কোজাগরী রাত
কমলিকা ভট্টাচার্য
গাড়ি সিগন্যালে থামতেই, বাচ্চা কোলে এক মহিলা এগিয়ে এলো। জানালায় টোকা পড়তেই ফোন থেকে মুখ তুলে তাকালাম। চোখাচোখি হলো আমাদের।
তার দৃষ্টিতে অনুনয়ের চেয়ে দাবিটাই যেন বেশি। হাতে ইশারা করে বাচ্চাটাকে দেখিয়ে সে টাকা চাইলো। প্রতিবার এমন দৃশ্য দেখলে আমার মনে এক প্রশ্ন জেগে ওঠে—
তারা কেন সাইন ভাষা ব্যবহার করে?
এটা কি আমাদের হৃদয়ের দরজায় নাড়া দেওয়ার এক উপায়, নাকি বোঝানোর চেষ্টা—আমরা সমাজ হিসেবে কতটা বধির হয়ে গেছি তাদের আর্তির সামনে?
ব্যাগ হাতড়াতে লাগলাম কিছু খুচরো টাকা খোঁজার জন্য। কিন্তু আজকাল সব কিছুই ডিজিটাল—GPay, PhonePe—ফলে ব্যাগে টাকার রিনরিন শব্দ শোনা যায় না। মনে হলো, হয়তো একদিন ভিক্ষুকদের হাতেও থাকবে আধুনিক পেমেন্টের বারকোড। সময়ের সঙ্গে সব বদলায়, কিন্তু যতদিন মানুষের ভিতরে করুণা থাকবে, ততদিন ভিক্ষা নামের এই সম্পর্কটাও টিকে থাকবে—দাতা ও গ্রহীতার মধ্যেকার সেই অনন্ত নৈঃশব্দ্যে।
🍂
ঠিক তখনই আবার জানালায় টোকা পড়ল।
শিশুটি মায়ের বুক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অস্থির।
পাশের বাইক থেকে এক হেলমেটধারী চোখের জোড়া তার ছেঁড়া কামিজের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা যৌবনকে গিলে খেতে চাইছে। সেই দৃষ্টির ক্রূরতা আমার শরীর জুড়ে ঠান্ডা কাঁপুনি ধরাল।
আমি কাঁচ খুলে কিছু টাকা দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু সিগন্যালে সবুজ আলো জ্বলে উঠল।
পেছন থেকে হর্ন বাজতে লাগল একটানা—যেন দৌড় শুরু হয়েছে, দাঁড়ালে হার নিশ্চিত।
গাড়ি চালাতে বাধ্য হলাম।
তবু একবার পিছন ফিরে তাকালাম—
মেয়েটির চোখ থেকে যেন তীরের মতো ছুটে আসছিল হাজারো প্রশ্ন, এক অভিশাপের নীরব শিখা।
সেই চোখের দৃষ্টি বহুদিন আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।
পরের দিন থেকে প্রতিদিন অফিস যাওয়ার পথে সেই সিগন্যালে তাকিয়েছি, কিন্তু আর কখনও তাকে দেখিনি।
সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমার রাত।
লক্ষ্মীপুজোর পর ছেলেকে হোস্টেলে নামিয়ে স্বামীর সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলাম।
চাঁদের আলোয় শহর তখন সোনালি, কিন্তু সেই জ্যোৎস্নার নিচে লুকিয়ে ছিল ক্লান্ত অন্ধকার।
আমার স্বামী বললেন, একটু নামতে হবে ওকে,কিছু জিনিস কেনার আছে।
তিনি গাড়ি পার্ক করে দোকানে গেলেন। সারাদিনের ধকলে ক্লান্ত আমি গাড়িতেই বসে আকাশ দেখছিলাম।
হঠাৎ রাস্তার আলোয় চোখে পড়ল—একটি মেয়ে।
আধুনিক পোশাক, মেকআপ, চুলে ঝলমলে ক্লিপ—সবই ছিল ঠিকঠাক, কিন্তু সাজের মধ্যে একটা অদ্ভুত অসঙ্গতি, এক শূন্যতা।
সে ব্যাগ থেকে ফোন বের করল। মোবাইলের আলোয় তার মুখ স্পষ্ট হলো—
আমি চমকে উঠলাম।
সেই মুখ। সেই চোখ।
ততক্ষণে পাশের লরি থেকে ড্রাইভার নেমে এসে তার সঙ্গে কথা বলছে।
কিছুক্ষণ পর দু’জন মিলে অন্ধকারের দিকে চলে গেল—পোলের পিছনে, যেখানে আলো পৌঁছায় না।
আমি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
সেই মুহূর্তে বুঝলাম—
সেদিন সিগন্যালে তার চোখে যে অভিশাপ দেখেছিলাম, তা আসলে আমার জন্য ছিল না।
সেটা ছিল এই সমাজের জন্য—যে সমাজ করুণা দেয়, কিন্তু সুযোগ কেড়ে নেয়।
যে সমাজ করতালি দেয় “নারীশক্তি” শব্দে, কিন্তু রাস্তার আলোয় প্রতিদিন এক মেয়েকে ঠেলে দেয় অন্ধকারের কোলে।
সত্যিই, জীবনের কত দিক আমরা দেখি না।
আমরা শিখি কেবল আলোয় বাঁচতে, অথচ ভুলে যাই—
পূর্ণিমার আলোও ছায়া ফেলে।
সেদিন কোজাগরী রাত ছিল—
সবাই বলে, “মা লক্ষ্মী ঘুরে বেড়ান।”
আর আমি দেখেছিলাম—
1 Comments
সাধারণ লেখনি দিদিভাই
ReplyDelete