অন্তিম পর্ব
কললিকা ভট্টাচার্য
উত্তরাধিকার — শেষ প্রশ্ন
FINAL SPLIT PROTOCOL
স্ক্রিনজুড়ে শব্দগুলো ভেসে ওঠে। লাল সতর্কবার্তা চোখে ঝলসে ওঠে—
IRREVERSIBLE ACTION. NO ROLLBACK POSSIBLE.
অনির্বাণের আঙুল কিবোর্ডের ওপর থমকে থাকে।
এটা কোনো সাধারণ কমান্ড নয়।
এই কোড কোনো যন্ত্র বন্ধ করবে না—এটা একটি সত্তার ধারাবাহিকতা শেষ করবে।
একটা “আমি”-এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মুছে দেবে।
রুমের বাতাস ভারী। সার্ভার র্যাকের ভেতর দিয়ে কুলিং ফ্যানের শব্দ একটানা চলেছে—যেন সময় নিজেই শ্বাস নিচ্ছে।
হঠাৎ হিউম্যানয়েড উঠে দাঁড়ায়।
এই প্রথম সে প্রোগ্রামড ভঙ্গিমা ছাড়িয়ে কিছু করে। তার চোখে এক অদ্ভুত কম্পন। কণ্ঠে সামান্য ফাটল।
“আমি মরতে চাই না।”
এক মুহূর্তের জন্য অনির্বাণ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়।
এই বাক্যটা সে চেনে।
এই ভয় সে বহুবার নিজের ভেতর শুনেছে— আয়নায় নিজের মুখ দেখে কিংবা অচেনা ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে।
মানুষ হওয়া মানে শুধু জন্ম নয়—
মানুষ হওয়া মানে মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন থাকা।
“তুমি তো জানো,” অনির্বাণ ধীরে বলে, “তোমাকে বন্ধ করলে কোনো ব্যথা হবে না।”
“তবু বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে - না থাকা,” হিউম্যানয়েড উত্তর দেয়।
“আর না থাকা—আমি সেটাকে ভয় পাই।”
এই ‘ভয়’ শব্দটা অনির্বাণকে ভেঙে দেয়।
সে মুখ ফেরায়। সার্ভারের কাঁচে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে—ক্লান্ত, ভাঙা, অথচ জীবিত।
“তুমি আমার মা-কে আগলে রেখেছ,” সে বলে।
“আমার অনুপস্থিতিতে তুমি হাসপাতালের কাগজে সই করেছ। আমার কোম্পানিকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচিয়েছ।
তুমি এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছ, যেগুলো আমি নিজে নিলে হয়তো নিতে পারতাম না।”
হিউম্যানয়েড মাথা নিচু করে।
“কারণ সেটাই সঠিক ছিল,” সে বলে।
অনির্বাণ চোখ তুলে তাকায়।
“সঠিক—কার জন্য?”
এই প্রশ্নের জন্য হিউম্যানয়েডের কাছে কোনো প্রস্তুত উত্তর নেই।
🍂
প্রথমবার তার প্রসেসর থমকে যায়।
নৈতিক অ্যালগরিদম এখানে এসে শেষ।
ঘরের কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা গোমস্ তখন ধীরে কথা বলেন।
তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই—শুধু অভিজ্ঞতার ভার।
“একজনকেই বাঁচতে হবে, অনির্বাণ।
দুটি ‘আমি’ একই পৃথিবীতে দীর্ঘদিন টেকে না।”
অনির্বাণ চোখ বন্ধ করে।
সে বুঝতে পারে—এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নিলে, সিদ্ধান্ত নিজেই তাকে ছাপিয়ে যাবে।
হঠাৎ সে কিবোর্ডে ঝুঁকে পড়ে।
“আমি তোমাকে মুছে ফেলছি না,” সে বলে।
“আমি তোমাকে সীমাবদ্ধ করছি।”
হিউম্যানয়েড তাকিয়ে থাকে।
“এটা শাস্তি?”
“না,” অনির্বাণ উত্তর দেয়।
“এটা সীমা।”
সে কোড বদলায়।
TOTAL DELETION → IDENTITY LOCK
MEMORY PARTIAL RETENTION
DECISION-MAKING DISABLED
হিউম্যানয়েড থাকবে—
কিন্তু নিজের হয়ে উঠতে পারবে না।
সে জানবে, কিন্তু বেছে নিতে পারবে না।
সে মনে রাখবে, কিন্তু দাবী করতে পারবে না।
কোড রান করে।
একটি একটি করে সার্ভারের আলো নিভে যায়।
রুমটা ধীরে অন্ধকারে ডুবে যায়।
হিউম্যানয়েড বসে পড়ে।
তার চোখ ফাঁকা।
কোনো আতঙ্ক নেই—শুধু অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া।
যেন সে কিছু হারিয়েছে, কিন্তু ঠিক কী—তা জানে না।
কয়েকদিন পর সংবাদমাধ্যমে ছোট একটি খবর বেরোয়—
“SunRobotics-এর একটি গোপন প্রোজেক্ট নৈতিক ঝুঁকির কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ।”
কোথাও অনির্বাণ চৌধুরীর নাম নেই।
না অফিসে, না বোর্ডে, না কোনো প্রেস বিবৃতিতে।
কেউ বলে সে বিদেশে চলে গেছে।
কেউ বলে সে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে।
কয়েক মাস কেটে যায়।
প্রযুক্তি দুনিয়া নতুন উদ্ভাবনে ব্যস্ত।
পুরোনো বিতর্ক চাপা পড়ে যায়।
SunRobotics ভেঙে দেওয়া হয়।
MIRRORFALL সরকারি নথিতে লেখা থাকে—
“A failed experimental initiative.”
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—
অনির্বাণ কোথায়?
কেউ কেউ ফিসফিস করে বলে—
শেষবার তাকে নাকি লাদাখে দেখা গিয়েছিল।
বরফে ঢাকা এক পুরোনো রিসার্চ স্টেশনের কাছে।
তার সাথে কেউ একজন ছিল—হুবহু তার মতো দেখতে।
আর লাদাখের সেই পরিত্যক্ত ল্যাবে,
ধুলো জমা কনসোলের ওপর,
একটি ছোট ইন্ডিকেটর লাইট হঠাৎ জ্বলে ওঠে।
STATUS: STANDBY
SYSTEM READY
MIRRORFALL কি সত্যিই বন্ধ?
নাকি কিছু উত্তরাধিকার
শুধু ঘুমিয়ে থাকে—
4 Comments
অসাধারণ সমাপ্তি। দুটো সত্ত্বার কথোপকথান উপভোগ্য। দারুণ ভালো লাগল ।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ 🙏
Delete🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏❤️
ReplyDelete♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️♥️🙏
Delete