চিত্র- শুভম দাস
স্বপ্ন সন্ধানী
পুলককান্তি কর
- হ্যাঁ, এইবার আপনার নাম আর বয়স টা বলুন।
- আমার নাম সৌমেন মুখোপাধ্যায়, বয়স সাতান্ন।
- আপনার সমস্যাটা কি?
- স্বপ্ন...
- আপনি বেশী স্বপ্ন দেখেন - এটাই সমস্যা?
- ডাক্তার বাবু, ঠিক দু-লাইনে ব্যাপারটা বলা যাবে না। আমি জানি বাইরে আপনার রোগীর প্রচুর ভিড়, তবু ভালো করে না শুনলে আমি ঠিক সমস্যাটা বোঝাতে পারবো না। চাইলে আপনি অন্য কোনও চেম্বারের বা অফটাইমে আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে পারেন।
- না, না আপনি বলুন না। আমি শুনব। সময় দিয়েই শুনবো। আশ্বস্ত করলেন ডাঃ মিত্র। পীযুষ কান্তি মিত্র। খুব নাম করা নিউরো সাইকিয়াট্রিষ্ট।
- জানেন ডাক্তারবাবু, আমি নানান রকমের স্বপ্ন দেখি। মজার, ভয়ের, রোমান্টিক। আমার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে - আমি স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।
- নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, মানে?
- মানে ধরুন কোনও ভালো লাগার স্বপ্ন দেখছি। হঠাৎ কোনও কারণে ঘুম ভেঙে গেল। আমার একটু প্রস্টেট এর সমস্যা আছে। রাতে বাথরুমে উঠতে হয়। তো ঘুম ভেঙে যাওয়ার পরও যদি আমার মনে হয় ওই স্বপ্নটাকে আমি কন্টিনিউ দেখব - তাহলে আমি সেটা পারি।
- আজ যে স্বপ্নটা দেখলেন - তার কন্টিনিউইয়েশন কালকে দেখতে পারেন?
- হ্যাঁ। বেশীর ভাগ সময়েই পারি। কোনও দিন ধরুন ভয়ের স্বপ্ন দেখেছি, ভয়টা এক্সট্রিম পর্যায়ে চলে গেলে আমার অটোমেটিক ঘুম ভেঙে যায়।
- সেটা শরীরেরই মেকানিজাম মিঃ মুখোপাধ্যায়। স্বপ্ন তো আসলে ঘুমটা কন্টিনিউ করার একটা ফিজিওলজিক্যাল উপায়; ভয় যখন একটা থ্রেসহোল্ড ক্রস করে যায় তখন মনের একটা অংশ শরীরকে জাগিয়ে দেয়।
- এটা আমি পড়েছি ডাঃ মিত্র। আসলে আমি নিজে স্বপ্নচর্চা করি। ফলে এ সংক্রান্ত আর্টিক্যাল টার্টিক্যাল পড়ে থকি। আমি আসলে বলতে চাইছিলাম- এই ধরনের ভয়ের স্বপ্নও আমি ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আবার কনটিনিউ করতে পারি ভয়ের জায়গাটা একটু রেগুলেট করে।
- কীভাবে রেগুলেট করেন? বিষ্ময় প্রকাশ করলেন ডাঃ মিত্র।
- সে ঠিক বলতে পারবো না। মনের মধ্যে কিছু একটা সেটিং অটোমেটিক হয়ে যায় আমি চাইলে।
- বেশ ইন্টারেষ্টিং তো। তারপর?
- ব্যাপারটা মোটামুটি এই। এইবার সমস্যার কথাটা বলি। গত বছর দেড় দুই ধরে আমি মাঝে মাঝে একটা স্বপ্ন দেখছি-এক ঝলকের জন্য-কিন্তু সেটা আর চাইলেও কন্টিনিউ করতে পারছি না।
- কী রকম?
- একটা অচেনা মেয়ের মুখ। বছর চব্বিশ পঁচিশ হবে। মুখটার একটা ঝলক আসে কোনও এক স্বপ্নের মাঝে। স্বপ্নটা হয়তো কন্টিনিউড হয়, কিন্তু ওকে আর দেখতে পাইনা।
- মেয়েটি দেখতে কেমন? আপনার চেনা কারোর সাথে আদল মেলে?
- মুখটাই তো দেখতে পাইনা ডাক্তার বাবু। কোনওদিন এক ঝলক হয়ত মাথার এক সাইডে চোখ পর্যন্ত দেখলাম। পরের বার হয়তো তা বেড়ে ওই দিকের গাল পর্যন্ত এল।
- লাস্ট টাইম কবে দেখেছেন ওকে?
- এই তো কালই দেখলাম। কাল ঠোঁট অব্দি দেখেছি।
- ঠোঁটটা কেমন? চেনা কারোর মতন?
- খুব পাতলা ঠোঁট, ঠিক উল্টানো চাঁদের মত। মানে তৃতীয়া বা চতুর্থীর চাঁদকে যদি উল্টে দেওয়া যায় আকাশে, অনেকটা সেই রকম। হাসি হাসি মুখ - না না - হাসি হাসি না, কোথাও বিষন্নতা আছে বোধহয়!
- আপনি আমার কাছে কী চাইছেন মিঃ মুখোপাধ্যায়?
- আমি চাইছি ওই মেয়েটাকে খুঁজে পেতে। ওকে পরোটা দেখতে চাই।
- আপনি শিক্ষিত মানুষ। আপনি বুঝতেই পারছেন- এসব ওষুধসাধ্য নয়। আর আপনার মনকে রেগুলেট করার ক্ষমতাও তো আমার হতে নেই যে আমি তাকে কন্ট্রোল করে আপনাকে স্বপ্নে প্রোজেকশান পাঠাবো!
- তা নয় ডাক্তারবাবু। আমি চাই আপনি আমার মনের ভেতরটা খুঁজুন! আপনারা তো কাউন্সিলিং এ অভিজ্ঞ। যে সব টুকিটাকি আমরা সাধারণ মানুষ মিস করে যাই, আপনাদের অভিজ্ঞ চোখে নিশ্চই তা ধরা পড়বে।
- আপনি ওই মুখটা জানার জন্যই বা এত কেন উদ্গ্রীব মিঃ মুখোপাধ্যায়? ওটাতে তো আপনার জীবন আটকে নেই।
- বিষয়টা তা নয় ডাক্তার বাবু। কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে মনে মনে। মেয়েটা বারে বারে কেন আসছে স্বপ্নে? আর যদিও বা আসছে - আমার নিয়ন্ত্রণ কেনই বা তার উপর কাজ করছে না! আমি মোটামুটি স্বপ্ন সন্ধানী। আমি প্রতিটি স্বপ্নের কারণ বুঝতে চেষ্টা করি। এটা আমার নাগালের বাইরে চলে গ্যাছে ডাক্তারবাবু।
- ঠিক আছে। বিষয়টা আমাকেও আকৃষ্ট করছে মিঃ মুখোপাধ্যায়! আচ্ছা দাঁড়ান। মুখোপাধ্যায় বড্ড বড় শব্দ। কী নাম যেন বললেন? সৌমেন না? আমি আপনাকে সৌমেনবাবু বলেই ডাকবো।আচ্ছা আপনি থাকেন কোথায়?
