ের রঙ। সাক্ষাৎ এক দেবশিশু যেন। বাবা-মা সে-ছেলের নাম রাখলেন রামচন্দ্র। জৈষ্ঠ্য পুত্র। তারপর একে একে আরও এক ছেলে শক্তিপদ এবং তিন মেয়ে কণিকা, রীনা, মিনু ভূমিষ্ঠ হয়েছে পরে। দুই ছেলে আর তিন মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার তখন। ছোট ছোট ভাই-বোনদের আগলে রাখে সবার বড় রাম। দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে গমগম করত বাড়িঘর। এভাবেই দিন কেটে যেত পাঁচ ভাইবোনের।


সুখটান :

শিশু রামের বয়স তখন মাত্র বছর তিন কী চার। খুব ছোটবেলায় তার লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। কশাড়িয়া গ্রামে তখন একটি মাত্র টোল। টোলের গুরুমশাই নীলকন্ঠ নায়েক একজন অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। উদার প্রকৃতির মুক্ত মনের মানুষ। অসীম ধৈর্য্য তাঁর। বেশি বকাবকি করেন না। সযত্নে পাঠ বোঝান একবার, দুবার, বারবার। লেখাপড়ায় ছেলের আগ্রহ দেখে মা সাবিত্রীবালা দেবী শিশু রামকে গুরুমশায়ের কাছে নিয়ে গেলেন টোলে ভর্তি করতে। রাম বেশ মেধাবী। পড়াশুনায় দারুণ মনোযোগ। এদিকে বয়েসও অল্প। অবশ্য বয়েস কম হবার সুবিধাও ষোলআনা। স্নেহময়ী মায়ের কোলে পিঠে চড়ে ধুমধাম সহকারে সে যেমন টোলে পৌঁছত রোজ, তেমনি গুরুমশাই কোলে বসিয়ে আদর যত্ন করে লেখাপড়া শেখান তাকে। গ্রাম্য টোলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ; এক থেকে দশ অব্দি নামতা মুখস্থ বলা রামের কাছে ছিল জলভাত। এক নিমিষে গড়গড় বলে ফেলত সব। সেজন্য গুরুমশায়ের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র বনে যায় সে, অল্প সময়ে। 

