ত্রিশ পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
(সুর স্রষ্টা কবি নজরুল)
নজরুলের সঙ্গীত জীবন সম্পর্কে কবিতা,গানের বাণী ও সুরের ওপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে অনেক আলোচক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
নজরুল গবেষক সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন :--
"--তারপর নিজে সে (নজরুল) গান রচনা করতে আরম্ভ করে- নিজের দেওয়া সুরে সে যখন নিজের গানগুলি একটার পর একটা গেয়ে যেতো তখন সেখানে যে পরিবেশের সৃষ্টি হতো তার কথা মনে হলে এখনো আনন্দ হয়। ...' তারপর বাংলাদেশে নজরুল গানের পুষ্পবৃষ্টি করে গেছে- সে নিজে একজন বিশিষ্ট সুরজ্ঞও ছিল, তাই তার গানে এমন পরিপূর্ণ প্রাণসঞ্চার করতে একদিন নজরুলের গানে বাংলাদেশ আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল-তার নবনব সুরের মাধুর্যে ও মূর্ছনায়।’'
বাংলা গান মূলত বাণীপ্রধান। ফলে বাণীর ভাবকে সমুন্নত রেখে গানে সুরারোপ করতে হয়। বাণীর সঙ্গে সুরের মিলন হলে সে গান হয়ে ওঠে অনিবর্চনীয়। নজরুল সৃষ্ট বাংলা গানগুলো তাই ছিল সৃষ্টির মাহাত্ম্যে মহৎ। নজরুল বাংলা গানের ঐতিহ্যের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন।
🍂
তার গানে বাংলার ঐতিহ্য রূপায়িত হয়েছে পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাই নজরুলের গান একদিকে যেমন বাণী সম্পদে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে তেমনি সুরৈশ্বর্যে অদ্বিতীয়। নজরুল শুধু কবি বা গীতিকারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুরকারও। তিনি প্রচলিত রাগের কাঠামোকে ভেঙে নতুন সুরের উদ্ভাবন করেছেন। 'দোলনচাঁপা' তেমনই একটি উদাহরণ, যা তাঁর সৃজনশীলতার এক অনবদ্য নিদর্শন।'
রাগ-রক্তহংস সারং:
সাঁঝের বেলায় দিনের শেষ ভাগে পরিবেশিত গান গাইবার রাগ কবি নজরুলের সৃষ্টি রক্তহংস সারং: রাগটি তার মিষ্টি সুর ও সৌন্দর্যের জন্য বিশেষভাবে জনপ্রিয়। যা এক ধরনের গভীরতা ও আত্মিক প্রশান্তি সৃষ্টি করে, যা মনকে গভীর প্রশান্তি ও নির্ভার অবস্থায় পৌঁছে দেয়। যা রাগটির সুরকে অত্যন্ত পরিষ্কার ও নির্মল করে তোলে। এই রাগটি -ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক বিশেষ রাগ, যা তার সুরের গভীরতা এবং আবেগময়তার জন্য পরিচিত। এই রাগ টি মূলত হিন্দুস্তানি সঙ্গীত ঘরানার একটি আধুনিক সৃষ্টি, প্রাচীন রাগ সারং-এর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। রাগ-রক্তহংস সারং-রাগে রচিত স্মরণীয় গান ---
“বল রাঙা হংসদূতী, তার বারতা দাও তার বিরহ-লিপি, বল সে কোথা।” এই গানটি রাগটির আবেগময়তা ও সুরের সরলতা ও মাধুর্যে একধরনের অন্তর্নিহিত ভালোবাসা ও বিরহের অনুভূতির পরশ পাওয়া যায় । এটি সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে একটি গভীর প্রভাব ফেলে এবং শ্রোতাদের মনকে একধরনের আনন্দময় প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে ।