- বিরাটীর দিকে।
- তাহলে এই বেহালায় এসেছেন কেন, এত দূরে? আমার তো এয়ার পোর্টের কাছেও চেম্বার আছে।
- আসলে আমার এক বন্ধু এই চেম্বারটার কথা বলল - সে আপনাকে এখানে দেখায়। আপনার নাম রেকোমেন্ড করল - তাই চলে এলাম। এবার থেকে না হয় এয়ার পোর্টেই দেখাবো। আপনার প্যাডে ওখানকার নাম্বার আছে তো?
- হ্যাঁ। আপনি এক কাজ করুন। আপনি নিশ্চই বাড়ী ফিরবেন এখন?
- হ্যাঁ।
- তাহলে একটু অপেক্ষা করে যেতে পারবেন? আমি পেশেন্টগুলোকে ছেড়ে দিই। তারপর একসাথে গাড়ীতে করেই ফেরা যাবে। আপনার সাথে তখনই কথাবার্তা বলা যাবে। আপনার কোনও অসুবিধে নেই তো?
- অসুবিধা আর কী? আমার গরুও নেই, গোয়ালও নেই। ঝাড়া হাত পা।
- তাও! প্রায় ঘন্টা দেড়েক বসতে হবে কিন্তু!
- কোনও ব্যাপার নয়। আপনি পেশেন্ট দেখুন। আমি বাইরে গিয়ে চা-টা খাই।
- ও কে।
ডাঃ মিত্র পরবর্তী পেশেন্টে মন দিলেন। সব রোগী সেরে উঠতে উঠতে প্রায় সওয়া আটটা হয়ে গেল তাঁর। সৌমেনবাবুকে নিয়ে গাড়ীতে উঠেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন, ‘নিশ্চই বোর হয়ে গেছেন?’
- না তেমনটা নয়। এই চা-টা খেয়ে একটু পায়চারি করলাম। আপনার এই চেম্বারটা পেরিয়ে কিলোমিটার দেড়েক হাঁটলে একটা ফাঁকা মতো জায়গা আছে - ওখানে গিয়ে বসলাম আধঘন্টা মতো।
- ওখানে বসে কী করলেন?
- কী আর করব? মন তো যোজনগামী। এটা ওটা ভাবলাম; আকাশ দেখলাম।
- আজকের স্বপ্নের রসদ জোগাড় করলেন বুঝি?
সৌমেন কিছু না বলে হাসল।
ডাঃ মিত্র আবার জিজ্ঞাসা করলেন, কী ভাবলেন?
- নির্দিষ্ট কিছু না। একটু ওই অদেখা মেয়েটির কথা ভাবলাম। তারপর আমার কালকে একটা ডিজাইন জমা করার আছে - সেটার কিছু মাইনুটস ছকে নিলাম। তারপর আকাশ দেখলাম।
- আকাশে কী দেখেন?
- মেঘের ঘরবাড়ী দেখি। চাঁদ দেখি। আজ একাদশীর চাঁদ। নজরুলের একটা গান আছে না - একাদশীর চাঁদ রে ওই রাঙা মেঘের কাছে? তাই দেখলাম।
- একাদশী বুঝলেন কি করে?
- আমি চাঁদের আকার দেখে বুঝতে পারি আজকের তিথি। এটা আমার বহুদিনের অভ্যেস।
- আচ্ছা - আপনি কিছু ডিজাইন জমা দেওয়ার কথা বলছিলেন, কিসের ডিজাইন?
- আমি পেশায় আর্কিটেক্ট। বিভিন্ন বিল্ডিং, অফিস, ঘর ইত্যাদির প্ল্যানিং ডিজাইনিং এর কাজ করি। আমার নিজেরই ফার্ম আছে কনসাল্টেশনের জন্য। বলেই সৌমেন তার একটি কার্ড ধরিয়ে দিল ডাঃ মিত্রকে।
- বাঃ, এই কার্ডটা বেশ সুন্দর বানিয়েছেন তো! এটাও কি আপনারই আঁকা আর ডিজাইন করা’?
- একটু আধটু আঁকারও অভ্যেস আছে আর কী! লাজুক গলায় বলল সৌমেন।
- আপনি বেশ শিল্পি মানুষ দেখছি! অবশ্য শিল্পি মন না হলে স্বপ্নের মতো জটিল জিনিসকে ধাওয়া করা বেশ কষ্টের! আপনি সন্ধেতে খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন। আমি খেয়াল করেছি, তবে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারিনি তখন!
- কী কথা?
- ‘স্বপ্ন সন্ধানী’। আপনি স্বপ্ন সন্ধান করেন।
- জানেন তো ডাঃ মিত্র, সন্ধান কথাটার দুটো অর্থ। এক তো খোঁজা - এটা সবাই জানে। দ্বিতীয় অর্থ হল - জোড়া, বন্ধন করা - যেমন ধরুন ‘ভগ্ন সন্ধান’ – মানে ভাঙা জায়গাকে জোড়া - আপনারা যেমন হাড় ভাঙলে জোড়েন, সেইরকম! সন্ধানের আর এক মানে অবশ্য আছে - সেটা হল ফার্মেন্টেশন করার একটা পদ্ধতি - এটা অবশ্য অনেকেরই অজানা।
- আমিও ‘খোঁজা’ মানেটাই জানতাম সৌমেন বাবু। আপনি তো শব্দসন্ধানীও বটে! যাক্, আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগলো খুব। আচ্ছা কাজের কথাতে আসি এবার! আজ আপনি কি স্বপ্ন দেখলেন রাতে?