এ হেন উদারনৈতিক মুক্ত মনা গুরুর শিক্ষাদানে লেখাপড়ার আনন্দ-দ্বার আচমকাই হাট করে ঘুরে গেল ছোট্ট রামের কাছে। গুরুগৃহের পাঠ সমাপ্ত করে সে ভর্তি হল গ্রামের পাঠশালায়। পাঠশালার একমাত্র মাস্টার মশাই শ্রী নীলমণি মণ্ডল। অত্যন্ত রাশভারী মানুষ। রাগী প্রকৃতির। তাঁর পাঠশালায় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। গ্রামে ঘরে এমনই তাঁর প্রতাপ। প্রভাব প্রতিপত্তি। পড়তে আসা ছেলেমেয়ের দল অজানা ভয়ে সবসময় কাঠ হয়ে স্থির বসে থাকত। কোনও গণ্ডগোল নেই। দুষ্টুমির নাম-গন্ধ হাপিস। চিৎকার নেই। চেঁচামেচি বন্ধ। বিন্দুমাত্র অভাব নেই। অভিযোগ! বালাই ষাট! শুধু পড়া, পড়া আর পড়া। যতক্ষণ ক্লাস চলে, ততক্ষণ শিক্ষার্থীদের থরহরি কম্প দশা। অত্যন্ত কড়া মেজাজের নীলমণি বাবু যখন ক্লাসে ঢুকতেন, তাঁর হাতে থাকত একখানা বেতের ছড়ি। বেতের ভয়ে ছেলেপুলের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। মাস্টার মশাইয়ের সামনে ভালো ভালো ছেলেমেয়েদের থরহরি কম্প দশা হত। গলা জড়িয়ে যায়। কণ্ঠ কেউ যেন ভেতর থেকে আটকে রাখে। শব্দ বের হতে ভয় পায়। বেমালুম গায়েব হয়ে যায় সারা বেলার কষ্টার্জিত পড়া। ব্যস! পেটে নয়, পিঠে পড়ত আস্ত বেতের ঘা। আসলে মাস্টার মশাইয়ের কড়া হুকুম— আগের দিনের হোম ওয়ার্ক সেরে আসা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় অবধারিত শাস্তি মসৃণ বেতের আঘাত। গত দিনের পড়া জিজ্ঞেস করবার সময় মাস্টার মশাইয়ের হাতে বেতখানি সমানে দুলত শিক্ষার্থীর নাকের ডগায়। কনসেন্ট্রেশন চুলোয় যেত। বেত যেদিকে দোলে, সকলের তীক্ষ্ম নজর সেদিকে ধাবিত। এর অবশ্যম্ভাবী ফল জিজ্ঞাস্য প্রশ্নের সঠিক উত্তর মনের ভেতর জমা থাকলেও সহসা বের হত না অজ্ঞাত কারণে। অচিরেই শাস্তির খাড়া নেমে আসত স্টুডেন্টের মাথায়। শাস্তিরও আবার হরেক রকমফের। বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তো জলভাত। একচালা ক্লাস ঘরের বাইরে প্রচণ্ড রৌদ্রে এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিনব কৌশল চালু ছিল। আরও একপ্রকার শাস্তির প্রকোপ বেশি প্রচলিত ছিল। মাথা কোমর অব্দি সমকোণে ভেঙে সামনের দিকে ঝুঁকে ডান হাতের একটি আঙ্গুল দিয়ে মাটি স্পর্শ করে রেখে এবং বাম হাত পিঠের উপর তুলে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ শাস্তি ভোগের নিদান দিতেন মাস্টার মশাই। এ সব আজব কষ্টদায়ক শাস্তির প্রকোপে লেখাপড়ার প্রতি তীব্র ভীতি সঞ্চারিত হত ছাত্র-ছাত্রীর মনে। শাস্তির চোটে অর্ধেকের বেশি স্টুডেন্ট পাঠশালার চৌকাঠ পেরোতে রীতিমত ভয় পেত। পাছে কী কঠিন সাজা অপেক্ষা করছে কে জানে! দীর্ঘ সময় পাঠশালা কামাই করার ফল আরও ভয়ানক! সেও এক লম্বা ফিরিস্তি! বিস্তর ঝক্কি। ক'দিন বাদে হাজির হলেও অনুপস্থিতির সঠিক কারণ দর্শানোর বড় দায়। গুরু মশাইয়ের মনের মত কারণ না দর্শালে পিঠের চামড়া আর আস্ত থাকত না। পেঁদিয়ে বৃন্দাবন পার করে দিতেন পণ্ডিত মশাই।

