জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৭৫/ভাত আর পিঠেয় রাজার আসন/ভিয়েতনাম (এশিয়া)/চিন্ময় দাশ


দূর দেশের লোকগল্প— ২৭৫

ভাত আর পিঠেয় রাজার আসন

ভিয়েতনাম (এশিয়া)

চিন্ময় দাশ


এক রাজা আর তার রানি। সাত-সাতজন ছেলে তাদের। সুখেই দিন কেটে যায় রাজারানির।

দেখতে দেখতে বয়স হলো রাজার। মন্ত্রীকে ডেকে বলল-- আয়োজন করো। সময় থাকতে ছেলেটাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে যাই।

 রাজার মন্ত্রী বুড়োমানুষ। বলল-- একটা কথা বলি, রাজামশাই। রাজা বলল—বলো, কী কথা তোমার। 

--আমি বলছি, বড়ছেলেকেই রাজা করার কথা ভাবছেন তো?

--হ্যাঁ, তাই তো করতে হবে।

--আমি অন্য কথা বলছিলাম। একেবারেই অন্য কথা। রাজার মুখ গম্ভীর—বলো, কী তোমার অন্য কথা।

মন্ত্রী বলল-- রাজার কাজ হচ্ছে রাজ্য রক্ষা আর প্রজাপালন। আপনার সাতটি ছেলে। কোন ছেলেটি সেই কাজে বেশি দড়, বেশি মনোযোগী-- সেটা বিচার করে, তবে রাজা করার কথা ভাবা হোক।

রাজা একটু চুপ করে রইল। পরে বলল-- মন্দ বলনি হে। কথাটা খুব কাজের। একটু ভেবে দেখতে দাও। 

দরবার শেষ হলো। মহলে ফিরে গেলেন রাজা। মুখ গম্ভীর দেখে, রানী বলল-- কিছু ভাবছো মনে হচ্ছে। এমন চুপচাপ কেন?

রানিকে কথাটা খুলে বলল রাজা।  অনেক কথা অনেক পরামর্শ হলো দুজনে। শেষে দুজনেই একমত হল, পুরাণো নিয়মের বাইরে বেরোবে তারা। পরীক্ষা করে দেখবে, কোন ছেলেটি রাজা হওয়ার উপযুক্ত। তাকেই রাজা করা হবে। 

মন্ত্রীকে ডেকে বলল-- তোমার কথাই রাখছি, বুঝলে? সেই ছেলে রাজা হবে, যে রাজা হবার উপযুক্ত। একটা পরীক্ষা নেব আমি।

বছর শেষ হয়ে আসছে। সাত দিন বাকি আর। সাত জন ছেলেকে ডেকে, রাজামশাই বলল-- সাত দিন বাদে নতুন বছর শুরু। নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দিচ্ছি তোমাদের। যে জয়ী হবে, তাকেই রাজা করা হবে। বয়স হয়েছে আমার। তোমাদের কেউ একজন রাজ্যের দায়িত্ব নাও।

বড় ছেলের মুখ গম্ভীর। বাকি পাঁচজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো 

রাজা বলল-- বড় ছেলেদের রাজা হওয়ার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম এখন থেকে বাতিল করা হলো। সাতজন ছেলের মধ্যে যে উপযুক্ত প্রমাণ করতে পারবে নিজেকে, রাজা হবে সেই।

ছেলেরা জানতে চাইল তারা কিসের প্রমাণ দেবে। রাজা বলল-- ঠিক ৭ দিন বাদে, নতুন বছর। সেদিন তোমরা দরবারে এসে হাজির হবে। কোনও একটা উপহার নিয়ে আসবে আমার জন্য। যার উপহার সেরা হবে, তাকেই রাজার আসনে বসানো হবে। 

সবাই চুপ। বড় ছেলে বলল-- আপনাকে যোগ্য উপহার দেবো, সেই ক্ষমতা আমাদের কোথায়? তেমন জিনিষ জোগাড় করব কেমন করে আমরা? 