- মানে গত রাতের কথা বলছেন কি? আমি আবার দিন রাতটা বাংলা মতেই ভাবি।
- হ্যাঁ। গত রাতের স্বপ্নের কথাই বলতে চাইছি।
- গত রাতে এমনি হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছি। তবে যেটুকু আমার মনকে ষ্ট্রাইক করেছে সেটুকু বলি। আমি দেখলাম আমাদেরই পাড়ার এক দাদা – আমাদের বাড়ীর গেটে দাঁড়িয়েছে। আমি ওর কাছে যাব বলে পাঁচিলের উপর চড়েছি। পাঁচিলটা এমন কিছু উঁচু নয়, পাঁচ ফিটের মতো হবে। লাফ দিতে গিয়ে দেখি ওটা প্রায় দু-তলার সমান উঁচু হয়ে গেল। হঠাৎ দেখলাম ওটা আর পাঁচিল নেই - ওটা হয়ে গেছে আমাদের বাইরের দেওয়ালের কার্নিশ। হঠাৎ ভয় হতে লাগল এত উঁচু থেকে যদি পড়ে যাই? অমনি দেওয়াল ধরে ধরে গুটি গুটি হাঁটতে শুরু করলাম। ভয়ে আর নীচে তাকাচ্ছি না! ভাবছি, পড়লে নির্ঘাত মাথাটা ফাটবে। মনে মনে তৈরী হচ্ছি, পড়লে কীভাবে মাথাটাকে বাঁচাবো - হঠাৎ দেখি নীচে বিরাট এক নদীর মতো - ঠিক নদী না – চিল্কা হৃদের মতো! ঘুমটা ভেঙে গেল তখনই। তার ঠিক আগেই এক ঝলক মেয়েটিকে দেখলাম।
- আপনি কি স্ট্রেসের মধ্যে আছেন?
- স্ট্রেস কার নেই ডাক্তার বাবু? তবে স্ট্রেসকে আমি সেভাবে মাথায় নিই না। আমার বিরাট কোনও অ্যাম্বিশন নেই। এটা হব- সেটা হব - এমনও ভাবিনা। এমনি আমার ফার্ম এর সুনাম আছে - কাজেরও অভাব নেই। সব সময় আমি বিন্দাস থাকি।
- আপনার স্বপ্নে কি এধরনের ভীতিপ্রদ ব্যাপার বেশী আসে?
- না - তেমনটা নয়। যখন যেমন আর কী! কিছু কিছু স্বপ্ন আমি রিপিটেডলি দেখি। আমার বিশ্বাস, এই স্বপ্ন আরো অনেক মানুষ দেখেন- আপনি ভালো বলতে পারবেন ব্যাপারটা।
- কী স্বপ্ন?
- এই যেমন আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি। আড়াই ঘন্টা হয়ে গেছে সবেমাত্র একটা কোশ্চেন এর অ্যানসার লেখা হয়েছে - চেষ্টা করছি - কিন্তু সময়ে শেষ করতে পারছি না!
- এই স্বপ্ন মানুষ বৃদ্ধ বয়সেও দেখে। আসল ব্যাপার হল - ছোটবেলার পরীক্ষা ব্যবস্থা এমন ভাবে মাথায় গেঁথে গেছে আমাদের, যে কোনও টাইট সিচুয়েশনে এই প্রতিচ্ছবিটাই সাবকনসাস আমাদের জানান দেয়।
- আরেকটা স্বপ্নও আমি প্রায় দেখি। ওই পথের পাঁচালির সিনটার মতো - আমি আর দুর্গা দৌড়োচ্ছি - কাশবন নলবন পেরিয়ে দিগন্তের দিকে। ওই দিকে ছুটছি তো ছুটছিই! অন্তহীন দিগন্তহীন!
- আপনার কি কোনও দিদি ছিল?
- না। আমি বাবা মা’র একমাত্র সন্তান।
- ওই যে ‘দুর্গা’ বললেন, ওর মুখ দেখতে পান? কোনও পাড়াতুতো দিদি-ফিদি’র মতো বা অন্য কারও মতো?
- না - ওটা ওই সত্যজিৎ রায়ের ফিল্মের দুর্গার মতোই দেখতে।
- ওই মেয়েটার সাথে কি আপনার স্বপ্নের মেয়েটির মিল পান কোনও?
- না, না। ও তো টিন এজ। আমি যাকে দেখি, ও যুবতী। চুলফুল দেখি - বেশ এখনকার মেয়েদের মতো স্টাইলিশ্। ঘন কালো। ওই চুল দিয়েই তো ঢেকে থাকে মুখের বাকী ভাগটুকু!
- আপনি যা বললেন - তাতে দাঁড়াচ্ছে - মেয়েটি রহস্যময়ী! ঘন কালো চুলে মুখের একটা অর্ধ ঢাকা। ঠোঁট গুলো পাতলা, উল্টানো চাঁদের মতো। তাই তো?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা - এমন কোনও মেয়ে আপনার পরিচিতদের মধ্যে আছে?
- না।
- আপনি বলছিলেন - আপনি ঝাড়া হাত পা। মানে, আপনি কি অবিবাহিত?
- না না। বিয়ে করেছিলাম। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে - তাও প্রায় পঁচিশ বছর হয়ে গেল।
- এই মুখ কি আপনার স্ত্রীর সাথে মেলে?
- একদমই মেলে না। আমার স্ত্রীর ঠোঁট ঠিক মনে করতে পারি না। ফটো-টটোতে যা দেখি তা বেশ পুরু বলেই তো মনে হয়।
- আপনার স্ত্রী সম্বন্ধে একটু বললে ভালো হয়। আসলে আপনার সম্বন্ধে ভালো মতো না জানলে আপনার মন পড়া আসুবিধা হবে।
- কী জানতে চান, বলুন!
- আপনি আপনার স্ত্রীকে মিস্ করেন?
- ঠিক বুঝি না। তার চলে যাওয়াও হয়ে গেল পঁচিশ বছর। আমি যে রোজ ওকে মনে করি এমন নয়। মৃত্যু বার্ষিকীও আমি ভুলে যাই মাঝে মাঝে।
- যে বছর মনে থাকে, কী করেন?
- কী আর করব? ফটোর সামনে ধূপ-টুপ দিই, মালা পরাই। ও রাবড়ি ভালোবাসতো - ওই টা এনে ফটোর সামনে দিই - ব্যস।
- আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ?
