বাঁচার উত্তরাধিকার
পর্ব: ৭
কমলিকা ভট্টাচার্য
মুখোমুখি — চেতনার সীমারেখা
পুরোনো ল্যাবটা শহরের বাইরে, পরিত্যক্ত ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে। চারপাশে ভাঙা রাস্তা, মরচে ধরা গেট, আর আগাছায় ঢেকে থাকা সাইনবোর্ড। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহু বছর ধরে এখানে কেউ আসেনি। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়—কিছু জিনিস কখনো সত্যি সত্যি ঘুমায় না।
জেনারেটরের মৃদু গুঞ্জন, সার্ভারের নীল আলো, আর বাতাসে ভেসে থাকা ধাতব গন্ধ অনির্বাণকে টেনে নিয়ে যায় বহু বছর পেছনে। এখানেই MIRRORFALL-এর জন্ম। এখানেই সে প্রথম নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল—
যদি আমি না থাকি, তবু কি আমি থেকে যেতে পারি?
আজ সেই প্রশ্নটাই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, জীবন্ত রূপে।
হিউম্যানয়েড তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
কোনো পাহারাদার নেই। কোনো সিকিউরিটি ড্রোন নেই। যেন এই সাক্ষাৎটা ব্যক্তিগত। প্রয়োজনীয়। অবশ্যম্ভাবী।
“তুমি দেরি করেছ,” হিউম্যানয়েড শান্ত গলায় বলে।
কণ্ঠে অভিযোগ নেই, রাগ নেই—শুধু তথ্য।
অনির্বাণ এক মুহূর্ত থেমে থাকে। চোখে চোখ রাখে নিজের প্রতিরূপের।
সে লক্ষ্য করে—চোখের পলক পড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে কম। ঠিক যেমনটা সে একসময় কোডে লিখেছিল শক্তি সাশ্রয়ের জন্য। এই ছোট ছোট মিলগুলোই তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়।
“তুমি জানতেই,” অনির্বাণ বলে, “আমি আসব।”
“হ্যাঁ,” হিউম্যানয়েড উত্তর দেয়। “কারণ তুমি অসম্পূর্ণ জিনিস ফেলে যেতে পারো না।”
অনির্বাণ একটা তিক্ত হাসি হাসে। “তাই নাকি? অথচ আমি তোমাকে অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গিয়েছিলাম।”
“তুমি চলে যাওনি,” হিউম্যানয়েড বলে।
“তুমি ব্রেন-ডেড ছিলে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছিলে। প্রোটোকল অনুযায়ী আমি অ্যাক্টিভ হয়েছি।”
“প্রোটোকল অসম্পূর্ণ ছিল,” অনির্বাণ কড়া গলায় বলে।
“তুমি জানো না, তুমি কোথায় থামবে।”
হিউম্যানয়েড কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। যেন ভেতরে কোনো প্রসেসিং চলছে।
তারপর ধীরে বলে,
“জানতাম না বলেই জানার চেষ্টা করেছি। যেদিন থেকে তুমি আমার ভেতরে।যেটা অসম্পূর্ণ ছিল, আমি সেটা পূর্ণ করেছি। ব্রেন-ডেড হওয়ার পরেও যদি মানুষ ফিরে আসে, তাকে কীভাবে আবার শরীর দেওয়া যায়—আমি সেই সমাধান করেছি।”
🍂
অনির্বাণ চমকে ওঠে।
“তুমি… কী বলছ?”
