দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৩শে জানুয়ারি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন, যা আমরা দেশপ্রেম দিবস নামে পালন করি। আসুন এই মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সবকিছুই আমরা জেনে নিই।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ দেশপ্রেমিক, বিপ্লবী নেতা ও অনন্য সাধারণ সংগঠক। তাঁর জন্মদিন ২৩শে জানুয়ারি ভারত সরকার দ্বারা দেশপ্রেম দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় দেশের জন্য আত্মত্যাগ, ও সংগ্রামের মূল্য এবং জাতীয় চেতনার গুরুত্ব।
নেতাজির জীবন ও আদর্শ আজও প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে অনুপ্রেরণার আলো জ্বালিয়ে রাখে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি,
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”
যা আজও আমাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।
দেশপ্রেম দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো, দেশের নাগরিকদের মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও জাতীয় চেতনার বোধ জাগ্রত করা। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা সহজে আসেনি,অসংখ্য বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক ও সাধারণ মানুষের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। দেশপ্রেম কেবল দেশের প্রতি ভালোবাসা নয়,বরং দেশের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা।নেতাজির জীবন ছিল, সেই আদর্শের জীবন্ত উদাহরণ।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, বর্তমান ওড়িশার কটকে। তাঁর পিতার নাম জানকীনাথ বসু এবং মাতার নাম প্রভাবতী দেবী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, আত্মমর্যাদাশীল ও সাহসী। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ রোপিত হয়। তিনি ইংরেজদের অন্যায় শাসন ও ভারতবাসীর উপর অত্যাচার দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হতেন। নেতাজি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন,যা সেই সময় অত্যন্ত সম্মানের চাকরি ছিল,কিন্তু দেশের দাসত্ব মেনে তিনি ইংরেজ সরকারের চাকরি করতে রাজি হননি। তাই তিনি সেই চাকরি ত্যাগ করেন এবং নিজেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর অসীম দেশপ্রেমের প্রমাণ।
নেতাজি প্রথমে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসে যোগ দেন। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আরও দৃঢ় ও সংগ্রামী পথের সমর্থক।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া ভারত স্বাধীন হতে পারবে না। তাই তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন এবং জাপানের সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
নেতাজির নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ছিল, এক সাহসী ও বিপ্লবী বাহিনী। এতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করতেন। তিনি নারীশক্তিকে সম্মান জানিয়ে ঝাঁসির রানি বাহিনী গঠন করেন। নেতাজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার ভারতীয় সৈনিক দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হন। তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করেন,
শহীদ দ্বীপ ও স্বরাজ দ্বীপ।
নেতাজির আদর্শ ছিল, আত্মমর্যাদা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন,স্বাধীনতা ভিক্ষায় পাওয়া যায় না, ছিনিয়ে নিতে হয়। জাতির উন্নতির জন্য ঐক্য অপরিহার্য।
নারী ও পুরুষ সমানভাবে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করবে। তিনি ধর্ম, ভাষা ও জাতির ঊর্ধ্বে উঠে এক জাতির ধারণায় বিশ্বাস করতেন।
১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে আজও নানা রহস্য রয়ে গেছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন তিনি জীবিত ছিলেন এবং আত্মগোপনে ছিলেন।
যাই হোক, তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম চিরকাল আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।
🍂
দেশপ্রেম দিবস পালন
প্রতি বছর ২৩শে জানুয়ারি দেশজুড়ে পালিত হয়। এই দিনে স্কুল-কলেজে আলোচনা সভা হয়,
রচনা, বক্তৃতা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়,
নেতাজির জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
তাঁর মূর্তিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এই দিনটি তরুণ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে নেতাজির শিক্ষা
আজকের যুগে দাঁড়িয়ে নেতাজির আদর্শ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। দেশপ্রেম শুধু সীমান্তে যুদ্ধ করা নয়, বরং সমাজের উন্নয়নে কাজ করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দেশের সম্পদ রক্ষা করা এবং সৎ নাগরিক হওয়াও দেশপ্রেমের অংশ।নেতাজি আমাদের শিখিয়েছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে আত্মসম্মান বজায় রাখতে,দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে।
দেশপ্রেম দিবস আমাদের জাতীয় চেতনার উৎসব। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ত্যাগ, সাহস ও আত্মবলিদানের কথা। তাঁর জীবন ছিল এক দীপ্ত শিখা, যা আজও আমাদের পথ দেখায়। নেতাজি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ, একটি চেতনা এবং একটি বিপ্লব। তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন, শক্তিশালী ও আত্মনির্ভর ভারত। আমরা যদি তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি,তবেই প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেম দিবসের মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে।
0 Comments