জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা : ২০৭

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা : ২০৭
চিত্রগ্রাহক:  বিখ্যাত বেহালাবাদক শ্রী আদিত্য কুমার মাল 

সম্পাদকীয় 

প্রিয় বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? আজ চিঠির শুরুতেই তোমাদের ধন্যবাদ জানাব। কারণ অনেকেই আমাকে তাদের আঁকা সুন্দর সুন্দর সব ছবি পাঠিয়েছে। যারা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ এ ছবি পাঠিয়েছো, তাদের আঁকা ছবি আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পত্রিকা তে দিয়ে দেব। আর যারা এখনো লজ্জা লজ্জা করে ভাবছো আঁকা ছবিগুলো পাঠাবো নাকি পাঠাবোনা, তাদেরকে বলি তোমরা অবশ্যই তোমাদের আঁকা ছবি লেখা কবিতা বা ছড়া অবশ্যই অবশ্যই পাঠাও । সবাই ভালো থাকো, বাড়ির সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকো। অনেক ভালবাসা নিও সবাই। 
ইতি - তোমাদের স্বাগতাদি
আদ্রিকা ঘোষ
শ্রেণী: দ্বিতীয়, DAV পাবলিক স্কুল

ছড়া

বায়না
কেয়া দেবনাথ


আমার পুতুল বায়না ধরে- সাজতে চায় না
কনে-
আমার চাই খাতা
কলম
এক্ষুনি দাও এনে। 

🍂
তিতলির ভূত দেখা
 অনিন্দিতা শাসমল‌

বৈশাখ মাসের শেষ অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুরু। দিন বা তারিখ  সঠিক মনে না থাকলেও এইটুকু মনে আছে, প্রচন্ড গরমের একটি সন্ধে। মামার বাড়ির ভেতর বাইরের চারদিকের বাঁধানো বারান্দায় বড়রা গল্পের মজলিস বসিয়েছে। তখনও গ্রামে গঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোগ হয়নি। সুতরাং বারান্দায় মাদুর পেতে হ্যারিকেন ও লণ্ঠনের আলোয় বই খাতা মেলে পড়তে বসেছে মামাতো ভাই বোনেরা। কেউ জোরে জোরে পড়ছে ,কারোর চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসতেই ,বড় বড় চোখ করে ততোধিক জোরে পড়া শুরু করছে। কেউ আবার উপুড় হয়ে কলম হাতে  মাথা একেবারে গুঁজে দিয়েছে অঙ্কের খাতায়। অভ্যস্ত হাতে হাতপাখা চালাতে চালাতেই মামা,মামী, মাসি ও মা সংসারের জটিল অঙ্কের সমাধানে মগ্ন। তিতলি একবার বড়দের আলোচনা শুনছে ,আর একবার দাদা দিদিদের পড়ার নামে অদ্ভুত সব কাণ্ড কারখানা দেখছে। হঠাৎ মনে হল একবার বাইরে বেরিয়ে বাথরুমে যাই। খিড়কি দরজার খিল খুলে ,বাইরের কলতলা পেরিয়ে বাথরুমে যেতে হবে। একটু ভয় ভয় করলেও একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। একটা লণ্ঠন হাতে নিয়ে দরজা খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখে ,দূরের অন্ধকার বেশ গাঢ়। কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না‌। বাথরুমের পেছনে একটি পুরোনো মাটির দোতলা বাড়ি। চাষের ধান, চাল,  আলু,  তিল ,সরষে ,সবজি সব রাখা থাকে। সেখানে ‌দিনের বেলায় মামীদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার ঢুকেছে সেই ঘরে । মাটির বাড়ির পেছনে প্রাচীরের  ইঁটগুলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। তার ওপারে একটি ভাঙা পরিত্যক্ত ইঁটের গাঁথুনি দেওয়া  বাড়ি। দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে ,ইঁটের খাঁজে খাঁজে অনেক আগাছা জন্মেছে। স্থানে স্থানে লতানো গাছ উঠেছে দেওয়াল বেয়ে। পাখির ঠোঁটে আনা ফলের বীজ পড়ে ছোটো ছোটো বট ও অশ্বত্থ গাছও মাথা তোলার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে রাতের অন্ধকারেও তিতলি খুব একটা ভয় পেল না। লণ্ঠন হাতে এগিয়ে চললো বাথরুমের দিকে। হঠাৎ লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় দেখলো -- ইঁটের বাড়ির দিক থেকে একটা সাদা কাপড় শূন্যে ভেসে আসছে তার দিকে । সে যত এগোচ্ছে,কাপড়টাও তত এগিয়ে আসছে। আরো কাছাকাছি আসতেই মনে হল , একটা ছায়ামূর্তি মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল তিতলির। চিৎকার করে মাকে ডাকতে চাইলো ।