জ্বলদর্চি

সুদীপ কুমার খাঁড়া (রক্তযোদ্ধা, শিক্ষক, গোপীবল্লভপুর) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৬
সুদীপ কুমার খাঁড়া (রক্তযোদ্ধা, শিক্ষক, গোপীবল্লভপুর) 

ভাস্করব্রত পতি

- হ্যালো ...... সুদীপবাবু বলছেন? 
- হ্যাঁ বলছি। আপনি কে বলছেন? 
- আমাকে আপনি চিনবেন না। চন্দ্রকোনা টাউনের শ্যামলবাবু আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন। আমার নাম শেখ আলামত। কাঁথিতে বাড়ি। আমার দাদি নার্সিং হোমে ভর্তি। ইমিডিয়েট এক বোতল এ নেগেটিভ ব্লাড লাগবে। অপারেশন আছে। একটু জোগাড় করে দেওয়া যাবে?
- ঠিক আছে, অসুবিধা নেই। চেষ্টা করছি একজন ডোনারকে পাঠিয়ে দিতে। আপনার এই নম্বরে যোগাযোগ করে নেবে। 
- ধন্যবাদ দাদা।
- ধন্যবাদ। 

এইরকম অনেক ফোন মেদিনীপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন আসে সুদীপবাবুর নম্বরে। রক্ত জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ সেসব। হাসিমুখে সেসব সমাধান করেন নিজস্ব নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে। এ পর্যন্ত কয়েক'শ আর্ত রোগীর জন্য পৌঁছে দিয়েছেন রক্তের পাউচ। বেঁচেছে প্রাণ। বেঁচেছে পরিবার। আর প্রচারবিমুখ মানুষটি পর্দার আড়ালে থেকে চাগিয়ে রেখেছেন মনুষ্যত্ব। জাগিয়ে রেখেছেন মানবতা। আঁকিয়ে রেখেছেন হৃদয়ের পলেস্তারায় ভালোবাসার আগুন।
মৌবনি সরকারের হাত থেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন

তিনি সুদীপ কুমার খাঁড়া। মেদিনীপুরের চুয়াডাঙ্গা হাইস্কুলের ইতিহাস বিষয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক। মনেপ্রাণে বামপন্থী। সমাজ বদলের নেশায় বুঁদ। মেকি পলিটিক্স তাঁর ধাতে নেই। মানুষের পাশে থাকেন, বিপদে আপদে। নেই দেখনদারি, নেই ভাও নেওয়া, নেই কমাণ্ডিং চালচলন। আপাদমস্তক বিনয়ী পরোপকারী এই মানুষটির দিন কাটে আর্ত রোগীর জন্য রক্তের পাউচ জোগাড় করে দেওয়ার মাধ্যমে। 

ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুর ২ ব্লকের রাধাগোবিন্দপুর গ্রামে জন্ম। বাবা নলিনীকান্ত খাঁড়া ছিলেন স্থানীয় মহাকাল শ্রীবিদ্যাপীঠ হাইস্কুলের শিক্ষক। বাবার হাত ধরেই তাঁর উত্তরণ। বাবা ছিলেন এলাকার প্রতিষ্ঠিত নাট্য অভিনেতা। ফুটবলও খেলতেন। ছোট থেকে এহেন আদর্শ বাবার সাহচর্যে তিনি বড় হয়েছেন। আর আজ যেভাবে সব ঝক্কি সামলে হাসিমুখে বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন নিয়মিত, তাতে তাঁর বাবার অনুপ্রেরণাই প্রধান শক্তি। মা সরোজিনী খাঁড়ার অবদানও প্রণীধানযোগ্য। 
এ পর্যন্ত নিজে রক্তদান করেছেন ৫৫ বার

প্রথমে গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক পাঠ। এরপর মহাপাল শ্রীবিদ্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিক ও বেলদা গঙ্গাধর আকাডেমি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর মেদিনীপুর কলেজ থেকে ২০০০ সালে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী। কলেজের করিডোরেই ছাত্র রাজনীতির অন্দরমহলে প্রবেশ। ব্যাস, আর পিছু ফেরা নয়। বামপন্থী রাজনীতির আদর্শকে হাতিয়ার করে তাঁর এগিয়ে চলা। ২০০২ তে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী এবং বিদ্যাসাগর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ২০০৪ এ বি এড ডিগ্রি অর্জন। এই বছরেই চাকরি চুয়াডাঙ্গা হাইস্কুলে। 

