মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৩
অনির্বাণ ভট্টাচার্য (চলচ্চিত্রাভিনেতা, মেদিনীপুর)
ভাস্করব্রত পতি
মেদিনীপুর শহরের বিধাননগরের অনির্বাণ ভট্টাচার্য এখন বাংলা ছায়াছবির ব্যস্ত অভিনেতা। ১৯৮৬ এর ৭ ই অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। এখানকার নির্মল হৃদয় আশ্রম ক্যাথলিক চার্চ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর ২০০৪ সালে তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। আসলে তিনি ভালোবাসতেন নাটক। তাই ভবিষ্যতে নাটককে ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলেন। তিনি যে ভুল পথ বাছেননি, তা তিনি প্রমান করে দিয়েছেন নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে নাটকের করিডোর দিয়ে হাঁটার মাধ্যমে। মেদিনীপুরের সন্তানরা জানে লড়াইয়ের অপর নামই 'সাফল্য'। তাই তিনি সফলতা খুঁজতে নিজের দক্ষতা পারদর্শিতাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন আপাদমস্তক। খুঁজেও পেয়েছেন পরশপাথর। আজ তিনি একাধারে চলচ্চিত্রাভিনেতা, অন্যদিকে তিনি সঙ্গীতকার, সুরকার, গায়ক, পরিচালক, লেখক। বিরল প্রতিভা নিয়েই 'মেদিনীপুরের মানুষ রতন' অনির্বাণ ভট্টাচার্যের পথচলা।
নাটক থেকে উত্তরণ তাঁর। মনোজ মিত্রের লেখা এবং দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় দেবী সর্পমস্তা নাটকে তাঁর অভিনয় ছিল চোখে পড়ার মতো। মঞ্চের সফলতাকে পাথেয় করে দ্রুত উত্তরণ তাঁর। নাটক নিয়ে তাঁর স্বপ্নের খেয়া চলাচল করেছে ২০০২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত। তখন তিনি ছিলেন শিক্ষার্থী। অনেক টানাপোড়েন, উত্থান পতনের সঙ্গী হয়ে খুঁজে নিয়েছেন নিজের ভবিষ্যৎ। কখনও লড়াই ময়দান থেকে সরিয়ে নেননি। এখনও নয়। তিনি মানেন, প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারলেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো সম্ভব। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মিনার্ভা রিপারটায়ার থেকে পদত্যাগ করেন। সেইসাথে একজন পেশাদার ফ্রিল্যান্স মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে নিজের গতি বাড়িয়ে নেন।
অনির্বাণ ভট্টাচার্য অভিনীত অন্যান্য নাটকগুলি হল বিজলিবালার মুক্তি (২০০৫), দূর বাজে, তুমি ডাক দিয়েছো কোন সকালে (২০০৭), শিল্পী (২০০৮), আমার আত্মহত্যাকালীন জবানবন্দী (২০০৯), কিং লিয়ার (২০১০), দেবী সর্পমস্তা (২০১১), চন্দ্রগুপ্ত (২০১২), অ্যান্টনি সৌদামিনী, তিনকন্যা, তিন পয়সার পালা, নাগমণ্ডলা (২০১৩), বিসর্জন, যারা আগুন লাগায়, ছায়াবাজি, ট্রয় (২০১৪), ইচ্ছের অলিগলি, কারুবাসনা, এফ এম মহানগর (২০১৫), অনুসরণ (২০১৬), অথৈ (২০১৭), পন্টু নাহা ২.০, তিতুমীর (২০১৯), মেফিস্টো (২০২১), ঘরে বাইরে (২০২২) ইত্যাদি। ২০১০ সালে তিনি নিজের নাট্যদল 'সংঘরাম হাতিবাগান' গঠন করেছেন। তাঁর পরিচালিত নাটকগুলি হল - গুরু, চৌমাথা, উদরনীতি, পন্টু নাহা ২.০ ইত্যাদি।