কোনো আওয়াজ বেরোলো না গলা দিয়ে । লণ্ঠনটা হাত থেকে পড়ে গেল । ছুটে পালাতে চাইলো বাড়ির খিড়কি দরজার দিকে। পা এতটাই ভারি হয়ে গেছে যে, এক পাও এগোতে পারলো না। ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল সে। 
           যখন জ্ঞান এলো তখন দেখলো , মায়ের কোলে মাথা রেখে মাদুরে শুয়ে আছে সে। বড় মামী চোখে মুখে অল্প জল ছিটিয়ে দিচ্ছে আর মেজো মামী হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে। বড় বড় চোখে তাকিয়ে সবাইকে একবার দেখলো তিতলি। সব কিছু মনে করার চেষ্টা করলো। তখনো তার ঝাপসা চোখে সেই ছায়ামূর্তি । মাকে বললো , একবার বাথরুমে যাবো।মায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখলো, কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। দূরে চাঁপা গাছের ডাল থেকে কয়েকটা বাদুড়ের  ডানা ঝাপটানোর শব্দ ভেসে আসছে। মনে পড়লো ,মেজো মামার কাছে  একবার গল্প শুনেছিল,লক্ষ্মীপুজোর রাতে ঐ চাঁপা গাছের ডাল থেকে একটা সাদা কাপড় ঝুলতে দেখে, ছোটোবেলায় প্রসাদের থালা হাতে  মামা সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছলো‌। ঐ  ইঁটের বাড়ির একজন বৌ বহু বছর আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তার প্রেতাত্মা নাকি ঘুরে বেড়াতো বাড়িটায়। তারপর থেকে ঐ বাড়িতে কেউ থাকে ন। পোড়ো বাড়ি হিসেবেই দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে তার অস্তিত্ব জাহির করছে। মাঝে মাঝে সেই অতৃপ্ত আত্মা চাঁপা গাছের ডালে দোল খেতে আসে। নিজের জীবনে একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে মামার ছোটোবেলার ঘটনাটা মেলাতে চেষ্টা করছিল মনে মনে । হঠাৎ মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরলো তিতলির-- "কি রে ! কী ভাবছিস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! চল ! আমি টর্চের আলো দেখাচ্ছি। বাথরুমে চল। ভয় নেই।বাইরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো।চল।" মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু স্মার্ট হবার চেষ্টা করলো তিতলি। বললো -- হ্যাঁ হ্যাঁ ।চলো।মাথাটা একটু ঘুরে গেছলো হঠাৎ। ভয় কিসের ? তুমিই তো বলেছো । রবিঠাকুর আছেন না আমার সাথে ! তাঁর সেই  গান আছে না -- আমি ভয় করবো না ভয় করবো না , দুবেলা মরার আগে মরবো না ভাই মরবো না ! 
 যতই স্মার্ট হবার চেষ্টা করুক , বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে আবার একবার পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে। এবার কলের পেছনে কলাগাছের পাতাগুলোকে আচমকা নড়ে উঠতে দেখলো ! কয়েকটা চামচিকে উড়ে গেল আওয়াজ করতে করতে ! মা আবার ডাকলো-- "কি রে তিতলি ? আবার থমকে দাঁড়িয়ে গেলি কেন ? তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোক ! রাত তো কম হল না ! " মা দরজা বন্ধ করার আগে পর্যন্ত, স্থির দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকলো ইঁটের পরিত্যক্ত বাড়িটার দিকে। 

