পঞ্চম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দর্শনের আলোকে ধর্ম)
ধর্ম হোলো একটি সংস্কৃত শব্দ। যার মূল ধাতুরূপ হোলো "ধৃ"। এর অর্থ হোলো "ধারণ করা" বা "বহন করা"। এখন প্রশ্ন হোলো, কি ধারণ করবে? উত্তরে বলা যায়, যা জগতের নৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ মননকে ধরে রাখতে সাহায্য করে তাই-ই ধর্ম। নৈতিকতা বর্জিত কাজকর্ম মানব অস্তিত্বকে বিপন্ন করে। আপাতদৃষ্টিতে নীতি বিগর্হিত কর্ম সাময়িক সুখপ্রদানে সমর্থ হলেও তা পরিণতিতে কখনোই সুখদায়ক তো থাকেই না, শান্তি তো অনেক দূরের কথা। ধর্মীয় আলোচনায় নীতিসম্মত কাজকে ধর্মকর্ম ও নীতিবর্জিত কর্মকে অধর্মকর্ম বলে উল্লেখ করা যায়।
ধর্মীয় কর্ম বলতে সংস্কারজাত ধারণা অনুযায়ী বেদবিহিত ধর্ম কর্ম তথা যজ্ঞাদি-পূজার্চ্চনাদি ক্রিয়াকর্মকে বোঝানো হয়ে থাকে। আর অধর্মকর্ম বলতে পাপাচার তথা নানা নাশকতামূলক কাজকর্ম যা হিংসা, বিদ্বেষ সঞ্চার করে এবং বিবেকহীন ইন্দ্রিয়ভোগী জীবনযাপন ইত্যাদি নীতিবিগর্হিত কাজকর্মকে বোঝায়।
🍂
এবার আসা যাক্, বিস্তৃত অর্থে ধর্মচেতনায়। ধর্মীয় চেতনা তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা ব্যক্তি চেতনাকে সমৃদ্ধ করে,বিবেক বোধকে জাগ্রত করে। পার্থিব বিষয় লাভের আকাঙ্ক্ষায় ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন কখনো ধর্মের পরিভাষা হতে পারে না।
জীবহত্যা একটি বিশাল বড় অনৈতিক কাজ। নতুন জীবন দান করার ক্ষমতা ব্যক্তির থাকে না, অথচ অনায়াসে জীব হত্যা করে যান নিজের স্বার্থে, নিজ ভোগলোলুপতাকে পরিতৃপ্ত করার জন্য। তারপর সেই ব্যক্তি কিছু ধর্মীয় আচার-বিচারমূলক কর্মসম্পাদন করে নিজেকে ধার্মিক বলে মনে করেন- এটা কি ধর্মীয় মানসিকতার পরিচায়ক? যে প্রাণী একজন বিচারবোধসম্পন্ন প্রাণী হয়ে অন্য প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারেন না, তিনি কি করে ধারণ করার তাত্ত্বিকতাসম্পন্ন ধর্মীয় ব্যক্তি হতে পারেন?
প্রকৃত ধর্ম হল যা জীব অন্তঃকরনকে পরিশুদ্ধ করে ইহজাগতিক বিষয়ের প্রতি অদম্য আকর্ষণকে প্রশমিত করে, আত্মিক শান্তি প্রদান করতে পারে। ধর্মে ধর্মে কোন বিভেদ থাকতে পারে না- যেখানে ধর্মের মূল কথা হোলো ধারণ করা। ব্যক্তি যখন ষড়রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করে, বিবেক বোধের আলোকে আত্মিক জ্ঞানের পথে নিজের জীবনকে সুনিয়ন্ত্রিত করতে পারেন, তখনই মনে করা যেতে পারে তিনি ধর্মীয়চেতনাসম্পন্ন ব্যাক্তি- তিনি প্রকৃত ধর্মাচরণে নিয়োজিত আছেন।
ধর্ম কখনো ধর্মবিদ্বেষ বা জাতিবিদ্বেষকে প্রশ্রয় দেয় না। ব্যক্তির একটাই পরিচয়- জাগতিক ব্যাখ্যায় তিনি মানুষ আর পারমার্থিক ব্যাখ্যায় তিনি অজড়, অমর আত্মা। পোশাকের ভিন্নতায়, আচার অনুষ্ঠানের ভিন্নতায় ব্যক্তির শাশ্বত পরিচয় কখনো বদলে যায় না।
ধর্ম মানুষকে ক্ষমা করতে শেখায়। কারণ যে মানুষ ভুল করে সেই মানুষ-ই একদিন মহান ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারেন- স্বীয় কর্মের মাধ্যমে।ধর্ম শেখায়, ব্যক্তির অন্তরে কিভাবে বিবেকবোধ জাগ্রত করে, ভুলগুলোকে সংশোধন করে,ব্যাক্তিকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা যায়।
পরিশেষে উল্লেখ্য যে, ধর্ম মানুষকে শান্তি লাভের পথপ্রদর্শন করায়। ব্যক্তি প্রতিনিয়ত জাগতিক বিষয়লাভের বাসনায় অস্থির, চঞ্চল, অসহিষ্ণু, উদ্ধত হয়ে ওঠেন, ব্যাক্তি ভাবেন বিষয় লাভেই সন্তুষ্টি। কিন্তু আগুনে ঘি দিলে আগুন যেমন দ্বিগুন তেজে প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে, তেমনি বিষয় বাসনা রূপ আগুন যতই জড়বিষয় ভোগের মাধ্যমে ব্যাক্তি প্রশমিত করার প্রচেষ্টা করেন,ততই সেই বাসনা আরো নতুন বাসনার সৃষ্টি করে, অস্থিরতার আরো এক পটভূমি রচনা করে। আত্মার শান্তির জন্য জাগতিক বিষয় লাগে না। আত্মা মুক্ত স্বভাব, তা আনন্দময় সত্তা। জীবন নির্বাহের প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যক্তি খুব সহজেই জোগাড় করে ফেলতে পারেন। কিন্তু উদগ্র বাসনায়,'আরো চাই' এর খোরাক জোগাড় করতে ব্যক্তি নাস্তানাবুদ্ হয়ে যান ও অতৃপ্তিমূলক মানসিকতার শিকার হন।ধর্ম এই "চাই- চাই" বৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সুস্থিত হয়ে, সন্তুষ্টিপূর্ণ জীবন যাপন করতে শেখায়।।
0 Comments