- না না, কোথায় লাভ! আমার স্ত্রী দুলু একচুয়ালি আমাদের বাড়ীর মেইড- ছবি মাসীর মেয়ে। আমার বাবা যখন মারা যান, আমি তখন আহমেদাবাদে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়াশুনো করি। তখন ছবি মাসি দিন রাত আমাদের বাড়ীতেই থাকতো, মাকে দেখাশুনো করতো। ছবি মাসির বর ওকে দেখতো না। ফলে মা-মেয়ে দুজনেই আমাদের বাড়ীতে আশ্রিতা ছিল। তখন দুলুর বয়স কত! এগারো বারো হবে - কী আর একটু বেশী। ওরা ছিল বলে আমি নিশ্চিন্তে এম.টেক করলাম, একটা চাকরীতেও জয়েন করলাম আহমেদাবাদে। এর মধ্যে একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে দুলুর মা গত হলেন। তখন দুলুই মাকে দেখেশুনো করত। এভাবে বছর ছয়েক কেটে গেল। হঠাৎ মা-ও মারা গেলেন। আমি বাড়ী যখন পৌঁছাই, তখন দেখি একা মেয়ে বডি আগলে বসে আছে। ফ্লাইট ম্যানেজ করে বাড়ী পৌঁছতে পৌঁছতে তো আমার প্রায় একদিন লেগে গেছিল। পাড়া প্রতিবেশীরা ছিলেন - তবে যা হয় আর কী! পাড়ার মানুষ-জন আর কতক্ষণ পাহারা দেবে? শ্রাদ্ধ-শান্তি মিটে যেতে ভাবলাম – দুলুকে নিয়ে কী করব? কুড়ি একুশ বয়সের মেয়েকে তো এভাবে বাড়ীতে রেখে যাওয়া যায় না! আমিই বা কতদিন ওকে পাহারা দেব? তাছাড়া যে সমাজে বসবাস করি – তারাই বা ভালো চোখে দেখবে কেন? অগত্যা দুলুকে নিয়েই আহমেদাবাদ রওনা দিলাম। সবাইকে পরিচয় করে দিলাম আমার স্ত্রী বলে! আমারও রান্নাবাড়ীর জন্য কাউকে দরকার, ওকেই বা বিয়ে দেব কী করে? বাবা-মা কেউ নেই। একদিন ভাবলাম বিয়েটাই করে নিই ওকে। দুলুকে একথা বলতেই - ও কী করবে ভেবে পেল না! লজ্জায় পালিয়ে গেল অন্য ঘরে। যখন আবার বললাম, বললো - আমি তো তোমায় ছোটবেলায় রাখী পরিয়েছি – দু একবার ভাইফোঁটাও দিয়েছি – তার কী হবে? আমি বললাম - রাখী সবাইকে পরানো যায়। রবি ঠাকুর সবাইকে রাখী পরিয়েছিলেন জানো তো? ও বলল- ‘জানি, আমি ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়েছি। আর ভাইফোঁটা?’ আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম। বললাম - আমি এমন দশজনকে দেখিয়ে দেবো যারা ছোটবেলায় ভাইফোঁটা দিয়েও যৌবনে তার সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছে। ছোটবেলায় পাড়াতুতো সম্পর্কে অনেকে এমন ফোঁটা দিয়ে থাকে। মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে নিলাম। বছর তিনেকের দাম্পত্য আমাদের।
ডাঃ মিত্র জিজ্ঞাসা করলেন – কেমন দাম্পত্য ছিল আপনাদের?
- দুলু সব সময় কেমন সিঁটিয়ে থাকতো। ও আসলে আমাকে ঠিক স্বামী হিসাবে না ভেবে প্রভূ টাইপের ভাবতো। আমি ওকে ছুঁলে বা আদর করতে গেলে কেমন কুঁকড়ে যেত, আমি বলে বোঝাতে পারবো না। ওকেই কি ব্রীড়ানম্র বলে? এটা লজ্জা নাকি হীনমন্যতা বুঝতে পারিনি আমি কোনও দিন’
- আপনি কখনও বোঝাননি?
- বহুবার। ও মাধ্যমিক পাশ ছিল বলে যে মূর্খ ছিল তা নয়। গল্প কবিতার বই পড়ত। নিজেকে আমার যোগ্য করে তোলার চেষ্টা সে করত। আমি এই নিয়ে কখনও তাকে লজ্জা দিতাম না।
- সত্যি করে বলুন তো, এই নিয়ে আপনার কোনও খারাপ লাগা ছিল না?
- সত্যি ছিল না। দেখুন ডাক্তার বাবু আমি একরকম ভাবে বিষয়গুলো দেখি। আমার স্ত্রীর যোগ্যতা কী হওয়া উচিত? সে আমার পরিবারে স্ত্রী সুলভ কাজে পটু কিনা, আমার যত্ন বা খেয়াল রাখে কিনা – এই তো? ওর এম.এ, এম.এস.সি পাশ দিয়ে আমার কী হবে? ওকে কি আমি চাকরী করতে পাঠাবো - নাকি সাজিয়ে দেখাবো - দ্যাখো আমার বউ এম.এস.সি পাশ! ওর ডিগ্রী আমার সংসার চালানোতে কী কাজে লাগবে? বরং দেখা উচিৎ সে আমাকে ভালোবাসে কিনা? সে মানুষ হিসাবে কেমন - এই সবই না? দুলু মানুষ হিসাবে ভালো ছিল, আমার স্ত্রী হিসাবে আমার মনের মতোই ছিল।
- উনি মারা গেলেন কিভাবে?
- বিয়ে করার দু বছর পর ও সন্তানসম্ভবা হয়। ডাক্তার দেখানো নিয়মিতই হ’ত। শেষের দিকটা ডাক্তার বলতেন আই.ইউ.জি.আর। শিশুর নাকি গ্রোথ হচ্ছে না ঠিক মতো। সিডিউলড ডেটের মাসখানেক আগে ও একটি মৃত কন্যা সন্তান প্রসব করে। তখনই টক্সিমিয়া হয়ে তার দু-তিন দিনের মধ্যে দুলুরও মৃত্যু হয়।
- আচ্ছা সৌমেন বাবু – দুলুদেবীর মৃত্যুর পর আপনি আর বিয়ে করেননি কেন? দাম্পত্য তো একটা অভ্যাস!
- আসলে ছোটবেলা থেকে আমার বিয়ের প্রতি খুব একটা আকর্ষণ ছিল না। দুলুকে কী পরিস্থিতিতে বিয়ে করেছি, তাও আপনাকে জানিয়েছি। আমি বেসিক্যালি বর্তমান নিয়েই বাঁচি। সেই পরিস্থিতিতে মনে হয়েছিল – আমার বিয়ে করাটা জরুরী। যখন দেখলাম – কেউই আর রইল না পিছুটানের, তখন মনে করলাম – এরকম জীবনও বেঁচে দেখি।
- আপনার মনে হয় না, বিয়ে করলে আপনার একজন মনের সঙ্গী হত। দুলু দেবীর সাথে নিশ্চই আপনার মানসিক নৈকট্য ছিল না?
- ডাক্তার বাবু, মাফ করবেন! আপনি নিশ্চয়ই মানসিক নৈকট্য না থাকার কারণ হিসাবে ওর পড়াশুনোকেই দায়ী করছেন তো?