রাজার মুখে হাসি-- সেটা আমিও জানি। ঠিক আছে। এক কাজ কর তোমরা। খাবার বানিয়ে নিয়ে এসো। যার খাবার সেরা হবে, জয়ী হবে সে-ই।

ছেলেরা যে যার মহলে ফিরে গিয়েছে। তাদের বউরা জানতে চাইল, কী পরীক্ষা দিয়েছে রাজামশাই। সেরা খাবার রাজাকে উপহার দিতে হবে শুনে, সবাই খুশি। এটা এমন আর কী কঠিন পরীক্ষা। সবাই ভাবল, আমাদের খাবারই সেরা হবে। তাহলে আমরাই রাজা আর রানি হতে পারব।

🍂

বড় আর মেজ দুই ছেলের বৌদের মধ্যে খুব ভাব। তারা দু’জন ঠিক করল, মাংস রান্না হবে রাজার জন্য। মাংসের চেয়ে ভালো খাবার, আর কী হতে পারে? বড় আর মেজো দু’ ভাই শিকারে বেরোল। বড় বলল-- আমি হরিণ শিকার করব। মেজো বলল-- তাই করো। আমি তাহলে খরগোশ শিকার করি।

সেজো আর সান ছেলের বউদের মধ্যেও খুব ভাব। তারা বলল-- আমরাও মাংস রান্না করব। তবে সেটা পাখির মাংস। সেই দুই ছেলে তীর-ধনুক নিয়ে  বেরোলো পাখি শিকার করতে। 

তাদের পরের দুই ভাইয়ের বউ ঠিক করল, তারা মাছের পদ রান্না করবে। সমুদ্র পারের দেশ তাদের। রাজার নিশ্চয় পছন্দ হবে।  সেই দুই ভাই বেরোলো নৌকা সাজিয়ে। একজন বলল, আমি বিখ্যাত টুনা মাছ নেব। এটা বাবারও খুব পছন্দের। অন্যজন বলল-- ঠিক আছে। আমি তাহলে কাঁকড়া নিয়ে যাব।

বাকি রইল ছোট ছেলে। বড় ছ’জন তাকে পছন্দ করে না। সেই ছেলে এক্কেবারে অন্যরকম। রাজার ছেলে-- সে কথা মনেই থাকে না তার। সাদাসিধে সরল মানুষ। তার কপালও এমন, বউ পেয়েছে এক্কেবারে তার নিজের মতোটি। তারা নিজের মতো থাকে। অন্যদের কারও সাতেও থাকে না, পাঁচেও থাকে না। রাজপ্রাসাদে আটকে থাকতে মন চায় না দুজনের। গাঁয়ের দিকে চলে যায় তারা। রাজামশাই জানে, একটা বাগানবাড়ি আছে ছোট ছেলের। সেখানে তারা নিজের হাতে চাষবাসও করে। সেখানকার প্রজারাও খুব ভালোবাসে ছোট ছেলেকে। 

দরবারে রাজার ঘোষণা শুনে, ছোটছেলে চলল গ্রামের বাগানবাড়িতে। সাথে তার বউ আর দু’জন ছেলে মেয়ে। তখন হেমন্তকাল। সোনার রঙ লেগেছে ধানের শীষে। একটা শীষ ছিঁড়ে নাকে ঠেকিয়ে শুঁকে দেখল ছেলেটা। কী মিষ্টি সুবস!

চারজনে মিলে ধান তোলা হল ক্ষেত থেকে। ধান শুকানো হলো। মাড়ানো হলো। ছেলে মেয়ে দুটো বলল-- আমরা কী নিয়ে যাব দাদামশাইর জন্য? 

বউটি বলল—শুধু ভাত নয়। কিছু পিঠেও বানাব আমরা।  চালের গুঁড়িও বানাতে হবে। 

সেটাই ঠিক করা হোল। দু’ রকম খাবার নিয়ে যাবে তারা। ভাত রান্না হবে, পিঠেও তৈরি হবে সেই সাথে। ছোট ছেলে আর তার মেয়ে বসল ভাত রান্না করতে।  পিঠে তৈরি করতে বসল বৌটি আর তাদের ছেলে।

যোগাড়যন্ত্র করতে পুরো সাত দিন সময় ছিল হাতে। সবাই সেরাটা বানিয়েছে তাদের সাধ্য মতো। সাত দিন কেটে গেল দখতে দেখতে। পরের দিন নতুন বছর শুরু। সবাই গিয়ে হাজির হয়েছে দরবারে। সকলের হাতেই রাজার জন্য তৈরি খাবার। 

