মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৮৪
মুরারীচরণ দিণ্ডা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, ঘাটাল)
ভাস্করব্রত পতি
পূর্তমন্ত্রী ভূপতি মজুমদার (প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এবং বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রী সভায় মন্ত্রী ছিলেন) একবার এসেছিলেন ঘাটালের দাসপুর থানার রবিদাসপুরের বিখ্যাত দিণ্ডা পরিবারে। প্রথমে কোলাঘাট থেকে নৌকায় চেপে আড়খানা হয়ে তিওরবেড়িয়া আসতে হয়। এরপর সেখান থেকে পালকিতে চেপে সোজা দিণ্ডা বাড়ি। মন্ত্রীকে যথাযোগ্য আপ্যায়ন করা হয় সেখানে। দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের পর কোনও যানবাহন ছাড়াই ঐ রবিদাসপুর গ্রাম থেকে বাড়ির মালিক মুরারীচরণ দিণ্ডা খোসগল্প করতে করতে মন্ত্রী মহোদয়কে পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে চললেন পাঁশকুড়া রেলস্টেশন পর্যন্ত। অচিরেই মন্ত্রী মহোদয় বুঝতে পেরেছিলেন এই পন্থা অবলম্বনের অভিপ্রায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঘাটাল পাঁশকুড়া রাজ্য সড়ক তৈরির কাজে হাত দিলেন। সুরাহা পেল এতদঞ্চলের মানুষ। এই কাহিনি আজও লোকমুখে ফেরে।
সেই বিপ্লবী মুরারীচরণ দিণ্ডা ছিলেন ঘাটালের ঐতিহাসিক চেঁচুয়াহাটের ঘটনায় কুখ্যাত ভোলা দারোগা ও এস.আই অনিরুদ্ধ সামন্তের হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রী। একজন বলীষ্ঠ ক্ষুরধার বিপ্লবী। ঘাটালের দাসপুর থানার রবিদাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত সজ্জন এবং শিক্ষিত। পরিবারের মধ্যে ছিল দেশপ্রেমের স্রোতধারা। বাবা বসন্তকুমার দিণ্ডার আদর্শে বলীয়ান মুরারিমোহন দিণ্ডা।
১৯৩০ সালে গান্ধীজির লবণ আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বানে সারা মেদিনীপুর জেলার মতো দাসপুরের শ্যামগঞ্জেও লবণ উৎপাদন শুরু করেন এখানকার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। মুরারীচরণ দিণ্ডা ও অন্যান্যদের নেতৃত্বে রূপনারায়ণ তীরবর্তী শ্যামগঞ্জে এবং কাঁসাই তীরবর্তী চেঁচুয়াহাটে গড়ে উঠে লবণ সত্যাগ্রহ কেন্দ্র। সেই লবণ আইন অমান্য আন্দোলন ১৯৩০ এর এপ্রিলে সারা এলাকায় তীব্রতর হয়ে উঠে।
সেসময় এখানকার তেমুয়ানি ঘাট, নন্দনপুর, চক কিশোর, সোনাখালি, শ্যামগঞ্জ এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে তীব্রভাবে। নেতৃত্বে ছিলেন মুরারীচরণ দিণ্ডা, পুষ্প চ্যাটার্জী, কিশোরী মাল, জীবনকৃষ্ণ মাইতি, জানকীরঞ্জন রাজপণ্ডিত, মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কানন গোস্বামী, বিনোদ সামন্ত প্রমুখ সত্যাগ্রহীরা। সেসময় তাঁদের তৈরি লবন বিক্রি করা সহ বিদেশী দ্রব্যের বর্জন ও স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার করার কাজে চেঁচুয়াহাটকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা।