- মানে যারা বেশী পড়াশুনো করে তারা আপনার কোনও পড়াশুনোর বিষয়ের সাথে বা আপনার প্রিয় কোনও কবিতা উপন্যাসের সাথে কোনও ভাবে কো-রিলেট করতে পারে, অ্যাটলিস্ট করার একটা সম্ভাবনা থাকে। আপনি তার সাথে আপনার ফিলিংস শেয়ার করতে পারেন।
- আমি একদমই সহমত নই ডাক্তারবাবু। মানুষের মেন্টাল মেক-আপ তথাকথিত শিক্ষার উপর একদমই ডিপেন্ড করে না বলেই আমি মনে করি। সাঁওতাল দিনমজুর যারা, তারা এমনকি তাদের লিপিটুকু হয়তো জানে না, কিন্তু তারা কি চাঁদ দেখে মাদল বাজায় না? বাঁশীতে সুর তোলে না বাতাসের বিরহে? যারা ঘটনাক্রমে শিক্ষিত, আমরা ভুল করে সেইটাকেই শিল্পি মনের কারণ বলে ভেবে ফেলি। এটা আমাদেরই মোহ। এটা ঠিক, আমাদের মানসিক গড়নের মিল ছিল না। ও অনেক বেশী ঘরোয়া, যাকে বলে ‘গৃহকর্মে নিপুনা’ টাইপের ছিল। গাছ-পাতা-চাঁদ- এসব ওর কাছে জাগতিক বিষয়ের একটা অঙ্গমাত্র ছিল। এর বেশী কিছু ছিল না। কিন্তু তাতে আমার দাম্পত্যে কোনও সমস্যা হয়েছে বলে তো আমার মনে হয়নি। পৃথিবীতে বহু সুখী দম্পতি আছে- যারা পরস্পরের মননশীলতার একেবারে বিপরীত। আবার এমন বহু দম্পতিকে আমরা জানি যারা একই মননের লোক – অথচ সুখে নেই। দুই কবি একসাথে ঘর করতে পারে? দুই চিত্রশিল্পি একসাথে বেশী দিন থাকতে পারবে? তখন তো বলবেন – ‘বনষ্পতি রাখে ব্যবধান বাড়িবার তরে’।
- আচ্ছা না হয় আপনার কথাই মানলাম। কিন্তু সৌমেনবাবু, আপনি এখন নিঃসঙ্গ বোধ করেন না? এমন কি মনে হয় না, আগে বাড়ীতে একটা কথা বলার লোক ছিল! এখন কারুর না থাকাটা আপনাকে পীড়া দেয় না?
- না ডাক্তারবাবু। আমি বেসিক্যালি নিঃসঙ্গতা ভালোবাসি। আমি একা থাকতে ভালোবাসি। যখন দুলু ছিল - তখন একরকম ছিল। আর তাছাড়া, মানুষ বিয়ে করলে বুঝি মনে মনে একা হতে পারে না?
- সৌমেনবাবু, এই আপনার বিরাটী আসছে। আপনি আজ নেমে যান। কালকে আমার সল্টলেকে চেম্বার আছে সন্ধে সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে আটটা। আপনি সাড়ে আটটায় ওখানে আসুন। আজকের মতো একসাথে ফিরতে ফিরতে কথা বলব। অসুবিধে নেই তো?
- না না। কালকে কি ওখানে নামটা লিখিয়ে রাখব ফোন করে?
- আরে না না। আপনাকে তো আর চেম্বারে দেখব না – নাম লেখাবেন কেন?
- আপনি কোথায় যাবেন ডাক্তারবাবু?
- আমার বাড়ী বারাসাত।
- আমি কি আপনার সাথে যাব বারাসাত অব্দি? আমার কোনও তাড়া নেই।
- আরে এত অস্থির হওয়ারও কিছু নেই। আগে আপনার বিষয়ে ভালো মতো জানি, তবে তো সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে পারবো। আরও দু-তিন দিন আসতে হতে পারে কিন্তু।
- ও ঠিক আছে। গুড নাইট ডাক্তারবাবু।
- গুড নাইট।
পরের দিন ঠিক সাড়ে আটটায় সৌমেন হাজির হল ডাঃ মিত্রের চেম্বারে। তখনও একটা দুটো পেশেন্ট বাইরে বসে। ডাক্তার মিত্র ফ্রি হতেই ভেতরে ডাকলেন সৌমেনকে। বললেন, ‘আসুন- একটু কফি খেয়ে রওয়ানা দেব। খাবেন তো?’
- হ্যাঁ, খাওয়া যেতে পারে।
কফি খেতে খেতে ডাক্তার মিত্র জিজ্ঞাসা করলেন-
- আজ, আই মিন গত রাতে কী স্বপ্ন দেখেছেন?
- কালকের স্বপ্নটা ভারী অদ্ভুত ডাক্তার বাবু। দেখলাম - গাঢ় নীল আকাশ। আকাশে একটাও মেঘ নেই। একটা পাখী – বোধহয় বাজপাখি, কেবল উড়ছে – এ দিগন্ত থেকে ও দিগন্ত। আস্তে আস্তে সন্ধে হয়ে এল। পাখী তবুও উড়ছে। হঠাৎ আকাশে চাঁদ দেখা দিল – আর আমি পাখীর বদলে উড়তে শুরু করলাম। আমার হাত দুটোই ডানা হয়ে গেল। আমি মাটি থেকে ক্রমাগত উপরে উঠছি – উঠছি - ঠিক চাঁদের কাছে পৌঁছে যেই হাত বাড়াতে গেছি - দেখি ওখানে কেবল উঁচু নীচু পর্বত; মাটি নেই একটুও। হঠাৎ একটা রকেটের মতো কিছু এল – আমি ওতে চড়ে বসলাম – সাঁ সাঁ করে তীব্র গতিতে ওটা নামতে লাগলো মাটিতে। বায়ুমণ্ডলের কাছে এসেই হঠাৎ আগুন। ঘুম ভেঙে গেল তখনই।
- আপনি এই স্বপ্ন আর কন্টিনিউ করেননি?
- হ্যাঁ। বাথরুম ঘুরে আবার যখন শুলাম – তখন দেখি – আমি আগুন পাখী হয়ে গেছি। আর নীচ থেকে আবুল বাশার বলছেন – দেখ দেখ, তোকে তো আমি লিখেছিলাম – তুই বই থেকে পাখী হয়ে গেলি কী করে রে ভোলা?
- বইটার লেখক কি আবুল বাশার?
- না। ওটা লিখেছেন হাসান আজিজুল হক। তবে স্বপ্নে আমি আবুল বাশারকে দেখেছি।
- আপনার নাম ভোলা নাকি?
- মা মাঝে মাঝে ডাকতো ‘ভোলা’ বলে।
- আবুল বাশারকে কি আপনি চেনেন? বা উনি আপনাকে?
- না না। ওঁর ছবি দেখেছি। সাক্ষাৎ দেখিনি কখনও।
- আচ্ছা সৌমেনবাবু – স্বপ্ন থেকে উঠে আপনার কেমন ফিলিংস হয়?
- যেদিন যেমন স্বপ্ন দেখি – সেরকম। যেমন আজ সকাল থেকে কেমন একটা শূন্যতা এসে গ্রাস করেছে আমাকে।
- আপনি কি বিষাদ ভালোবাসেন?
