অভিজিৎ হালদার
নীলিম-দহনের পাণ্ডুলিপি
হৃদয়ের গহনে এক হৃদ-মন্থিল হাহাকার,
তুমি নেই, তাই আকাশ আজ নীলিম-বিষাদ।
চৈত্র দিনের তপ্ত রোদে স্মৃতির মর্ম-ক্ষরণ,
তোমার চিবুকে ছিল যে তিল, তা আজ কাল-ক্ষতিল।
আমরা দুজনে গড়েছিলাম এক স্বপ্ন-বাসরিল,
যেখানে বাতাসের শব্দ ছিল সুর-মদিরা।
আজ সেখানে শুধু ধুলো আর অশ্রু-বীজক অন্ধকার,
বিরহ যেন এক ক্ষুধার্ত প্রাণ-ভক্ষিল রাক্ষস।
ডায়েরির পাতায় কলমের ডগা আজ নিঃসঙ্গ-নীল,
শব্দেরা সব মিছিমিছি মৌন-বিলাপী সাজে।
তুমি ছিলে আমার বিকেলের গোধূলি-প্রতিমা,
এখন তুমি অন্য কারো সুখ-প্লাবন।
আমার একাকীত্ব এক পাথর-প্রতিম নীরবতা,
যেখানে প্রতিধ্বনি হয় শুধু হৃদ-চূর্ণিল শব্দ।
প্রেমের মরা গাঙে আজ শূন্য-সাঁতার,
লোনা জলে ভিজে ওঠে স্মৃতি-কঙ্কাল।
তুমি কি শোনো সেই নিশি-ক্রন্দন?
যা আমার বুকের ভেতর দহন-বীজ বোনে।
এক ফোঁটা জলের নাম দিয়েছি নয়ন-বিষ,
যা পান করে বেঁচে আছে এই ছায়া-শরীর।
বিরহের আকাশে ওড়ে ব্যথা-গাঙচিল,
তাদের ডানায় লেগে আছে বিচ্ছেদ-রক্ত।
আমি একলা দাঁড়িয়ে এই স্মৃতি-প্রান্তিল মোড়ে,
যেখানে সময়ের ঘড়ি আজ স্তব্ধ-পাথর।
প্রেমিকা, তুমি কি এখনও হাসি-বিলাসী?
নাকি তোমার চোখেও নামে মেঘ-আঁধার?
আমাদের বিচ্ছেদ এক মহাজাগতিক-ক্ষত,
যা সারিয়ে তোলার কোনো মন্ত্র-ঔষধি নেই।
বিদায় বেলায় দিয়েছিলে এক শীতল-চুম্বন,
যা আজও আমার কপালে বরফ-জ্বালা হয়ে আছে।
🍂
অস্তিত্বের প্রেতচ্ছায়া
চারদিকে শুধু অস্তিত্ব-ধূসর কুয়াশা,
আমার ভেতরে এক হতাশা-বৃক্ষ শাখা মেলেছে।
দিনগুলি কাটে যেন শূণ্য-বিলাসী খেলায়,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস এক সঙ্কট-ক্লেশিল বোঝা।
আমি খুঁজছি এক আলোক-কণা বিহীন ঘর,
যেখানে বিষণ্ণতা হবে আমার মরণ-মাধুরী।
পৃথিবীর ভিড়ে আমি এক জন-বিচ্ছিন্ন দ্বীপ,
সমুদ্রের ঢেউয়ে মেশে আমার লবণ-কান্না।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখি এক ভস্ম-মানুষ,
যার চোখের মণি আজ দৃষ্টি-হীনিল।
সফলতার গল্পগুলো সব মিথ্যা-মলাট,
আমার প্রাপ্তি শুধু শূন্য-ঝুলির আর্তনাদ।