গবেষক দুর্গাপদ ঘাঁটি লিখেছেন, "মৃগেন্দ্রনাথ চেঁচুয়াহাট সংলগ্ন বাসিন্দা হওয়ায় চেঁচুয়াহাট ও তার সংলগ্ন এলাকা ছিল তাঁর নখদর্পণে। তাই তাঁর উপর দায়িত্ব ছিল এই এলাকায় ব্রিটিশ পুলিশের গতিবিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে খবর আদান প্রদানের কাজ। যেহেতু প্রাচীন চেঁচুয়াহাট ছিল দাসপুর থানার সংস্কৃতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রাণকেন্দ্র সেইহেতু দাসপুর থানার অন্যান্য অঞ্চলের থেকে এই চেঁচুয়াহাটের উপর নজরদারী ছিল বেশি। এলাকায় কয়েকজন বিত্তশালী ব্যক্তি অধিক মুনাফা লাভের জন্য দেশের স্বার্থ না ভেবে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চেঁচুয়ার হাটকে বিদেশি দ্রব্য বিক্রয়ের উন্মুক্ত প্রান্তর করেছিলেন। তাই এই চেঁচুয়াহাটই স্বদেশীদের আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল হয়েছিল। মৃগেন্দ্রনাথ ছিলেন চেঁচুয়াহাটের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রণী মুখ। তিনি চেঁচুয়াহাটকে পাখির চোখ করে ২৪ ঘণ্টা নজর রাখতেন। এখানকার সকল খবরাখবর স্বদেশীদের গোপনে প্রদান করতেন।"
ঘটনায় প্রকাশ, ৩ জুন তারিখে চেঁচুয়াহাটে লবন উৎপাদনকারীরা পিকেটিং করার সময় থানার বড় দারোগা ভোলানাথ ঘোষ এবং সেকেন্ড দারোগা অনিরুদ্ধ সামন্ত সেখানে আসেন। পিকেটিং বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁরা রাজি হননি। তখন দারোগা কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে ঐ লবন সত্যাগ্রহীদের উপর বেধড়ক লাঠিচার্জ করেন। অনেকে অচৈতন্য হয়ে পড়েন। তাঁদের গায়ে মল মূত্র ত্যাগের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও সেদিন ঘটে। স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দাসপুরের চেঁচুয়াহাটে পিকেটিংয়ের সময় এখানকার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রণী মুখ বিপ্লবী মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে দারোগা ভোলানাথ ঘোষের কথা কাটাকাটি হয়। উন্মত্ত এবং উত্তেজিত জনতা তখন ঐ অত্যাচারী বড় দারোগাকে ভোলানাথ ঘোষকে সেখানেই পিটিয়ে হত্যা করে। রাতের অন্ধকারে ডোমনার ঘাটে পুড়িয়ে ফেলা হয় ভোলা দারোগার দেহ। আর ছোট দারোগাকে পাল্কিতে করে নিয়ে যাওয়া হয় ঘাটালের দাসপুর থানার চকবোয়ালিয়ার মাঠে চিৎমল্লিকা পুকুরের দক্ষিণপাড়ে। সেখানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। কথিত আছে, মুরারীচরণ দিণ্ডাই প্রথম অনিরুদ্ধ সামন্তের গলায় কুঠারাঘাত করেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এস আই। এরপর সেই চিৎমল্লিকা পুকুরের জলে তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দেয় উন্মত্ত জনতা। পুলিশ মৃত দুজনের কারোরই দেহাংশ খুঁজে পায়নি পরবর্তীতে। অত্যাচারী দারোগার প্রতি মানুষের সমবেত ঘৃণা এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল।
চেঁচুয়াহাটের শহীদ মঞ্চ