দরবারে সেদিন ভারি ভীড়। থিকথিক করছে গোটা দরবার। সবার চোখে কৌতুহল, সাত ছেলের মধ্যে কার কপালে শিকে ছেঁড়ে। কে হয় দেশের রাজা।।

রাজা বসেছে তার আসনে। পাশে মন্ত্রীমশাই। সেই সাথে সেনাপতি, কোতোয়াল, উজির, নাজির মিলে আরো সাতজন। এখানেই শেষ নয়। পাশে আরো পাঁচ জন এসে বসেছে। মন্ত্রীর পরামর্শে, পাঁচজন সাধারণ প্রজাকেও আনা হয়েছে দরবারে। আজ তারাও বসেছে বিচারকের আসনে।

বুড়ো মন্ত্রী বলেছিল, রাজা হল প্রজাদের পিতার সমান। সাতজন ছেলের কেউ তাদের কথাও ভাবছে কি না, সেটাও দেখে নেওয়া দরকার। বলেছিল, রাজামশাই, আমি আপনি দুজনেই আর বেশি দিন থাকবো না। থাকবে আপনার প্রজারা। তাদের কথা ভাবছে, এমন একজন যদি বের হয় ছেলেদের মধ্যে থেকে, সেই হবে উপযুক্ত রাজা।

খুশি মনে মন্ত্রীর কথা মেনে নিয়েছিল রাজামশাই। তাই পাঁচজন প্রজাকেও এনে বিচারকের আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

বিশাল একখানা খাবার টেবিল। তার দুদিকে ১৪ জন বিচারক বসেছে। বড়ছেলে থেকে খাবার দেওয়া শুরু হল। সে এনেছে হরিণের সুস্বাদু মাংস। মেজো ছেলে এনেছে খরগোশের নরম মাংস। খাবার দেওয়ার সাথে সাথে সুগন্ধে ভরে গেছে গোটা দরবার। সেজো ছেলে নামালো ময়ূরের মাংস। কী নরম আর তুলতুল সেই মাংস। তাতে স্বাদও তেমনি। ছোট্ট তিতির পাখি রান্না করে এনেছে শানছেলে। সেও ভারি সুস্বাদু।

এবার এল ন’ছেলে এবং তার পরের ভাই। নোনা জলের সাগরের তীরে ভিয়েতনাম। সে এনেছে মহার্ঘ টুনামাছের রান্না। পরের জন এনেছে কাঁকড়ার সুস্বাদু পদ। 

সকলের রান্নাই পরখ করে দেখছে বিচারকরা। প্রত্যেকটা রান্নাতেই তারা ভারি খুশি। চোখ মুখ দেখে সেটা বুঝতেও পারছে সবাই। 

রাজা আর মন্ত্রী দুজনেই লক্ষ্য রাখছে পাঁচজন প্রজার দিকে। ভারী ফুর্তির সাথে খাচ্ছে পাঁচজন। এমন খাবার তাদের কপালে জোটেনি কোনও দিন। এমনকি স্বপ্নও দেখেনি তারা। আজ বরাত জোরে পেয়েছে যখন, চেটেপুটে খাচ্ছে পাঁচ জনে।

এবার সবশেষে ছোটছেলের পালা। চারজনেই দাঁড়িয়ে আছে তারা। রাজবাড়ির দামি কোনও পাত্র নাই তাদের হাতে। তারা খাবার এনেছে সবুজ কলাপাতায় মুড়ে। সে খাবার যখন টেবিলের নামিয়ে দেওয়া হলো, গোটা দরবার স্তব্ধ হয়ে গেল। কথা নেই কারও মুখে। তবে, বড় ছয়জন ভাই আর তাদের বৌদের মুখে বাঁকা হাসি। ছিঃ-ছিঃ, এটা একজন  রাজার খাবার! এই খাবার রাজা মুখে তোলে কখনও! রাজাকে কীভাবে খাবার দিতে হয়, এটুকু জ্ঞানও নাই এদের মাথায়!

