দর্শনের আলোকে
চতুর্থ পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দার্শনিক আলোচনায় জগৎতত্ত্ব)
জীবতত্ত্ব আলোচনার পরই প্রাসঙ্গিকতাক্রমে এর পরে যে তত্ত্ব আলোচনা এসে যায়, তা হোলো জগততত্ত্ব।
সাধারণভাবে মনে হতেই পারে, ঘটা করে এই তত্ত্ব আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা কি আছে! এই জগত তো আমাদের চিরপরিচিত জগত- এ তো কম বেশি সবার জ্ঞাত বিষয়। কিন্তু দর্শন তো শুধু দৃশ্যমান রূপ নিয়ে আলোচনা করে না, তার আলোচনা পদ্ধতি হোলো সামগ্রিক। এই সামগ্রিকতার খোঁজে দার্শনিক অনুসন্ধান সদা সচেষ্ট। দৃশ্য বিষয় হয়তো একই রূপে প্রতিভাত হয়। যেমন, সাদা জিনিস সাদা, ক্ষুদ্র জিনিস ক্ষুদ্র, ঠান্ডা জিনিস ঠান্ডা, ভারী জিনিস ভারী- কিন্তু এর উপলব্ধিগত বা অনুভূতিগত ব্যাখ্যা কিন্তু ব্যক্তি ভেদে আলাদা। ঠিক সেরকমই রূপ- রস- শব্দ -গন্ধ -স্পর্শ সমন্বিত এই জগতের উপলব্ধিগত ব্যাখ্যা আলাদা। যেমন কেউ ফুলের রূপে ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি হিসেবে করতে পারে, আবার কেউ বা ফুলের রূপে কাব্যিক মানব অন্তরের অনুভূতির রূপময়তা অনুভব করতে পারে আবার কোথাও তা শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপনের সুভাষিত উপকরণও হতে পারে। জগত মায়াসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে বন্ধনের ক্ষেত্র, আবার যোগীগনের কাছে এই জগত ধ্যান- যোগ সাধনার মাধ্যমে মুক্তি লাভের সাধনা ক্ষেত্র।
মায়াসক্ত ব্যক্তিরা জগতে বন্ধনাক্লিষ্ট হয়ে জন্ম- মৃত্যু- জরা-ব্যাধি- সুখ-দুঃখ বিভিন্ন বিষয়ে নানাভাবে আবর্তিত হতে থাকে আর যোগীগণ সংসারে থেকেও মুক্ত চেতনায় মুক্তভাবে স্বধর্ম পালন করে শান্তিতে ভব দুঃখসাগর পার হয়ে যান।
🍂
আত্মার কর্মস্থল হল এই জগত। এই জগত আত্মার কাছে অনেকটা সংশোধন ক্ষেত্র। ভুল ধারণা, ভুল কর্ম সংশোধন করে যখন আত্মা মুক্তির স্তরে পৌঁছতে পারে, চির আনন্দময় সত্তায় উন্নীত হতে পারে, তখন আত্মা জড়বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে।
এই জগত বা জাগতিক বিষয় সমূহকে ব্যক্তি অজ্ঞানতাবশতঃ স্থায়ী বলে মনে করে। কিন্তু একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে জগতের স্থায়ী সত্তা নেই। জাগতিক সকল বিষয়ই বিনাশশীল। জাগতিক যে বিষয়সমূহকে ব্যক্তি নিজ বলে মনে করে, তাও পরিবর্তনশীল। জাগতিক বিষয়ে ব্যক্তি শান্তি অনুসন্ধান করে। প্রকৃতপক্ষে বিষয় সংস্পর্শে সুখ লাভ হতে পারে, কিন্তু শান্তি লাভ হয় না। সুখ কামনা করে ব্যক্তি শুধু বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গমন করে কিন্তু পরিণতিতে দুঃখই প্রাপ্ত হয়। ভোগ -আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ব্যক্তি যখন জড় বিষয়ের সংস্পর্শে যায়, তখন তা তার বন্ধনের কারণ হয় আর বিষয়ের স্বরূপের প্রকৃত জ্ঞান নিয়ে বিষয়ের সংস্পর্শে গেলে তা ব্যক্তিকে মিথ্যা বিষয় বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে না।
