জ্বলদর্চি

গুচ্ছকবিতা /কমলিকা ভট্টাচার্য

গুচ্ছকবিতা 
কমলিকা ভট্টাচার্য


জল হতে চাই

আমাকে চাঁদ বলো না,
চাঁদের আলো যেমন দূরে থেকে ঝরে,
স্পর্শের অধিকার দেয় না কারোকে।

আমাকে জ্যোৎস্না বলো না,
সৌন্দর্য যতই দ্যুতিময় হোক,
একটু কালো মেঘে ঢেকে যায় সহজেই।

আমাকে আগুন বলো না,
অহংকারে নিজেকেই ভস্ম করে দেয় সে।

আমি হতে চাই জল!

জলের নেই কোনো নিজস্ব রং,
তবু সে আঁকে আকাশের নীল,
মেঘের ধূসর, শালের সবুজ,
প্রতিটি মুখের ক্লান্ত প্রতিচ্ছবি।

জলের নেই কোনো নিজস্ব স্বাদ,
তবু সে শুষে নেয় লবণ,
মিশে যায় অশ্রুতে,
অথবা লুকিয়ে রাখে বিষের আঁধার।

জলের নেই কোনো নিজস্ব আকার,
তবু সে গড়ে তোলে নদী, সাগর, হ্রদ,
অথবা কারো হাতের কাপ ভরে দেয় নিঃশব্দে।

আমি চাই, আমাতে তুমি নিজেকে দেখো
তোমার সত্যিকারের মুখ,
যেখানে অহংকার গলে যায়,
আত্মমর্যাদার ধার হয়ে ওঠে মৃদু ঢেউ।

আমাকে চাইবার জন্য কারো কাছে যুক্তি লাগে না,
যেমন তৃষ্ণা এলে সব দার্শনিকতা ভেসে যায়
এক ফোঁটা জলের সামনে।


সম্পর্কের নকশাসিঁড়ি 

প্রথমে কেবল ছিল হাওয়ার মতো হালকা অভিবাদন,
অচেনা ভিড়ে তোমাকে দেখতাম, অথচ মনে থাকত না মুখ।
হয়তো কিছু শব্দ ছিটকে পড়েছিল নিঃশব্দ বাতাসে,
তাদের কোনো অভিধান ছিল না তখন,
শুধু উড়ন্ত ধুলোকণার মতো,
দূরের স্রোতের মতো,
যা ছুঁয়ে যায় অথচ ছাপ রেখে যায় না।

তারপর অদৃশ্য কোনো জলরঙ মিশতে শুরু করল,
কথার পাশে ভেসে উঠল হাসি,
হাসির পাশে জমল একফোঁটা নীরবতা।
অলক্ষ্যে সেই নীরবতাই হয়ে উঠল শেকড়,
শেকড় থেকে জন্ম নিল অদ্ভুত এক শ্বাস,
যার গন্ধ আমরা চিনিনি,
তবু তারই ভিতর বসবাস শুরু করলাম অজান্তে।

কে জানে কবে হাতছোঁয়ার প্রয়োজন হলো,
কবে চোখে চোখ রাখা অভ্যাসে পরিণত হলো,
আমরা দু’জনই খেয়াল করিনি।
মনে হলো এ শুধু গতকালকের ঘটনার মতো,
কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখি
পথের প্রতিটি ধাপে জমেছে অচিন্তনীয় নকশা।

আজ তাই আর প্রশ্ন করি না
“কেন তুমি”,
“কীভাবে আমরা”
কারণ উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
ভালোবাসা নিজেই তার জন্মদাতা,
আমরা শুধু তার ছায়ায় দাঁড়ানো দুইটি বৃক্ষ,
যাদের ডালপালা অদৃশ্য কোনো ঋতুর ছোঁয়ায়
মিশে গেছে একাকার।


ডিজিটাল পদ্ম

আজও আস্থা আছে মানুষের উপর,
জানি, এখন তা ভুলে যাওয়া কোনো কোড,
তবু শুধু এক আপডেট,
সিস্টেম ভেঙে পড়লেও আবার চালু হয়,
কারণ আস্থার ডেটাই জীবনকে রাখে অনলাইনে।

যদি এক মুহূর্তেই
শহরের নিয়ন আলো নিভে যায় হঠাৎ,
বিশ্বাসের হয় লোডশেডিং,
অথবা কেটে যায় তার,
যেমন টানেলের ভেতর হারিয়ে যায় মোবাইল সিগন্যাল।

অবিশ্বাসের জন্ম বড় ভয়ংকর,
সে ঢুকে পড়ে শিরায়,
ব্যক্তির বুক থেকে ছড়িয়ে দেয় বিষ,
ধীরে ধীরে জ্যাম করে ফেলে পুরো সমাজের ট্রাফিক।

