মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯২
প্রসন্নকুমার পাল (ইঞ্জিনিয়ার, খাঞ্জাপুর, ঘাটাল)
ভাস্করব্রত পতি
সূর্যঘড়ির গায়ে আজ আর সূর্যের আলো পড়ে না। ফলে সময় জানানোর ক্ষমতা থাকলেও উপায় নেই তার। খাঞ্জাপুর গ্রামের বর্ষীয়ান সূর্যঘড়ির কথা বলছি। অযত্ন, অবহেলা আর অপরিণামদর্শিতার চূড়ান্ত নিদর্শন বুকে আঁকড়ে বুনো আগাছা আর কাঁটা ঝোপঝাড়ের অন্তরালেই তাঁর বাস ছিল একসময়। এটি অবিভক্ত মেদিনীপুরের একমাত্র সূর্যঘড়ি।
নিরেট পাথরের তৈরি এই বিরল সূর্যঘড়ি। দাসপুরের খাঞ্জাপুর গ্রামে বহুকাল আগে যিনি এটি তৈরি করেছিলেন তাঁর পরিবারের উত্তরসূরিদের কাছে অবশ্য তিলমাত্র সমীহ আদায় করতে পারেনি এই সূর্যঘড়ি। প্রচারের অন্তরালে থাকা ঘড়িটি এখন কেবল একটি প্রাচীন ইতিহাস হয়েই রয়ে গিয়েছে।
১৮৭১ সালে এই সূর্যঘড়ি বানিয়েছিলেন খাঞ্জাপুর গ্রামেরই ইঞ্জিনিয়ার প্রসন্নকুমার পাল। তিনি সে সময় বিহার ও ওড়িশার প্রতিষ্ঠিত সরকারি ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। তখন ইংরেজ রাজত্ব। প্রসন্নকুমার পালের কাজকর্মে প্রসন্ন হয়ে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে 'রায়বাহাদুর' খেতাব দেয়। শেষ বয়সে প্রসন্নবাবু নিজের গ্রাম খাঞ্জাপুরে ফিরে আসেন। নিজের বাবা রামধন পালের নামে গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরির সাথে সাথে সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে একটি সূর্যঘড়ি বানান। সেটিকে নিজের গ্রামেই প্রতিষ্ঠিত করেন। আজ এই মানুষটির কথা ভুলেই গিয়েছে মেদিনীপুরের মানুষ।
তখন মানুষের কাছে হাতঘড়ি ছিল না। ফলে সময় জানতে অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হত। এমতাবস্থায় গ্রামের মানুষের সুবিধার জন্য তিনি বানিয়েছিলেন এক আশ্চর্য সূর্যঘড়ি। পুকুরের উত্তরপাড়ে সেই ঘড়ি হয়ে ওঠে এলাকার মানুষের অন্যতম সময়জ্ঞাপক যন্ত্র। ভোর পাঁচটা চল্লিশ থেকে সন্ধ্যা ৬ টা ২০ পর্যন্ত সময়ের হিসেব নিখুঁতভাবে দিতে পারে প্রসন্নকুমার পালের তৈরি এই সূর্যঘড়ি। তবে ১৯৭৮ এর বন্যায় জলের তলায় চলে যায় এটি। জল কমলে দেখা যায় ঘড়িটিতে আধঘন্টা সময় হেরফের হচ্ছে।
বৃত্তাকার ঘড়িটির ব্যাস প্রায় ২ ফুট। আকৃতিতে রাজমুকুটের অর্ধভাগের মতো। মধ্যভাগে রয়েছে একটি ছায়াধারক ফলক। তার ওপর খোদাই করা আছে 'LAT 20°40′10°N। এছাড়া উত্তরমুখী এই ফলকের ডানদিকের পাথরের পাটাতনে খোদাই করা প্রসন্নকুমার পাল এবং বামদিকে 'শকাব্দ ১৮১৭' খোদাই করা রয়েছে। ফলকের মধ্যেকার পুচ্ছতে '১২' এবং দুইপাশের শেষ প্রান্তে '৬' সংখ্যা খোদিত হয়েছে। সূর্যের আলো ফলকের গায়ে পড়লে তার ছায়া পাথরের গায়ে খোদাই করা দাগ স্পর্শ করলেই সময় চিহ্নিত করা যায়। এখন সময় জানার নানা যন্ত্র আবিষ্কৃত হলেও সে সময় এই সূর্যঘড়ির চাহিদা ছিল খুবই।