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ : তেইশ

রতনতনু ঘাটী

খুব খিদে পেয়েছিল লোকনের। সেই কখন স্কুলে যাওয়ার সময় দু’ মুঠো ভাত খেয়ে বেরিয়েছিল। রাধাপিসি আজ পাঁচমিশেলি আনাজ দিয়ে তরকারিটা ভালই রান্না করেছিল। তারই কিছুটা পারুলমণি তুলে রাখতে বলেছিল রাধাপিসিকে। 

   এখন সেই তরকারি দিয়ে মুড়ি খেতে-খেতে লোকন জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি, তুই স্কুল থেকে ফিরে কিছু খেয়েছিস তো?’

   ‘তোর আসার পথের দিকে চেয়ে-চেয়ে দু’ মুঠো মুড়ি খেয়ে নিয়েছি।’

   লোকন পাতের শেষ গ্রাসটা মুখে পুরে জিজ্ঞেস করল, ‘দিদি, তুই নতুন কী একটা জিনিস দেখাবি বললি যে তখন? কই দেখা!’

   ভাইয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে ভাইবোন দাঁড়াল অন্ধ মাছটার কাচের জারের সামনে। জারের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে পারুলমণি বলল, ‘ভাই, আমাদের নয়নীর জারে নতুন কিছু একটা তুই দেখতে পাচ্ছিস না?’

   ‘ও মা! তাই তো! ওটা কী রে? ওকে কোথা থেকে আনলি দিদি?’

   পারুলমণি হেসে বলল, ‘ও হল সুনয়নী! তোর অন্ধ মাছের নাম তুই রেখেছিলি নয়নী! আমি আজ নয়নীর বন্ধু হবে বলে ওই মাছটাকে অমিতাভ সেনজেঠুর মাছঘর থেকে ভিক্ষে চেয়ে এনেছি! ওর নাম রেখেছি সুনয়নী। কেমন মিলিয়ে নামটা রেখেছি বল দেখি ভাই? আচ্ছা দ্যাখ তো ভাই, ওদের দুটো মাছের মধ্যে বেশ ভাব হয়েছে তো রে? আমি তো দেখতে পাই না! ’

   ‘ওদের দু’জনে খুব ভাব হয়ে গেছে রে দিদি?’

   ‘হবে না কেন? একজন চোখে সাগরের জলকণাও দেখতে পায় না, আরজন উত্তাল জলরাশি দেখতে পায়। কী মজা বল দেখি ভাই? আমি খুব ছোটবেলায় একটা আশ্রমের এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তুই তখন খুবই ছোট। বাবা তোকে নিয়ে যায়নি। আমাকে হাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বাবা। সেখানে একজন সন্ন্যাসী তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মাইক্রোফোনে। তিনি বলছিলেন, ‘এরকম এক অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানে দেখলাম, জন্মান্ধ একটি মেয়েকে হাতে ধরে নিয়ে সেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের হলে ঢুকল একটি ছেলে। ছেলেটি কিন্তু চোখে দেখতে পায়। শুনলাম, ওরা দু’জন খুব বন্ধু। মেয়েটি তো বই পড়তে পারে না। তখন ব্রেইল আসেনি আমাদের এদিকে। মেয়েটিকে ধর্ম সম্পর্ক বক্তৃতা শোনাতে নিয়ে এসেছিল ছেলেটি। কিছুদিন পরে শুনেছি, ওরা দু’জনে বিয়েও করেছিল! ওদের সঙ্গে পরে আমার দেখা হয়েছিল। আমি ওদের বুকভরে আশীর্বাদ করেছিলাম। আসলে কোনও কিছুর জন্যে পৃথিবীতে কারও কিছু আটকে যায় না! ঈশ্বর একজনকে চোখে দৃষ্টি দেননি তো কী হয়েছে, অন্ধ মেয়েটি ছেলেটিকে তো পেয়েছে! সে-ইই তো তাকে চক্ষুষ্মান করে তুলেছে। এখন ওদেরও জীবনও ফুলে-মুকুলে ভরে উঠেছে!’ বল ভাই, কী সুন্দর না গল্পটা! কিন্তু এ তো গল্প নয় রে, সত্যি!’