কেউ বোঝে না এই মর্ম-ছিদ্রিল যন্ত্রণা,
সবাই খোঁজে শুধু মুখোশ-হাসির আড়াল।
হতাশার কালো মেঘে ঢাকা মন-নীলিমা,
সেখানে বৃষ্টি হয়ে ঝরে রক্ত-অভিমান।
জীবন যেন এক ক্লান্তি-মিছিল পথ,
যেখানে গন্তব্য শুধু অন্ধকার-পুরী।
আমি এক বিফল-বিলাসী নাবিক,
যার কম্পাস আজ দিক-ভ্রান্তিল।
সমাজের চোখে আমি এক উচ্ছিষ্ট-ছায়া,
যার অস্তিত্বের কোনো মূল্য-রেখা নেই।
বিছানায় শুয়ে শুনি দেওয়াল-ঘড়ির বিদ্রূপ,
টিক-টিক শব্দে কমে যায় আয়ু-রেখা।
একাকীত্বের এই মৌন-প্লাবন থেকে,
আমাকে বাঁচানোর মতো কোনো হাত-স্পর্শ নেই।
আমি নিজেই নিজের কবর-খনিল,
যেখানে জীবন্ত দাফন হয় ইচ্ছে-পাখি।
হতাশার এই বিষ-পানীয় পান করে,
আমি অমর হতে চাই এক মৃত-মহাকাব্যে।
অরণ্য-রোদনের গান
অরণ্যের গভীরে আজ সবুজ-বিলাপ,
কুঠারের আঘাতে কাঁদে বৃক্ষ-আত্মা।
নদীর বুক চিরে জেগে ওঠে বালু-হাহাকার,
যেখানে জল ছিল, সেখানে আজ তৃষ্ণা-দহন।
প্রকৃতি আজ এক ধর্ষিত-মানবীর মতো,
যার আঁচলে লেগে আছে মানুষ-লোভ।
পাখিরা ভুলে গেছে তাদের কণ্ঠ-রাগিণী,
আকাশে ওড়ে শুধু ধোঁয়া-কুণ্ডলীর সাপ।
পাহাড়ের চূড়ায় আজ বরফ-অশ্রু,
যা গলে মিশে যায় ধ্বংস-স্রোতে।
আমরা গড়েছি এক ইট-পাথর এর খাঁচা,
যেখানে বাতাস আজ বিষ-বাষ্পিল।
ফুলের পাপড়িতে নেই রেণু-সুরভি,
সেখানে জমেছে শুধু সীসা-ধুলো।
অসহায় হরিণ খোঁজে তৃণ-ভূমি,
কিন্তু পায় শুধু কংক্রিট-জঙ্গল।
পৃথিবীর ফুসফুসে আজ ক্যান্সার-ক্ষত,
আমরাই সেই ঘাতক, সভ্যতা-নামধারী।
মেঘেরা অভিমান করে বৃষ্টি-হীন,
মাটি ফেটে চৌচির, এক ক্ষুধা-চিত্র।
সমুদ্রের উদরে আজ প্লাস্টিক-বিষ,
মাছেদের চোখে ভাসে মৃত্যু-আতঙ্ক।
আমরা কি তবে এক আত্মঘাতী-প্রজন্ম?
যারা ধ্বংস করছি নিজের জন্ম-নাড়ি।
অসহায় প্রকৃতি আজ মৌন-প্রতিবাদী,
তার দীর্ঘশ্বাসে আসে প্রলয়-ঝড়।
এই পৃথিবীকে দিয়েছি শুধু আবর্জনা-স্তূপ,
বদলে নিয়েছি এক অভিশপ্ত-ভবিষ্যৎ।
অরণ্যের কান্নায় আজ নিশুতি-আঁধার,
যেখানে মানুষ হারিয়েছে তার বোধ-অরণ্য।
প্রেমিকার জন্য একটি প্রেত-পত্র
প্রিয়তমা, তুমি কি জানো আমি ছায়া-বন্দী?
