জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি/একত্রিশ তম পর্ব /চিত্রা ভট্টাচার্য্য

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি
একত্রিশ তম পর্ব 

চিত্রা ভট্টাচার্য্য


সুরস্রষ্টা নজরুল)

সুরস্রষ্টা নজরুল নতুননতুন রাগ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা রাগসংগীতের বহুমুখী ধারা প্রবাহিত করে .সংগীত জগতে এক নবদিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁর সৃষ্ট রাগ যোগিনী সাধারণত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এমন একটি বিশিষ্ট রাগ যার মাধ্যমে শিল্পীরা বিরহ, বিষণ্ণতা, শান্তি এবং অন্তর্মুখী ভাবনা প্রকাশ করেন। যোগিনী রাগের বিশেষ সংগঠন ও সুরের মাধুর্য শোনার পর মন  একশ্রেণীর নীরবতায় অবগাহন করে, যেখানে জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ক্লেশ একপলকে নিঃশেষ হয়ে যায়। এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বক্র সম্পূর্ণ জাতির অন্তর্গত এবং এর সুর ও ছন্দ শ্রোতাদের বিশেষ মনোরঞ্জনের  ভূমিকা রাখে। শিল্পী নানা আবেগের প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হন—যা কখনো শান্ত, কখনো বিষণ্ণ, আবার কখনো প্রেম-বিরহের মিলন। এই রাগটি বাংলা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের  এক স্বতন্ত্র ও মনোমুগ্ধকর রাগ। 

“যোগিনী” অর্থাৎ বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন এক আধ্যাত্মিক নারী শক্তি। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগের নামকরণ প্রায়ই দেবী-দেবতার বা পৌরাণিক চরিত্রের সাথে যুক্ত থাকে। তাই রাগ যোগিনী শব্দার্থে এমন এক সুরের প্রকাশ যেখানে মাধুর্য ও শক্তির এক অসাধারণ মিশ্রণ স্পষ্ট দেখা যায় |  এই রাগটি সুরের সমষ্টি নয় বরং সম্পূর্ণ আবেগের ভাষা, যা শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। এর কোমল কিন্তু শক্তিশালী সুরের ছোঁয়া জীবনের নানা দুঃখ-বেদনা ও আনন্দের সাথে সঙ্গীতের মেলবন্ধন ঘটায়। রাগ যোগিনী আজও তাই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অমূল্য রত্ন।

নজরুলের সঙ্গীত-জীবনের পঞ্চম ও শেষ পর্যায় হচ্ছে রাগভিত্তিক রাশিরাশি গানের সৃষ্টি ।  রাগভিত্তিক গান নিয়ে তিনি অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং নব নব সৃষ্টিতে মৌলিক সঙ্গীত-প্রতিভার স্বাক্ষরও রেখেছেন। নজরুল বিশুদ্ধ রাগ অবলম্বনে কিছু হিন্দুস্থানি বন্দিশের ওপর বাংলা কথা বসিয়ে বাংলা খেয়াল রচনার সূত্রপাত করেন, যেমন জয়জয়ন্তী রাগে ‘দূর বেণু কুঞ্জে’, মেঘ-এ ‘গগনে সঘনে চমকিছে দামিনী’ বাহারে ‘পিউ পিউ বোলে’ প্রভৃতি। 
🍂

এ গানগুলি কলকাতা বেতারের হারামণি, নবরাগ মালিকা, মেল-মিলন, যাম যোজনার কড়ি মাধ্যম, প্রহর পরিচায়িকা নামক অনুষ্ঠানসমূহে পরিবেশিত হতো।
রাগ জয়জয়ন্তী উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে একটি মিশ্র রাগ, যাতে শুদ্ধ গান্ধারের প্রয়োগ প্রবল। নজরুল গীতিতে এই রাগের মেলোডি অত্যন্ত কাব্যিক এবং করুণ রসের সৃষ্টি করে তিনি রাগাশ্রয়ী নজরুল গীতিতে ‘জয়জয়ন্তী’ রাগটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছেন। যা মূলত বিরহ, বিষাদ এবং বর্ষার পরিবেশ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে । এই রাগে নিবদ্ধ তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো,
‘সজল হাওয়া কেঁদে বেড়ায় 
কাজল আকাশ ঘিরে’।
তুমি এসো ফিরে 
উঠছে কাঁদন ভাঙ্গন ধরা নদীর তীরে তীরে....
 জয়জয়ন্তী রাগের সুরে নজরুল বিরহী প্রেম ও প্রকৃতির রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। নজরুল সঙ্গীতে জয়জয়ন্তী রাগের ব্যবহার দেখা যায় কাহার্বা তালের গানে। 
  জয়জয়ন্তীতে কবির আর একটি সমধিক সুপ্রচলিত গান .যদিও এই গানটির রচনাকাল ও স্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
মেঘ মেদুর বরষায় কোথা তুমি
ফুল ছড়ায়ে কাঁদে বনভূমি॥
ঝুরে বারিধারা
ফিরে এসো পথহারা
কাঁদে নদী তট চুমি’ ॥