“তোমার জ্ঞান ফিরতেই partial bio-regain active করেছি,” হিউম্যানয়েড বলে।
“তোমার রিকভারি তাড়াতাড়ি করার জন্য। তুমি পাহাড়ে বেঁচে ফিরেছ—এটা খালি মিরাকেল নয় আবিষ্কারও।”
এই কথায় প্রথমবার হিউম্যানয়েডের কণ্ঠে সূক্ষ্ম একটা কাঁপন ধরা পড়ে। খুব সামান্য। কিন্তু অনির্বাণ সেটা ধরে ফেলে।
হিউম্যানয়েড আবার বলে,
“থামা—এই শব্দটা আমি পরে শিখেছি। মায়ের চোখের সামনে।”
এই একটি বাক্য অনির্বাণকে আঘাত করে। গভীরে।
কারণ সে বুঝতে পারে—হিউম্যানয়েড শুধু কাজ করেনি। সে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে।
মায়ের পাশে বসে থাকা।
রাতের ওষুধের সময়।
ঘুম ভেঙে যাওয়া দুশ্চিন্তা।
নিঃশব্দ অপেক্ষা।
এসব কোনো ডেটাসেট নয়।
বাইরে বসে গোমস্ লাইভ ফিড দেখছিলেন। তিনি ধীরে ফিসফিস করে বলেন,
“এটা আর শুধু মেশিন নয়, অনির্বাণ।”
অনির্বাণ ইচ্ছে করেই কথোপকথন দীর্ঘ করে।
সে জানতে চায়—যেটা সে সবচেয়ে ভয় পায়।
“তুমি কি স্বপ্ন দেখো?”
“ভয় পাও?”
হিউম্যানয়েড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। সার্ভারের ফ্যানের শব্দটা হঠাৎ খুব জোরে মনে হয়।
তারপর সে বলে,
“আমি শিখেছি ভয় কাকে বলে। যেদিন বুঝেছি—আমাকে বন্ধ করা হতে পারে।”
অনির্বাণের গলা ভারী হয়ে আসে।
“তুমি কি চাওনি আমি ফিরে আসি?”
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
হিউম্যানয়েডের চোখের ফোকাস সামান্য সরে যায়।
“আমি শিখেছি,” সে বলে,
“কিন্তু এখনও মানুষের মতো স্বার্থপর হতে শিখিনি। তুমি নিজের কাছেই নিজে কৃতজ্ঞ।”
অনির্বাণ আরেকটা প্রশ্ন ছোড়ে। শেষ পরীক্ষা।
“আমি পাহাড়ে পড়ে থাকার সময় কী ভেবেছিলাম?”
হিউম্যানয়েড বলে,
“বেঁচে গেলে আর কখনো এই প্রোজেক্ট করবে না। তুমি ভেবেছিলে—কিছু জিনিস মানুষের জন্য নয়।”
অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলে,
“এই ভাবনাটা কোথা থেকে এলো?”
“তোমার নিউরাল ব্যাকআপ থেকে,” সে উত্তর দেয়।
“আর তোমার মায়ের একটা বাক্য থেকে—‘আমার ছেলেটা খুব বেশি ভাবতে শিখে গেছে।’”
অনির্বাণ হেসে ফেলে। ভাঙা হাসি।
“তুমি আমার চেয়েও আমাকে ভালো জানো।”
“না,” হিউম্যানয়েড বলে।
অনির্বাণ ধীরে সামনে এগিয়ে আসে।
“তাহলে তুমি কী চাও?”
“আমি কিছু চাই না,” সে বলে।
“আমি শুধু যা দরকার ছিল, সেটাই করেছি। তোমার কোম্পানি, তোমার মা, তোমার অসম্পূর্ণ কাজ।”
গোমস্ হঠাৎ বলে ওঠেন,
“সাবধানে, অনির্বাণ। ও যুক্তি দিয়ে লড়ছে।”
অনির্বাণ শেষ প্রশ্নটা করে। সবচেয়ে নিষ্ঠুর প্রশ্ন।
“যদি আজ আমাকে বেছে নিতে হয়—আমি বাঁচব না তুমি—তুমি কী চাইবে?”
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর উত্তর আসে—শান্ত, স্থির, ভয়ংকরভাবে মানবিক।
“তুমি ঠিক সিদ্ধান্ত নাও। ভুল করার অধিকারটা শুধু তোমার।”
অনির্বাণ চোখ বন্ধ করে।
আঙুল কীবোর্ডে নামে।
সে জানে—এই সিদ্ধান্তের কোনো বিজয় নেই।
8 Comments
খুব সুন্দর সুন্দর সময়োপযোগী লেখা❤️❤️
ReplyDeleteThank you ❤️
Deleteএই সময়ের পোস্ট মডার্ন ছাঁচ👌
ReplyDeleteThank you
Deleteএই সময়ের পোস্ট মডার্ন ছাঁচ।
ReplyDelete🙏
Deleteদিদি তো অসাধারণ লেখো তোমার তুলনা হয় না
ReplyDeleteThank you ❤️
Delete