বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১০৮
আতা
ভাস্করব্রত পতি
'আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মৌ।
হিরে দাদার মড়মড়ে থান
ঠাকুর দাদার বৌ।।'
ছোটবেলায় এই ছড়াটি পড়েনি, এরকম ছেলে মেয়ে বাংলায় নেই। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই ছড়াটি আমাদের সাথে পরিচিত করে আতা গাছের সঙ্গে। বসতবাড়ির গায়ে এই গাছ জন্মায় বলে খুব আদুরে হয়ে থাকে।
আতাকে সংস্কৃতে আপ্য, গণ্ডগাত্র, হিন্দিতে আতা, সীতাফল, মেওয়া, শরীফা, ফারসিতে আতা, শরীফা, তামিলে সীতাপল্লম, তেলুগুতে সীতাপুন্দঃ, ওড়িয়াতে আত, ইংরেজিতে Sweet Shop, Castard Apple, Sugar Apple, Sugar Pineapple এবং Sweetsop বলে। আমেরিকার উষ্ণপ্রধান অঞ্চল থেকে আগত গাছটি ভারতের বিভিন্ন স্থানেই মেলে। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Annona squamosa Linn। এটি Annonaceae পরিবারের অন্তর্গত। আরেক ধরনের আতার দেখা মেলে। নোনা আতা। এটি একটু কমা। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Annona reticuleta। এছাড়াও আতার আরও কিছু প্রজাতির দেখা মেলে। লক্ষণ ফলের বিজ্ঞানসম্মত নাম Annona muricata। একে টক আতাও বলে। আর Annona cherimola কে বলা হয় হনুমান ফল। Annona senegalensis কে বলে আফ্রিকান নোনা আতা।
অত্রি সংহিতার ফলবর্গে এর নামোল্লেখ মেলে। সেখানে বলা হয়েছে-
'গণ্ডগাত্রং হিমং বৃষ্যং বাতপিত্ত নিসূদনম্। শ্লেম্মলং তর্ষ'শমনং বান্ত্যুৎক্লেশনাশনম্।।'
অর্থাৎ গণ্ডগাত্র ফলটি হল বলকারক (ধাতুবল), বাতপিত্তনাশক। এটি শ্লেষ্মাবৃদ্ধিকারক, তৃষ্ণাবারক, বমিনাশকও।
গণ্ডগাত্র আতা
এছাড়াও মাধব শর্মার নিঘন্টু রত্নাকর গ্রন্থে পাই --
'সীতাফলং গণ্ডগাত্রং রক্তপিত্ত মরুৎ প্রণুৎ। বাতলং কফকৃৎ স্বাদু হৃদ্যং চাপি বলপ্রদম্। তর্পণং মাংসকৃৎ দাহ পিত্তোপসর্গনুৎ পরম্।।' এর বঙ্গাব্দ করলে পাই, এই সীতাফলের দুটি নাম, সীতাফল ও গণ্ডগাত্র। এটি বায়ু ও কফকারক, স্বাদু, হৃদ্য, বলকারক, তৃপ্তিদায়ক, দেহের মাংসের বর্ধক এবং রক্তপিত্ত রোগে উপকারী। এটি দাহ এবং পিত্তবিকারগুলিও দূর করে।
আতা হল বহুশাখা বিশিষ্ট মাঝারি ধরনের গাছ। খুব একটা শক্ত কাণ্ড নয়। মোটামুটি ১০ - ১৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা। ছাল ধূসরবর্ণ। এদের কাণ্ড খুব একটা শক্ত নয়। পাতাগুলো লম্বাটে, অগ্রভাগ ক্রমশঃ সরু। ৩ - ৪ ইঞ্চি লম্বা ও ১ - ১.৫ ইঞ্চি চওড়া। ফলগুলির বিশেষত্ব আলাদা। সবুজ গোলাকার ফলের গাত্র মসৃন নয়। এবড়োখেবড়ো। অমসৃণ। এটি একটি গুচ্ছিত ফল। অর। অর্থাৎ একটি মাত্র পুষ্পের মুক্ত গর্ভাশয়গুলো হতে একগুচ্ছ ফল উৎপন্ন হয়। ফল পেকে গেলে রঙ পরিবর্তন করে। তখন সুগন্ধ হয়। ভেতরের কোয়াযুক্ত শাঁস বেশ মিস্টি। কোয়ার ভিতরে বীজ থাকে। কালো বীজগুলি হালকা বাঁকানো। এই বাংলার কোথাও কোথাও ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি কোনও বৃহস্পতিবারে হিন্দু বাড়িতে লক্ষীপূজার সময় পূজোর ডালিতে পঞ্চফলের সঙ্গে দেওয়া হত ভাদুরে আতা। ইদানিং অবশ্য পূজায় এই ফল অচল বললেই চলে।
আতা গ্রামবাংলার অতি পরিচিত একটি গাছ। স্বাভাবিকভাবেই এই গাছের নাম বিভিন্ন ভাবে চলে আসে ছড়া কবিতায়। তমলুক এলাকার প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক লোক খেলা 'ডিমাডিম' এর ছড়ায় ছোটদের মুখে বলতে শোনা যেত একটি ছড়া। যাতে এসেছে আতার প্রসঙ্গ --
'আতা গাছে তৈরি ফুল
মামা বাড়ি বহু দূর
ও মামা কেঁদোনা,
আতার বীজ
যাঁরা আবৃত্তি শেখান, তাঁরা তাঁদের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য Tongue Twister এ বলেন আতা নিয়ে একটি ছড়া - 'মিতা আটা হাতে আতা কাটে'। জনপ্রিয় এই ফলটি গ্রামবাংলায় সহজলভ্য। অনেক উপকারী গুণও রয়েছে এর।
পাকা আতা ফল বলবর্ধক, পিত্তপ্রশমক ও বমননিবারক। আতার ভেতরের নরম অংশ খেলে মাংসপেশী শক্তিশালী হয়। পাকা আতার শাঁস ফোঁড়াতে লাগালে তা তাড়াতাড়ি ফেটে দ্রুত পুঁজ বেরোতে সাহায্য করে। আতা গাছের পাতার রস থেকে কীটনাশক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। মাছের কাঁটা ফুটে যন্ত্রণা হলে উপশমের জন্য আতার পাতার রস বেশ উপকারী। জীবজন্তুর দেহের পুরাতন দগদগে ক্ষতে পোকা জন্মালে আতা পাতা ও তামাক পাতাকে গুঁড়ো করে এর সাথে চুনাপাথরের গুঁড়ো মিশিয়ে ঐ ঘায়ের উপর ছড়ালে পোকার মৃত্যু হয়।
🍂
0 Comments