   লোকন মন দিয়ে দিদির মুখ থেকে শুনছিল সন্ন্যাসীর ভাষণ। লোকন ব্যাটে ছয় মারার আগে যেভাবে চোখ পিটপিট করে, এখন হঠাৎ চোখ পিটপিট করে লোকন বলল, ‘দিদি, তোকে একটা কথা বলব?’

   ‘কী বলবি, বল না!’

   লোকন গলায় জেদ এনে বলল, ‘আমি যখন আরও খানিকটা বড় হব, তারপর একদিন চোখে দেখতে পায় এমন একটা ছেলেকে খুঁজতে বেরোব। তাকে পেয়ে গেলে বলব, ‘আমার দিদি চোখে দেখতে পায় না! কিন্তু জানো, আমার দিদিটা খুব ভাল! তুমি আমার দিদিকে বিয়ে করবে?’

   ঠোঁটে টুকরো হাসি ঝরে পড়ল পারুলমণির। লোকন দিদির সেই হাসি দেখে বলল, ‘কী রে দিদি, তুই আমার কথা শুনে হাসছিস যে বড়? তুই দেখে নিস দিদি, একদিন...!’

   পারুলমণির গলায় গর্বের সুর ঝিলিক দিয়ে উঠল। বলল, ‘এই না হলে তুই আমার ভাই! পৃথিবীতে সব বোনেদের এরকম একজন করে ভাই থাকলে, তাদের কোনও দুঃখ থাকে না! এই জন্যে যেসব অন্ধ মেয়েদের কিছুই থাকে না, তোর মতো তাদের একজন করে ভাই থাকতে হয়!’

   তারপর একটু উদাসী হয়ে মুখ তুলে পারুলমণি বলল, ‘চল ভাই, আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়তে হবে। কাল স্কুলে তোর ক্রিকেট কোচিং আছে না? কাল তুই ক’টা ছক্কা হাঁকাস, এক ধারে বসে হাতের কর-গুনতে হবে তো!’

   লোকন চোখ বড়-বড় করে শাসনের ঢঙে বলল, ‘দিদি, তোকে কাল আবার অত কষ্ট করে গগনজ্যোতি স্কুলের খেলার মাঠে ক্রিকেট কোচিং দেখতে যেতে হবে না। দেখিস, আমি অনেক ছক্কা মারব! বাড়ি ফিরে তোকে সব গল্প করব!’

   সকাল হওয়ার আগে তখনও গাছপালার মাথায় রোদ এসে আদর মাখিয়ে যায়নি! পারুলমণি ঠেলা দিয়ে ঘুম থেকে তুলে দিল লোকনকে, ‘এই যে গগনজ্যোতি স্কুলের বৈভব সূর্যবংশী, এবার উঠে পড়ো! আজকের ক্রিকেট কোচিংয়ে তুমিই তো ‘সিক্সার কিং’, বেলা হল যে?’