- আমি বেসিক্যালি একটু দুঃখবিলাসী ডাক্তার বাবু। অকারণ আমার মন খারাপ হয়ে যায়। হয়তো যখন মন খারাপের জেনুইন কোনও কারণ থাকে – তখন আমার মন খারাপ হয় না। কিন্তু ধরুণ – আজ প্রবল জ্যোৎস্নায় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে – আমি একটা ফাঁকা জায়গায় গাছের তলায় বসে আছি – নিশ্চিত ভাবে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কেবল মনে হয় – এই আলো, এই জ্যোৎস্না আমি ভোগ করতে পারছি না – সব চলে যাচ্ছে – সব ফুরিয়ে যাচ্ছে।
- আপনি কি মৃত্যুকে ভয় পান?
- না। একদমই না। আমারও কবিগুরুর মতো মনে হয় ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান।’
- আর কিসে আপনার মন উদাস হয়? বা আপনি বিষন্ন হ’ন?
- ধরুণ – একটা গান কেউ গাইছে। তার কোনও এক জায়গা এমন ছুঁয়ে গেল ভেতরে – যে আমার মন টান মেরে ছিঁড়ে দিল সব আগল। হঠাৎ কোথাও বেহালার ছড় – এমন একটা স্বর ছেড়ে দিল বাতাসে – আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। চোখ থেকে জল বের হয়ে যায় তখন।
- এটা কি আপনার ইদানীং হয়েছে? নাকি বরাবরের?
- এটা বরাবরের ডাক্তারবাবু। ছোটবেলায়ও এমনি ছিল। দিনের পর দিন আমি এমনই এক খোলসের মধ্যে কাটিয়ে দিতাম। কথাই বলতাম না হয়ত বহুদিন কারোর সঙ্গে।
- কীভাবে ঠিক হতেন?
- নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যেতো। আমার এই মুডের জন্য বাবা-মা চিন্তা করতেন, ডাক্তারও দেখিয়েছেন দু-একবার। আসলে আমারও এক একবার মনে হতো, এটা কি কোনও পাগলামির লক্ষণ? আপনার কী মনে হয় ডাক্তার বাবু?
- শিল্পি মানুষরা এই ধরনের এক সত্ত্বা নিজের মধ্যে তৈরী করে তার মধ্যে বসবাস করতে পারেন। এটা তাঁদের অর্জিত একটা ক্ষমতা। একে পাগলামি বলা ঠিক হবে না।
- জানেন ডাক্তারবাবু – কোনও কিছু অতি নিখুঁত হলেই সেটা আমার মনকে ছোঁয়। বোধহয় সেটাই আমার বিষাদের কেন্দ্রকে নাড়িয়ে দেয়।
- আচ্ছা চলুন। বাকী কথা পথে যেতে যেতে হবে।
গাড়ীতে বসে ডাঃ মিত্র বললেন ‘আপনার কোনও প্রিয় বন্ধু বা বান্ধবী আছে?’
- না। সেই অর্থে প্রিয় যাকে বলা হয়, সেরকম কেউ নেই।
- কেন? মনের তরঙ্গে মেলে না?
- হয়তো মেলে না; হয়তো মেলাতে চাই না। আমার মতো করে ভাবেন – এমন লোক কি পৃথিবীতে নেই? আছেন নিশ্চই – কিন্তু সেই ‘এক কহে আরেকটি একা কই একা/শুভযোগে কবে হব দুঁহু হায়’ – সেই ফিলিংস আমার হয় না।
- ধরুণ দুলু দেবী – তিনিও কি সেই প্রিয়ত্বের জায়গায় পৌঁছতে পারেননি?
- না। এক একটা সম্পর্কের জন্য আমার এক একটা অলিন্দ, এক একটা দরজা। সবার জন্য যে দরজা থাকবে এমনও নয়। হয়তো শুধু অলিন্দই আছে। কারোর জন্য অবাক কান্ড – দরজা আছে, অলিন্দ নেই। সবার জন্য সব খেলা নেই আমার।
- আপনি যখন স্কুল কলেজে পড়তেন, প্রেমে পড়েন নি? বা কেউ আপনার প্রেমে পড়েনি?
- তেমন করে কিছু মনে পড়ে না। বোধহয় আমি রিজার্ভড ছিলাম বলে, কেউ আমাকে অ্যাপ্রোচ করার সাহস পায়নি। তাও বন্ধু-বান্ধব কারুর কথা বললে ওগুলোকে আমি ‘নাদানি’ ভেবে আমল দিতাম না।
- আপনি কি বয়সের তুলনায় পক্ব ছিলেন?
- হয়তো বা।
- আপনার কাউকে ভালো লাগেনি?
- লেগেছিল তিন-চারজনকে।
- যেমন ?
- আমি যখন ফার্ষ্ট ইয়ারে পড়ি – সোমা বলে একটি মেয়ে ছিল – ভালো গান করতো – ওকে আমার বেশ ভালো লাগতো।
- কেমন দেখতে ছিল মেয়েটি?
- বেশ সুন্দর দেখতে, রোগা ফর্সা, কারলি হেয়ার।
- ঠোঁট দুটো কেমন।
- কী জানতে চাইছেন? স্বপ্নের মেয়েটির মতো কিনা?
হাসলেন ডাঃ মিত্র। সৌমেন বলল, ‘পাতলা ঠোঁট ছিল বটে তার, তবে স্বপ্নের মেয়েটির মতো নয়।
- এটা প্রেমে পরিণত হ’ল না কেন?
- ভালো লাগলেই কি প্রেম করতে হবে ডাক্তারবাবু? তাছাড়া ওর বয়ফ্রেন্ড ছিল। ভালো গাইতো, আমার প্রিয় গান গুলো শুনতে চাইলে যত্ন নিয়ে শোনাতো বলে আমার হয়তো একটা ভালোলাগা তৈরী হয়েছিল ওর প্রতি।
- আর?
- আরেকটি মেয়ে ছিল - ওর নাম ছিল দিমানী। ও গুজরাটি। একবার একটা মিউজিক কমপিটিশানে ও আর আমি একই গ্রুপে ছিলাম। এক-দুমাস বেশ একটা ইনফ্ল্যাচুয়েশান ছিল তার প্রতি। এক সময় সেটাও কেটে যায়।
- কেটে যাওয়ার কারণ কি? আপনার মুড?
- হতে পারে। আমার এম.টেক করার সময় একজনের সাথে বেশ গভীর সম্পর্ক হয়েছিল। ও বাঙালী। ওর নাম ছিল সেঁজুতি। ও ভালো লিখতো। ওর সাথে কাব্যচর্চার কারণে বেশ ভালো রিলেশান হয়েছিল। ও আমাকে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়েও ছিল- ও একটা স্থায়ী সম্পর্ক গড়তে চায় আমার সাথে। কিন্তু আমি খুব একটা উৎসাহ দেখাই নি।
- কেন?
- বিয়েটা আমার কেমন বন্ধন মনে হত। মনে হত এতে আমার ওড়ার পরিসর থাকবে না একটুও।
- দুলু দেবীর সাথে বিয়ের পর সে ধারনা কি আপনার বদলে ছিল?