এই রাগের গানে বিরহ ও বিষাদগ্রস্ত আবেগ প্রাধান্য পায়, যা প্রায়শই বর্ষা বা প্রকৃতির সাথে মিশে যায়, যা এই গান টির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। 
জয়জয়ন্তী উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে একটি মিশ্র রাগ, যাতে শুদ্ধ গান্ধারের প্রয়োগ প্রবল ভাবে দেখাযায় নজরুল গীতিতে এই রাগের মেলোডি অত্যন্ত কাব্যিক এবং করুণ রসের সৃষ্টি করে।

  শিব-সরস্বতী রাগ-কবি নজরুল উদ্ভাবিত একটি বিশেষ রাগ মূলত একটি ভক্তিগীতি বা বন্দনা রাগ, 'জয় ব্রহ্ম বিদ্যা শিব-সরস্বতী' গানের মাধ্যমে এই রাগ বিশেষ ভাবে পরিচিতি পায়। শিব সরস্বতী রাগটি হিন্দু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট রাগ, যার নামকরণ শিব ও সরস্বতী দেবীর প্রতি উৎসর্গীকৃত।এই রাগটি ত্রিতাল বা অন্যান্য তালে গাওয়া যায়।, যার গ্রহস্বর সাধারণত গা ।এটি এক ধরনের ষাড়ব জাতির রাগ, অর্থাৎ তার (আরোহ) ও   (অবরোহ) উভয়েই ছয়টি স্বর নিয়ে গঠিত।এই রাগে বাদী স্বর হচ্ছে মধ্যম (মা) এবং সমবাদী স্বর  হলো ষড়জ (সা)। রাগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গ (গন্ধার) এবং ধ (ধৈবর্ত) স্বরের ব্যবহার, যা হয় কোমল অথবা শুদ্ধ উভয়ভাবেই ধরা হয়।

এই রাগে নিবদ্ধ গান  "জয় ব্রহ্ম বিদ্যা শিব-সরস্বতী জয় ধ্রুব জ্যোতি, জয় বেদবতী"।. 
জগৎ ঘটক-কৃত স্বরলিপিসহ এই গানটি ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে মাঘ মাসে পাঠশালা পত্রিকায় এবং পরে 'বেণুকা' স্বরলিপি সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল।এটি মূলত সরস্বতী বন্দনা বা জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা হিসেবে নজরুলসঙ্গীত ধারায় প্রচলিত। ধ্রুপদী ধারার না হলে ও নজরুল ইসলামের নিজস্ব এই রাগ সৃষ্টির একটি চমৎকার উদাহরণ,. যেখানে শিব ও সরস্বতীকে একই সাথে বন্দনা করা হয়েছে।
জয় ব্রহ্ম বিদ্যা শিব -সরস্বতী – (নজরুল সঙ্গীতকোষ)
 শিব সরস্বতী নজরুল-সৃষ্ট রাগ টির তাল: ত্রিতাল।  
আশা ভৈরবী।
শিব সরস্বতী রাগ সাধারণত প্রাতঃকালীন বা সন্ধ্যাকালীন পরিবেশে গাওয়া হয় এর মধুর সুরময়তা এবং ও ঐশ্বরিক অনুভূতি শ্রোতাদের মনকে প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক গভীরতায় নিয়ে যায়।এই রাগে ব্যবহৃত কোমল স্বরগুলি শান্ত ও মৃদু আবেগ সঞ্চার করে, যা শ্রোতার মনের সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করে।  গন্ধার স্বরটি কখনো কোমল এবং কখনো শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা হয়, যা রাগের ভিন্ন ভিন্ন রঙ প্রকাশ করে। ধৈবর্ত স্বরটিও প্রধানত কোমল থাকে, যা রাগটির মৃদু ছন্দ ও গম্ভীরতা বৃদ্ধি করে। রাগটি বেশ সংক্ষিপ্ত,এর মেলোডির অনুভূতি গভীর এবং প্রবল। শিব সরস্বতী রাগের নাম থেকেই বোঝা যায় এটি দেবশক্তির প্রতি নিবেদিত। 