   বেলা হতে তড়িঘড়ি করে ছুটল লোকন স্কুলে। যাওয়ার সময় পিছন ফিরে লোকন দেখল, পারুলমণি দরজায় ঠায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! দিদির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল লোকন। তার পরেই লোকন ভাবল, দিদি তো তার হাত নাড়া দেখতে পাবে না! তক্ষুনি লোকন মনে-মনে বলল, ‘আমার দিদি যদি সুদূর আকাশের নীলে মিশে থাকা বাবাকে দেখতে পায়, তবে এখন তার হাত নাড়া ঠিকই দেখতে পাবে! আমার দিদি তো ওরকমই!’

   স্কুলে পৌঁছতেই দেবোপমস্যার ক্রীড়াকৌমুদী রুমে ডেকে পাঠালেন লোকনকে ঘন্টিদাদুকে দিয়ে। লোকন ছুটল তক্ষুনি। লোকনের মনে চিন্তা উঁকি দিল, স্যার কি আজ কোচিংয়ে তাকে খেলতে নিষেধ করবেন নাকি? মুখ নিচু করে স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল লোকন, ‘স্যার, আমাকে ডেকেছেন?’

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘আমি তোমাকে ডাকলাম, তুমি তো জানো না, আজ আমাদের স্কুল মাঠে ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসবেন আমাদের নবীনগঞ্জ জেলার ডি এম সাহেব কর্ণার্জুন পাল। হেডস্যার সকালে ফোন করে আমাকে বলেছেন। লোকন, তোমাকে দারুণ খেলে দেখিয়ে দিতে হবে যে, তুমিও পারো। তুমি শুনেছ তো, ডি এম সাহেব নবীনগঞ্জ জেলায় একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চালু করতে চলেছেন? সেদিন তাঁর অফিয়ে একটা বনসড় মিটিং করে ঘোষণা করেছেন। আমাদের মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে ডেকেছিলেন ডি এম সাহেব। হেডস্যারও সঙ্গে ছিলেন। সেদিনই হেডস্যার ডি এম সাহেবকে আমাদের স্কুলের ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসতে ইনভাইট করেছিলেন। তাই আজ সময় বের করে তিনি আমাদের স্কুলে আসছেন কিছুক্ষণের জন্যে। আমি চাই, তোমার খেলা দেখে উনি যেন আজ থেকে তোমাকে টুর্নামেন্টের একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার বলে ভাবতে শুরু করেন। তোমার একজন বড় ফ্যান তো আছেনই, মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। তাঁর অনুরোধেই তো তোমাকে এক্সট্রা এক ওভার ব্যাট করতে দিয়েছিলাম সেদিনের কোচিংয়ে। আর আমাদের হেডস্যার তো তোমার খেলায় মুগ্ধ।’

   লাজুক মুখে লোকন বলল, ‘স্যার, আমি কি অত ভাল খেলতে পারব? ক্রিকেট নিয়ে আমিও স্বপ্ন দেখি স্যার! তাই যখন আমি সি-সেকশানের টিমে চান্স পেলাম না, তখন খুব ভেঙে পড়েছিলাম স্যার। বাড়িতে ফিরে দিদির কাছে খুব কেঁদেছিলাম। আমাদের দেবক সাহা দিদির বিয়েতে যদি ছুটি না নিত, তা হলে হয়তো স্যার আমার চান্সই হত না।’

   দেবোপমস্যার গলায় আবেগ এনে বললেন, ‘ওসব ভাবতে হবে না! কী হয়নি বা কী হল না, সে নিয়ে পিছন ফিরে তাকাতে নেই লোকন। মানুষকে সামনের দিকে তাকিয়ে এগোতে হয়। তবেই তো সামনের দিকটা স্পষ্ট দেখা যায়। তোমাকে নিয়ে এখন আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। আমরা তো ডি এম সাহেবের আন্তঃজেলা স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে দুটো টিম দেব বলে ভেবেছি। হেডস্যারের সঙ্গে এখনও কথা বলা হয়নি। একটা ছেলেদের ক্রিকেট টিম, আর-একটা মেয়েদের ক্রিকেট টিম। ছেলেদের ক্রিকেট টিম যেন টুর্নামেন্টের ফাইনালে ট্রোফি জিততে পারে—এই স্বপ্নই দেখতে শুরু করেছি আমি। আর সে স্বপ্ন কিন্তু তোমাকে ঘিরে। আর মে?এদের ক্রিকেট টিম তো কম যাবে না! কেননা, ইন্ডিয়ার মেয়েদের বিশ্বকাপ ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ জিতে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মেয়েরাও পারে!’

