জ্বলদর্চি

কে তুমি নন্দিনী/ শেষ পর্ব

কে তুমি নন্দিনী 
তৃতীয় ও শেষ পর্ব

তনুশ্রী ভট্টাচার্য 


রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের দীক্ষায় দীক্ষিত। তিনি জানেন‌ নিজেকে চেনা জানা অনুধাবন আর আত্মবিশ্লেষণ  করতে করতেই এগিয়ে যেতে হয়।  আত্মানাংবিদ্ধি বা  Know thyself   আসলে মনুষ্যত্বের দীক্ষা, মানবতার উড্ডীন ধ্বজা। কিন্তু  যাঁরা অহমিকায় আত্মগর্বী , ক্ষমতায় মদমত্ত থাকেন তাঁরা তো আসলে নিজেকে চিনতেই পারেন না  --এর থেকে দু:খের আর কি আছে মানবজীবনে!  নিজেকে না চিনতে পারার অক্ষমতাই মানুষকে দাম্ভিক করে তোলে। সেখান থেকে আসে ক্রোধ, সেখান থেকে বিচলন, বিকলন,  দু:খ বেদনা, হতাশা  এবং নিষ্ঠুরতা। শেষে অন্যকে বশ করার প্রবণতা, নির্যাতন করার পৈশাচিক উল্লাস । এ সমস্তই পার্থিব ক্ষমতাশালী মানুষের মনোবিকার বা মনোগ্লানির স্তর। রবীন্দ্রনাথ  বিশ্বাস করতেন শেষ পর্যন্ত  একজন মানুষ  মানুষ হয়ে উঠবেই। অন্তত রক্তকরবীতে  রাজার চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে তেমনটাই দেখিয়েছেন। এখানে রোম্যান্টিসিজম নেই, আছে ঘোর রিয়েলিজম। তবে এই মানুষ হয়ে ওঠার জন্য একটি অনুঘটক ত লাগবে। নন্দিনী সেই অনুঘটক। নন্দিনী চিনিয়ে দিয়েছে রাজাকে যে সে আসলে মানুষ,-- প্রেম ভালোবাসা আবেগ দোষ ত্রুটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ  মানুষ। জালের আড়ালে থেকে বেরোবার আকুতি তারও আছে। চিকিৎসকের কথাতেও ধরা পড়েছে যে রাজা আসলে ততটাও নিষ্ঠুর নয় । এদিকে  রাজাও বার বার নন্দিনীকে বোঝার আকুতি জানিয়েছে কখনো  নরম সুরে, কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো জোর খাটিয়ে , কখনো ক্লান্ত সুরে। কখনো চেয়েছে রক্তকরবীর অঞ্জন চোখে পরতে, কখনো নন্দিনীর চুলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বটগাছের ডালে বসা ছোট্ট পাখির মতো‌ দোল খেয়েছে তার মন। কখনো রঞ্জনকে হিংসা করেছে, কখনো রঞ্জনের যাদুতে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছে।
🍂

 অথচ মাঝে মাঝেই নিজের শক্তির দম্ভে, সম্পদের অহংকারে অন্ধ রাজা নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিনতে পারে নি যেমনটি  পারেন না যুগে যুগে‌ দেশে দেশে রাষ্ট্রনায়করা। তাদের দুর্ভাগ্য কোনো‌ নন্দিনী তাদের আত্মআবিস্কারের পথ উন্মুক্ত  করে দেবার জন্য থাকে না। রক্তকরবী নাটকের  নন্দিনী যেন সেই সহজ শক্তি যা রাজাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে, রাজার মনে একান্ত গহনে যে  প্রকৃতি প্রেম,  যে মনুষ্য প্রেম  লুকিয়ে ছিল এবং তা  প্রায় অতল  গহ্বরে চলে গিয়েছিল তাকেই  আবার  গভীর থেকে টেনে উপরে উঠিয়ে নিয়ে এলো। রাজা  যে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই একজন মানুষ  সেই আত্মোপলব্ধির  পর্যায়ে পৌঁছতে পারল নন্দিনীর বারবার দরজার আঘাত পেয়ে। আসলে  এ আঘাত রাজার রুদ্ধ মনের কপাটে পড়েছে। আর ধীরে ধীরে অন্তিম পর্যায়ে  রাজা নিজেই বেরিয়ে এসেছে খোলস ছেড়ে। বাস্তবে এ পরিবর্তন হোক বা না হোক বিশ্বাস রাখতে দোষ‌ নেই যে  রাজার মতো  নিষ্ঠুর দাম্ভিক রাষ্ট্রনায়করা একদিন না একদিন‌ সত্যিকারের মানুষ হয়ে নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে। হয়তো ততদিনে অনেক ভুল হয়ে যাবে, অনেক মৃত্যু ঘটে যাবে, রঞ্জনের মতো  প্রতিবাদের,  কিশোরের মতো  সতেজতার  মৃত্যু ঘটবে কিন্তু নন্দিনীর প্রাণান্ত চেষ্টায় রাজা একদিন পৌষের মাঠে এসে দাঁড়াবেই দাঁড়াবে। শুধু রাজা নয় তার সর্দাররাও কূটভাষ পরিত্যাগ করবে। আর এ সবের কান্ডারী  ঐ‌ নন্দিনী। নন্দিনী তো আসলে মানুষের ভেতরের শক্তি,ঘুমিয়ে থাকা বিবেক,  জীবনে চাপা পড়ে থাকা মাধুর্য।

তবে এটাও ঠিক ঐ হতভাগ্য রাষ্ট্রনায়করা মনের দিক থেকে রাজার মতোই নি:স্ব, রিক্ত। তাদের না আছে বিশু পাগলের গান ,না আছে কিশোরের মতো সবুজ দৃঢ়তা, না আছে রঞ্জনের মতো প্রেম না আছে‌ নন্দিনীর মতো হৃদয়ভরা আলো।
 তাই তারা সত্যিই হতভাগ্য। কিন্তু আমরা যারা রাষ্ট্রনায়ক নই, আমরা যারা অতি সাধারণ মানুষ-- সরষের ক্ষেত ভালোবাসি, ভালোবাসি কুন্দ ফুলের মালা, খোলা হাওয়া আমরা তো পারি ঐ রাষ্ট্রনায়কদের পীড়িত জীবনে সংবেদনের মলম লাগাতে নন্দিনীর মতোই।
জীবনকে ভালোবাসলে, সমাজের মঙ্গলাকাঙ্খী হলে, মানবতাকে সম্মান করলে  আমরা  প্রত্যেকেই রঞ্জন ,প্রত্যেকেই কিশোর প্রত্যেকেই বিশু পাগল হতে পারি। চাই কি মনের নান্দনিকতা  জাগিয়ে তুলে আলোর ঢেউটি রচনা করতেই পারি আঁধার ঘেরা এই পৃথিবীতে। শেষে সফল হয়ে নিজেই হয়তো নিজেকে প্রশ্ন করব ---কে তুমি নন্দিনী?

Post a Comment

1 Comments

  1. অপূর্ব লিখেছেন।

    ReplyDelete