- আসলে দুলু আমার কোনও কিছুই বাঁধতে চাইতো না। হয়তো সেটা চাওয়ার সাহসও বোধহয় বেচারা পায়নি কোনও দিন। ফলে ধারণা বদলাবার সুযোগও হয়নি কখনও।
- দুলুদেবী যে বাঁধতে চাইতেন না – সেজন্য কি দুঃখ হত আপনার? মনে কি হ’তো – আহা বাঁধলেই ভালো হ’ত?
- না। তেমনটা কোনওদিনই মনে হ’ত না। তেমন হলে আমি দুলুর প্রতি বোধহয় রুষ্ট হতাম।
- সেঁজুতি এরপর কী করলেন? বিয়ে?
- বোধহয়! আর খবর রাখিনি তারও।
- তিনি কি কোনও ভাবে স্বপ্নের মেয়েটির মতো?
- না। ওর আদল একেবারেই অন্যরকম ছিল। গোলগাল ঠাকুর-ঠাকুর।
ডাঃ মিত্র বললেন, সৌমেনবাবু – বিরাটী আসছে এবার। নামুন।
- কবে আসবো আবার?
- জানাবো ফোন করে। আপনার কার্ডটা তো আছে আমার কাছে।
সৌমেন নেমে গেলো বিরাটীতে। ডাঃ মিত্র নানান কোণ থেকে ভাবতে লাগলেন সৌমেনের বিষয়টাকে। ভদ্রলোক সত্যিই বেশ ইন্টারেস্টিং। এমন মানুষও পৃথিবীতে আছে? পেশার প্রয়োজনে তিনি বহু মানুষের সাথে মেশেন, কিন্তু ‘স্বপ্ন-সন্ধানী’ কাউকে জানেন বলে মনে করতে পারলেন না। অনেক ভেবে ডাঃ মিত্র ধারণা করলেন সৌমেন মুখোপাধ্যায় আদতে একজন সত্যিকারের শিল্পি মনের মানুষ। সৃষ্টিশীল লোক। কোনও কিছু সত্যিকারের সৃষ্টি না হতে পারাটাই হয়তো অবচেতনে ভদ্রলোককে তাতিয়ে রাখে। বাড়ীর এক্সটিরিয়ার ইন্টিরিয়ারের বাহাদুরি দিয়ে এই শিল্পি সত্তার সন্তুষ্টি হচ্ছে না কোনও ভাবেই। তবে মেয়েটি কে? সে ধীরে ধীরে ধরা দিতে চেয়েও দিচ্ছে না কেন? একি কোনও স্বপ্ন প্রতিমা? অবচেতনে রাখা কোনও নারীর আদল?
খেতে বসেও এই চিন্তা থেকে নিজেকে সরাতে পারলেন না তিনি। ঘুমোতে গিয়েও প্রতিটি ঘটনা মনে করলেন পুঙ্খানুপুঙ্খ। হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন তিনি। মোবাইলটা নিয়ে ছাদে উঠে এলেন প্রায় নিঃশব্দে। যাক - পাশে স্ত্রী’র ঘুম ভাঙেনি। আকাশে দেখলেন আধখানার একটু বেশী চাঁদ এখনও আকাশে। মোবাইল জ্বালিয়ে দেখলেন রাত প্রায় দেড়টা। সৌমেনের নাম্বারটা খেতে বসার আগেই সেভ করে রেখেছিলেন মোবাইলে। রিং করলেন ওকে – ‘ হ্যালো – সৌমেনবাবু?’
- হ্যাঁ। এত রাত্রে? কোনও দরকার আছে ডাক্তারবাবু?
- স্যরি! এতরাত্রে কল করলাম। আপনি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?
- না। ছাদে এসেছি।
- কেন? চাঁদ দেখতে?
- ওই আর কী! ঘুমটা আজ আসছে না একেবারেই। সাড়ে এগারোটা নাগাদ শুতে গিয়ে আজ আবার সেই মেয়েটিকে দেখলাম স্বপ্নে। তারপর কিছুতেই ঘুমোতে পারছি না। আজও বোধহয় ধরা পাবো না তার!
- আজ ওর মুখ কত অব্দি দেখলেন?
- চিবুক পর্যন্ত।
- কোনও স্পেশিফিক কিছু আছে চিবুকে?
- একটা তিল দেখলাম মনে হ’ল। তবে এত অল্পক্ষণের জন্য দেখা – আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না।
- আচ্ছা সৌমেন বাবু, আপনি চাঁদ দেখতে খুব ভালোবাসেন না?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা বলুন তো – আজ কোন তিথি?
- আজ ত্রয়োদশী।
- আপনার কোন তিথির চাঁদ দেখতে সবচেয়ে বেশী ভালোলাগে?
- এক এক তিথির চাঁদ এক এক রকম। চতুর্দশী, পূর্ণিমার চাঁদ তো ভালো লাগেই – এত জ্যোৎস্না, তবু কত আঁধার! তবে আমার তৃতীয়ার চাঁদ খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে চৈত্রমাসে। নজরুলের ওই গানটা শুনেছেন ডাক্তার বাবু – ‘কর্নে দোলাবো তৃতীয়া তিথির চৈতি চাঁদের দুল’?
- না শুনিনি।
- গানটা শুনবেন। আর এবছর চৈত্র মাসের তৃতীয়ার চাঁদটাও দেখবেন। আমি ফোন করে মনে করিয়ে দেব। সত্যি সত্যি যেন কানের দুল।
- কী করে আর দেখবো? তৃতীয়ের চাঁদ দেখতে হলে তো সন্ধে বেলায় আকাশে চোখ রাখতে হবে। তখন তো আমার চেম্বার থাকে।
- ও! আপনি বঞ্চিত হলেন তাহলে।
- আচ্ছা আপনার ওই মেয়েটির ঠোঁটটা ওল্টানো তৃতীয়ার চাঁদের মতো, না?
- হ্যাঁ।
- ঠিক আছে। কাল রাত সাড়ে আটটায় আমার এয়ারপোর্টের চেম্বারে আসুন। কথা হবে তখন।
- আচ্ছা। রাখি তাহলে?
- হ্যাঁ রাখুন। গুডনাইট।
পরের দিন ঠিক সময়েই চেম্বারে হাজির হ’ল সৌমেন। সব রোগী দেখা শেষ করে ডাঃ মিত্র ভেতরে ডাকলেন তাকে। আজ ডাঃ মিত্রের মধ্যে বিশেষ এক উত্তেজনা কাজ করছে। সৌমেন ভেতরে আসতেই ওঁর অ্যাটেনডেন্টকে বললেন কফি আনতে। বললেন, ‘আচ্ছা সৌমেনবাবু, ছোটবেলায় আপনি লেখালেখি করতেন? এই ধরুণ- গল্প বা কবিতা?’
