বিস্মৃতপ্রায় সাহিত্যিক ইন্দিরা দেবী চৌধুরী
নির্মল বর্মন
"তোকে আমি যেসব চিঠি লিখেছি তাতে আমার
মনের সমস্ত বিচিত্র ভাব সেরকম ব্যক্ত হয়েছে
এমন আমার আর কোন লেখায় হয়নি"
রবীন্দ্রনাথ
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ভাইজি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা এবং স্বনির্বাচিত বর প্রমথ চৌধুরী' র স্ত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরী। ১৮৭৩ সালে ২৯ শে ডিসেম্বর কর্ণাটকের বিজাপুরে জন্মগ্ৰহন করেন। ইন্দিরা দেবী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক হিসেবে নিজস্ব আসন পাক্কা করেছিলেন। ইন্দিরা দেবী ১৮৮১ সালে সিমলার অকল্যান্ড হাউসে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে লরেটো হাউসে পড়াশোনা করে এন্ট্রান্স পাশ করেন। তারপর এফ.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।সংগীতশিল্পী, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক ইন্দিরা দেবী ঠাকুর পরিবারের কন্যাদের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বি.এ পাশ করেন। পড়াশোনায় প্রথম স্থান পাওয়ার জন্য "পদ্মাবতী স্বর্ণপদক" পান। ১৯৬০ সালে ১২ই আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
🍂অনুবাদক ইন্দিরা দেবী রবীন্দ্রনাথ পরিচালিত ও মা জ্ঞানদানন্দিনী সম্পাদিত "বালক" পত্রিকায় "রাস্কিন রচনা" বাংলায় অনুবাদ করে খ্যাতির শীর্ষে অবতীর্ণ হন। পরে ফরাসি ভাষা শিখে "রেনে গ্ৰুসের ভারতবর্ষ" , " পিয়ের লোতির কমল কুমারিকাশ্রম" , " মাদাম লেভির ভারতভ্রমন" অনুবাদ করে সুযশের অধিকারিনী হন।
'সাধনা ' , 'পরিচয় ' , ও 'সবুজপত্র' , 'বামাবোধিনী' , ' ও 'বঙ্গলক্ষী'পত্রিকায় ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অনুবাদ , সংকলন ও মৌলিক রচনা প্রকাশ করেছিলেন।
সংগীতশিল্পী ইন্দিরা দেবী মৌলিক গ্রন্থ গুলি হল ঃ-
" রবীন্দ্র সংগীতের ত্রিবেণী সঙ্গম" ১৯৫৪ , " শ্রুতি স্মৃতি" , "রবীন্দ্র স্মৃতি"-১৯৫৯ । ইন্দিরা দেবী সম্পাদিত গ্রন্থ গুলি হলঃ--
" নারীর উক্তি" ১৯২০ , " বাংলার স্ত্রী আচার"-১৯৫৬ ,"পুরাতনী"-১৯৫৭ , "স্মৃতিকথা" , " গীত পঞ্চশতী" ।
সংগীতশিল্পী ও প্রাবন্ধিক ইন্দিরা দেবী দেশী ও বিদেশী সুরে পিয়ানো ,বেহালা ,সেতার ইত্যাদি যন্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। পাটনার প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত "হিন্দু সংগীত" ইন্দিরা দেবীর সংগীত চিন্তার পরিচয়। "ভানু সিংহের পদাবলী" , "মায়ার খেলা" , "কাল মৃগয়া" ইত্যাদি ও আরো দুশো রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি এবং বর্তমান সময়ে ও সমাজে প্রচলিত প্রকাশিত বহু রবীন্দ্র সংগীত স্বরলিপি তাঁর সম্পাদনায় সম্পাদিত। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় "ভুবনমোহিনী" পদক, ১৯৪৪ প্রদান করেন।১৯৫৬ সালে ইন্দিরা দেবী বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী উপাচার্য নিযুক্ত হয়েছিলেন।১৯৫৭ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় "দেশিকোত্তম" উপাধি দান করেছিলেন। বর্তমান সময় ও সমাজে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাম্মানিক "ডি.লিট" ডিগ্রী প্রদান করে ইন্দিরা দেবী কে সম্মানিত করেছিল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৫৯ সালে রবীন্দ্রভারতী সমিতি প্রথম "রবীন্দ্র" পুরস্কার প্রদান করেন।
উপাচার্য ( অস্থায়ী) ইন্দিরা দেবী প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর রসবোধ , দৃষ্টান্ত চয়নের ক্ষমতা , যুক্তিনিষ্ঠা ও শব্দ ব্যবহারের পারদর্শিতার নিদর্শন হিসেবে "সম্বন্ধ" প্রবন্ধটি'র প্রেক্ষিত কালজয়ী।"সম্বন্ধ" প্রবন্ধটি শুরু কিন্তু গল্পের স্টাইলে। দৃষ্টান্ত---
"আমার কোনো এক পূজনীয় আত্মীয় বলিতেন যে,
মানুষ বিবাহ পূর্বে দ্বিপদ, বিবাহান্তে চতুষ্পদ এবং
সন্তানাদি হইলে ষটপদ হইতে ক্রমশ অষ্টপদ হইয়া
অবশেষে মাকড়সার জালে জড়াইয়া পড়ে।---এক এক সময়ে আমার মনে হয় এই মাকড়সার সঙ্গে মানুষের অনেক মিল আছে। আমরা সকলে তেমনি 'আপনি রচিত জালে আপনি জড়িত', তেমনি সংসারবৃক্ষে সুখদুঃখের ছায়ালোককে দোদুল্যমান তেমনি অদ্ভুত অধ্যাবসায় ও নিপুণতার সহিত এই ক্ষণভঙ্গুর জীবনজাল বুনিতে ব্যস্ত"।
ডি.লিট ডিগ্ৰী প্রাপ্ত ইন্দিরা দেবী স্ত্রী ও পুরুষের তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রবন্ধে লিখেছেন--
"স্ত্রীলোক ও পুরুষের দেবদত্ত অনৈকের মধ্যে এই একটি প্রধান যে, স্ত্রীলোক নিকটের সঙ্গে এবং পুরুষ দূরের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করিতে সম্ভবত পটু। কারণ পুরুষ সৃষ্টিকর্তা, রক্ষা কর্তা। যিনি রক্ষক তিনি গচ্ছিত দ্রব্য হইতে বেশি দূরে গেলে চলে না। গৃহ এবং সমাজই নারীর নিকট গচ্ছিত সেই ধন , সুতরাং নারীর তাহাই লইয়া পড়িয়া আছে ও পাহারা দিতেছে"।
অনুবাদক ইন্দিরা দেবী নিজে নারী হয়ে নারীর শক্তিরূপিণী, ঘুর্ণমানা,দশভূজে কর্মনিরতা রূপ আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। নারী পরের সুখে সুখী ও পরের দুখে দুঃখী হবার সততই উন্মুখ ও প্রস্তুত ইন্দিরা দেবী উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। "নারী অন্নের ভিখারী ,প্রেমের ভিখারী ,জ্ঞানের ভিখারী" ভাবনা উপস্থাপন নৈপুণ্য আস্বাদনীয় হতে পারে বিদুষী ইন্দিরা দেবী তা প্রমাণ করে ছেড়েছেন।
0 Comments