কাজী কবির এক ব্যতিক্রমী অনন্য সৃষ্টি আরেকটি রাগ সন্ধ্যামালতী ও যেন সান্ধ্যকালীন পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সৌন্দর্য ও ক্ষণস্থায়ী ফুলের জীবনের প্রতিচ্ছবি।সন্ধ্যামালতীফুল যেমন সাঁঝবেলায় প্রস্ফুটিত হয়ে পরদিন সকালে ঝিমিয়ে যায় ঠিক তেমনই যেন তাঁর এই রাগটি। ১৯৪০ সালের ১৩ জানুয়ারি কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত ‘নব রাগমালিকা’গীতিনাট্যের প্রথম পর্বে প্রথমবারের মতো সন্ধ্যামালতী রাগ পরিবেশিত হয়েছিল। এই রাগে স্বরগুলির বক্র ব্যবহারে এক অনন্য সুরের আবহ সৃষ্টি করে ,যা শ্রোতাকে সন্ধ্যার নরম আলো ও প্রশান্তির অনুভূতি প্রদান করে এক ধরনের বিষণ্ণতার পরিবেশ প্রকাশ পায়। যা তাঁর সুরসাধনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই রাগে গাওয়া গান ‘ ''সন্ধ্যামালতী বালিকা তপতী বেলা শেষের বাঁশী বাজে’' এই আবহকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে। সন্ধ্যা মালতি যবে ফুলবনে ঝুরে কে আসি বাজালে বাঁশী ভৈরবী সুরে – কথার সঙ্গে সামন্জস্য রেখে রাগের ব্যবহার এই গানটিতে বড় সুন্দর দেখা যায়। গানটির প্রতিটি পংক্তিতে কবি নজরুল সন্ধ্যা ও উষার বর্ণনা এক সাথে করেছেন এবং সুরকার নজরুল ক্রমাগত সন্ধ্যার প্রসঙ্গে ভীমপলশ্রী এবং উষার প্রসঙ্গে ভৈরবীর সুর প্রয়োগ করেছেন।
কবি নজরুল ভারতীয় ঠাট ও রাগের সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। এবং নতুন রাগ সৃষ্টিতেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি বিলুপ্তপ্রায় রাগগুলিকে নতুন সঙ্গীত সৃষ্টি করে নবজীবন দান করেছিলেন। এই রাগ টি বাংলা সংগীতের জগতে নজরুলের এক অনন্য সৃষ্টি, যা তাঁর সুরসাধনার গভীরতা ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন। এই রাগের মাধ্যমে তিনি সান্ধ্যকালীন প্রকৃতির সৌন্দর্য ও মানবমনের অনুভূতিকে সুরের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, যা আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
রাগ-বনকুন্তলা :
নজরুলের সৃষ্টি রাগ বনকুন্তলা। হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে একটি -স্বতন্ত্র ও মনোমুগ্ধকর বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর সুর ও চলন একদিকে যেমন প্রকৃতির কোমলতা প্রকাশ করে, তেমনি অন্যদিকে এক গভীর আবেগের সঞ্চার ঘটায়।রাগ বনকুন্তলা তার সুরের মাধ্যমে একটি কোমল ও মায়াবী আবহ সৃষ্টি করে। এর আরোহ ও অবরোহে ব্যবহৃত স্বরসমূহের বিন্যাসে একটি স্বপ্নময় অনুভূতি জাগ্রত হয়। নজরুল রচিত এই 'বনকুন্তলা' রাগের বিখ্যাত গান হলো "বন-কুন্তল এলায়ে বন-শবরী ঝুরে সকরুণ সুরে", যা তাঁর সৃষ্ট রাগমালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বনকুন্তলা রাগের রূপ বর্ণনা করে, যেখানে ঘন বন ও বিরহী বন-শবরীর চিত্র ফুটে ওঠে। এই গানটি মূলত 'নব রাগমালিকা' গীতিনাট্যের অংশ এবং এর মাধ্যমে নজরুল এই নতুন রাগের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন, যা অরণ্য ও বিরহের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুনি সেই গান-যেন বনের মর্মর।
