তুরস্ক (ইউরোপ)
সুলতানের ভাবনা
চিন্ময় দাশ
সৎমার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে ছেলে মেয়ে দুটো। বাবা নাই তাদের। থাকবার মধ্যে আছে তাদের সৎমা আর তার একটা মেয়ে।
ভাই-বোন দুটিতে কত চেষ্টাই না করে। সব সময় মিষ্টি করে কথা বলে। হাতে হাতে কাজ গুছিয়ে দেয় মায়ের। বাড়ির সব ফাইফরমাস খেটে দেয় দুজনে। তবু মন পাওয়া যায় না মা-মেয়ের। দিনরাত বকাঝকা। গায়ে হাত তুলতেও ক্সুর করে না। দুবেলা দু’মুঠো খেতেও দেয় না ভালো করে।
কত দিন আর সহ্য করা যায়? একদিন বোন বলল—চল ভাই, পালাই।
--কোথায় যাবো? ভাইয়ের গলায় ভয়।
--কোথায় যাবো, সে পরে ভাবা যাবে। এখান থেকে তো বেরোই আগে।
একদিন ভোর হবার আগে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল দুটিতে। ঘুরতে ঘুরতে শহরতলিও ছাড়িয়ে গেল এক সময়। সূর্যও ঢলে পড়েছে তখন। রাত কাটাবার জন্য জঙ্গলে ঢুকে পড়ল দুজনে।
আসলে হয়েছে কী, তাদের সৎমা একজন ডাইনি। অনেক যাদুবিদ্যা জানা আছে তার। ছেলেমেয়ে দুটোকে ঘরে না পেয়ে, সেও খোঁজ লাগিয়েছে। দুজনের হদিশ জেনেও ফেলেছে এক সময়।
সারা জীবন তো আর জঙ্গলে কাটানো যাবে না। সকাল হলে নিশ্চয় বেরোতে হবে। ডাইনি-মা করল কী, জঙ্গলে যতো ঝরণা ছিল, যাদু করে দিয়েছে সব কটাকে। পেটে আর কিছু পড়ুক না পড়ুক, জলের কাছে তো যেতেই হবে। একবার শুধু জলে হাত ছোঁয়ালেই হোল। মজা বুঝে যাবে বাছাধনরা।
সকাল হয়েছে। জঙ্গল থেকে বের হয়েছে দুটিতে। এক সময় কলকল শব্দ কানে এলো ভাইয়ের। বলল—ঝরণার শব্দ! চলো বোন, জল খেয়ে নিই।
ঝর্ণাটার কাছে পৌঁছে মেয়েটি অবাক। কলকল শব্দের মধ্যে কে যেন বলছে— “জল ছুঁয়ো না, পান কোর না। হাত ছোঁয়াবে জলটিতে, পালটে যাবে বাঘটিতে।“
এ নিশ্চয় সৎমার কাজ! মেয়েটা বুঝে ফেলেছে। সে তাড়াতাড়ি ভায়ের হাত ধরে ফেলেছে—এক্কেবারে না, ভাই। এ জল ছোঁয়াও যাবে না। বিপদ হবে আমাদের।
শুনে তো ভাই অবাক—জলে হাত ছোঁওয়ালে আবার বিপদ কিসের?
--হাত ছোঁয়ালে, সাথে সাথে বাঘ হয়ে যাবে তুমি। আর প্রথমেই কামড়ে খাবে আমাকে। চলো, পালাই এখান থেকে।
আবার চলেছে দুটিতে। কিছু দূর গিয়ে আবার একটা ঝরণা। ভাইয়েরও পিপাসা লেগেছে খুব। সে এগিয়ে চলেছে জলের দিকে। কিন্তু বোন শুনতে পেয়েছে ঝরণার হুঁশিয়ারি-- “জল ছুঁয়ো না, পান কোর না। হাত ছোঁয়াবে জলটিতে, পালটে যাবে নেকড়েটিতে।“
বোন আবার তড়িঘড়ি করে হাত ধরে টেনে আনল ভাইকে। ভাই বলল—এ জলেও কি বিপদ?