জেলাশাসক পেডির নির্দেশে পরের দিন ৪ ঠা জুন দলবল নিয়ে চেঁচুয়াহাটে হাজির হয় এডিএম আবদুল করিম এবং দারোগা ইয়ার মহম্মদ। বিশাল পুলিশ বাহিনী পৌঁছায়। তাঁরা জনগণের উপর পৈশাচিক অত্যাচার করতে শুরু করে। শুরু হয় ধরপাকড়। এই পুলিশী অত্যাচারের প্রতিবাদে ৬ জুন চেঁচুয়াহাট এলাকায় বিশাল জনতা জড়ো হয়। সেদিনটি ছিল দশহরা। পুলিশী অত্যাচার বন্ধের দাবিতে মানুষজন পুলিশের কাছে আবেদন জানালেও কোনও সুরাহা হয়নি। বিকেলে বিভিন্ন দিক থেকে প্রচুর মানুষের মিছিল শুরু হয়। মুরারীচরণ দিণ্ডা ও তাঁর ভাই পার্বতীচরণ দিণ্ডা এবং মোহিনী মণ্ডলের নেতৃত্বে প্রবল প্রতিবাদ সংগঠিত হয় সেখানে।আর এতেই ভয় পেয়ে নৃশংসভাবে গুলি চালায় পুলিশ। মৃত্যু হয় ১৪ জন নিরস্ত্র গ্রামবাসীর। আহত হয়েছিলেন ১৪৫ জন।
সেদিন পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় চন্দ্রকান্ত মান্না (তেমুয়ানি), শশীভূষণ মাইতি (সয়লা), কালিপদ শাসমল (জালালপুর), ভৃগুরাম পাল (মোহনমাইতিচক), দেবেন্দ্রনাথ ধাড়া (জোতভগবান), সতীশচন্দ্র মিদ্যা (খাড় রাধাকৃষ্ণপুর), রামচন্দ্র পাড়ই (জ্যোতঘনশ্যাম), নিতাই পড়্যা (পাঁচবেড়িয়া), অবিনাশ দিণ্ডা (বাঁশখালি), সত্য বেরা (বাঁশখানি), পূর্ণচন্দ্র সিংহ (খাড়), মোহনচন্দ্র মাইতি, অশ্বিনী দোলই (চক বোয়ালিয়া) এবং কালি দিণ্ডা (গোবিন্দপুর) নামে ১৪ জন সত্যাগ্রহীর।
চেঁচুয়াহাটের এই গণবিদ্রোহের জন্য দেশের দ্বিতীয় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। হত্যাকারীদের শাস্তিবিধানের জন্য সরকার এই স্পেশাল ট্রাইবুনাল গঠন করলে মামলা পরিচালনার বিষয়ে কথা বলতে মুরারীচরণ দিণ্ডা কলকাতায় সাতকড়িপতি রায়ের কাছে চলে যান। এমনকি পরামর্শ করেন দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গেও। চেঁচুয়াহাটের এই ঘটনায় মৃগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৩০ এর ২৫ শে সেপ্টেম্বর স্পেশাল ট্রাইবুন্যালের বিচারে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি। পরে হাইকোর্টের বিচারে দ্বীপান্তরের বদলে ৭ বছর কারাদণ্ড ভোগ করেন।
এছাড়াও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় কানন গোস্বামী, মৃগেন্দ্রনাথ বাগ, শীতল ভট্টাচার্য, যোগেন্দ্র হাজরা, ভূতনাথ মান্না, বিনোদ বেরা, শীতল ভট্টাচার্যদের। সাত বছরের জেল হয় জীবন পতি, কালিপদ সামন্ত, কালাচাঁদ ঘাঁটি, যুগল মাল এবং ব্রজ ভুঁইয়ার। অন্যান্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন পার্বতীচরণ। কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় তাঁকেও। কিন্তু পুলিশ ধরতে পারেনি দারোগা হত্যাকারী মুরারীচরণ দিণ্ডাকে। তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। আত্মগোপন করে থাকার সময়ে মেদিনীপুরের সঙ্গতবাজার থেকে বিনোদ বেরা ও কিশোর মালের সঙ্গে তাঁকেও পুলিশ গ্রেফতার করে। ওস্তাদ কালীশঙ্কর মিশ্রের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেওয়া এই সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষটি স্বাধীনতার পর ঘাটালে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। নানা উন্নয়নে সামিল হন। ১৯৮৮ এর ২২ শে অক্টোবর মৃত্যু হয় তাঁর।
🍂
0 Comments