এই জগত মিথ্যা নয়, এর ব্যবহারিক সত্যতা রয়েছে কিন্তু শাশ্বত সত্তা নেই। তাই শাশ্বত সত্তা যেখানে নেই সেখানে শাশ্বত আত্মা সুস্থিত অবস্থান অনুভব করে না। তাই তার লক্ষ্য থাকে- জগতের নশ্বরতাকে উপলব্ধি করে মুক্ত চেতনায় নিষ্কাম কর্ম করে যাওয়া, যাতে তাকে জাগতিক দুঃখ- দুর্দশা ক্লিষ্ট পরিণতি পরিদর্শনে বাধ্য হতে না হয়।
এই জগত কর্মযজ্ঞের স্থল। এই যজ্ঞে নিজের কামনা বাসনা আহুতি দিয়ে কেবলমাত্র স্বীয় কর্তব্য জ্ঞানে কর্ম করে যেতে হয়, যে কর্ম কর্মফলভোগরূপ বন্ধনের কারণ হয় না। যে ব্যক্তি যে সুকর্মে সুনিপুণ বা ইচ্ছুক তাঁকে সেরূপ কর্ম করে যেতে হবে। যেমন যিনি জ্ঞানতত্ত্বের প্রতি আগ্রহান্বিত, তিনি জ্ঞানের ভান্ডার যথাসাধ্যসমৃদ্ধ করবেন। যিনি সুরক্ষা প্রদানের কাজে দক্ষ ও ইচ্ছুক, তিনি বিভিন্ন সুরক্ষা বিভাগীয় কাজে নিযুক্ত থাকবেন- এভাবেই দক্ষতা অনুযায়ী নিজ কর্ম পালন করে যাওয়াই হোলো কর্তব্যকর্ম। কারণ কর্মই ধর্ম- কর্ম সবাইকেই করতে হয়। তবে এই কর্ম যেন নীতিবিগর্হিত আত্ম চেতনা অবনমনকারী না হয়।
এই জগত ও জাগতিক সকল বিষয়কে স্থায়ী বলে মনে করে ব্যক্তি জড় চেতনাসক্ত হয়ে জড় কর্ম করে,জড়বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারপর ব্যক্তি এই অস্থায়ী জড় বিষয় সংস্পর্শে প্রাপ্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু এর উপায় বাইরের জগতে থাকে না। ব্যক্তি চেতনাই হল মুক্তি লাভের পথপ্রদর্শনকারী। চেতনা যখন মুক্ত হয় তখন ব্যক্তি বুঝতে পারে যে এই জাগতিক বিষয় অস্থায়ী, এর চাওয়া-পাওয়া এবং স্থায়ী সত্তা খুঁজতে গিয়ে ব্যক্তি প্রতিক্ষণে নিজের প্রকৃত সত্তাকে ভুলে যায়এবং ভ্রম জ্ঞানের শিকার হয়ে জড় জগতে কর্মফল ভোগ হেতু পুনর্জন্মের আবর্তনে আবর্তিত হতে থাকে।
এই জগত এবং জাগতিক বিষয় -সমূহ প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানীকে ভ্রমিত করতে পারে না। এই জগতের প্রকৃত স্বরূপ জ্ঞান জ্ঞাত থাকার ফলে প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞানী জাগতিক লাভ- ক্ষতি, সুখ-দুঃখ প্রভৃতি বিষয়ে উদাসীন থেকে শুধুমাত্র কর্তব্য জ্ঞানে উচিত কর্মটুকুই সম্পন্ন করে যান।এই জড়জগতে ব্যক্তির নশ্বর শরীর থাকলেও, ব্যক্তি চেতনা অতীন্দ্রিয় পারমার্থিক জ্ঞানে পূর্ণ থাকে - চেতনা জড়কলুষতা মুক্ত হয়।
ক্রমশঃ...
0 Comments