দর্শনের আলোকে
তৃতীয় পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
(দার্শনিক আলোচনায় জীব বা আত্মা)
জীব যদি না থাকতো তাহলে কোন তাত্ত্বিক আলোচনা করার প্রেক্ষাপটই থাকতো না। তাই দার্শনিক আলোচনায় জীব মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিভিন্ন দর্শনে বিভিন্নভাবে দার্শনিকগণ জীব সম্পর্কিত তত্ত্ব ব্যক্ত করেছেন। কোথাও জীব অর্থে আত্মাকে গ্রহণ করা হয়েছে, কোথাও বা জড় দেহকেই জীব অর্থে ধরা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের কাছে জীব অর্থে যার জীবন আছে।কিন্তু বিস্তৃত অর্থে তথা দার্শনিক অর্থে জীব বা আত্মা বলতে এই জীব রূপ দৈহিক কাঠামোকে বোঝায় না। এর অন্তরালে স্থিত অনুভূতিগম্য শাশ্বত সত্তাকে বোঝায় যা স্বরূপতঃ চেতনাময়। যার জন্য এই দেহ সচল থাকে- প্রাণবন্ত থাকে। এই জীবসত্তা বা আত্মা অনুভূতি লব্ধ, বৌদ্ধিক লব্ধ। অভিজ্ঞতায় এর স্বরূপ সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। এ সম্পর্কিত বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ আলোচনা আমরা পাই বেদান্ততত্ত্বে। যেখানে জীব ও ব্রহ্মকে অভিন্ন বলে ধরা হয়েছে- জীব হল অনুচৈতন্য, ব্রহ্ম হল বিভু চৈতন্য। জীব যখন ব্রহ্মের সাথে তার একাত্মতা উপলব্ধি করে তখন এই জড় বুদ্ধি থেকে মুক্ত হয়। তখন সে ব্রহ্মে বিলীন হয়।
বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী আত্মার জন্ম হয় না, মৃত্যুও হয় না- এটি নিত্য, শ্বাশ্বত,এ কখনো পুরোনো হয়না, শরীরের মৃত্যুতে আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না।
🍂
আমাদের চিত্ত যখন একাগ্র হয়, শান্ত হয়, যখন অনুভূতির গভীরতায় আমরা নিমগ্ন হই, তখন আমাদের উপলব্ধি হয় যে, আমি এই দেহ নই, ইন্দ্রিয় নই, এসবের অতিরিক্ত আমাদের এক চিৎ সত্তা রয়েছে। যা এই জড় জগতের ভোগে সন্তুষ্ট হয় না- তা জ্ঞান চায়, শান্তি চায়। নিত্যনতুন কাম্যবস্তুর প্রতি আসক্তিতে তার কষ্ট হয়, সে চায় গভীর আত্ম উপলব্ধি। পূর্ণের সাথে সংযোগ সাধন- পূর্ণের সাথে তার সম্পর্কের উপলব্ধিতে নিজেকে জড় চেতনার থেকে মুক্ত করে চিন্ময় চেতনায় স্থিত হতে চায়।
"ঋত"তথা বিশ্বের অন্তর্নিহিত যে প্রাকৃতিক নিয়ম, সেখানে ধনী-দরিদ্র, উচ্চ- নীচ বলে কোন প্রভেদ নেই- সবাই সমান। আত্মা সেই কর্মফল ভোগের অসম্পূর্ণ প্রবহমানতাকে সম্পূর্ণ করে। দেহ বিনষ্ট হলেও কর্মজনিত চেতনার ছাপ আত্মাতে থাকে। আত্মা সেই অনুযায়ী পরবর্তী কর্ম সাধন করে। তাই আমাদের উচিত সবসময় ভালো কর্ম করা, ভালো জ্ঞান আহরণ করা। এই ভব সংসারে যেমন কোন ব্যক্তিকে তার চেতনা যাই হোক, কর্ম যেমন হবে তার ফলভোগ করতে হয়- ঠিক তেমনি আত্মা চেতনা সমৃদ্ধসত্তা হলেও বিবেকের দ্বার রুদ্ধ করে আমরা যেরকম কর্ম করি,আত্মাকে কর্মকর্তা রূপে সেই রকম কর্মফল ভোগ করতে হয়। তদনুরূপ তার জন্মান্তর পরিচালিত হয়।