--হ্যাঁ, বিপদ। এ জলে হাত ছোঁইয়ালে, নেকড়ে হয়ে যাবে তুমি। তখন আমাকেই খেতে আসবে।
ভাই কাতর গলায় বলল—আমার যে ভারি পিপাসা, বোন।
--এ জলে পিপাসা তো মিটবেই না। বরং জীবনটাই যাবে তোমার। চলো, পালাই এখান থেকে।
আরও কতো দূর পথ চলল দুটিতে। এক সময় আবার শোনা গেল দূরাগত ঝরণার কলতান। ভাই বলল—আর পারছিনা, বোন। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে আমার। এক আঁজলা অন্তত মুখে দিই।
সে কথায় কান নাই বোনের। সে ঝরণার গান শুনছে কান পেতে-- “জল ছুঁয়ো না, পান কোর না। হাত ছোঁয়াবে জলটিতে, পালটে যাবে হরিণটিতে।“
ভাইয়ের হাত ধরবার সুযোগই পেল না এবার সে। পাবে কী করে? ভাই তো তখন মরিয়া। ছুট্টে গিয়েছে জলের পাশটিতে। যেই না এক আঁজলা জল তুলেছে, মুখে দিয়েছে, কি দেয়নি। কোথায় তার সেই সোমত্ত ভাই? একটা টগবগে হরিণ দাঁড়িয়ে তার সামনে।
কী আর করা যাবে? ডাইনির যাদু কাটাবার উপায় তার জানা নাই। সোনার একটা হার ছিল গলায়। ভাইয়ের গলায় পরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে এলো বোন। কী জানি, যদি এখানেও চলে আসে সৎমা! বাইরে ঘোরাঘুরি ঠিক হবে না। বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল মেয়েটি। সাথে হরিণ-ভাই তার।
কতোক্ষণ ঘোরাঘুরির পর, একটা কুঁড়েঘর দেখা গেল। এই গহন বনে, এমন কুঁড়ে এলো কোথা থেকে। এসব ভাববার সময় নাই হাতে। সেই কুঁড়েতেই রয়ে গেল দুটিতে।
বনের ফল-মূল জোগাড় করে আনে। তাতেই পেট ভরায় দুজনে। এভাবেই দিন কেটে যায় দুজনের।
বেশ শান্তিতেই দিন কাটছিল। একদিন এক উৎপাত। একদল শিকারি হাজির হয়েছে বনে। হরিণটা চোখে পড়ে গেল তাদের। বোনও দেখে ফেলেছে তাদেরকে। এক শিকারি তীর জুড়েছে ধনুকে। বোন দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে তার হরিণ-ভাইকে। চেঁচিয়ে উঠেছে—দোহাই তোমাদের। মেরো না একে।
দলের নেতা এক সুলতান। মানুষের গলা শুনে, তিনি অবাক। এগিয়ে এসে দেখলেন দৃশ্যটা। হরিণটাকে বুকে জড়িয়ে, আগলে রেখেছে এক সুন্দরি মেয়ে। এই গহিন বনের ভেতর এরা এলো কোত্থেকে! সুলতান ভারি অবাক।
মেয়েটির কাছে গিয়ে বললেন—আমি এই রাজ্যের সুলতান। এ বনটাও আমার। কিন্তু তুমি এখানে এলে কীভাবে?
মেয়েটি বলল—ভারি বিপদে পড়েই এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি, হুজুর। এই হরিণ আমার নিজের ভাই। অনুগ্রহ করুন আপনি। দয়া করে একে মারবেন না। দোষ যদি করে থাকি, আমাকে শাস্তি দিন। যা বলবেন মাথা পেতে নেব আমি।
সুলতানের মুখে হাসি ফুটে উঠল—যা বলব, মাথা পেতে নেবে তুমি? আপত্তি করবে না?
--কোন আপত্তি করব না। কথা দিলাম।
সুলতান বললেন—আমাকে বিয়ে করবে তুমি?
মেয়েটি তো আকাশ থেকে পড়েছে। চেয়েছিল ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে। এখন তো দুজনের জীবনই নিরাপদ হয়ে যাচ্ছে। দু’বেলা দু’মুঠো জুটতো না। এখন সে হবে দেশের সুলতানের বেগম! বেহেস্ত (স্বর্গ) নিজেই এসে ধরা দিয়েছে হাতের মুঠোয়। একথা তো তার স্বপ্নেরও বাইরে।
মেয়েটি বলল—আমি তো কথা দিয়েই রেখেছি। আমার মতো অভাগির কাছে এ তো মহা পুরষ্কার, হুজুর।
ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ের। হরিণ-ভাইও থাকে তাদের সাথে। হরিণেরও ভারি খাতির সুলতানের প্রাসাদে। সারা প্রাসাদ ঘুরে বেড়ায় নিজের মর্জি মতো। আনন্দে শান্তিতে দিন কেটে যায় তাদের।
এভাবে দিন যায়। মাস যায়। বছরও কেটে গেল একদিন। একদিন ফুটফুটে একটি ছেলেও হোল সুলতানের। রাজ্য জুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। উৎসবে মেতে উঠল সারা রাজ্য।
সেই আনন্দ হুল্লোড়ে, ডাইনি সৎমা জেনে গেল, সুলতানের বেগম আর কেউ না, তারই সৎমেয়ে! রাগে হিংসায় সারা গা রি-রি করে উঠল তার। এত সুখ ঐ মেয়েকে পেতে দেওয়া যাবে না।
একদিন রাতে সুলতানের বেগমকে মেরে ফেলল সে। নিজের মেয়েকে আসল বেগমের চেহারা দিয়ে বিছনায় শুইয়ে রেখে দিল। সুলতান এসবের কিছুই জানেন না। তবে, একটা জিনিষ দেখলেন। বেগম যেন ছেলেকে আদর-যত্ন করছে না তেমন। খিদে পেলে খাওয়াচ্ছে না।
যে শিশুর খিলখিল হাসিতে সারা প্রাসাদ ভরে থাকতো, প্রথম বার সেই শিশুর কান্না অবাক করে দিল প্রাসাদের সবাইকে। লোক-লস্কর, দাস-দাসী, পেয়াদা-বরকন্দাজ শুনল সে কান্না। এ ওর মুখের দিকে চেয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। মাথায় কিছু ঢুকছে না কারুরই।
এক দিন গেল। দু’দিন গেল। তৃতীয় দিনে, মেয়েটিকে চেপে ধরলেন সুলতান— কে তুমি?