খাঞ্জাপুর সংলগ্ন মানুষজন আজও গর্ব করেন এই সূর্যঘড়ির জন্যে। মাঝে মধ্যে এখানে দু'একজন আসেন। তবে জঙ্গলময় রাস্তা আর দুর্গম এলাকা হওয়ায় মানুষের আগ্রহ নেই। নেই কোনও পথ নির্দেশক বোর্ড। ঘাটাল রাণীর রাস্তায় পাঁচ কিমি পথ খাঞ্জাপুর গ্রাম। এর পাশের গ্রাম গোপমহল। এই গ্রামের অগভীর দেশখাল পেরিয়ে যেতে হয় খাঞ্জাপুরের সূর্যঘড়ি দেখতে।
এতদঞ্চলের নামডাক খাঞ্জাপুর গ্রামের পাথরের সূর্যঘড়ির জন্য। ঝাড়গ্রাম ও পূর্ব এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কোথাও এরকম ঘড়ির নিদর্শন নেই। শুধু খাঞ্জাপুর নয়, এরকম সূর্যঘড়ি বারাণসী, নেপাল, গয়া এবং ভুবনেশ্বরেও নির্মাণ করেছেন প্রসন্নকুমার পাল। কিন্তু তাঁর পরিবারের কেউ আগ্রহান্বিত নন এই কীর্তিকে টিকিয়ে রাখতে।
খাঞ্জাপুর গ্রামে প্রসন্নকুমার পালের তৈরি অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার একমাত্র সূর্যঘড়ি
উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই প্রসন্নকুমার পালের পৌত্র প্রভাংশুশেখর পাল ১৯৩২ সালে মেদিনীপুরের অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবার্ট ডগলাসকে হত্যা করেন। উল্লেখ করা যায়, ১৯৩১ এর এর ৭ ই এপ্রিল পেডী হত্যার পর ১৯৩২ এর ২০ শে এপ্রিল মেদিনীপুরের আরেক জেলাশাসক ডগলাসকে হত্যা করেছিল প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশুশেখর পাল। ঠিক এক বছর বাদে ১৯৩৩ এর ২ রা সেপ্টেম্বর তেঁতুলতলা মাঠে পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে টাউন ক্লাবের সঙ্গে স্থানীয় মহম্মদীয়া ক্লাবের ফুটবল মাঠে টাউন ক্লাবের হয়ে খেলতে আসার পথে বার্জকে হত্যা করে অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। অর্থাৎ ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই খাঞ্জাপুর গ্রামের বাসিন্দারা অবশ্য চান তাঁদের গ্রামের এই শিল্পকর্মটি সংরক্ষিত হোক যথাযথভাবে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে রক্ষনাবেক্ষন হোক।
কিছুদিন আগে এই সূর্যঘড়িটি চুরি করে নিয়ে পালায় চোরেরা। কিন্তু তা পরে স্থানীয় মাঠে ফেলে চলে যায়। অবশেষে গ্রামবাসীরা সেটিকে উদ্ধার করে পুনরায় পালপুকুরের পাড়ে এনে স্থাপন করে। এখন অবশ্য জনগনের ইচ্ছেয় সেটিকে লোহার বেড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আসলে অনাদরে গাছের ছায়ায় নয়, জনগন এখন চেয়েছে যত্নআত্তির সাথে সূর্যের আলোয় ফের সময় জানাতে থাকুক খাঞ্জাপুরের সূর্যঘড়ি।
🍂
0 Comments