আমার প্রতিটি রাত এক ঘুম-হীনিল প্রহর।
তোমার হাতের স্পর্শ ছিল জাদু-পরাগ,
এখন আমার হাত শুধু শূন্য-মুঠো।
জানলার গ্রিলে মাথা রেখে দেখি চাঁদ-ক্ষয়,
যেন আমার প্রেমের শেষ-অবশেষ।
তুমি বলেছিলে তুমি হবে চির-সাথী,
অথচ এখন তুমি এক দূর-নক্ষত্র।
তোমার হাসির শব্দ ছিল ঝর্ণা-বিলাসী,
এখন আমার ঘরে শুধু শূণ্য-নৈঃশব্দ্য।
একাকীত্ব এক ধীর-বিষ এর মতো,
যা আমার রক্তে মিশে গেছে মজ্জা-অবধি।
আমি আয়নায় দেখি তোমার ছায়া-মূর্তি,
হাত বাড়ালেই পাই শুধু ঠাণ্ডা-কাঁচ।
প্রেমের এই মায়া-জাল ছিঁড়ে তুমি মুক্ত,
আমি পড়ে আছি এক স্মৃতি-আঁস্তাকুড়।
প্রেমিকা, তোমার কি মনে পড়ে সেই বৃষ্টি-বিলাস?
যখন এক ছাতার নিচে ছিল বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড।
আজ আমি ভিজি একলা জল-যন্ত্রণায়,
যেখানে প্রতিটি ফোঁটা এক স্মৃতি-দংশন।
তোমার শাড়ির আঁচলের সুগন্ধ-ঘ্রাণ,
আজও আমার ঘরে বাতাস-বন্দী।
আমি এক অপেক্ষা-পাথর হয়ে বসে আছি,
যদিও জানি তুমি আসবে না কাল-চক্র ঘুরে।
আমার একাকীত্ব এক অন্ধকার-বিবর,
যেখানে আমি নিজেই নিজের কথা-সঙ্গী।
প্রেমিকার নামে লিখেছি এক রক্ত-কবিতা,
যা পড়ার কেউ নেই এই নির্জ্জন-পুরে।
তুমি সুখে থেকো অন্য কোনো আলোক-লতায়,
আমি না হয় মিশে যাই এই একাকী-নীলিমে।
মহাজাগতিক বিষাদ-পুরাণ
মহাকাশের শূন্যতায় ঘোরে নক্ষত্র-রোদন,
প্রতিটি গ্রহ যেন এক একাকী-যাত্রী।
সময় এক নিষ্ঠুর-কারিকর এর নাম,
যে গড়ে আর ভাঙে সৃষ্টি-কঙ্কাল।
মানুষের জীবন এক বুদবুদ-ক্ষণ,
যা ফেটে যায় এক মহাকাল-চমক এ।
আমরা সবাই এক অস্তিত্ব-সংকটে রত,
কেউ জানে না কোথা থেকে এই জন্ম-বিলাপ।
গ্যালাক্সির ধুলোয় ওড়ে স্মৃতি-রেণু,
হাজার বছরের কান্না আজ শব্দ-হীনিল।
বিজ্ঞানের দম্ভে আমরা অন্ধ-বিলাসী,
অথচ মহাজগতে আমরা এক ধূলি-কণা।
এই বিশাল শূন্যতা এক ভয়-জাগানিয়া সত্য,
যেখানে ঈশ্বরও বোধহয় একাকী-বিষণ্ণ।
ব্ল্যাক হোলের গহ্বরে হারায় আলোর-স্বপ্ন,
যেমন আমার ভেতরে হারায় ইচ্ছে-নদী।
পৃথিবীর ইতিহাস এক রক্ত-মাখা গল্প,
যেখানে বারবার জয়ী হয় ধ্বংস-দেবতা।
ভালোবাসা এক ভ্রম-মরীচিকা মাত্র,
যা শুধু বাড়িয়ে দেয় বিরহ-জ্বালা।
আমরা সবাই একেকজন মহাজাগতিক-একা,
ভিড়ের মাঝেও এক নিঃসঙ্গ-সত্তা।
হতাশা কোনো অসুখ নয়, এ এক বোধ-উপলব্ধি,
যে জেনেছে জীবনের অন্তিম-শূন্যতা।
আকাশপানে চেয়ে খুঁজি মুক্তি-পথ,
কিন্তু মহাকাশও এক বৃহৎ-কারাগার।
নক্ষত্ররা যখন মরে যায় তীব্র-বিস্ফোরণে,
তখন কি তারাও পায় কোনো শান্তি-শীতল?
মহাবিশ্বের এই বিরাট-বিমূর্ত ক্যানভাসে,
আমাদের দুঃখ শুধু এক বিন্দু-বিষাদ।
0 Comments