কে তুমি নন্দিনী?
দ্বিতীয় পর্ব
তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে। বীভৎসতা আর বিভীষীকায় পৃথিবী কেঁপে উঠেছে। সত্যদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ আরো বেশী করে এই মারণ যুদ্ধের কুফল দেখতে পাচ্ছেন। দেখতে পাচ্ছেন বিশ্ব জুড়েই মানুষের অন্তরের দৈন্য,চিন্তার দারিদ্র্য, বোধের অবক্ষয়। দেখতে পাচ্ছেন বস্তুবাদী লোভের শিকার হয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারী নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা কী কুৎসিৎ লড়াই, কী প্রাণঘাতী যুদ্ধের জন্ম দিচ্ছে। তারা ভুলে গেছে জীবনের অন্য মানে, বৃহত্তর অর্থ।
মানুষের সংজ্ঞাটাই যাচ্ছে হারিয়ে। কাকে বলে মানুষ ? কি করণীয় থাকে একজন মানুষের এই পৃথিবীতে? সাধারণ মানুষ আর অসাধারণ মানুষের মধ্যে কি পার্থক্য ,কতখানি পার্থক্য? হেসে খেলে বেড়ানো, অল্পে সন্তুষ্ট অগণন সাধারণ মানুষ পৃথিবীর সম্পদ ? না কি অদৃশ্যে থেকে সাধারণ মানুষ কে দাস বানিয়ে, হর্ম্যরাজি গড়ে তোলা প্রবল ক্ষমতাশালী লোভী, মুষ্টিমেয় রাষ্ট্রপ্রধানরা পৃথিবীর সম্পদ? কোন সম্পদ বেশী দরকার ? মানবিক সম্পদ না বস্তুগত সম্পদ ? একে অপরের পরিপূরক না কি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী?
রক্তকরবীর যক্ষপুরীর রাজা জালের আড়ালে থাকে, অদৃশ্যে থাকে। বহু বহু মানুষকে সে দাস করে রেখে ভুলিয়ে দিচ্ছে তাদের জীবনের স্বাভাবিক সৌষ্ঠব তাল লয় ছন্দ । সুর নেই, আনন্দ নেই, আলো নেই। সব এখানে নিস্প্রভ। সবাই তার বশংবদ হয়ে কেবলমাত্র 'মাটির তলার মরাধন তাল তাল সোনা' তুলে নিয়ে আসছে দিনরাত। কেউ জানে না এর অন্তিম পরিণতি কি? কি তাদের ললাট লিখন ? কবে তারা মুক্তি পাবে? কবে তারা গান গাইবে? কবে তারা পাকা ফসলের মাঠে যেতে পারবে ? সেই সংকটের অন্ধকারে আলো ঢেলে দিতে তাদের কাছে একমাত্র ত্রাতা নন্দিনী। সে এসেছে যক্ষপুরীতে সবাইকে মুক্তির আনন্দ দিতে, মুক্তির গান শোনতে। সে এসেছে জালের আড়ালে থাকা মানুষটিকে মুক্তি দিতে যাকে সেখানকার সর্দাররা বীভৎস বানিয়ে রাজার মুখোশ পরিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চায় যে 'সে মানুষ'--- সেই কথাটি মনে করিয়ে দিতে।
🍂
সবাই জানি ---শিলং এ বাড়ি ছেড়ে আসার সময় বাড়ির পিছনে লোহালক্কড়ের জঞ্জাল থেকে একটি রক্তকরবী গাছ ফুল সহ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দেখে কবি নাটকটির নাম বদল করলেন। রক্তকরবী ফুল সহ গাছটি দেখে কবির মনে হোল ফুলগাছটি বলছে 'আমি কিন্তু মরি নি' অর্থাৎ জীবনের মহত্ব শ্রেষ্ঠত্ব কখনোই বিলীন হয় না, তা ফিরে ফিরে আসে আর আমাদের জানিয়ে দিয়ে যায় জীবনকে সুন্দর রাখার কৌশল-- সহজ থাকা ,সরল থাকা, অ-কপট থাকা। রক্তকরবী একই সঙ্গে উৎকৃষ্ট সাহিত্য এবং নাটক। প্রচলিত ব্যাখ্যায় বা অ্যাকাডেমিক ব্যাখ্যায় রক্তকরবী একটি রূপক সাংকেতিক নাটক, সেখানে কর্ষণজীবী আকর্ষণজীবীর দ্বন্দ্ব রয়েছে , প্রতীকময়তা ,ব্যাঞ্জনার দ্বারা মূল বিষয় উপস্থাপনা করা হয়েছে, এটি বন্ধন মুক্তির নাটক, জড়ের বিরুদ্ধে প্রাণের আন্দোলনের নাটক, সমাজ বাস্তবতার নাটক। শুধু কি এইটুকুই ? বোধ হয় না । তাহলে রক্তকরবী কিসের নাটক?---- আত্মোপলব্ধির নাটক, আত্মআবিস্কারের নাটক, আত্মদীপ জ্বালাবার নাটক।