শিব ও সরস্বতী দেবী ভারতীয় সংস্কৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ দেবত্রী, যারা যথাক্রমে ধ্বনি ও জ্ঞানের প্রতীক। এই রাগে তাই সঙ্গীতের মাধ্যমে উচ্চতর আধ্যাত্মিক বোধ ও জ্ঞানের প্রেরণা পাওয়া যায়।শিব সরস্বতী রাগটি মূলত হিন্দু-শাস্ত্রীয় সংগীতে ব্যবহৃত হলেও,আধুনিক ভারতীয় সঙ্গীতে ও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কিছু ক্ষেত্রে এটি আধুনিক সংগীত বা চলচ্চিত্র সংগীতে ও অনুপ্রাণিত রূপে ব্যবহৃত হয়। শিব সরস্বতী রাগ তার সরল অথচ গভীর সুরের কারণে শ্রোতাদের মধ্যে এক অনন্য প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি সৃষ্টি করে। এর গন্ধার ও ধৈবর্ত স্বরের কোমল ব্যবহার রাগটিকে শ্রোতা ও শিল্পী উভয়ের জন্য   মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।

রাগ-নির্ঝরিণী :
রাগ-নির্ঝরিণী হল ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি মূল্যবান রত্ন।এক অনন্য এবং স্বল্প পরিচিত রাগ। এটি বিশেষত মোহনরাগ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হলেও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং আভিজাত্য রাগটিকে আলাদা করে তোলে। শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রতিটি রাগের নিজস্ব একটি আবেগ, ভঙ্গি ও সময় রয়েছে, আর নির্ঝরিণী সেই তালিকায় একটি প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। গানের রাগটি শুরু হয়েছে উচ্ছল ঝর্নার চলমান মধুর মোহিত ধ্বনি সৌন্দর্যের কথায়। কবি কল্পনায় তা জল-ঝুমঝুমী।

“রুম ঝুম ঝুম রুম ঝুম্ কে বাজায়, জল ঝুমঝুমি চমকিয়া জাগে ঘুমন্ত বনভূমি।'
গানটির প্রথম পংক্তিটি 'রুম্ ঝুম্ ঝুম্ ঝুম্ রুম্ ঝুম্', 
অনুপ্রাসের ধ্বনি-প্রবহমানতার ধ্বনিমাধুর্যে অলঙ্কৃত হয়ে উঠেছে। অবিরাম জল-ঝুমঝুমির শব্দে ঘুমন্ত অরণ্য জেগে উঠে। বনের হরিণী রঙের খেলায় মেতে উঠে, পুষ্পকোড়ক বর্ণিল দল মেলে দেয়, বনকোকিলের কুহু ধ্বনিতে ভরে উঠে, গাছের পাতার শব্দও ঝিরি ঝিরি বাতাসের সাথে মিশে বীণার মধুরধ্বনির মতো ঝংকার তোলে।   অরণ্য হয়ে উঠে ধ্বনি ও দৃশ্যের মোহনীয় আবেশে নান্দনিক। এই আবেশে অরণ্য উদ্বেলিত করে রাখালিয়াকে। তার বাঁশির সুরে লাগে জল-ঝুমঝুমির  ছোঁয়া,পল্লীপ্রান্তর আবেশিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়। নির্ঝরিণী শব্দের অর্থ ' রাগ যা রাগিণীর হৃদয়ে  নির্ঝরের মত শান্তি এবং স্নিগ্ধতা আনে।' এই রাগের মাধুর্য এবং সুরের বৈশিষ্ট্য সাধারণত এক ধরণের গভীর প্রশান্তি এবং কোমলতার প্রতিফলন । এর সুরের ছোঁয়ায় যেন ঝুমঝুম বৃষ্টি নামে, জঙ্গলজুড়ে তারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

গানটিতে তালের ছন্দ এমন পরিবেশের সৃষ্টি করে যা শুনলে মনেহয়,  শব্দগুলো শান্তির বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে। এই রাগ সাধারণত ভোরের দিকে বা সন্ধ্যায় পরিবেশে গাওয়ার জন্য মানানসই। যখন প্রকৃতি ঘুম থেকে জেগে ওঠে বা ঘুমন্ত বনভূমি চমকায়। তাই এই রাগ শ্রোতাকে এক ধরণের গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ অনুভব করায়। এই গানের মাধ্যমে প্রাকৃতিক দৃশ্য ও শান্তির অনুভূতি প্রকাশ পায় । সুরের গতি ও তাল রাগের অতুলনীয় মাধুর্যকে পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ ঐশ্বর্য্য মন্ডিত করে।

তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-চরিতমানস, ডঃ সুশীলকুমার গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং (২০১৫)।
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
৬)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ)

Post a Comment

0 Comments