   আবেগে কোনও কথাই বলতে পারল না লোকন। এখন শুধু তার দিদির মুখটাই মনে পড়ল। দিদিও হেডস্যারের কাছে অনুরোধ করতে এসেছিল, যাতে তাকে স্কুলের ক্রিকেট টিমে নেওয়া হয়। আসলে তার দিদিও তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ভিতরে-ভিতরে কাঁপছিল লোকন। এতজনের আশা তাকে নিয়ে। সকলের আশা তাকে পূরণ করতে হবে। সে কি পারবে? ভিতরে-ভিতরে একটা অদম্য জেদ লোকনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে মুখ তুলে দাঁড়াল। মুখটা নিচু করে লোকন বলল, ‘স্যার, আমি আসি?’

   দেবোপমস্যার আশান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলেন লোকনের দিকে। তারপর বললেন, ‘ক্লাসে যাও!’

   ধীর পায়ে লোকন এইট সি-সেকশানের ক্লাস রুমে ঢুকতে দেবক কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘লোকন, দেবোপমস্যার কী বললেন রে? তুই আজ কোচিংয়ে খেলছিস তো? নাকি আমার আজ চান্স হবে? এখন ভাবছি, দিদির বাড়ি থেকে কেন যে পরেশনাথ পাহাড়ের চূড়ায় বেড়াতে গেলাম। ছুটি বাড়িয়ে নিতে হল।’

   দেবকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল লোকন। ‘হ্যাঁ’ কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারল না। চুপ করে নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়ল।

   শনিবার হাফ ডে। তার আগেই হেডস্যারের নির্দেশ মতো ঘন্টিদাদু সম্মতিচরণ দাস স্কুলের মাঠের একদিকে কর্পূর গাছের দিকটা ছাড়িয়ে একটা চাঁদোয়া টাঙাতে লেগেছেন। গ্রামের ছেলেরা এসে হাত লাগিয়েছে। গ্রামের লোকজনও শুনেছে আজ ডি এম সাহেব খেলা দেখতে আসবেন। গগনজ্যোতি গ্রামেরও তো একটা সুনাম আছে। ডি এম সাহেবের যেন কোনও সম্মানের ঘাটতি না হয়, সেদিকে  সকলের লক্ষ! 

   ইতিমধ্যে হেডস্যার ক’বার ঘুরে দেখে গেছেন। সারি করে চেয়ার পেতে দেওয়া হয়েছে। স্টাফ রুমের সব চেয়ার আজ খেলার মাঠে। একটা টেবিল রাখা হয়েছে চেয়ারের গ্যালারির সামনে। সে টেবিলের উপর বাংলার গীতিকা ম্যাম স্কুলের অফিস রুম থেকে ফুলদানিটা এনে রেখেছেন। ইতিহাসের অনুলেখা ম্যাম কোত্থেকে যেন ফুল তুলে এনে সে ফুলদানিতে সাজিয়ে দিয়েছেন। আজ এখনই মাঠে চলে এসেছেন দেবারতি ম্যাম, কনকলতা ম্যাম আর লতিকা ম্যাম। গ্রাম থেকে ছোট ছোট দলে লোকজন আসছেন। লোকন সেদিকে তাকিয়ে মনে-মনে ভাবল, যেন আজই ফাইনাল ম্যাচ!