অবিশ্বাসে জন্ম নেয় ফাঁকা ফ্লাইওভার,
যার নিচে জমে থাকে অচেনা অন্ধকার,
ভেঙে যায় কথার ব্রডব্যান্ড,
মানুষ দাঁড়ায় রেড সিগন্যালের মতো থেমে,
ভেতরে ভেতরেই কখন অজান্তে অফলাইন।

তবু আমি চাই
এক মুঠো বিশ্বাসের আলো,
যেমন মেট্রো টানেলের শেষে জ্বলে ওঠা নীল দিশা,
যা শিখিয়ে দেয়,
মানুষের উপর আস্থা হারালে
মানুষ নিজের ভিতরেই লগ আউট।

তাইতো কবি আজও লেখে কবিতা,
যদি কারো মনে দাগ কেটে যায় বিশ্বাস,
বিবেকের বিজ্ঞাপনী কোলাজের পাতাতেও
হঠাৎ ফোটে সত্যের ডিজিটাল পদ্ম।

🍂


ভালোবাসি

ভালোবাসি ,
শব্দটি যেন অদৃশ্য এক প্রশ্নপত্র,
যেখানে নেই কোনো নির্দিষ্ট উত্তর
কে, কী, কেন?
সব ভাষা গলে যায় নীরবতায়,
থাকে কেবল ব্যক্তিগত অনুভবের কুয়াশা।

তবু সময়ের হাত ধরে
জুড়ে গেছে কিছু অনাহূত আবেগ,
শরীরে মিশে গেছে লজ্জার ছায়া,
মনে ঢুকে পড়েছে ভয়ের নীল রাত্রি,
অজানা এক গোপনতার তালা।

কোথায় হারাল সেই নির্মল চাওয়া,
যে ভালোবাসা একদিন ছিল অমলিন,
যেন সকালের শিশিরে ভেজা পাপড়ি?
আজ সে ভালোবাসা দাঁড়িয়ে থাকে
টাকা, গাড়ি, বাড়ির তালিকার পাশে,
অমূল্য নয়,
বরং এক জীর্ণ সম্পদ,
দৈনন্দিন হিসেবের খাতায়
কম দরে বিকে যায়।


অর্ধেক কবিতা 

কলমের মুখে আজ আর শব্দ নেই,
তোমার নামের আদরে
সব রঙ গলে যায়।

তোমার কিছুনা বলা হাসি,
আলোয় ভেজা এক চুম্বন,
যা ছুঁয়ে দিলে
আমার সমস্ত বাক্য ভিজে ওঠে।

উড়ে যাওয়া আঁচলে
আমি খুঁজে পাই রাতের গোপন সুবাস,
যেখানে ঝরা পাতার ফাঁকে
তোমার আঙুল খেলে যায় আমার ত্বকে।

প্রজাপতির কাছে আমি ডানা চাইনি আজ,
কারণ জানি
আমার একমাত্র উড়ান
তোমার বুকে শুয়ে থাকা,
তোমার নিশ্বাসের উষ্ণতায়
গলে যাওয়া
আর তোমার ঠোঁটের কাছে থাকুক আমার
অর্ধেক বলা কবিতা।

শব্দেরা আজ লুকোচুরি খেলছে,
তারা শুধু চায়
তোমার শরীরের বর্ণমালা ছুঁতে ছুঁতে
আমার কবিতার শেষ লাইন
তোমার ভিতরেই থেমে যাক।


আনন্দ স্নান

তোমার সেই জমা সব অনুভূতিগুলো
আজ না হয় ঢেলে দাও আমার উপর,
তোমার কষ্টের গ্লেসিয়ার গলে আমি
নদী হয়ে যাই,
তোমার আবেগকে ভাসিয়ে নিয়ে যাব দূর মোহনায়—
মিলিয়ে দেব
বিশালের সীমাহীন ব্যাপ্তিতে,
যেখানে বিন্দুর মত তোমার কষ্ট তুচ্ছ হয়ে
অজস্র বিন্দুতে মিলে ঢেউ হয়ে যাবে।

আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে
শুধু তোমার আনন্দ-স্নান দেখব।

Post a Comment

7 Comments

  1. কবি কমলিকা ভট্টাচার্যর কবিতা ভালো লাগল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 07, 2025

      ধন্যবাদ

      Delete
  2. ভাস্কর সেনSeptember 07, 2025

    নিপাট ভালবাসার কবিতাগুলি পড়ে অসম্ভব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 07, 2025

      ধন্যবাদ

      Delete
    2. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 07, 2025

      ধন্যবাদ

      Delete
  3. সব কবিতাই ভালোবাসার গভীরতায় লীন। ভালো লাগল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 07, 2025

      ধন্যবাদ

      Delete