দূর দেশের লোকগল্প— ২৭২
দুই ব্যাঙের দেশ দর্শন
জাপান (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
ওসাকা আর কিয়োটো। জাপান দেশের দুটো শহর। সেখানে দুই শহরে থাকে দুটো ব্যাঙ।
ওসাকা তো সাগরের পাড়ে। সেখানেই খাদের ভেতর বাসা এক ব্যাঙের। ওদিকে একটা পাহাড়ি নদী বয়ে গিয়েছে কিয়োটো শহরের ভেতর দিয়ে। একটা ব্যাঙের বাসা সেই নদীর তীরে।
দুরত্ব বড় একটা কম নয় দুজনের বাসার। তার ফলে, দুজনের কেউ কাউকে চেনে না। পরিচয়টুকুও নাই দুজনের। কিন্তু ভারি মজার কাকতালীয় ব্যাপার হোল, অনেক দিন থেকে একটাই ব্যাপার খেলা করছে দুজনের মাথাতেই।
ব্যাপারটা বেশ মজার। দুজনেই তারা দেশ দেখতে চায়। ওসাকা আর কিয়োটো—দুটোই বেশ বড় শহর। খুব নামডাক। ওসাকার ব্যাঙের ইচ্ছে কিয়োটো শহর দেখবে। কিয়োটো হল জাপানের প্রাচীন রাজধানি। সেখানে সম্রাটের প্রাসাদটা নাকি দেখবার মতো। সেটা দেখবার ভারি সাধ ওসাকার ব্যাঙের।
গোপন একটা লোভও আছে মনের ভিতর। মওকা পেলে, সুড়ুত করে ঢুকে পড়বে প্রাসাদটার ভিতরে। দু’-একটা দিন ঘাপটি মেরে বসে থাকবে। কেউ টেরটিও পাবে না। পুরাণো প্রাসাদে বাস করবার মজাই আলাদা! কপালে থাকলে নিশ্চয় মওকা জুটে যাবে।
ওদিকে কিয়োটোর ব্যাঙের সাধ, সাগর পারের ওসাকা শহর দেখবে। বিশাল বড় সেই শহর। আর, কী সব বাড়িঘরদোর। চেয়ে চেয়ে দেখেও সুখ! কিন্তু সব সাধ ঐ ভাবনাতেই থেকে যায়। যাওয়া আর হয় না।
একদিন ওসাকার ব্যাঙের বউ বলল—মনে সাধ হয়েছে, যাও না। দেখে এসো, শহরটা কেমন। ভেবে ভেবেই তো দিন চলে যাচ্ছে তোমার।
ওদিকে হয়েছে কী, কিয়োটোর বউও তাড়া দিয়েছে—সারা দিন মনমরা হয়ে থেকে লাভ কী? বেরিয়ে পড়ো। দেখে নিও, নিশ্চয় সাধ মিটবে তোমার।
ঘটনা হোল, দুই ব্যাঙ ভাবল, বউয়ের কথা অমান্য করতে নাই। যা থাকে কপালে। একই দিনে দুই ব্যাঙ বেরিয়ে পড়েছে ঘর থেকে।
চলতে চলতে একদিন তারা একটা পাহাড়ের মাথায় এসে হাজির হয়েছে। বিধাতার কী খেয়াল! সেখানে দুজনের মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। কেউ কাউকে চেনে না। আলাপ সালাপ নাই। তবে, অবস্থা দুজনের একেবারে একই।
একে তো এইটুকুনি পুঁচকে দুটো শরীর। পাগুলোও ছোট্ট ছোট্ট। থপথপিয়ে চলা। পাহাড়ি পথ ভাঙতে হাঁপিয়ে উঠেছে দুজনেই। গা-হাত-পা টনটন। শরীর একেবারে এলিয়ে পড়েছে দুজনেরই।
ফলে পরিচয় হতে সময় লাগল না। দুজনেই অবাক দুজনের একই ইচ্ছার কথা শুনে। পাহাড়ের মাথা। হাওয়া বইছে ফুরফুর করে। একটা পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসেছে দুজনে।
ওসাকার ব্যাঙ বলল—শোন বন্ধু, দেশ দেখতে বেরিয়েছি। তাড়াহুড়ো করবার দরকারটা কী? এখানে বরং খানিক জিরিয়ে নিই দুজনে।
কিয়োটোর ব্যাঙ বলল—হ্যাঁ, বন্ধু। ঠিকই বলেছ। কোনও তড়া নাই। তাছাড়া, এই পাহাড়ি পথে আসতে শরীরটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। জিরিয়ে নেওয়াই ভালো।
অনেকটা সময় গড়িয়ে বসে সময় কাটল দুজনের। তাতে শরীর একটু সয়ে এল। আবার শুরু হোল দুজনের আলাপ। ওসাকার ব্যাঙ বলল—সমস্যা হোল কী, জানো? আমাদের শরীরগুলো বড্ড ছোট। নইলে—
কিয়োটোর ব্যাঙ বলল—শরীর ছোট বলে, সমস্যা কী হোল?
ওসাকা—এমনিতেই আমরা এখন একটা পাহাড়ের চুড়ায় চড়ে পড়েছি। জায়গাটা বেশ অনেকখানি উঁচু। তার উপর যদি চেহারাটাও বড় হোত, দাঁড়িয়ে উঠে চারদিকটা চেয়ে চেয়ে দেখতে পারতাম।
কিয়োটো—চেয়ে চেয়ে দেখলে, বাড়তি কী লাভ হোত আমাদের?