- হ্যাঁ। কিন্তু টুকটাক। সিগনিফিকেন্ট কিছু না?
- এখন লেখেন না কেন?
- সময় কই? আর তাছাড়া লিখতে আলস্য লাগে।
- আচ্ছা, আর একটা কথা! আপনার স্ত্রী যখন সন্তান সম্ভবা, আপনারা কি বিশেষ কোনও সন্তান আশা করেছিলেন?
- আমার নিজের বোধহয় কোনও স্পেশিফিকেশন ছিল না। তবে দুলু মেয়ে চাইতো।
- কেন?
- ও বলতো – তুমি যা চাপা মানুষ – ছেলে হলে যদি তোমার গুণ পায় তবে মাঝখানে অভিমানের বিন্ধ্য পর্বত খাড়া হয়ে যাবে। কেউ কারও নাগাল পাবে না। বরং মেয়ে হলে সে তোমার মন পাবে, তোমাকে বুঝবে। সে তোমার মন খারাপ হতে দেবে না।
- আপনারা কি ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন – তার নাম ঠিক করে রেখেছিলেন?
- আমি মনে মনে একটা নাম ঠিক করে রেখেছিলাম। ‘রাকা’। দুলুকে বলিনি।
- রাকা মানে তো চন্দ্র? তাই না?
- হ্যাঁ। জেনারেলি চন্দ্র পুংলিঙ্গ। নক্ষত্ররাজ। তবু আমরা মেয়েদের মুখের সাথে চাঁদের তুলনা করি। রাকা যেহেতু শেষে ‘আ’ কার যুক্ত – তাই মেয়ে হলেও তার নাম হিসেবে চলে যেত। আর তাছাড়া দুলু বলতো বলে কিনা কে জানে - আমি মনে মনে জানতাম - আমাদের মেয়েই হবে।
- সৌমেনবাবু – আপনার স্বপ্নের মেয়েটিকে আমি খুঁজে পেয়েছি। সে আপনার পঁচিশ বছর আগের গর্ভমৃত মেয়েটি।
- সে কী!
- হ্যাঁ। আপনি মনে মনে যত নিঃসঙ্গতা ভালোবাসুন না কেন – আপনার সাবকনসাস সেখান থেকে রেসকিউ চায়। আপনার স্ত্রীর মতো আপনার অবচেতনও জানে বা বিশ্বাস করতে চায় সেই মেয়েই আপনাকে এই নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দেবে। তাই মাঝে মাঝেই সে আপনার স্বপ্নে সেই প্রতিচ্ছবিকেই ফোকাস করে। আপনি চাঁদ ভালোবাসেন, তার নামও চাঁদের নামেই রেখেছিলেন। ওর ঠোঁটটাও তৃতীয়া চাঁদের মতো। চাঁদ যেমন আস্তে আস্তে রাহুর কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রকাশ পায় – আপনার অবচেতনও অল্প অল্প করে সেই মুখচ্ছবিকে আপনার কাছে প্রকাশ করতে চাইতো এতদিন।
- ডাক্তারবাবু, আমি তাহলে পুরো মুখ দেখতে পাই না কেন?
- ও মুখ পুরো হয়তো আপনি কখনও দেখতে পেতেন না সৌমেনবাবু। কেননা আপনার অবচেতনও পুরোপুরি সিওর না যে এই মৃত মেয়েটি ঘাপটি মেরে বসে আছে আপনার মনে – যে আপনাকে রেসকিউ করতে পারতো। যদি কোনও দিন আপনার মনে এই দ্বিধার অবসান হ’তো সেদিন হয়তো দেখতে পেতেন পুরো ছবি।
- সেই মেয়েটি পঁচিশ বছর পরে বড় হয়ে এমনটা হবে এটা মন জানবে কী করে ডাক্তারবাবু?
- আপনি শিল্পি মানুষ! শিল্পি তার কল্পনায় এক একটা সম্পর্ককে এক একটা অবয়ব দেয় সৌমেনবাবু। এটা আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন। এই সম্পর্ক কখনও নদী হয়, কখনও আকাশ। কখনও পাখী হয়ে ডানা মেলে, কখনও বা সাপের মতো ফণা তোলে! আপনার অবচেতনের মেয়েটি এমনই – যার চুলটা বনলতা সেনের মতো, ঠোঁটটা পাতলা এবং চৈতি চাঁদের মতো; চোখটা সাগরের মতো – দীঘল কৃষ্ণ বর্ণ – কী ঠিক বলছি তো সৌমেন বাবু?
ডাঃ মিত্র স্পষ্ট উপলব্ধি করলেন – চন্দ্রের গ্রহণের মতো আস্তে আস্তে একটা পর্দা যেন এসে গ্রাস করল সৌমেনের পুরো মুখ। আস্ত বিষাদ নেমে এসেছে যেন! ডাঃ মিত্র জীবনে প্রথম বিষাদকে চাক্ষুষ করলেন এভাবে, তার নিজের অবয়বে। তিনি আস্তে আস্তে উঠে এসে সৌমেনের কাঁধটা ধরে ঝাঁকালেন। সৌমেন সেই অবস্থাতেও দাঁতটা বের করে কেঠো হাসি হেসে বলল – ‘আজ কি তবে যাব?’
- দূর বোকা! যাবে কোথায়! আমিও তো এক পথের পথিক। বসো। কফি খাও।
খানিকক্ষণ দুজনে কেউ কোনও কথা বললেন না। গাড়ীতে উঠে ডাঃ মিত্র বললেন – ‘সৌমেন – তুমি আবার লেখা শুরু করো। যা খুশী। ছবিও আঁকতে পারো। তবে নিছক বাড়ীর প্ল্যানিং নয়! রিয়েল আর্ট। আমার বিশ্বাস তুমি আর এত স্বপ্ন দেখবে না। সম্ভবত মেয়েটিকেও আর দেখবে না তুমি!’
- কিন্তু আমি তো তাকে স্বপ্নে দেখতে চাই ডাক্তারবাবু।
- ডাক্তারবাবু নয়। আমাকে দাদা বলে ডাকো। আমি তোমার থেকে বছর দুই বড়ই হ’ব। আর তাকে দেখতে চেওনা সৌমেন। ওকে মুক্ত করো। ওর এখন অমাবস্যা হওয়া জরুরী। তুমি চলো আজ আমার বাড়ী। ওখানে প্রায় কাছাকাছি বয়সের একটা রাকা আছে।
সৌমেন দেখল ঠিক আড়াই নম্বর গেটের কাছটায় – মস্ত বড় চতুর্শীর চাঁদ উঠেছে আজ গাছটার মাথায়। কোথাও আর খাঁজ খোঁজ নেই। প্রায় নিটোল, গোল - ঠিক পূর্ণিমার মতোই।
0 Comments