টেলিভিশনে তাঁর অভিনয় শুরু ২০১৫ তে। জি বাংলার টেলিফিল্ম 'কাদের কুলের বউ'তে প্রথম অভিনয় করেন এখানে। এরপর ২০১৭ তে অভিনয় করেন 'ঈগলের চোখ'তে। এখানে তিনি ছিলেন বিজন রায় নামক পার্শ্বচরিত্রে। এই চরিত্রের জন্য তিনি পান ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। আবার ২০১৯ এ সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান 'ঘরে বাইরে আজ'তে অভিনয়ের জন্য। প্রাক্তন সাংসদ মিমি চক্রবর্তী প্রথম সিনেমা 'দ্বিতীয় পুরুষ' এ ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে জি বাংলা সিনেমা অরিজিনালস এর সাথে কাদের কুলের বউ, যদি বল হ্যাঁ এবং এভাবে ফিরে আসা যায়তে অভিনয় চালান।
অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিনীত চলচ্চিত্রগুলি হল কলকাতার কিং (২০১৩), যদি বলো হ্যাঁ, এভাবেও ফিরে আসা যায়, আরশিনগর, কাদের কুলের বউ (২০১৫), কলকাতায় কলম্বাস, ঈগলের চোখ (২০১৬), ধনঞ্জয়, ঘ্যা চ্যাং ফু, দূর্গা সহায় (২০১৭), জোজো, আলিনগরের গোলকধাঁধা, পরীক্ষাগার, এক যে ছিল রাজা, উমা (২০১৮), ভিঞ্চি দা, অবশেষে ভালবাসা, বিবাহ অভিযান, গুমনামি, ঘরে বাইরে আজ, শাহজাহান রিজেন্সি (২০১৯), ডিটেকটিভ, ড্রাকুলা স্যার, দ্বিতীয় পুরুষ (২০২০), গোলন্দাজ, মুখোশ (২০২১), বল্লভপুরের রূপকথা (২০২২), মিঠে প্রেমের গান, মিসেস চ্যাটার্জী বনাম নরওয়ে, অনুসরণ, আবার বিবাহ অভিযান (২০২৩), আথোই (২০২৪), রঘু ডাকাত, এবং পক্ষীরাজের ডিম (২০২৫)। অপর্ণা সেনের 'আরশিনগর'এ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
গায়ক হিসেবেও অনন্য তিনি। গানের গলাটিপে সহজেই শ্রোতাদের মন কেড়েছে বারবার। সম্প্রতি তাঁর 'হুলি গান ইজম' এর গানগুলি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে 'কাগজ আমরা দেখাবো, দেখাবোই দেখাবো' গানটি। এর আগে 'আমাদের বকুলতলায় ভিড় জমেছে' গানটিও খুব সমাদ্রিত হয়েছে। তাঁর গাওয়া অনেক গানবেশ মনকাড়া। ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ সিনেমায় ‘কিচ্ছু চাইনি আমি’ গানটি এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এই গানের জন্য একাধিক পুরস্কার জুটেছে তাঁর। অভিনেতা থেকে গায়ক হিসেবে উত্তরণ এই গানের জন্যই। মেদিনীপুর শহর থেকে উঠে গিয়ে টলিউড মাতাতে এই মানুষটির লড়াই প্রণীধানযোগ্য।
দক্ষ অভিনয়ের জন্য তিনি পেয়েছেন অজেয় সম্মান ২০১৭। এছাড়াও জি বাংলা গৌরব পুরস্কার, ডাব্লুবিএফজেএ পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, মেটা অ্যাওয়ার্ড, নীরদবরণ স্মৃতি পুরস্কার, বিআইজিএফএম থেকে বিআইজি বাংলা রাইজিং স্টার পুরস্কার, শ্যামল সেন স্মৃতি সম্মান, সুন্দররাম সম্মান, হইচই পুরস্কার- ২০২০ পেয়েছেন তিনি। এইসব পুরস্কার কেবল তাঁর অভিনয় দক্ষতার মাপকাঠি নয়। তাঁর দক্ষতা তাঁর অভিনয় প্রতিভার মাধ্যমেই প্রস্ফুটিত।
আজ টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ পরিচিত মুখ তিনি। সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে পেরিয়ে পৌঁছাতে চেয়েছেন লক্ষ্যে। চোখের আগুন দিয়ে লিখেছেন ক্যারিয়ারের প্রেমপত্র। মনের খিদের সাথে সখ্য করে দাপিয়ে চলেছেন অভিনয়ের মঞ্চ। ক্যামেরা, অ্যাকশন, লাইট, প্যাক আপ শোনার জন্য মেদিনীপুর শহর থেকে কাঁসাই, ক্ষীরাই, রূপনারায়ণ, দামোদর ও ভাগীরথী পেরিয়ে হাজির হয়েছেন কল্লোলিনী কলকাতায়। ডুব সাঁতার তিনি ভালোই জানেন। আর রেসের শেষে জয়মাল্য জেতার ক্যারিশমাও তিনি আয়ত্ত করেছেন মেদিনীপুরের ঊষর মাটির সাথে লেপটে থেকেই।
🍂
0 Comments