মেদিনীপুর কলেজে পড়াকালীন ১৯৯৮ তে প্রথম রক্তদান করেন। সেসময় এন এস এস এর গঙ্গাধর ত্রিপাঠী ছিলেন উৎসাহদাতা। তখন ক্ষুদিরাম বক্সীর বাড়িতে বক্সী মেসে থেকেই রক্তদান চালিয়ে যেতেন। আজ তাঁর রক্তদানের মাইলস্টোন ৫৫ ছুঁয়েছে। অনেককে নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকেই মনের মধ্যে পোষণ করেন। যা আজও বিদ্যমান। 
একসাথে স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে পারিবারিকভাবে রক্তদান

আজ তিনি 'রক্তযোদ্ধা'। রক্তের অভাবে কেউ যাতে অসুবিধায় না পড়ে তার জন্য তিনি সচেষ্ট। এক ফোনেই বাজিমাত। নিজেও রক্তদান করেন নিয়মিত। ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর ও পশ্চিম মেদিনীপুর -- তিন জেলাতেই তিনি রক্তদান করেছেন। নিজের মেয়ে সম্প্রীতির আঠারো বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৪ এর পয়লা সেপ্টেম্বর এক রক্তদান শিবিরে প্রথম রক্তদাতা হিসেবে মেয়েকে রক্তদান করতে উৎসাহিত করেন। এই শিবিরেই প্রথমবার রক্তদান করিয়েছেন স্ত্রী মৃন্ময়ী খাঁড়াকেও। সেবার চারটি রাজ্য থেকে রক্তদান করতে এসেছিল তাঁর উদ্যোগে। সেবারই ছিল রক্তযোদ্ধা সুদীপ কুমার খাঁড়ার পঞ্চাশতম রক্তদান। 

ভূবনেশ্বর থেকে কলকাতা, কটক থেকে আরামবাগ -- রক্ত লাগলেই ব্যবস্থা করে দেন রক্তের। ডোনার খুঁজে তাঁকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মতো Thankless Job কাজের কৃতিত্ব তাঁর। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে রক্তের জোগান ঠিক করে দেন। যাঁদের জন্য প্রাণপাত করে রক্ত খুঁজে দেন, তাঁদের মধ্যে ৭০% মানুষই রক্তের সমস্যা মিটে যাওয়ার পর ভুলে যান। মাত্র ৩০ % মানুষ মনে রাখেন। যদিও এতে অখুশি নন তিনি। তাঁর কাছে 'রক্তদান জীবনদান' স্লোগানটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। 

রক্তদানের কিছু নিয়মের পরিবর্তন জরুরি বলে অভিমত এই রক্তযোদ্ধার। বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার রক্ত নেওয়া হয়না। এরফলে অসুবিধায় পড়েন রক্তদাতারা। কাজের দিনে ছুটি নিয়ে রক্ত দিতে যাওয়া খুব অসুবিধার। রক্তদান করার দিন সবেতন ছুটি দেওয়ার দাবি রক্তদাতাদের। এটি এখনও কার্যকর হয়নি। তাঁর দাবি, যেসব সরকারি ক্লাব, সংগঠন, পূজা কমিটি সরকারের থেকে আর্থিক সহযোগিতা পায়, তাঁদের প্রত্যেককে সেই প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ দিয়ে রক্তদানের আয়োজন করতে হবে। তাঁর অভিমত, যত বেশি নতুন রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া যাবে, ততই ভালো। থ্যালাসেমিয়া ও অ্যানিমিয়া রোগীদের জন্য অনেক রক্ত লাগে। কিন্তু সেই পরিমাণে রক্তের জোগান আসে না। 

বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেন কাজের সুবাদে। ভালোবাসার তাগিদে। যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এযাবৎকাল ধরে পড়েছেন, সেগুলিকে ভুলে যাননি আজও। এইসব প্রতিষ্ঠানের সকল প্রাক্তনী সংগঠনগুলিতে জড়িয়ে রয়েছেন ওতপ্রোতভাবে। এ আসলে অন্যরকম ভালোবাসা। জন্মলগ্ন থেকেই মেদিনীপুরের বিখ্যাত সুবর্ণরৈখিক পরিবারের পরিচালকমণ্ডলীর সঙ্গে যুক্ত। 'আমারকার ভাষা আমারকার গর্ব' তাঁর মনের একান্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চের জেলা কাউন্সিল সদস্য। এবিটিএ পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা কমিটির প্রাক্তন সদস্য এবং বর্তমানে জোনাল কমিটির সদস্য। এস এফ আই এর প্রাক্তন জেলা সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য। মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থার মেদিনীপুর আঞ্চলিক ইউনিটের সহ সম্পাদক এবং জঙ্গলমহল উদ্যোগের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা কমিটির সদস্য পদে রয়েছেন। যুক্ত রয়েছেন বজরং ব্যায়ামাগারের সাথেও। মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। মেদিনীপুর ভগৎ সিং ফাউন্ডেশনের সদস্য হিসেবেও কাজ করে চলেছেন। 