রাগ-বেণুকা সাধারণত দিনের প্রথমভাগে যখন প্রকৃতি নবজীবনের স্পন্দনে মুখরিত থাকে তখন পরিবেশিত হয়ে থাকে। বজ্রগতির রাগ হিসেবে ও পরিচিত এই রাগ টি যার অর্থ এটি দ্রুত ও শক্তিশালী গতিতে পরিবেশিত এবং এটি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি অনন্য রাগ, যা তার স্বরবিন্যাস,গতি ও আবেগময়তার জন্য বিশেষভাবে চর্চিত হয়।
এই রাগের মাধ্যমে সংগীতশিল্পীগন তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা যেমন প্রকাশ করতে পারেন তেমনি এর চঞ্চল গতিময় সুরপ্রবাহ শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরনের উদ্দীপনা উচ্ছ্বাস ও প্রাণচাঞ্চল্য সংগীতের রসের প্রভাব ফেলে। কবির বিশ্লেষণে এই রাগের গঠন, স্বরচরিত্র এবং প্রয়োগের দিক থেকে এটি সংগীত প্রেমীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। রাগটির গঠন এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে এটি দ্রুত গতির তান ও আলঙ্কারিকতা প্রদর্শনে উপযোগী।
“বেণুকা ও কে বাজায় মহুয়া বনে“।
বেণুকা রাগের ওপর সৃষ্টি বেশির ভাগ গানগুলি সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদানকারী। যা শ্রবণে এক গভীর তৃপ্তি এনে দেয়,মোহিত করে দিয়ে গানটি রাগটির সুরপ্রবাহ ও আবেগময়তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে। বেণুকা রাগের ওপর রচিত আরেকটি গান ;---
" বনের কিশোর আসে বাঁশরী বিসরি।
হেরিয়া কিশোরে চন্দ্রা আনত নয়নে
অনামিকা অঙ্গুলিতে জড়ায় আঁচল।
যত লাজ বাধে, তত সাধে মনে মনে,
হে সুন্দর থাকো হেথা আরো কিছুক্ষণ।"
গীতিনাট্যের এই গানটির রাগের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাণীর ভাবগত পরিবর্তন ঘটায় গানটিতে বিরহ বেদনার করুণ আবেদন অনুভূত হয়। বাঁশীর সহজাত মধুর এবং করুণ ধ্বনির আবেশ এই গানের সুরে ধ্বনিত হওয়ায় এই বেদনার প্রকাশে ঘটে আদি, অকৃত্রিম এবং আরণ্যক ভাব।
কবি নজরুল স্বয়ং 'বেণুকা রাগের পরিচিতিতে বলেছিলেন -বুনো বাঁশীর আভাস ফুটিয়ে ওঠে বলিয়া ইহার নাম বেণুকা।' গানের বাণীতেও রয়েছে করুণ রসের মধুরিমা। এই মধুরিমা গাঢ়তর হয়ে উঠে, সঞ্চারী ও আভোগে। বেদনার সুর বলেই এই গানটির সুরে মীড়ের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। তাই এই গানের গায়কীতে ছন্দের ধাক্কার চেয়ে, অধিকতর ভাবের কোমল এবং স্নিগ্ধতার দাবি রাখে। ''(তথ্যসূত্র: নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক (বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। মার্চ ১৯৯৯)। পৃষ্ঠা: ১১৯-১২০।)
রাগ-উদাসী ভৈরব