দরবারের কেউ নয় তো বটেই। বিচারকের আসনে যারা বসে আছে, তারাও কেউ ভাবেনি এমন করে এমন খাবার কেউ রাজার সামনে নামিয়ে দেবে। নিজেরাও মুখ চাওয়া চাওয়ি করল সকলে। 

রাজা আর মন্ত্রী—দুজনের মুখেই পাতলা হাসি। দুজনেই তাকিয়ে প্রজাদের দিকে। কলাপাতায় মোড়া ভাত আর পিঠেগুলো মেলে দেওয়া হয়েছে। চোখে পড়তেই, আলো জ্বলে উঠেছে পাঁচজনেরই মুখে। সে আলো বড়ই আন্তরিক।  

সাদা ভাতই। কিন্তু কী সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে তার। এমন ভাতও তাদের জীবনে জোটেনি। পিঠের মধ্যে পুর ভরে দেওয়া। তারপর দুধে সেদ্ধ করা হয়েছে পিঠেগুলোকে। কী মিষ্টি গন্ধ!

খাবার পরখ করে দেখার কাজ শেষ হলো। রাজা সকলকে মতামত দিতে বললেন। এখানেই হলো সমস্যা। রাজার যারা কর্মচারী সাত জন, তারা কেউ মুখ খুলছে না সঙ্কোচে। সবাই রাজকুমার। 

রাজাও সে কথা বুঝলেন। মন্ত্রীকে বলল—এখন কী করা যায়? 

মন্ত্রী হেসে বলল-- পাঁচজন প্রজার মতামত নেওয়া হোক। কেন না, তারাই থাকবে নতুন রাজার রাজ্যে। নিজেদের রাজাকে তারাই পছন্দ বেছে নিক।

সবাই সায় দিল এ কথায়। একই সমস্যা প্রজা পাঁচজনেরও। সবার সামনে কি করে মুখ ফুটে একজনকেই সেরা বলে। 

রাজা বলল-- কোন ভয় ভাবনা নেই। নিশ্চিন্তে তোমরা তোমাদের মতামত দিতে পারো। 

পাঁচজন তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কিছু আলোচনা করল। একজনকে দায়িত্ব দিল, সে সকলের মতামত জানিয়ে দেবে। 

রাজা বলল-- ঠিক আছে। তাই বলো তোমরা। 

সেই প্রজা বলল—রাজামশাই, প্রথম ছয় জন রাজকুমার যে খাবার এনেছে, সে আমাদের স্বপ্নেরও বাইরের জিনিষ। খুবই পছন্দও হয়েছে আমাদের। জীবনে এই প্রথম খেলাম এমন খাবার। হয়তো এটাই জীবনে শেষও। কেন না, এ খাবার কেবল রাজারই। পফ্রজার নয়। কোন রাজাই তার প্রজাদের জন্য চিরকাল এই ব্যবস্থা করতে পারবেন না।

রাজা মন্ত্রী দুজনেই মাথা নাড়ছে। প্রজাটি এবার বলল—কিন্তু আপনার ছোট ছেলে এনেছে ভাত আর চালের পিঠে। যা আমরা দিন দু’বেলা খেয়ে থাকি। তবে, আজকের ভাত আর পিঠে অনেক ভালো ছিল। আমাদের রায় হল, এই ভাত পিঠেই আমরা যেন দু’বেলা পেট ভরে খেতে পাই-- তেমন রাজাই হোক আমাদের। ছোট ছেলেকেই রাজা দেখতে চাই আমরা। কোনও প্রজার যেন ভাতের অভাব কোনদিন না হয়। সেটাই আশা করে থাকব আমরা।

অন্য বিচারকদের কিছু বলতে হলো না। দরবার শুদ্ধ সকলে হৈ হৈ করে উঠলো-- সঠিক কথা। সঠিক কথা। এমন রাজাই আমরাও চাই। ছোট রাজকুমারকেই রাজা করা হোক। আমাদের সকলের সায় আছে।

তার পর? তার পর আর কী? রায় তো হয়েই গেছে বিচারের। 

ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দেয়া হোল গোটা রাজ্যে। ছোট রাজকুমারের অভিষেক। রাজ্যের সব প্রজার নেমন্তন্ন! কাড়া- নাকাড়া বাজিয়ে, সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হল ছোট ছেলেকে।

Post a Comment

0 Comments