রামের অবশ্যি সেসবের  ভয় নেই। পড়াশুনা অন্ত প্রাণ তার। ধীর, স্থির, নম্র স্বভাবের ছেলে রাম। অসীম তার ধৈর্য্য। উচ্চ তার কনসেন্ট্রেশন। আকাশ ছোঁয়া তার মেধা। অল্প সময়ে সকল পড়া আয়ত্ত করে ফেলে অনায়াসে। অল্পদিনে নীলমণি মাস্টারের প্রিয় ছাত্র বনে গেল সে। ধন্য ছেলের অধ্যবসায়। পড়া না-পারার জন্য একদিনও শাস্তি ভোগ করতে হয়নি তাকে। তবে বন্ধু ভাগ্যে এক-আধবার শাস্তির খাড়া নেমে এসেছে ওর উপর। একদিনের ঘটনা। ক্লাসের মধ্যে একদল ছেলে তুমুল ঝগড়া বেঁধেছে। থামার লক্ষন নেই। চিৎকার চেঁচামেচিতে গমগম করছে ক্লাসঘর। উচ্চ স্বরে চলছে গালিগালাজ, মারপিট। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। কে কী‌ বলছে, শুনছে না কেউ। সবাই বক্তা, শ্রোতা কেউ নেই। সবারই উচ্চ স্বর। উপযাচক হয়ে রাম গেল গণ্ডগোল থামাতে। সুষ্ঠু মীমাংসা করতে। নাহ! কাকস্য পরিবেদনা। সমাধানের ন্যুনতম সূত্র মিলল না। বরং গণ্ডগোলের খবর গেল নীলমণি মাস্টারের কানে। ব্যস! যা হবার তাই ঘটল। মাস্টার মশাইয়ের কানে ঝগড়ার সংবাদ যাওয়া মাত্র নিমিষে বন্ধ সব মনোমালিন্য, ঝগড়াঝাঁটি, কথা কাটাকাটি। পণ্ডিত মশাইয়ের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির খাড়া নেমে এলো সবার উপর। যে-রাম কখনও শাস্তি ভোগ করেনি, তার ভাগ্যেও শাস্তির শিকে ছিঁড়ল! অকারণে একটি বেত্রাঘাত সহ্য করতে হল তাকে। কী আর করা যাবে? বন্ধুত্বের প্রয়োজনে বন্ধুর জন্য না হয় একবার বেতের ঘা সহ্য করতে হল। সে-ই প্রথম বার, আবার সে-ই শেষবার।


প্রথম আর‌ দ্বিতীয় শ্রেণীর পড়াশোনা আপাতত সমাপ্ত। পরবর্তী লক্ষ্য তৃতীয় শ্রেণীতে অ্যাডমিশন। জালিয়াঘাটায় 'খেজুরী মধ্য ইংরাজী স্কুল' (Khejuri Middle English School বা Khejuri M. E. School)-এর তখন বেশ নামডাক। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা হয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলটির হেডমাস্টার ছিলেন শ্রী চুনীলাল মণ্ডল স্যার। অত্যন্ত রাশভারী মানুষ। তিনি মূলত ইংরেজি টিচার। ইংরেজিতে তুখোড় জ্ঞান। এ হেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে রামকে ভর্তি করে দিলেন বাবা। সেদিন ছিল প্রধানশিক্ষকের ইংলিশ ক্লাস। ক্লাসে ঢুকলে পড়াশুনার শেষ পর্যায়ে কিছু ইংরেজি শব্দ বাড়ির কাজ হিসাবে দেওয়া চুনী লাল স্যারের বরাবরের অভ্যেস। বিগত দিনের হোম ওয়ার্ক ছিল এমনই চারটি শব্দ। Father, Mother, Brother এবং Sister এই ছিল পড়া। প্রতিদিন ক্লাসে এসে সবার প্রথমে আগের দিনের পড়া ধরতেন চুনী মাস্টার। সেদিন ওই চারটি শব্দ বই কিংবা খাতা না-দেখে ক্লাসে বসে লিখতে হবে। মাস্টার মশাই এক এক করে সবার খাতা চেক করবেন। সেদিন হেডমাস্টার ক্লাসে ঢুকলেন মস্ত একখান বেত নিয়ে। ক্লাসে ঢুকে লিখতে দিলেন চারটি শব্দ। তারপর খাতা দেখার পালা। একে একে সবাই খাতা যাচাই করিয়ে নিতে ব্যস্ত। শেষমেশ এল রামের পালা। রামের খাতায় দৃষ্টি পড়তেই মাস্টার মশাইয়ের ভ্রু গেল কুঁচকে। মুখের জিওগ্রাফি গেল পাল্টে। বড় বড় চোখে মুখোমুখি তাকালেন ছাত্রের দিকে। তাকানো দেখেই ছাত্র বুঝল, নির্ঘাত ভুল উত্তর। আসলে Mother ও Brother শব্দ দুটো ঠিক লিখলেও Father এবং Sister শব্দের বানানে ভুল ছিল। এত সহজ ভুল করায় লাগে লাল হয়ে গেল মাস্টার মশাইয়ের গাল। রাগের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হল রূঢ় মাত্রায়। রামের ভাগ্যে জুটল বেত্রাঘাত। সশব্দে। 