উদাসী ভৈরব বাংলা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম গভীর ও প্রভাবশালী রাগ। এ রাগের সুর ও ছন্দে বিরাজমান থাকে এক বিশেষ ধরনের বিষাদ ও অন্তর্মুখী মনোভাব, যা শ্রোতাকে এক মায়াময় অনুভূতির জগতে প্রবেশ করায়।উদাসী ভৈরব রাগটি-নজরুলের নতুন রাগ সৃষ্টির প্রচেষ্টার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল জগৎ ঘটক ও নজরুল ইসলামের যৌথ উদ্যোগে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জগৎ ঘটক 'উদাসী ভৈরব' নামে একটি নাটিকের খসড়া তৈরি করেন। নজরুল এই নাটিকাটির পরিমার্জনা করেন এবং এর সাথে ৬টি গান জুড়ে দেন। তবে নজরুল এই গানগুলোর সুর করেছিলেন তাঁর সৃষ্ট রাগ অবলম্বনে। উদাসী ভৈরবী হলো ভৈরব রাগের একটি নজরুল-সৃষ্ট রূপ, যা ভৈরব ঠাটের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এবং এর মাধ্যমে ভৈরব রাগের পরিচিত সুরকে এক ভিন্ন মেজাজে পরিবেশিত করা হয়েছিল।
নাট্যকার জগৎ ঘটকের বর্ণনা করেছিলেন --
''সুরেশদা কবিকে ভৈরব রাগের প্রচলিত রূপ এড়িয়ে নতুন সুরের রূপ সৃষ্টি করতে অনুরোধ করলেন। কবি সেই নিয়ে মেতে উঠলেন, এমনকি ঘুমের মধ্যেও রাগ-রাগিণীর স্বপ্ন দেখতে লাগলেন, নতুন ভৈরব রাগের উদ্ভাবন করলেন অরুণ ভৈরব, উদাসী ভৈরব, রুদ্র ভৈরব ইত্যাদিতে ।''
উদাসী ভৈরবী রাগটি ও নজরুল সৃষ্ট একটি বিশেষ রাগ, যা তাঁর নাটক 'উদাসী ভৈরব'-এর জন্য তৈরি করেছিলেন। এটি ভৈরব রাগের একটি রূপান্তর, যেখানে ভৈরব রাগের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে স্বরবিন্যাসে কিছুটা ভিন্নতা আনা হয়েছে, যা নজরুল গানে ব্যবহৃত হয় এবং এই রাগের গীতি, ভজন বা রাগিণীতে ভৈরবের সুরকে এক উদাসীন বা বিষণ্ণ মেজাজ দেওয়া হয়। উদাসী ভৈরব রাগের সুরতত্ত্বে ললিত রাগের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ললিত যেমন কোমল ও বিষাদময়, তেমনি উদাসী ভৈরবও গভীর বিষাদের প্রকাশ ঘটায়। তবে উদাসী ভৈরবের সুরে একটা দার্শনিক ভাব ও অন্তর্মুখী মনোভাব স্পষ্ট, যা শ্রোতাকেঐকান্তিক ভাবনায় নিমগ্ন করে। এই রাগে কখনো কখনো নিরাশা ও তীব্র অন্তর্দর্শনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও নাটকে উদাসী ভৈরবের ব্যবহার প্রায়শই এমন অনুভূতির জন্য হয়ে থাকে যা গভীর শোক বা বিষণ্ণতা প্রকাশ করে।
ভৈরব ঠাটের উপর ভিত্তি করে রচিত,রাগটি যেখানে ভৈরব রাগের মূল রূপ থেকে ভিন্নতা আনতে কিছু স্বরের পরিবর্তন করা হয়েছে। ভৈরবের গম্ভীর ও ভক্তিপূর্ণ মেজাজের সঙ্গে একটি বিষণ্ণ, উদাসীন বা ম্লান ভাব যুক্ত হয়, যা একে নজরুল-সৃষ্ট রাগ হিসেবে পরিচিতি দেয়। এই রাগে রচিত গান, যেমন 'সতীহারা উদাসী ভৈরব কাঁদে',বিষাণ ত্রিশুল ফেলি”— বেশ জনপ্রিয়এই গান টিতে রাগটির অন্তর্মুখী এবং শোকাকুল ভাবের প্রকাশ।