রক্তের জোগান দেওয়ার জন্য তাঁর কাজ বহুল প্রশংসিত। মেদিনীপুরের বুকে তিনি যে কাজটি করে চলেছেন তা রীতিমতো ঈর্ষনীয়। তাঁর এই কাজকে সম্মান জানিয়েছে বহু সংস্থা। মেদিনীপুর কুইজকেন্দ্র সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি থেকে ২০২৩ এ পান 'রক্তযোদ্ধা' সম্মাননা। অনয় মাইতি ফ্রেন্ডস এন্ড লাভার্স সংস্থা পক্ষ থেকেও ২০২৪ এ পেয়েছেন 'রক্তযোদ্ধা সম্মাননা'। ঝাড়গ্রাম জেলার বহড়াদাঁড়ি নেতাজী ক্লাব থেকে 'জনসংযোগ ও রক্তমিত্র রত্ন ২০২৫' পেয়েছেন রক্ত নিয়ে তাঁর নিঃস্বার্থভাবে কাজে লেগে থাকার জন্য। ৪৯ বার রক্তদানের জন্য ২০২৪ এর ১৪ ই জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে পঁচিশতম বা তদোর্ধ রক্তদাতা হিসেবে মেদিনীপুর ব্লাড সেন্টার থেকে সম্মানিত হয়েছেন। আবার ৫২ তম রক্তদানের জন্য ২০২৫ এর জুনে ডেবরা ব্লাড ব্যাংকে বিশ্ব রক্তদাতা দিবসকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৫০ এর বেশি বারের রক্তদাতা রক্তদাতা হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন সুদীপ কুমার খাঁড়া। 
 অশোক কুমার গাঙ্গুলী এবং রোশেনারা খানের হাত থেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন

এছাড়াও এই বহুমুখী কাজের মানুষটির লেখালেখির অভ্যাসও রয়েছে। সেইসাথে চুটিয়ে সাংবাদিকতাও করেন এবং অভিনয় করেন। অসংখ্য যাত্রাপালা, নাটক, শর্টফিল্মে অভিনয় করেছেন। বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, কুইজ, আবৃত্তি, প্রবন্ধ রচনা, নাটক রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রাজস্তরের দুটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার সহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। লেখালেখির জন্য ঝাড়গ্রাম জেলার সাঁকরাইল সাহিত্য পরিষদ থেকে পেয়েছেন সাঁকরাইল 'সাহিত্য সম্মাননা ২০২৬'। নির্ভীক কালচারাল ফোরামের পক্ষ থেকে 'আবার সহজপাঠ' শর্টফিল্মে অভিনয়ের জন্য 'কলাকুশলী সম্মাননা', বিনোদন সাহিত্য পরিবারের পক্ষ থেকে 'পরিবার রত্ন ১৪২৯ সম্মাননা' জুটেছে তাঁর। পশ্চিম মেদিনীপুরের অপরাজেয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে 'অপরাজেয় সম্মান ২০২২', আই সোসাইটি আয়োজিত নিউ নরমাল আই ফেস্টে 'শান্তি সম্মাননা ২০২০', কোভিড কালে মেদিনীপুরের সংকল্প ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে 'কোভিড যোদ্ধা সম্মাননা' পেয়েছেন। কলকাতার আলো ট্রাস্ট থেকে 'মানব রত্ন ২০১৯' পুরস্কার তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক কুমার গাঙ্গুলি ও সমাজকর্মী, সাহিত্যিক রোশেনারা খান। এছাড়াও এই সংস্থার 'বীরপুরুষ ২০২০' পুরস্কার পেয়েছেন মৌবনী সরকারের হাত থেকে। এগুলি তাঁর জীবনের অন্যতম পাওয়া। পুরস্কার নয়, কাজকেই তিনি গুরুত্ব দেন সর্বাগ্রে। 

রক্তের খোঁজেই তাঁর দিন শুরু হয়। তাঁর রাত গভীর হয়ও রক্তেরই খোঁজে। চব্বিশ ঘন্টা তিনি যেন জীবন্ত ব্লাড ব্যাঙ্ক। মেদিনীপুরের মাটিতে রক্তদান আন্দোলনের অন্যতম কারুশিল্পী সুদীপ কুমার খাঁড়া কোনও কিছু পাওয়ার দাবিতে না থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে কীর্তি গড়েছেন, তা আসলে 'কটিকে গুটিক'।
🍂

Post a Comment

0 Comments