মেয়েটির গলায় উত্তর নাই। মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুলতান হেঁকে উঠলেন—সত্যি করে বলো। নইলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারব সবার সামনে।
ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল নকল বেগম। গলা কান্না ভেজা। বলল— আমি কিছু করিনি, হুজুর। যা করবার, সব আমার মা করেছে।
মেয়ের কথায়, মাকে ধরে আনতে লোক পাঠালেন সুলতান । ততক্ষণে আসল বেগম তাঁর চেহারায় এসে হাজির হয়েছে সুলতানের সামনে। বেগমকে ফিরে পেয়ে, বুকে জড়িয়ে ধরলেন সুলতান।
সৎমাকে পিছমোড়া করে বেঁধে আনা হয়েছে। প্রাসাদের সামনে খোলা মাঠ। সেখানে তাকে দাঁড় করানো হয়েছে পায়ে পাথর বেঁধে। সারা রাজ্য ভেঙে পড়েছে প্রাসাদের মাঠে। ডাইনিকে সাজা দেওয়া হবে। আগুনের হলকার মতো সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে খবরটা। সবাই নিজের চোখে দৃশ্যটা দেখতে চায়। জীবনে এমন সুযোগ সচরাচর আসে না।
সুলতানের হুকুমে, আগুন লাগিয়ে দেওয়া হোল সৎমার গায়ে। পরিত্রাহী চেঁচাতে চেঁচাতে পুড়ে মরে গেল ডাইনিটা। অমনি এক অবাক কাণ্ড! কোথায় গেল টগবগে সেই হরিণ। তরতাজা এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে সুলতান আর তাঁর বেগমের মাঝখানে। ভাইকে ফিরে পেয়ে, বোনের আনন্দ তখন দ্যাখে কে!
এবার নকল বেগমের পালা। উজির সাহেব সুলতানকে কানে কানে বললেন—বিষের বিন্দুও রাখতে নাই, হুজুর। আবার কার সাজানো সংসার ভাঙতে যাবে, তার নাই ঠিক। এটাকেও নিকেষ করে ফেলুন আপনি।
সুলতান মাথা নেড়ে বললেন—ঠিক বলেছেন। চিড়িয়াখানা ছিল সুলতানের। সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হোল মেয়েটাকে। খাঁচার দরজা খুলে ভেতরে ঠেলে দিতে বললেন। বাঘ-সিংহরা ছিঁড়ে খাক ওকে।
আনন্দের বন্যা বয়ে গেল জমায়েতে। সবাই চিৎকার করছে। সবাই ভারি খুশি। সেই হৈ-হুল্লোড়ে উজির সাহেব দেখলেন, সুলতানের মুখে হাসি নাই। ব্যাপারখানা কী? নিজের বেগমকে ফিরে পেয়েছেন। আপদও বিদায় হয়েছে। তাহলে, সুলতানে মনে আনন্দ নাই কেন?
কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন—কী অতো ভাবছেন, হুজুর? মুখে হাসি নাই আপনার!
--ভাবনার কি আর শেষ আছে হে? সামনে তরতাজা একটা যুবক ছেলে নেমে এসেছে আকাশ ফুঁড়ে। এর কথাটা ভাবতে হবে না? এরও তো একটা বেগম চাই, না কি? উপযুক্ত একটা মেয়ে পাই কোথায়? কোথায় মেয়ে পাই একটা?
আবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন সুলতান। উজিরের মুখ ভরে গেল হাসিতে। ফিসফিস করে বলল—ভাবনা কী, হুজুর? আমার নিজেরই তো মেয়ে আছে একটি। কিচ্ছুটি ভাবনা করবেন না।
সুলতান আর তাঁর উজির—হাসি ফুটে উঠল দুজনের মুখেই।
0 Comments