ওসাকা—লাভ হোত না? অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পেতাম। যে এলাকাটা দেখতে যাচ্ছি, সেটাও দেখতে পেতাম। বুঝতে পারতাম, ঠিক কেমন দেখতে এলাকাটা। অতো কষ্ট করে চলেছি কি না। মনে ভারি কৌতুহল।
কিয়োটো—সেটা তুমি মন্দ বলোনি, বন্ধু। এক্কেবারে হক কথাই বলেছ তুমি। ঠিকই তো, আগাম দেখতে পেলে, পথ ভাঙবার কষ্টটা কম হোত। তা, শরীরগুলো বড় করে ফেললেই তো সমস্যা মিটে যায়।
ওসাকার ব্যাঙ অবাক হয়ে বলল—শরীর আবার বড় করা যায় নাকি? এ তো বিধাতার গড়ে দেওয়া। তোমার আমার কোনও কেরামতি খাটবে না এতে।
কিয়োটোর ব্যাঙের মুখে হাসি-- খাটবে না কেন? মাথা খাটালেই কাজ হয়ে যাবে।
ওসাকা—আমার তো মাথায় ঢুকছে না কিছু।
কিয়োটো—তাহলে, এসো, আমরা দুজনে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াই। তাহলেই শরীর বড়। মাথা উঁচু। দেখতে পাবো অনেক দূর পর্যন্ত।
ওসাকা হেসে বলল—তার ফল কী হবে জানো তো? সাথে সাথেই ধপাস। গড়তে গড়াতে পাহাড়ের তলায় গিয়ে হাজির হয়ে যাব। হাড়গোড় ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে।
কিয়োটোর ব্যাঙ হেসে বলল—ঐ যে বললাম , মাথা খাটাতে হবে। অত ভাবনা কোর না বন্ধু।, এসো, হাতেনাতে দেখিয়ে দিচ্ছি।
এবার এক মজার জিনিষ দেখা গেল। পিছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে দুজনে। দুজনেই তাদের সামনের পা দুটো অন্যজনের কাঁধে তুলে দিয়েছে। তাতে পড়ে যাবার আর কোনও ভয় রইল না।
ওসাকার ব্যাঙ যাবে কিয়োটো দেখতে। সে মুখ করে আছে কিয়োটোর দিকে। কিয়োটোর ব্যাঙ ওসাকা দেখতে বেরিয়েছে। সে দাঁড়িয়েছে ওসাকার দিকে মুখ করে।
সবাই জানে, ব্যাঙেদের চোখ বেশ বড় বড়। খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে, অনেকখানি দূর পর্যন্ত চোখ চলেও যাচ্ছে তাদের। বেশ একটা ভালো লাগা দুজনের মনে। কত সহজে, কত সুন্দর করে দেখে নেওয়া যাচ্ছে, বাকি পথটা, আর না-দেখা এলাকাও!
কিন্তু দুজনেই বুদ্ধু। বোকার বেহদ্দ একেবারে। নিজের নিজের শরীরটাকেই তারা চেনে না ভালো করে। তাতেই হচ্ছে যত বিপত্তি।
হয়েছে কী, ব্যাঙেদের চোখ বড় বড়, এটা সত্যি কথা? কিন্তু অন্য সমস্ত জীবের তেকে ব্যাঙের চোখের গড়ন আলাদা। চোখ দুটো থাকে তাদের মাথার প্রায় ওপরের দিকে। ব্যাঙেদের দৃষ্টিশক্তি বেশ প্রখর। অনেকখানি দূর পর্যন্ত দেখতেও পায় তারা। কেবল তাই নয়। চোখের মণি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশটা ভালো করে জরিপও করে নিতে পারে।
তবে, আসল সমস্যা হোল চোখ দুটো মাথার উপরের দিকে থাকায়। দুজনে তো তারা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ফলে, তারা জানতেই পারেনি, তাদের চোখগুলো সামনের দিকে না হয়ে, পিছনের দিকে হয়ে গিয়েছে।
খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজনে। ওসাকার ব্যাঙ দাঁড়িয়েছে কিয়োটোর দিকে মুখ করে। কিন্তু সে এখন তাকিয়ে আছে নিজের শহর ওসাকার দিকেই। যে পথা দিয়ে সে এসেছে, সেই পথটাই দেখছে সে। সেই পথ, সেই গাছপালা, সেই ফেলে আসা গ্রাম, ছোট-বড় শহর—সবই আবার দেখছে তাকিয়ে তাকিয়ে।
কিয়োটোর ব্যাঙেরও সেই দশা। সেও ফেলে আসা কিয়োটোর দিকটাকেই দেখছে। নতুন কিচ্ছুটি নয়।
দুজনেই পা নামিয়ে ফেলেছে। দুজনেরই বিরস বদন। উতসাহের সামান্য ছাপও নাই দুজনের চোখে মুখে। ওসাকা বলল—বন্ধু, আমি তো দেখলাম, কিয়োটো শহরটা একেবারে আমাদের ওসাকার মতই। নতুন কিছু নাই দেখবার মতো।
কিয়োটো—এক্কেবারে ঠিক বলেছ, বন্ধু। আমিও দেখলাম, আমার কিয়োটো যা, তোমার ওসাকাও তাই।
ওসাকা—তাহলে আর মিছিমিছি শরীরকে কষ্ট দিয়ে লাভ নাই। ঘরের মানুষ ঘরে ফিরে যাওয়াই ভালো।
কিয়োটো—হক কথা বলেছ তুমি। ফিরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। খামোখা পথ ভেঙে লাভ নাই।
দুজনেই ফিরে যাওয়াই স্থির করল। দুজনে বিদায় জানাল দুজনকে। শুভকামনা করল দুজনের।
দুজনেই বলল—একই দেশেরই তো শহর দুটো। একই রকমই তো হবে। ঠিক যেমন—একটা গাছে দুটো মটরশুঁটি। মিল বলো, তফাত বলো, এটুকুই!
0 Comments