একশো বছর পরেও রক্তকরবীর এই বিষয় এবং নাটকের কৃৎকৌশল সমান প্রাসঙ্গিক। যদি আমাদের দেশের কথাই এই মুহূর্তে ধরি ---সম্প্রতি ভয়ানক একটি ভৌগোলিক বিপর্যয় ঘটাতে যাচ্ছেন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় এবং ধরেই নিতে পারি রাষ্ট্রপ্রধান সহ পারিষদবর্গ। দিল্লী, রাজস্থান মহারাষ্ট্র ব্যাপী পশ্চিম ভারতে অবস্থিত প্রাগৈতিহাসিক আরাবল্লী পর্বতের ওপর আইনসিদ্ধ ভাবে আঘাত নেমে আসছে । একশো মিটারের কম উচ্চতার পর্বতশ্রেণীকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। কারণ ঐ উচ্চতাকে আর নাকি পাহাড় বলে সংজ্ঞায়িত করা হবে না। কেন ভাঙা হবে? উত্তর ---ওর তলায় আছে 'তাল তাল সোনা'---না ,ভুল বললাম , সোনা নয় --সোনার চেয়েও দামী ইউরেনিয়াম --আধুনিক সভ্যতার অন্যতম শক্তি প্রবাহের আকরিক যা নাকি এখন মাপকাঠি হয়ে উঠেছে ---বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণে। সেজন্য ভৌগোলিক সংজ্ঞা পর্যন্ত বদলে দিতে পারে এরা ---এরা এতটাই ক্ষমতাশালী! সুতরাং আইনকে বশীভূত করে আরাবল্লী ধ্বংসের ছাড়পত্র আদায় করতেই হবে। তদুপরি আছে বাণিজ্যিক লোভ এবং তাতে রাষ্ট্রীয় সমর্থন --প্রশাসনিক সম্মতিতে।
অর্থাৎ সেই যক্ষপুরীর রাজার মতো 'পৃথিবীর মরা ধনের' প্রতি আকাঙ্খা আজো আছে। তারা সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। আরাবল্লী ধ্বংস হলে রাজস্থানের মরুভূমি গ্রাস করবে দিল্লী সহ বিস্তীর্ণ জনপদকে । গৃহহারা হবে মানুষ, অরণ্য হারা হবে বৃক্ষ, ঝর্ণা হারা হবে নদী, বাস্তু হারা হবে বাস্তুতন্ত্র। কিন্তু তাদের কথা কেউ শুনবে না, কেউ শোনাবে না, কেউ বলবে না তাদের হয়ে, তাদের ওপর অকারণ ঘটে যাওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদ করবে না কেউ---কারণ তাদের জন্যে কোনো রঞ্জন নেই, নেই রক্তকরবীর মালা পরা, আঁচল ভরা আনন্দ নিয়ে জীবন সংগীত গেয়ে যাওয়া কোনো নন্দিনী।
সত্যিই কি নেই?
আমরা যারা রক্তকরবীর পাঠক, আমরা যারা জীবন ভালোবাসি, আমরা যারা লোভী নই, কপট নই--আমরা যারা নন্দিনী কে ভালোবাসি, ভালোবাসি তার গান, পছন্দ করি তার প্রেম ,আদরে রাখি তার সংলাপ, বিচলিত হই তার আকুতিতে--- --- সেই আমরাই তো এক একজন নন্দিনী। আমরাই তো পারি নন্দিনীর মতো ঐ লোভী জালের আড়ালে থাকা অদৃশ্য বীভৎস রসের মানুষ (ব্যবসায়ী বা রাষ্ট্রনায়ক) গুলোর মনের প্রাণের অন্ধকারে এই এত্ত এত্ত আলো ঢেলে দিতে।
রক্তকরবী যতবার পাঠ হবে, মঞ্চস্থ হবে, তার নির্মাণ ঘটবে, তার বিনির্মাণ ঘটবে ততবার রঞ্জন বিশু পাগল কিশোর ফাগুলাল আমাদের মধ্যে জেগে উঠবে। কি অভিনেতার মধ্যে ,বা দর্শকদের মধ্যে, কি পাঠকের মধ্যে বা শ্রোতার মধ্যে। এরা তো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এক একটা সত্তা।
নন্দিনী সমগ্র সত্তা-- শুদ্ধ হৃদয় বেত্তা,সহৃদয় হৃদয় সংবাদী শুদ্ধ মানবিকতা। যে রাজার মতো নিষ্ঠুরকেও চিনিয়েছিল তার আত্মস্বরূপ, যে রাজাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল আসলে রাজা খোলা মাঠে ঘাসের ডগায় শিশিরের বিন্দু দেখতেই ভালোবাসে ---ঐ তাল তাল সোনার চেয়ে, পৌষের ডাক শুনতেই বেশী ভালোবাসে, সর্দারদের নিরন্তর পরামর্শের চেয়ে।
কী দুর্দম প্রাণশক্তি নিয়ে সে যক্ষপুরীরতে প্রাণস্পন্দন জাগিয়েছিল! জ্বালিয়ে দিয়েছিল প্রত্যেক মানুষের আত্মদীপ।উসকিয়ে দিয়েছিল ওদের আত্মআবিস্কারের সলতেটি।রঞ্জনকে হারিয়েও তার প্রেমকে সম্বল করে সে শক্তি পেয়েছিল প্রকৃতির থেকে ,মানুষের থেকে আর সেই শক্তি সে বিলিয়ে দিয়েছিল যক্ষপুরীর সেই হতভাগ্য মানুষদের মধ্যে।
আজ যদি নন্দিনীর হৃদয় নিয়ে, নন্দিনীর প্রকৃতিপ্রেম নিয়ে, পুজা নিয়ে, শক্তি নিয়ে লক্ষকোটি মানুষ আরাবল্লীর সপক্ষে জেগে ওঠে, আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানরা কি হঠাৎ চমকিত হয়ে, পিছু হঠে, চোখ তুলে প্রশ্ন করবেন ভারতবাসীর প্রতি--কে তুমি নন্দিনী?
0 Comments