 আর একদিনের ঘটনা। স্কুলের পিছনে ছিল মস্ত বড় একটা পুষ্করিণী। তাঁর পাড় জুড়ে ঘন আম বাগান। বাগানটি স্কুলের পেছন দিকে হওয়ায় সচরাচর মাস্টার মশাইদের দৃষ্টিগোচর হত না আম বাগানে কে যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে, কী করছে ইত্যাদি। কয়েকজন ছেলে এর ভরপুর সুবিধা নিল। সবার অলক্ষ্যে চুপিসারে একদিন তারা বাগানে পৌঁছল। কোত্থেকে একখান সিগারেট জোগাড় করেছে কে জানে! প্রত্যেকের লক্ষ্য একবার অন্তত সুখটান দেওয়া। ধূমপানের স্বাদ নেওয়া। বেশ মজার বস্তু এই সিগারেট। সিগারেটে টান মারলেই নাকি মাথা ঝিমঝিম করে, নেশা হয়, আরও কত কী যে শুনেছে তারা; তার ইয়ত্তা নেই। সেজন্য প্রত্যেকের দারুণ কৌতুহল। আজ অভাবিত সুযোগ এসে পড়ায় সবাই প্রচণ্ড খুশি। যাকে বলে রীতিমত উত্তেজিত। সিগারেটে সুখটান দিয়ে বেশ মজা নিচ্ছিল ছেলের দল। এ হেন আমবাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল রাম। রামকে আমবনের পাশ দিয়ে যেতে দেখে একজন হাতছানি দিয়ে ডাক দেয়। সাতপাঁচ না ভেবে রাম ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। সেখানে পৌঁছে ধোঁয়া ওঠা বিষম বস্তুটি চাক্ষুষ করে সে। তাদের নিকটে পৌঁছতে না পৌঁছতেই মস্তান গোছের একটি ছেলে রামকে বলে — নে, একবার টান দে।
কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, জ্বলন্ত সিগারেট রামের হাতে গুঁজে দিল ছেলেটি। বাকিরা সব হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। খুশির আভা রামের চোখেমুখে।
— বাহ! জিনিসটা দেখতে তো বেশ! — বলতে বলতে টান মারল সিগারেটে। ব্যাস, আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে মাথা গেল ঘুরে। সঙ্গে দমফাটা কাশি। কাশির চোটে প্রাণ ওষ্ঠাগত। সেদিন থেকে মনে মনে শপথ করে রাম,
— এ ধরনের নেশার দ্রব্য জীবনে আর কখনও স্পর্শ করব না।
 শৈশবে আওড়ানো শপথ বাক্য অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন সারা জীবন। আজ পর্যন্ত কোনও রকমের মাদক দ্রব্য কিংবা নেশার বস্তু সেবন করেননি তিনি। শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা কখনও কাবু করতে পারেনি তাঁকে। শিশুকাল থেকেই কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ— তফাৎ করতে সিদ্ধহস্ত তিনি। ভালো মন্দের চুলচেরা বিশ্লেষণে তিনি ওস্তাদ। (ক্রমশ...)

 তথ্য সূত্র :
• প্রণম্য বৈজ্ঞানিক ড. রামচন্দ্র মণ্ডল মহাশয়
• শ্রী সুদর্শন সেন বিশিষ্ট শিক্ষক ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক
• 'মনীষী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল' – সম্পাদনা শ্রী জয়দেব মাইতি ও শ্রী সুব্রতকুমার মাঝি

 
পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

কথাকার সন্মাত্রানন্দ-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্বলদর্চি-র পক্ষে মৌসুমী ঘোষ

বাঙালি জীবনে দামোদর ব্রত/বিভাস মণ্ডল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

ষষ্ঠীপূজা / ভাস্করব্রত পতি

বিশ সাল বাদ উদার আকাশ : ফারুক আহমেদ/ খাজিম আহমেদ

ইতু পূজা /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ভীম ঠাকুর /অমর সাহা