ভৈরব রাগ মূলত বিষাদের বিভিন্ন স্তরকে ফুটিয়ে তোলে, যা বিশেষ করে ধ্যান, অনুশোচনা ও দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে সুসংগত। উদাসী ভৈরব রাগ বাংলা সঙ্গীতের এক অনন্য রত্ন, যা তার বক্রগতির গঠন ও স্বর ব্যবহারে শ্রোতার হৃদয়ে এক গভীর ছাপ ফেলে। এটি শুধুমাত্র একটি সুর নয়, বরং এক ধরনের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ যা মানুষের মনের বিষাদের গভীরতম স্তরকে স্পর্শ করে।শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য উদাসী ভৈরব রাগ হলো একটি অনন্য অধ্যায়, যেখানে সঙ্গীত ও মনস্তত্ত্ব মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য শোক সুরভিত অভিজ্ঞতা।
রাগ-শঙ্করী:
শঙ্করী বা শঙ্করা' নামে ও পরিচিত এই রাগ টি দেবী দুর্গার শঙ্করীর নামে উৎসর্গীকৃত। এই রাগের প্রকৃতি:শান্ত গম্ভীর, ভক্তিপূর্ণএবং এর স্বরবিন্যাস বিলাবল ঠাটের কাছাকাছি হলেও এর কিছু বিশেষত্ব আছে। শিবানী বা অঙ্গলীনা যোগমায়া শঙ্করী এই রাগের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অপরিসীম ভান্ডারে রাগ শঙ্করী একটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী এবং সূক্ষ্মভাব প্রকাশকারী রাগ। এটি শ্রোতাদের হৃদয়ে এক মাধুর্যময়ী অভিজ্ঞতা জন্মদেয়, যার মাধ্যমে প্রায়ই গভীর প্রেম, ভক্তি ও দুঃখের অনুভূতি প্রকাশ পায়। এই রাগের ব্যবহার অনেক সময় শিবের আধ্যাত্মিক শক্তি ও ভক্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে, শঙ্করী নামটি হয়তো শিবশক্তির ঐক্যের প্রতীক। এর স্বরবিন্যাস বিলাবল ঠাটের কাছাকাছি, কিন্তু কিছু বিশেষত্ব আছে। অবরোহণের মধ্যম স্বরের সাথে গান্ধার স্বরের কম্পন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।তবে দক্ষিণ ভারতে শঙ্করভরণম রাগের শুদ্ধ মধ্যম রূপটি শঙ্করী নামেও পরিচিত, যা মূলত 'কল্যাণ ঠাটের সমতুল্য। রাগ শঙ্করী ভক্তিগীতি, শ্যামা সঙ্গীত এবং নজরুলগীতিতে খুব জনপ্রিয়, যেখানে গভীর আধ্যাত্মিকতা ও ভক্তি প্রকাশ পেয়েছে ।
তাই তো গবেষক ড : সুনীল কুমার গুপ্ত লিখলেন,
" নজরুলের অধিকাংশ গানই সহজ, সরল ও স্বতঃস্ফূর্ত, ছন্দের বৈচিত্র্য, মিলের অভিনবত্বে অলঙ্কারের কারুকার্যে গানগুলো মনোমুগ্ধকর। নজরুলের কবিমন দুরন্ত, দুর্বার ও উচ্ছল। তাই তার কবিতা ভাবাবেগের প্রাবল্যে সাধারণত দীর্ঘ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই ভাবাবেগ আশ্চর্যভাবে সংহত হয়েছে তার গীতাবলিতে। তার গানের স্বল্প পরিসরে এসেছে কখনো চমক-লাগানো তীক্ষ্ণতা , কখনো হৃদয়-হারানো গভীরতা, আবার কখনো বা মন-কেড়ে-নেওয়া উচ্ছলতা। নজরুল তার গানে মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত প্রভৃতি ছন্দ অপূর্ব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন।"
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-চরিতমানস, ডঃ সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং (২০১৫)।
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
৫)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ পাবলিশার্স)
0 Comments