   একটা মাইক বেঁধে দেওয়া হয়েছে কর্পূর গাছের নিচু ডালে। দেবোপমস্যা টেবিলে মাইক্রোফোনটা সেট করে দিয়েছেন। তিনি মাইক্রোফোনে ঘোষণা করে দিয়েছেন—‘আজ ক্লাস এইট এ-সেকশানের সঙ্গে সি-সেকশান খেলবে। যে দল টসে জিতবে, তারাই তাদের পছন্দমতো ব্যাটিং বা বোলিং বেছে নেবে। স্যার ঘোষণা করে দিলেন, এ-সেকশানের ক্যাপ্টেন রোরো মজুমদার টিমনিয়ে মাঠে চলে এসো! সি-সেকশানের ক্যাপ্টেনের নাম ঘোষণা করলেন দেবোপমস্যার, ‘সি-সেকশানের ক্যাপ্টেন লোকন দাস, তুমি তোমার টিম নিয়ে মাঠে চলে এসো!’ স্যারের ঘোষমা শুনে মাঠের সকলে অবাক!

   এম সাহেবকে আনতে গিয়েছেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। তিনি ফোন করে বললেন, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওঁরা মাঠে পৌঁছে যাবেন। সে ফোন পেয়ে হেডস্যার শশব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেবোপমস্যারের নির্দেশে মাইকে বেশ কম ভলিউমে গান বাজছে—‘বলো বলো বলো সবে, শতবীণা বেণু রবে...ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে!’ 

   এমন সময় ডি এম সাহেবকে নিয়ে গাড়িটা স্কুলের মাঠে ঢুকে পড়ল। ডি এম সাহেবকে অভ্যর্থনা জানাতে হেডস্যার গাড়ির কাছে ছুটে গেলেন। গাড়ি থেকে মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি নামলেল প্রথমে। তারপর নামলেন ডি এম সাহেব কর্ণার্জুন পাল। তক্ষুনি স্কুলের মেয়েরা তৈরিই ছিল। গীতিকা ম্যামের নির্দেশে স্কুলের মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে ডি এম সাহেবকে বরণ করে নিল। ডি এম সাহেব সরাসরি মাঠের ধারে চাঁদোয়ার নীচে রাখা চেয়ারে গিয়ে বসলেন। তাঁর ডান দিকের চেয়ারে বসলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। ডি এম সাহেবের বাঁ দিকের চেয়ারে বসলেন হেডস্যার।

   আজকের আকাশটা নীলে নীল সেজে সাদা মেঘের এক-একটি ছোট-ছোট দলকে পাঠাল গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট মাঠের মাথার উপরে। বাতাস বইছে সুদূর দক্ষিণ দিক থেকে। এবার দুটি 

টিমই তৈরি টস করার জন্যে। দেবোপমস্যার কাছে এসে ডেকে নিয়ে গেলেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতিকে ক্রিজের পাশে টস করার জন্যে।

( এর পর ২৪ পর্ব)


হাতে খড়ি 
দুরন্ত বিজলী 

ছোট্ট সোনা 
রাগ করে না 
এই ছবিটা দেখো।

খড়ি দিয়ে 
হাত ঘুরিয়ে 
ভালো করে লেখো ।

অ আ ক খ
লেখো লেখো
শিখে যাবে তুমি।

শিখবে যত
মনের মতো 
গড়বে জন্মভূমি।

ক্যুইজ: ৬

1. ভূটানের জাতীয় খেলা কি ? 
2. ভারতের ক্ষুদ্রতম রাজ্য কোনটি? 
3. ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানের নাম কি? 
4. ISRO র পুরো কথাটি কি? 
5. ভারত হকিতে এখনো পর্যন্ত কয়টি বিশ্বকাপ পেয়েছে?  

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 
১. ২০১৩ 
2. বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় 
৩. এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স 
৪. রাজ্য - ২৮ টি ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল - ৮ টি 
৫. ২০০৩ এর ১লা ফেব্রুয়ারি। স্পেস শাটল কলম্বিয়া।

Post a Comment

0 Comments