আত্মার চেতনা জ্ঞান আমাদের কাছে বিবেকের প্রত্যাদেশরূপে প্রবৃত্তির গতিপথে বাধা সঞ্চার করতে চাইলেও, আমরা অনেক সময় এই জগতে অজ্ঞানতা পূর্ণ মায়ার আবরণ ও বিক্ষেপ কর্মে প্রলুব্ধ হয়ে সেই বিবেকের প্রত্যাদেশ অগ্রাহ্য করি। এবং প্রবৃত্তিবশতঃ বিবেকবিরুদ্ধ ইন্দ্রিয় প্রলুব্ধ কর্মে প্রবৃত্ত হই। কর্ম তো বিফলে যায় না-কর্মফল ভোগ করতেই হয়।
এই দেহ হলো আত্মার কর্মের মাধ্যম। আত্মা ওই খাঁচা বন্দী দেহের মধ্যে সেই কর্মফল ভোগ করার সময় কষ্ট পায়। দেহের থেকে তখন অন্তরের কষ্ট বড় হয়ে যায়। জড়দেহ, ইন্দ্রিয় যে কষ্ট পায়, তার অনেক বেশি কষ্ট আত্মা পায়।আত্মা মুক্তি চায়- জড় জগতের পঙ্কিলতা পূর্ণ পিছলপথে আত্মা হাঁটতে চায় না। সে চায় কর্মের বন্ধনে না বন্ধিত হয়ে সঠিক কর্ম করে,সঠিক জীবনযাত্রা নির্বাহ করে উচ্চতর চিন্তায়-উচ্চতর আদর্শে এই অস্থায়ী জীবন সময় কাল অতিবাহিত করতে। আত্মার মৃত্যু হয় না কিন্তু দেহের তো মৃত্যু হয়- পরিসমাপ্তি ঘটে, যতই প্রিয় হোক না কেন আত্মাকে এই দেহত্যাগ করে যেতেই হয়। এসবের জ্ঞান আত্মার থাকে, তাই আত্মা প্রথমে নির্লিপ্ত থাকে কিন্তু ধীরে ধীরে জড়জাগতিক চেতনা, সংস্কার আত্মার জ্ঞানচক্ষুর সামনে মায়াময় প্রভাব বিস্তার করে। একটা আচ্ছাদন টাঙিয়ে দেয় ওই আবরণের ফলে জগতের এই নশ্বরতারূপ কঠোর বাস্তব রূপ বোঝার জায়গায়, ইন্দ্রিয় সুস্থ না থাকলে ব্যক্তি যেমন সেই ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের সঠিক প্রত্যক্ষ জ্ঞান পায় না, ঠিক তেমনি বুদ্ধিও অস্থায়ী জিনিসকে স্থায়ী বলে মনে করে। জাগতিক বন্ধনে ইন্দ্রিয় প্রবৃত্তি প্রলুব্ধকারী বিভিন্ন বিষয়ে নিমগ্ন হয়ে প্রকৃত তত্ত্ব জ্ঞান বিস্মৃত হয়ে ও তদনুরূপ নানা রকম জড়জাগতিক কর্মে প্রবৃত্ত হয়ে অনন্তকাল ধরে সুখ-দুঃখক্লিষ্ট ফলাফল করতে হয় জীবাত্মাকে। এক দেহ ধারণ করে সেই জন্মে যদি কোন ফল ভোগ অসম্পূর্ণ থাকে, পরবর্তী দেহ ধারণ করে পরজন্মে সেই ফল ভোগ সম্পূর্ণ করতে হয়। আত্মা নিজ স্বরূপে স্থিত হয়ে, যতদিন না তদনুযায়ী তার কর্ম পরিচালিত করে জড় আসক্তি থেকে মুক্ত হয়, ততদিন এই জগতে কর্ম অনুযায়ী দেহ ধারণ করে সুখ-দুঃখ পূর্ণ জড়জাগতিক সংসারে আত্মাকে বারে বারে ফিরে আসতে হয় ও জন্ম- মৃত্যু, সুখ- দুঃখরূপ ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত হতে হয়।
0 Comments